গ্রেটওয়ালের দেশে-৭ম পর্ব

Prince Gongs Palace

১২ নভেম্বর দুহাজার ষোল। আজ শনিবার। সপ্তাহান্তের প্রথমদিন। আমাদের সাইটসিইং আজা প্রিন্স কুংস(Prince Kung’s) ম্যানশন। পাশেই হেইবেই পার্ক। প্রিন্স কুংস ম্যানশনকে এখানে সবাই প্রিন্স গংস (Prince Gong’s) প্যালেস বলে থাকে। এটি মিং ডাইনেস্টিরও পূর্বের সময়কার চিং ডাইনেস্টির আমলের স্থাপনা। এরা উচ্চারণ করছে চিং ডাইনেস্টি কিন্তু ইংরেজীতে লিখে থাকে Qing Dynasty নামে। চীনাদের উচ্চারণের সাথে ইংরেজী লিখিত রূপের বিষয়টায় এ ধরণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখি। এই প্যালেসে অনেকগুলো হল আছে। যেমন ইউ’নান হল, লেডস হল ইত্যাদি বড় বড় হল। এসব হলে তৎকালিন রাজরাজড়াদের  গুরুত্বপূর্ণ ব্যঅতিথিরা থাকতেন। জানা যায়, ১৮৫২ সালে প্রিন্স কুং তার দরবারের নাম দেন Ledao হল। প্যালেসটির একটি বৃহদাংশ জুড়ে রয়েছে কৃত্রিম হ্রদ। প্যালেসের সামনের গবাক্ষপথে এ হ্রদের সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। এছাড়া প্রাসাদের বাইরে এসে এই হ্রদের পাড়ে বসা যায় এবং হ্রদে নৌ-ভ্রমণও করা যায়। প্রিন্স কুংস প্যালেসে আছে ট্যুরিস্টগণের জন্য বিভিন্ন স্যুভেনির শপ। এখান থেকে আমি একটি কাঠের তৈরি ব্যাঙ কিনলাম। ব্যাঙের পেটের ছিদ্রপথে রাখা কাঠের কাঠিটি দিয়ে ব্যাঙের পিঠে বুলিয়ে দিলে কুনোব্যাঙের ডাক শোনা যায়। এখানকার বুকশপ থেকে প্রিন্স কুংস প্যালেস নামে একটি বইও কিনলাম। বইটি চীনা ও ইংরেজী ভাষায় লিখিত।

 

প্রিন্স কুংস প্যালেস দেখার পর নিকটবর্তী একটি মুসলিম রেস্তোঁরায় গিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সম্পন্ন করা হলো। এরপর আমরা গেলাম Wang Fu Jing স্ট্রীট। এখানে আছে বড় শপিং এরিয়া। ইলেক্ট্রনিক খেলনা, রোবট, ড্রোন ইত্যাদি ছাড়াও ব্যাগ, ঘড়ি, সিল্কের পোশাক ও থান কাপড় পাওয়া যায়। অনেকেই অনেক কিছু কেনাকাটা করলো। আমি এখানে একটি বড় বুকস্টোর পেলাম। বুকস্টোরের প্রতি আমার চিরায়ত দুর্বলতা। বুকস্টোর ভবনটি পাঁচতলা। প্রতিটি ফ্লোরে খুব সুন্দরভাবে বই সাজানো আছে বিভিন্ন শেলফে। সব ফ্লোরে চীনা ভাষার বই, শুধু চতুর্থ তলাটি ইংরেজী ভাষার বইয়ে ঠাসা। চীনা লেখকের বই ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লেখকের ক্লাসিক থেকে শুরু করে আধুনিক ইংরেজী বই এখানে পাওয়া যায়। ঘুরে ঘুরে আরামদায়কভাবে বই দেখার জন্য যথেষ্ট ফাঁকা স্থান আছে। এক জায়গায় দেখলাম, একটি শিশু তার বাবার সাথে ফ্লোরে বসে বই পড়ছে। আমি বুক-স্টোরটি থেকে দুটো বই কিনলাম। একটির নাম A History of Mathematics এবং অপরটি Uncle Tom’s Cabinবইয়ের দাম তুলনামূলকভাবে আমাদের চেয়ে বেশ কম। বইয়ের পাতার এবং ছাপার গুণগত মান আমাদের তুলনায় অনেক ভাল। আমাদের দেশে বই পুস্তকের দাম যথেষ্ট বেশি এবং কাগজ ও ছাপার মানও অনেক নীচে।

 

বুকস্টোর থেকে বেরিয়ে ভবনটির বাইরে রাস্তার ডানপাশে এবারে গেলাম বেইজিং আর্টস এ্যাণ্ড ক্র্যাফটস এম্পোরিয়ামে। এটিও দেখলাম পাঁচতলা ভবন। প্রতি তলা বিভিন্ন আর্টস-ক্র্যাফটস সামগ্রীতে ভরা। বিভিন্ন ধরনের অলঙ্কার যেমন সোনা, রূপা, প্লাটিনাম ইত্যাদি এবং বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান রত্ন বা পাথরের যেমন এমেরাল্ড, জেড, আকীক, ডায়মণ্ড ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের রত্নের জুয়েলারি আইটেম আছে। কোন ফ্লোরে এন্টিকস, কোনটিতে আর্টওয়ার্ক, পেইন্টিংস, হাণ্ডিক্র্যাফটস ইত্যাদির অথেনটিক দোকান। বেইজিং এর অনেক জায়গা আছে যেখানে ভীষণ রকম দামাদামি করে দ্রব্য ক্রয় করতে হয়। কিন্তু এখানে নো বারগেইনিং। ফলে এখানে ঠকা বা জেতা কোনোটিরই সম্ভাবনা নেই।

এসব দেখে সময় শেষ হয়ে এলে আমরা যার যার মতো গিয়ে আমাদের বাসে উঠলাম আমাদের হোটেলে ফিরে যাবার জন্য।

 

তেরো নভেম্বর দুহাজার ষোল। আজ আমরা গেলাম সামার প্যালেস নামক একটি অনুপম সৌন্দর্যমণ্ডিত জায়গায়। কিন্তু সামার প্যালেসে যাবার পথে যে ঘটনাটি ঘটল তা একটি অবাক করা ঘটনা। কোন ট্যুরিস্ট বাসই সামার প্যালেসের গেট তক যায় না। আমাদের বাসটিও সামার প্যালেসের গেট পর্যন্ত যায়নি। একটু দূরে আমাদেরকে বাস থেকে নেমে হেঁটে যেতে হলো। আর যে জায়গায় নামিয়ে দিল সে জায়গার নাম Erlongzha Lu; চীনা ভাষায় লু মানে হলো রোড। অর্থাৎ আরলংঝা সড়ক। গাড়ি থেকে নেমে আমরা যাব সামার প্যালেসের ইস্ট গেট। এখানে যাবার পথে একটি পাবলিক টয়লেট বা গণশৌচাগার পড়ল।  দূর দূরান্ত থেকে এসে এখানে সব ট্যুরিস্টরা গণ শৌচাগার ব্যবহার করে। তারপর আরো কিছুদূর হেঁটে গিয়ে ইস্ট গেট।  এই গণশৌচাগারের আশেপাশেই বিভিন্ন বয়সী চীনা হকার বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য যেমন প্যাণ্ডা টুপি, হ্যাট, খেলনা ইত্যাদি বিক্রি করছে। একজন হকার এগিয়ে এলে আমি একটি প্যাণ্ডা টুপি চাইলাম, কেননা মাফলার আনিনি, তাই ঠাণ্ডায় কান হিম হয়ে আসছে। হকার টুপিটির দাম চাইল ৫০ আরএমবি। আমি বললাম ১০ আরএমবি। সে বলল, ৩০ আরএমবি, তারপর ২৫ আরএমবি। এভাবে কমাতে কমাতে শেষ পর্যন্ত সে ১০ আরএমবিতেই দিতে রাজী হলো। সে বলল, ঠিক আছে, টাকা দাও। আমি মানিব্যাগ খুলে ১০ আরএমবি’র নোট খুঁজছি। সঙ্গে সঙ্গে সে অনেকগুলো খুচরো টাকা আমার সামনে মেলে ধরে বলল, আমি ৯০ আরএমবি দিচ্ছি, তুমি ঐ ১০০ আরএমবি’র নোটখানা দাও। কেন যেন আমার সন্দেহ হলো লোকটির ওপর। মনে হলো বেটা অসাধু হতে পারে। আমি তা দিলাম না । তাছাড়া আমি জানি আমার কাছে একাধিক ১০ আরএমবির নোট আছে। আমি যথারীতি একটি ১০ আরএমবির নোট দিয়ে টুপিটা নিয়ে চলে গেলাম। যখন সামার প্যালেসের গেটে পৌছালাম, তখন শুনলাম, একই ধরনের একটি প্যাণ্ডা টুপি বেলাল সাহেব নামে একজন ৫ আরএমবি দিয়ে কিনেছে। মনে মনে ভাবলাম, শালা এত বার্গেইনিং করেও ঠকে গেলাম। যাক কী আর করা। তারপর সামার প্যালেস ভ্রমণ শেষ করে জানতে পারলাম, যিনি ৫ আরএমবি দিয়ে কিনেছেন, তাকে ঐ একই কায়দায় ৯৫ আরএমবি গছিয়ে দিয়ে ১০০ আরএমবির নোট হাতিয়ে নিয়েছে। আর ওই ৯৫ আরএমবির সবই অচল রাশিয়ান রুবল। বেলাল সাহেব প্যালেসের ভেতর থেকে স্যুভেনির কিনতে গিয়ে দোকানির কাছে এটা জানতে পারে। বেইজিং এর এই জায়গাটা যে কী ধরনের বাটপাড়ে ভরা তাই মনে মনে ভাবলাম।

 

আমরা সামার প্যালেসের ইস্ট গেট দিয়ে প্রবেশ করিসামার প্যালেস(Summer Palace) চিং ডাইনেস্টির আমলে নির্মিত। এ প্যালেসটি সমতলভূমি, পাহাড়, লেক সব কিছুর সমাহারে গঠিত। গাইড জেসি বলল, এর আয়তন দুইশত নব্বই হেকটর। কিন্তু আজকের আবহাওয়াটা ট্যুরিস্টদের জন্য সুবিধেজনক নয়আকাশে সূর্য দেখা দিল না। বেইজিং এর দিনের তাপমাত্রা সাত ডিগ্রী সেলসিয়াস। কিন্তু মনে হচ্ছে যেন তাপমাত্রা চার ডিগ্রীর নীচে, এত ঠাণ্ডা।

অনিন্দ্যসুন্দর কারুকার্যময় রঙিন ভবনগুলো। এর মাঝে বিভিন্ন স্থানে রয়েছে কয়েকশত বছরের প্রাচীন বিভিন্ন বৃক্ষ। বৃক্ষগুলোকে যে কত যত্ন করে এতকাল বাঁচিয়ে রেখেছে এরা, ভাবলে অবাক হতে হয়। কয়েকটি প্রাচীন জুনিপার ট্রি ডাল ভেঙ্গে পড়েছিল আবার কতগুলো দেখলাম গাছের মূল গুঁড়িই ফেটে গেছে। এসব ভাঙ্গা ও ফাটা গাছ আর ডালগুলো মোটা রাবারের বেড় দিয়ে সুনিপুণভাবে আটকে রাখা হয়েছে। হেলে পড়া কিছু গাছকে সিমেন্টের পিলার কাঠের রঙ ও অবয়ব দিয়ে ঠেকনা দিয়ে রাখা হয়েছে এমনভাবে যেন মনে হচ্ছে এটা গাছেরই অংশ। প্যালেসের প্রবেশপথে একটি গিংখো গাছ  তার ঘন উজ্জ্বল হলুদ পাতা নিয়ে শোভা বিস্তার করে আছে। ভেতরে প্রবেশ করেই দেখলাম ম্যাপল গাছের পাতাগুলো সুন্দর লাল বর্ণ ধারণ করে ঝরে পড়বার অপেক্ষায় আছে। আবার বসন্তে নতুন পাতা গজাবে, রঙ বদলাবে আর ট্যুরিস্টদের মন মাতাবে। পাহাড়ের ওপর উঠবার জন্য চমৎকার সিঁড়ি করে দেয়া আছে, পাথরের পাত দিয়ে। পথের দুধারে ক্লান্তিতে বিশ্রামের জন্য হেলাঞ্চি আসন পাতা আছে। চারপাশে গাছ গাছালির মধ্যে বিভিন্ন পাখপাখালির সশব্দ ওড়াউড়ি নজরে এলো। পুরো তিনঘন্টা  হেঁটে হেঁটে দেখলাম তবুও সামার প্যালেস দেখা শেষ হলো না। আরো তিন ঘন্টা সময় দিলেও হয়ত দেখার তৃপ্তি  আসত কি না জানি না।

 

সামার প্যালেস দেখার পর আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো একটি পাকিস্তানী রেস্তোঁরায়। বেইজিং এর ডাউনটাউনের SOHO মার্কেটের একটি ভবনের ১১-তলায় এই রেস্টুরেন্ট। শুরুতেই পরিচয় হলো মিঃ খালেদ খান এর সাথে। খালেদ খান ছয়ফুটের ওপরে লম্বা পেশোয়ারী। আমাদের মধ্যে যারা জোহরের নামাজ পড়তে চাইল, তাদেরকে নিয়ে খালেদ খান একটি রুমে নামাজের ব্যবস্থা করে দিল। রেস্টুরেন্টটির নাম খানবাবা। খাঁটি ইন্দো-পাকিস্তানী খানা। বাঁশমতি চালের চিকেন বিরিয়ানি, বোনলেস ফিস ভুনা, চিকেন ভুনা, চিকেন গ্রীল, তন্দুরি রুটি, নানরুটি, ডাল মাখানি, দধি, সফট ড্রিংকসুস্বাদু রান্না। মসলা ছাড়া সব চীনা খাবার এতদিন খেয়ে সবার জিহবা ম্যাড়মেড়ে হয়ে গিয়েছিল। বেইজিং এ আসার পর এই প্রথম খাবারের পর সবাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলল। ক্যাশে বসে ছিলেন যিনি তার নাম ইমরান খান। আমাদের সালাম সম্ভাষণ করলেন। এখানে দেখলাম বিভিন্ন দেশের পর্যটকগণই মধ্যাহ্নভোজ সারছে।

 

মধ্যাহ্নভোজের পর আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো সিল্ক স্ট্রীট নামের একটি শপিং কমপ্লেক্সে। এখানে শপিং করতে এসে খুবই অবাক হয়ে গেলাম দামাদামির অবস্থা দেখে। নব্বই এর দশকে ঢাকার গুলিস্তানে যেমন বার্গেইনিং এর প্রচলন ছিল তাকেও হার মানিয়েছে এই মার্কেট। যে দ্রব্যের গায়ে তিনহাজার আরএমবি দাম লেখা, সেটিও একশ’ আরএমবিতে বিক্রী হচ্ছে দরকষাকষির জোরে। আমি একটি হাত ঘড়ি কিনলাম। চাইলো ৮০০ আরএমবি আর দামাদামি করে কিনলাম ১০০ আরএমবি দিয়ে। আমার সাথে ছিল ঘোড়াশাল পাওয়ার প্লান্টের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর। আমি নতুন ট্যুরিস্ট এখানে। কিন্তু আবু বকর ইতোপূর্বে  চীনে এসেছিল। সে অভিজ্ঞ। তাই একটি ঘড়ির দাম ১০০০ আরএমবি চাইলে সে বলে ২৫ আরএমবি। আমি অবাক হই। দোকানি যুবতি মহিলা আমাদের উদ্দেশ্য করে বলে, তোমরা কোথা থেকে এসেছো? আমরা নিরুত্তর থাকি। আবার বলে, কীভাবে এলে এ দেশে? ‘কেন? এয়ারপ্লেনে করে?’ তারপর সে বলে, ‘নিশ্চয়ই না। ইম্পসিবল। তোমরা নিশ্চয়ই সাঁতার কেটে এসেছো এদেশে। তোমাদের তো টাকা পয়সা নেই, তোমরা যেখান থেকে এসেছো সেখানে চলে যাও সাঁতার কেটে’। কোনো কোনো সময় এই মার্কেটে যুবতি দোকানি তার পায়ের স্যাণ্ডেল খুলে বলে, আমার এই স্যাণ্ডেলের ফিতাও পাবে না এই দামে। এই ধরনের বাজে কথা বলার পরও এরা ৮০০ আরএমবি’র দ্রব্য ৮০ আরএমবিতেও বিক্রি করে। অবাক করা কাণ্ড।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment