ঘনঘোর শ্রাবনে মহামানবের মহাপ্রয়ান

“ব্যাকুল বেগে আজি বহে যায় /বিজুলি থেকে-থেকে চমকায় / যে কথা এ জীবনে রহিয়া গেলো

 

মনে /সে কথা আজি যেন বলা যায় /এমন ঘনঘোর বরিষায় ”

 

“মিছে জীবনের কলরব/ কেবল আঁখি দিয়ে আঁখি সুধা পিয়ে/ হৃদি দিয়ে হৃদি

অনুভব/ আঁধারে মিশে গেছে আর সব”

ঘনঘোর বর্ষার দিনে এই ছিল কবির নিজের অনুভব।কবি চলে গেলেন সেই শ্রাবণ দিনে তাঁর শত কোটি ভক্তহৃদয়ের  আকাশও তেমনি আঁধারে ছেয়ে গেলো। কেঁদেছিল  মানুষ সেদিন।ছিলনা জীবনের কোন কলরব!

 

২২ শ্রাবণ ।আকাশভরা সঘন মেঘে ঢাকা কলকাতার সড়কে তিল ঠাঁই নেই।সারি সারি অশ্রু সজল মানুষের ঢল।শেষ দেখা একবার দেখতে চায় সবাই।একনজর দেখা আর হৃদয়ের সব ভালোবাসা ঢেলে দিতে হুঁ হুঁ করে কেঁদেছিল নাগরিকপ্রাণ।“ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে“।কেউ মানেনি সে বাধা ।

লাখো মানুষের অবাধ্য ঢল, সুনামির মত। ‘লাখো মানুষের যাত্রাটি ছিল  আশ্চর্য চুপ ও সজল“।

 

বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়,“ মহৎ, মহামূল্য, তূলনাহীন দুঃখ। কল্পনায় চেনা, সম্ভাবনায় পুরানো তবু বাস্তবে অশ্চরয্য ! আকস্মিকের মত নতুন। আশ্বাসের মত অসহ্য-‘কেবল হৃদয় দিয়ে হৃদি-অনুভব’।

  ভিড় বাড়লো ।জোড়াসাঁকোর বড় বড় ঘর আর বরান্দা ভরে গেলো। উঠোন আরও।অতো লোকের মধ্যে কারও মুখে টুশব্দটি নেই।চেনা অচেনারা পরস্পরকে দেখছে। কথা বলছেনা।অপেক্ষা । বোবা অপেক্ষা। শুধু অপেক্ষা।একবার একনজর দেখার সে কী আকুতি!একজন একজন করে এগিয়ে যাচ্ছে কী অটুট শৃঙ্খলায়।বর্ণণাতীত ধৈর্য স্থিরতা।   কী অপূর্ব সহিষ্ণুতা।মন্ত্রমুগ্ধ সম্মোহিত এক ভিন্ন বাঙালি যেন।কবিগুরুর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ।কবিচেতনায় ঋদ্ধ।ঐ দেখা যায় !“মাথাটা মনে হ’ল আগের চেয়েও বড় প্রকান্ড। কিন্তু শরীরটা একটু যেন খাটো হয়ে গেছে ।যদিও তেমনি চওড়া কব্জির হাত। তেমনি জোরালো প্রচন্ড আঙুল।’একে একে সবাই রুদ্ধক্রন্দনে গেলো সেই ঘরে কূল ছোঁয়া সাগরসলিলের মত আশ্চর্য নীরাবতায়।শেষবার চোখ রাখলো কতকালের  চেনা সেই   মুখের দিকে।কপালের দিকে।একবার হাত রাখলো   হৃদ্যজ প্রণামে হিমঠান্ডা পায়ে। “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,/আমি    বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,/চুকিয়ে দেব    বেচা কেনা,মিটিয়ে দেব গো,   মিটিয়ে দেব লেনা দেনা,বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে–তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে”।শোকার্তভক্তকূল লঘুপায় অতিক্রম করলো বিষাদব্যাথার সেই দুস্তর প্রান্তর।চোখে বন্যাচেপে,আর বুকের ভিতর হিমালয়ের মত ভারি শোকের পাথর নিয়ে্।  

    হে বন্ধু হে প্রিয়, গুরু হে প্রাণপ্রতিম,শুকতারা ,আলোকস্তম্ভ. পথের

    দিশারি,গগনজোড়া হে স্বাতী, তোমায়,“যেতে নাহি দিব হায় তবু

    যতে দিতে হয়।

       রাজপথে লক্ষ মানুষ অপেক্ষমান । নীরব শান্ত

    নিস্তব্ধ। আশ্চর‌্য চুপ।“মাত্রই কয়েকজন যেন অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে

     নিয়ে এলো কাঁধে করে – নিয়ে এলো উত্তর তেকে দক্ষিণে-পিছনে

    এলোমেলো লোক। বিদ্যুতের ঝিলিক দিলো লম্বা শাদা চুল আর মস্ত

    শাদা তন্ময় কপাল। অতটুকুই কেবল দৃশ্যমান হ’ল।

       “মৃত্যু তব হাত পূর্ণজীবনের মৃত্যুহীন ক্ষণে

  ওগো, শেষ অশেষের ধনে /ওগো মৃত্যু,ওগো মধুময় মৃত্যু

  তুমি আমায় নিয়ে চলেছ লোকান্তরে /গানের পাখায়“।

বুদ্ধদেব বসুর তিথিডোর উপন্যাসের নায়ক, সত্যেন দেখলো, স্বাতী দাঁড়িয়ে আছে শক্ত    সোজা হয়ে। হাত মুঠো করে । ঠোঁটে ঠোঁট চাপা। দেখলো তার কন্ঠের কাঁপুনি।গালের ঘন রঙ।দেখলো তার তরল কালো উজ্জল চোখদুটো আরও উজ্জল হলো।ঝকঝকে দুটো আয়না হয়ে উঠলো।

তারপর ভাঙলো আয়না ।আবার তরল হলো।উপচালো।মাথা নিচু হলো। আর তাই দেখে সত্যেনের নতুন করে গলা আটকালো। চোখ ঝাপসালো।আর সে জন্যে লজ্জা করলো নিজের কাছেই।এ মৃত্যু তো কান্না চায়না।এ দুঃখ মহান।মহামূল্য দুঃখ। আশি বছরের পরম পরিশ্রমের এই সবশেষ রত্ন- একি চোখের জলে বাজে খরচ করার”? বুদ্ধদেব বসু ধরে রেখেছেন কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের চিত্রটি এভাবেই তাঁর কালোত্তীর্ণ  রচনায়।জানিয়েছেন কবিগুরুকে হৃদয়জ প্রণাম।

 

কোটি প্রাণের সজল শ্রদ্ধা ভালোবাসায় স্নাত হয়ে, শতকোটি মানুষের অশ্রু  জলে ভেসে অনন্ত অসীমের পথে বিশ্বকবি যাত্রা করলেন ১৯৪১ সালের ৬ই আগষ্ট। ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮। বাদল ঝরা দিনে।

মানুষের মুক্তির দর্শনই ছিল কবিগুরুর জীবন দর্শণ।বিশ্বমানবতায় ছিল তাঁর অটল বিশ্বাস।জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি সেই দর্শনই নিরন্তর অন্বেষণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির মনমানসিকতা গঠনের ও চেতনা উন্মেষের প্রধান অবলম্বন।বাঙালি স্বাধীনতার জন্য উদ্বেল হ’ল।পরাধীনতার  শিকল ছেঁড়ার জন্যে ব্যাকুল হ’ল রবীন্দ্রচেতনাকে হৃদয়ে করে।মূর্খ স্বৈরশাসকরা সেদিন কবিগুরুর  প্রভাব মুছে ফেলার মূঢ় অভিপ্রায়ে  তাদের বাঁধন আরও শক্ত করার ব্যর্থ প্রয়াস পেলো।কিন্ত মোটা বুদ্ধির উজবুকরা অজ্ঞাতসারেই আগুনে ঘৃতাহুতি দিলো।অগ্নিবীণার অনলে পবনের ছোঁয়া লাগলো।“স্বরচিত রবীন্দ্র সঙ্গীত” লেখার হুকুমদারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান প্রফেসার আব্দুল হাইকে কতটা বিধুর করেছিল

তা কারও জানা নেই ।তবে চলন্ত রেলগাড়ির চাকা পিস্ট তাঁর রক্তাক্ত নিথর দেহ দৃষ্টে বাঙালি ভেবেছিল বিদগ্ধ সেই মহান বাঙালি     মূর্খদানবের মূঢ়তার জবাব দিলেন প্রাণের মূল্যে।কবিগুরুকে দিলেন ‘জীবনের পরম প্রসাদ“।

কবিগুরুর কাছে আমাদের ঋণের কোন শেষ নেই। তাঁর কাছেই আমরাখলখল করে হাসতে শিখেছি।কলকল করে গাইতে শিখেছি।“হেসে খলখল গেয়ে কলকল তালে তালে দিব তালি “।স্বজনের জন্যে কাঁদতে শিখেছি। শুনেছি কবির  উদাত্ত আহবান,“ওরে তুই ওঠ আজি, আগুন লেগেছে কোথা? কার শঙ্খ উঠিয়াছে বাজি জাগাতে জগৎজনে কোথা হতে ধ্বনিছে ক্রন্দনে শূন্যতল? কোন অন্ধকার মাঝে জর্জর বন্ধনে অনাথিনী মাগিছে সহায়?“ আমরা প্রতিরোধ করতে শিখেছি।“মুহূর্ত তুলিয়া শির একত্র দাঁড়াও দেখি সবে/যার ভয়েতুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে/ যখনই  জাগিবে  তুমি তখনি সে পালাইবে ধেয়ে ।“

“যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এইবাটে, তখন আমায় নাইবা   তুমি ডাকলে “।

 

 সে কী হয় কবিগুরু? তুমি যে আমাদেরই লোক! তুমি আছ তোমার স্বপ্নের দেশে   যার নাম তুমি রেখেছিলে “বাংলাদেশ“! তার জন্মের বহু আগে।রাম জন্মের ৫ শত  বর্ষ আগে বাল্মিকী যেমন  লিখেছিলেন রামায়ন  নামের  বরেণ্য মহাকাব্য।

ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ গান দিয়েছ  তোমার মানস সন্তানেরে !“আমার সোনার বাংলা  আমি তোমায় ভালেবাসি!”আমাদের গর্ব আমাদের অহঙ্কার তুমি।বিশ্ব দরবারে তুমি রেখেছ বাংলার মান আকাশ সমান উঁচু করে। তুমি আছ বিশ্বময় ।তুমি আছ বাংলাদেশের ১৭ কোটি বাঙালির  চিন্ময় চেতনায়। তুমি রয়েছ মৃন্ময় স্থাপত্যে বাঙালির স্মরণের স্তরে স্তরে।     মহেঞ্জোদারো-হরপ্পার  স্থায়িত্বে  অমর অক্ষয় হয়ে।তুমি আছ। তুমি ছিলে ।তুমি    থাকবে।যতদিন অরুণরবি আকাশে উদ্ভাসিত হবে, চাঁদের আলোয় প্রেমিক যুগল হাসবে,বজ্রের  

ধ্বণিতে ভূধর কাঁপবে ,বনে বনে পাখিরা গাইবে গান,  মহাসমুদ্রের  কল্লোল রবে,পদ্মা   মেঘনা গঙ্গা যমুনা  ইছামতি  সুরমা রবে সাগর সঙ্গমে ধাবমান! ততোদিন আকাশ বাতাস রবে  সৃষ্টি  সুধা  রবে অফুরান  ।  বাঙালি রবে, বাংলাদেশ রবে।তুমিও রবে দেদীপ্যমান।

 

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts