জয় বাংলা  এক অগ্নিঝরা দর্শনের নাম, এক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির নাম

ধরি মাছ না ছুঁই পানি।খুবই প্রচলিত এবং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত একটি বাংলা কথা।সরল বাক্য্‌।ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে নানা কথাই আসে।কখনও কখনও এটাকে কৌশলী আচরণ হিসাবে বিবেচনা করা চলে। আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলি।আমি একাত্তরের মধ্য এপ্রিলে একটা রোড ম্যাপ নিয়ে সীমান্ত অতিক্রমের জন্য সড়কপথে গোমতী নদীর একটা পারাপার ঘাটের দিকে এগোচ্ছিলাম । সাথে বোরকা পরিহিতা আমার স্ত্রী এবং ইসলামী লেবাজে দুই শিশু পুত্রকন্যা।দাড়িটুপি ও কালো শিরোয়ানি পাজামায় আমাকেও খুব পরিচিত জনেরও চিনতে কষ্ট হয়েছে।বিআরটিসি বাসে ওঠার সময় আমার খুব চেনা একজন বিপজ্জনক মানুষের চোখ ফাঁকি দিতে পারায় মহাবিপদ, বলতে গেলে, জীবনের ঝুঁকি থেকেই বেঁচে গেলাম।কিন্তু দাউদকান্দি ফেরি পার হতেই সেনাবাহিনীর একটা গাড়ি আমাদের পথ আটকালো।প্রথমে দুই জোয়ান বাসে উঠে সব যাত্রীকেই একবার চোখের দেখা দেখলো ।পরে আর একজন এসে পুরুষদের সবাইকে বাস থেকে নেমে লাইন দিয়ে দাঁড়াবার নির্দেশ দিল।আমি ঘাড়ে ব্যাগ ঝুলিয়ে দুই বাচ্চাকে দুই হাতে ধরে লাইনে সবার আগে গিয়ে দাঁড়ালাম।সেখানে হাতকাটা গেঞ্জি পরে দাড়িয়েছিল সুবেদার গোছের একজন পাকি সেনা।আমি সালাম দিলাম। কিন্তু সে আমাকে জিঞ্জেস করলো,“তুম মুসলমান হায় না বাঙালি হায়?“হঠাৎ মাথায় রক্ত উঠে গেল। নিজেকে সামলে নিলাম অতি কষ্টে।বাচ্চা দুটোর হাত খুব শক্ত করে চেপে ধরে নির্ভয়ে জবাব দিলাম, হাম ইনসান হায়।মনে হলো ব্যাটা একটু হচকচিয়ে গেল। নিশ্চই খুব সোজা সাপ্টা একটা জবাব আশা করেছিল।কিন্তু কপাল ভালো যে ক্ষিপ্ত হলো না। বরং পাল্টা প্রশ্ন করলো,  ক্যায়সা ইনসান হায়? আমি বললাম, আমার পিতা আমার নাম রেখেছিলেন আসমানী কেতাব ঘেটে।হি ইজ এ পায়াস ম্যান। সো অয়াজ মাই গ্রান্ড ফাদার।এবার একটু গলা চড়িয়ে জিঞ্জেস করলো,“তুম ক্যায়সা ইনসান হ্যায়?“ আমি বিনম্র কন্ঠে বললাম “হাম ভি ঈমানদার হ্যায়! হামারা বিবিভি ঈমানদার হ্যায়, বাচ্চালোগ ভি আল্লাহকা সাচ্চা বান্দা হ্যায়!“

কিন্তু বাচ্চাদের মুখ চেয়ে জীবন বাঁচাতে সেই যে চেঁচিয়ে বলতে পারিনি, আমি বাঙালি,আমি বংলায় কথা বলি, বাংলায় গান গাই, বাংলায় ভালোবাসি, বাংলায় মা ডাকি,- সে দুঃখ অনুশোচনা থেকে কখনোই মুক্ত হতে পারিনি। আজও সেই অপরাধবোধটা মুছে যায়নি ।প্রবাসের পথে যখন হাটি , ভিনদেশী পথচারি পরিচয় জানতে চায়। আমি বলি, আমি বাঙালি ।অনেকের চোখেই একটু বিস্ময় দেখি। তখন বলি, তুমি কী টেগোরের নাম শুনেছ?প্রথম বাঙালি নোবেল বিজয়ী, শোননি তার নাম?যদি বুঝি ল্যাঠা চোকেনি, তাহলে জিজ্ঞেস করি , তুমি কী বে অফ বেঙ্গলের নাম শোননি, রয়েল বেঙ্গর টাইগার ? তাতেও অনেক সময় কাজ হয় না। ব্রিটিশ কলোনী ছিল, ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্ট, শুনেছ নিশ্চই! সেখানেই এক পাশে বঙ্গোপসাগর ও বার্মা বা মিয়ানমার আর অন্য পাশে আমার মাদার ল্যান্ড বাংলাদেশ।ক্রিকেটে দুনিয়া জয় করে চলেছে।

বাংলাদেশের নাম কেউ জানে কেউ জানে না। সেও এক দুর্ভাগ্য্।এদেশের লোক এশিয়া চেনে, চীন চেনে। আমার মাসেলে সু্ঁই ঢুকিয়ে প্যাথলোজির জন্যে রক্ত শুঁষছিল এক মহিলা ল্যাব এ্যাসিস্টেন্ট। সে যা বললো তাতে আমার ভিমরি খাওয়ার জোগাড়। আমি বললাম ইন্ডিয়া চেন? সে বললো, হ্যা শুনেচি আফ্রিকার একটা দেশ! বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আমেরিকায় এরকম অজ্ঞ মানুষই সংখ্যায় বেশি।

একাত্তরে যে প্রশ্নটা “ধরি মাছ না ছুঁই পানি“ করে প্রাণের তাগিদে এড়িয়ে গিয়েছিলাম, পচাত্তরের শেষ ভাগ থেকেই রকমফেরে সেই প্রশ্নেরই মুখোমুখি হচ্ছি লাগাতার, এখনও্।নতুন প্রজন্মের অনেকেই এ প্রশ্নে গোয়েলেসীয় প্রপাগান্ডায় বিভ্রান্ত । তাদের অনেকেই প্রশ্ন করেন, “আমরা কী বাঙালি না বাংলাদেশী ?“

আমার কাছে এর একটাই জবাব, আমি বাঙালি।আমার সাফ জবাব আমি বাঙালি ।স্পষ্ট জবাব আমি বাঙালি।কারণ এটাই আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র।আমরা বাঙালি বলেই বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল বরকত সালাম জব্বার রফিক।আমরা বাঙালি বলেই তিরিশ লক্ষ শহীদ প্রাণ দিয়েছে । আমরা বাঙালি বলেই তিন লক্ষ নারী পাকিস্তানী জানোয়ারদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে। আমরা বাঙালি বলেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে শতাধিক মানুষ-নারী শিশু যুবা বৃদ্ধ ২০১৩ -১৪ সালেও জেনেভা ক্যাম্পে তৈরী হাত বোমা বা বিএনপি জামায়াত শিবিরের তৈরী মলোটভ ককটেলে ঝলসে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।স্বাধীনতা বিরোধীদের চাপিয়ে দেয়া “যুদ্ধে মরছে বাঙালি নারী শিশু, ঠিক য়েমন আফগাানিস্তানের যুদ্ধে মরছে নির্বিচারে মানুষ সন্ত্রাসী- তালেবান বিরোধী গণতন্ত্রের যুদ্ধে“।

আমাদের প্রিয় দেশবাসীকে বাঙালি আর বাংলাদেশী, এই দুইভাগে বিভক্ত করে গেছেন জিয়াউর রহমান।এখনও সেই পক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলেই আমি বিশ্বাস করি।কাজেই পাসপোর্টে কী লেখা আছে সেকথা বিবেচনায় নিয়ে “আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী , এমন প্রশ্নের উত্তর নিয়ে ধানাই পানাই করার কোন সুযোগ আছে বলে মনে করি না।বিশেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি তারাতো নিরপেক্ষ হতেই পারেন না । কারণ তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক।সত্যাচারী দার্শণিক জ্যাঁ পল সাঁত্রের সেই বিখ্যাত উক্তি স্মরণ থাকা উচিৎ সব জ্ঞানী-গুণ লেখক কবি সাহিত্যিকের যে,“ লেখক কখনও নিরপেক্ষ হতে পারেন না ,কারণ তাঁকে সব সময় সত্যের পক্ষ্যেই কথা বলতে হয়। সেটাই লেখকের ধর্ম।“

তুমি কে আমিকে?-বাঙালি! বাঙালি! তরুণ প্রজন্মের বজ্রকন্ঠে এই পরিচিত আওয়াজ শুনেই বাঙালি আবার ঘুম থেকে জেগে উঠেছে।তরুণ প্রজন্মের উচ্চারণে লাগাতার জয়বাংলা বজ্রনিনাদ শুণন বাঙালি আবার লড়াই করার শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে।হাজার হাজার কোটি ডলার তেজপাতার মত খরচ করে দুনিয়া তোলপাড় করে জামাতিরা যখন মরিয়া, তাদের পক্ষ্যে তুরষ্ক পাকিস্তানসহ বিশ্ব মোল্লাবাদ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের নতুন ষড়যন্ত্রে তৎপর, “জয় বাংলা “ তখন বাঙালি তরুণদের মধ্যে সুনামী শক্তি জাগিয়ে দিয়েছে।ক্ষেপেছেন একজন সাদা পোষাক জড়ানো কালো মনের মানুষ্।বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী খন্দকার মোশতাকের দোসর, সবার চেনা প্রতিক্রিয়ার সোল এজেন্ট।তিনিই ধৃষ্ট হয়ে বলেছেন, জয়বাংলা আবার কী? সে তো ছিল এক বিশেষ প্রেক্ষাপটের স্লোগান।এখন বলতে হবে জয় বাংলাদেশ! সেই একই লেবেনচুশ মার্কা পন্ডিতি! তাদের সবাইকে আর একবার বুঝিয়ে দিতে হবে জয়বাংলা শুধু স্লোগান মাত্র নয়,জয়বাংলা একটা অনির্বাণ আদর্শের নাম।জয়বাংলা মুক্তিযুদ্ধের সেই ব্রহ্মাস্ত্র, আর সেই সর্বজয়ী অস্ত্রই আবার গর্জে উঠেছে।ঠিক তেমনি , “বাঙালি “ একটা সর্বনাম মাত্র নয়, একটা অগ্নিঝরা দর্শনের নাম একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির নাম।

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment