নজরুল ও আমার ভাবনায় শান্তিনিকেতন

১.

নজরুলের যখন ভরা যৌবন, চারিদিকে উল্লাস তাঁকে নিয়ে, কয়েকবার চট্টগ্রামে এসেছিলেন। ১৯২৮ সালে মুসলিম এডুকেশন সোসাইটিতে কয়েকজন সত্যিকার মুমিনের সামনে তিনি হয়েছিলেন নতুনভাবে উদ্ভাসিত। তার বক্তৃতাটি সম্পূর্ণ পাওয়া যায় না, যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে মূর্ত হয়েছে কবির স্বপ্ন। তাঁর গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিল তাঁর স্বপ্নের প্রভেদ। প্রতি কবিরই তা হওয়ার কথা। নোবেলপ্রাপ্তির পর ও আগে রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন আশ্রমের ধাতে গড়ে তুলতে শান্তিনিকেতন। এখানে কয়েকবার গিয়েছি, উদ্দেশ্য ছিল তাঁর কল্পনার শান্তিনিকেতনকে আবিষ্কার।

২.

“গ্রামের মুসাফির বোলপুরে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছে ইতিহাসের পাতা থেকে বেরিয়ে আসা শান্তিনিকেতন। ক্ষিতিমোহন বাবু থাকতেন ‘দেহলী’র পাশেই। তৈরি হচ্ছিল আরেকটি বাড়ি, যাতে কবিগুরুর স্ত্রী, ছেলেমেয়েরা আশ্রমে এসে কবির সঙ্গেই বসবাস করতে পারেন। নাম তার ‘নতুন বাড়ি’। যেদিন গিয়ে উপস্থিত, সেদিন ‘দেহলী’র সামনে দ্বারিকের দোতলার কাজ শুরু হয়েছে। বিশ্বভারতীর কলাভবনের পত্তন এখানেই। বিকেলবেলা খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে যাই গুরুদেব সন্দর্শনে, মাঝখানের যে হলঘরটি সেখানেই কবি দর্শন দিতেন নতুন ছাত্রছাত্রী ও দু’দিনের মুসাফিরদের। সুদূর বলরামপুর গ্রামে থেকে এসেছে মুসাফির। দু’দিনের পথ, গরুর গাড়ি, রেলগাড়ি, বাস, আবার বাসে শান্তিনিকেতনে; হাতে নেই টাকাকড়ি, প্রশংসাপত্র যা নিয়ে কবির সামনে উপস্থিত হওয়া যায়।

গুরুদেবের ছোট মেয়ে মীরাদেবী থাকতেন ‘লেবুকুঞ্জে’। এটি ছিল ‘দ্বারিক’-এর লাগাও বাড়ি। ‘শমীকুটির’-এর সামনের বারান্দাতে কাউকে জিজ্ঞেস না করেই লম্বা ঘুম দিলাম। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেননি, সামনের ‘মোহিত কুটির’, ‘সতীশ কুটির’, ‘সত্য কুটির’, থেকে যখন অনেকে বেরিয়ে এসেছে গুরুদেবের সমবেত সান্নিধ্যে, আমিও। শমী ছিল গুরুদেবের ছোট ছেলে, আশ্রমের ছাত্র। মারা যায় কম বয়সে, সম্ভবত কালাজ্বরে। বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে অসুখ নিয়ে ফিরে আসে। গুরুদেবের বন্ধু ছিলেন মোহিতচন্দ্র সেন, ভীষণ সাহিত্যরসিক। গুরুদেব তাকে কাছে ডাকতেন এবং নতুন রচনাগুলো পড়ে শোনাতেন। তিনি ছিলেন আশ্রমের প্রথমদিককার অধ্যক্ষ। কবির অনেক লেখা তার সম্পাদিত। সম্পাদনার কাজ বাকি রেখেই তিনি চলে যান তার অচেনা গন্তব্যে। তার লেখা ‘গুরুদক্ষিণা’ বইটি খুঁজে পাওয়া যায়নি, আজও নয়। ‘সত্য কুটির’-এর নামের সঙ্গে লুকিয়ে আছে সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের স্মৃতি যিনি ছিলেন আশ্রমের অধ্যাপক ও চিকিৎসক। কবিগুরু তাকে এত ভালোবাসতেন যে বলার নয়। তার মেজ মেয়ে রেণুকার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেন সত্যেন্দ্রনাথকে। কিন্তু তারও ফেরার তাড়া। জীবনের সমাপ্তিপর্ব তাকে কাছে টেনে নিয়ে গিয়েছে। চারটি কুটিরের কাছে ঘুর ঘুর করে জানতে পেরেছি আশ্রম বালকদের পঠন ও শয়নের স্থানগুলো। প্রতি কুটিরে থাকতেন দুয়েকজন অধ্যাপক বালকদের সঙ্গে দিনেরাতে সঙ্গ দিতে। তাদের কর্মসূচি টাঙান থাকত প্রতিটি কুটিরের সামনে, যাতে লেখা ছিল এমন কিছু, যা আজকাল আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেমন অতি প্রত্যুষে সূর্যদেব ওঠার আগে গাত্রোত্থান, ঘর ঝাঁটপালা করে, গোসল, প্রাতঃখাবার, বৈতালিক আসন, এরপর গাছতলায় ক্লাস করতে যাওয়া। এগুলোর ছবি এখনও নানা পত্রিকায় ছাপা হয় বৈকি, কিন্তু সেই অধ্যাপকদের ক্লাসে যোগদানের অভিজ্ঞতা অন্যরূপ। কেমন সুন্দর করে পড়াতেন তারা, প্রতি ছাত্রের জন্যে ব্যক্তিগত মনোযোগ, প্রাত্যহিক ব্যায়াম, গোসল, দাঁত মাজা ও খেলাধুলায় সবাই অংশ নিচ্ছে কিনা, অধ্যাপকরা পর্যালোচনা করতেন নিয়মিতভাবে। রান্নাঘরে যার যার থালা বাটি গ্লাস নিতে হত, আবার নিজেরাই সেগুলো ধুয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসত হত যার যার থাকার জায়গায়।

গুরুপল্লীর আশ্রমে বাস না করলে কেমন করে বোঝা যাবে রবিঠাকুর কি চেয়েছিলেন। কোন দিনই বোঝা যাবে না রবীন্দ্রনাথের পল্লীশিক্ষা ও আশ্রম নিয়মানাধীন দিনগুলোর অন্তর্নিহিত ভাবধারা। শান্তিনিকেতনে আশ্রমে পড়তে আসতেন যারা, তাদের যেন আর আনন্দ ধরে না। মেয়েরা গানের অর্থ জানত না, সুরের দোলায় হত আন্দোলিত। শীতের রাতে বোলপুর স্টেশনের মিটিমিটি আলোতে যখন কোন ছাত্রছাত্রী এসে পৌঁছুতেন তখন যেমন রহস্যাবৃত মনে হত সবকিছু, তেমনি ধীরে ধীরে এর পরিবেশে কবির, দাদু ও বাউল সম্প্রদায়ের গানের আন্দোলনে এই রহস্য ধীরে ধীরে টুটে যেত। ক্ষিতিমোহন সেনের একটি খাতা ছিল যেখানে তিনি সব সময় পূর্ববাংলার স্ত্রীআচার, কনে সাজান, জল ভরা, এমনকি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার গান লিখে রাখতেন। আশ্রমের ছেলেমেয়েরা পূর্ববাংলার গান শিখতে বিশেষ আগ্রহী ছিল। শান্তিনিকেতনের পুরোটাই অন্ধকার। ভোরের আভাসে বকুল গাছগুলো থেকে অজস্র পাখি কলকল করে উঠত আর কোথায় যেন ঘণ্টাধ্বনি। কোথায় আবার, মন্দির একটাই। সবাই এসে জড় সেখানে। ছেলেমেয়েরা গাইত : ‘ধ্বনিলরে ধ্বনিলরে, ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর’। শালবীথিকার তলায় অধ্যাপকরা, কর্মীরা একজনের পর একজন দাঁড়িয়ে। তারা সবাই জানতেন ছাত্রদের, বাবা-মার নাম, কোথায় থাকতেন, সবকিছু। এগুলো ছিল আত্মীয়তার স্পর্শ মাখান। রুটিনের গন্ধে সবকিছু মেলান, কিন্তু কোথাও নেই এতটুকু ফাঁকি দেয়ার জো, তবু তা নয় ক্লান্তিকর। যেমন ছিল মজার গান ও নাচের ক্লাস, তেমনি লাঠিছোড়া খেলা ও যুযুৎসু। কোথাও রেডিও নেই, নেই টেলিভিশন, নেই ফুটবল-ক্রিকেটের আনন্দোল্লাস। মন্দিরে সবার প্রবেশ শ্রদ্ধাবনত মস্তকে, পায়ের তলায় ঝরে পড়েছে নিম গাছ থেকে অজস্র ফুলের কলি। গুরুদেব এসে দাঁড়ালেন। মন্ত্রোচ্চারণ নামমাত্র ‘ওঁ পিতা নোহসি’। তার পরেই গান : ‘প্রথম আলোর চরণধ্বনি বেজে উঠল যেই’।

গুরুদেবকে সবাই প্রণাম করল। মনে মনে তাকে করলাম সালাম। এমন শান্তমূর্তি আর কখনও দেখিনি। অংকের ক্লাসের গুরুদেবের বিশেষ আকর্ষণ। বিশ্বনাথের কাছে সবাই অংক করছে শালবীথিকায়, পিছনে পায়চারি করতে করতে উপস্থিত রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। বিকেলে একদিন মুড়ি, আরেকদিন দুধকলা। গুরুদেবের ছিল একটি গাড়ি। তিনি পছন্দ করতেন এমন সব মেয়েদের যারা থাকবে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি। তিনি মাঝে মাঝে গাড়ি করে পরিদর্শনে আসতেন। একদিন বললেন, জনকয়েক অতিথিকে দাওয়াত করে খাওয়াতে, এতে তারা খাবার তৈরি করতে শিখবে এটি তার ইচ্ছা। রান্নাঘরের তত্ত্বাবধানের ভার একেকদিন একেকটি ছেলে ও মেয়ের উপর। শ্রীভবনে একটি মেয়ের অসুখ হল, মেয়েটির বাবা নেই, মা থাকেন বম্বেতে। অভিভাবক স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, দু’বেলা নিজেই আসেন দেখতে, সঙ্গে ফুল আর বায়োকেমিক ওষুধ। কারও অসুখ শুনলে নিজেই ওষুধ দিতেন, আর সকালে একটি করে কমলা, আর এক গ্লাস ওভাল্টিন।

উত্তরায়নের দক্ষিণে ছিল বেলফুলের বাগান। দু’বেলা পানি দিতে হত সে গাছে, তার ফলেই বেলফুলের বাগান ছিল তরতাজা। ছেলেমেয়েরা বেলফুল চুরি করত বৈকি। গুরুদেব বললেন, দিনু শুনেছিস, ওরা আমার বাগানের ফুল তুলে আমাকেই মালা পরায়।

এবার দিনুদা (দিনেন্দ্রনাথ) বললেন, ওরা আর ফুল পাবে কোথায়?

গুরুদেব নিজেই একবার ইংরেজি ভাষা শেখাবার ক্লাস গুরু করলেন। যাতে ছাত্রছাত্রীরা ভয় না পায়, অধ্যাপকদের বললেন, তোমরা এবার যাও। তার ক্লাসে শুধু স্বাধীনতা। সবাইকে নানা রকম দায়িত্ব দিয়ে তাদের অগাধ বিশ্বাস স্থাপন করতে পেরেছিলেন। মজার ছিল বাগানের ক্লাস। সবজির বাগানে মটরশুটি ও টমাটো এবং অন্যান্য তরকারী ফলাবার জন্যে ছিল তার বিশেষ প্রচেষ্টা। ভাল কই মাছের সুরুয়া, মাছের টক ও মাঝে মাঝে মুরগির গোশত, নানা বৈচিত্র্যের আবরণে ছিল ছাত্রছাত্রীদের খাবার প্লেটটি সাজান। ফাঁকে ফাঁকে ঋতু-উৎসব, সংবর্ধনা উৎসব, ৭ই পৌষ ইত্যাদি নানা উৎসব নিয়ে মাততেন মাস্টার মশায় [নন্দলাল বসু]। ক্ষিতিমোহন বাবু ও মাস্টার মশায় ছিলেন চালচলনে বেশভুষায় কথাবার্তায় সুরুচিসম্পন্ন। এতটুকু বাহুল্য কোথাও নেই। সাজছিল বিকেলে গোসল করে মেয়েরা দেবে মাথায় ফুল আর কপালে টিপ, আর ছেলেরা করবে স্বাস্থ্যের যত্ন। ব্রহ্মচর্যাশ্রম ছিল প্রথম নাম। তখন ছিল একশ’ পাঁচজন ছাত্র আর পঁচিশজন শিক্ষক। বুধবার ছুটি। বাথরুম ছিল না, গরম পানি ছিল না, ভৃত্য কম, ছেলেরাই সব কাজ করত। পৌষের হাড় ভাঙা শীতে মোজা নেই, চটি পায়ে, সাদা পাঞ্জাবির  উপর সাদা চাদর জড়িয়ে লণ্ঠন হাতে রাত তিনটে সাড়ে তিনটেয় ঐ যে চলেছেন দীর্ঘকায় ব্যক্তিটি মন্দিরের দিকে। তিনিই রবীন্দ্রনাথ।”

গুরুপল্লী না দেখেই অনুভবে লিখেছি। ভেবেছি, ১৯১৯ সালে যখন আমার জন্মই হয়নি, তখন যদি এমনটি হয়ে থাকে, তাহলে এখন কেন পারব না এমন একটি গ্রামের পল্লীর পত্তন করতে, যেখানে প্রতি ছাত্র, প্রতি ছাত্রী অভিভাবকের সোনার কাঠির স্পর্শে হতে পারেন পরিপূর্ণভাবে স্পর্শিত। ওপরের লেখাটি তুলে দেয়ার অর্থ হলো যাতে আমাকে কেউ ভুল না বোঝেন। অর্থাৎ আমি সেই মন নিয়েই গুরুপল্লীতে ঢুকে পড়েছিলাম।

৩.

নজরুল তার গুরুদেবকে কাব্যে গানে অনুসরণ করেননি একমুহূর্তের জন্যও। নজরুলের মনে যে শান্তিনিকেতনের কল্পনা, তাও ভিন্নতর। কী ছিল তা অনুধাবন করার জন্য তাঁর কাব্য গীতিমালা যথেষ্ট, কারণ ১৯২৮ সালের পর আরো অনেক দিন তিনি তার পদচারণায় কাঁপিয়ে তুলেছিলেন পুরো বাংলাদেশ। কিন্তু সেদিনের বক্তব্যে যা প্রকাশিত হয়েছিল তা কল্পনাতেই রয়ে গেছে, দল মেলতে পারেনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। রবীন্দ্রনাথ কর্মবীর, নজরুল তা নন। এখানে তাঁর পরিকল্পনার কথা আলোচনা করা যেতে পারে।

চট্টগ্রাম রাউজান থানা সদরে মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্সে কবি প্রধান অতিথি। কলকাতা থেকে হবিবুল্লাহ বাহার, ‘দি মুসলমান’ পত্রিকার সম্পাদক মুজিবুর রহমান খান এবং মোহাম্মদ মোদাব্বের। কবি ও আব্বাসউদ্দীন গানে গানে মাতিয়েছিলেন। প্রায় ১০ হাজার লোক যোগ দিয়েছিলেন। স্থানীয়ভাবে এ সম্মেলন যারা সাফল্যমন্ডিত  করেছিলেন তারা হলেন, মোহাম্মদপুরনিবাসী মৌলভী নূরুল আফসার চৌধুরী, নূরুল হুদা চৌধুরী, আবুল কাসেম এবং আহমদ কবির চৌধুরী। সম্মেলনে কথাশিল্পী মাহবুবুল আলম ও ড. মোহাম্মদ এনামুল হক উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে আরো ছিলেন মাহবুবুল আলম চৌধুরী ও আহমদ সাগীর চৌধুরী। তার শ্যালক সাইফুদ্দিন সিদ্দিকীও উপস্থিত ছিলেন। তাকে নিয়ে কবি তাৎক্ষণিক একটি গান লিখলেন। তারপর গানটি গেয়ে শোনালেন। সবাই এ গান শুনে উৎফুল্ল। কিন্তু তিনি তাঁর কল্পনার শান্তিনিকেতন সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা আবার পাঠ করা যাক :

‘আপনাদের ইসলামাবাদ [চট্টগ্রাম] হোক ওরিয়েন্টাল কালচারের পীঠস্থান আরাফাত ময়দান। দেশে-বিদেশে তীর্থযাত্রী এসে এখানে ভিড় করুক। আজ নবজাগ্রত বিশ্বের কাছে বহু ঋণী আমরা। সে ঋণ আজ শুধু শোধই করব না ঋণ দানও করব, আমরা আমাদের দানে জগতকে ঋণী করব। এই হোক আপনাদের চরম সাধনা। হাতের তালু আমাদের শূন্যপানেই তুলে ধরেছি। এতদিন সে লজ্জা আজ আমরা পরিশোধ করব। আজ আমাদের হাত উপুড় করবার দিন এসেছে তা যদি না পারি সমুদ্র বেশি দূরে না; আমাদের লজ্জার পরিসমাপ্তি যেন তারি অতল জলে হয়ে যায় চিরদিনের তরে! আমি বলি, রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের মত আমাদেরও কালচারের সভ্যতার জ্ঞানের সেন্টার বা কেন্দ্রভূমির ভিত্তি স্থাপনের মহৎভার আপনারা গ্রহণ করুন। আমাদের শত শত তরুণ খাদেম তাদের সকল শক্তি আশা-আকাক্ষা জীবন অঞ্জলির মত করে আপনাদের সে উদ্যমের পায়ে অর্ঘ্য দেবে। প্রকৃতির এই লীলাভূমি সতিই বুলবুলিস্থানে পরিণত হোক, ইরানের শিরাজের মত। শত শত সাদী, হাফিজ, খৈয়াম, রুমি, জামি, শামসি তবরেজ এই নিরাজবাগে, এই বুলবুলিস্থানে জন্মগ্রহণ করুক। সেই দাওতের আমন্ত্রণের গুরুভার আপনারা গ্রহণ করুন। আপনারা রুদকির মত আপনাদের বদ্ধ প্রাণ ধারাকে মুক্তি দিন।’

আবু বকরের সাচ্চাই, ওসমানের সত্যনিষ্ঠতা, আলীর বীরত্ব ছিল কবির স্বপ্ন স্বপ্নমহলে বিরাজমান। আমার লেখা উপন্যাস ‘পুড়িব একাকী’-তে নজরুলের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্নগুলোর জাল সামান্য হলেও উপস্থাপিত। কেন দল মেলেনি তার জীবনস্বপ্ন, তার কারণও বিধৃত হয়েছে। লিখেছি :

‘জীবনের গল্পটি তুলে এনেছি, রঙ চড়াইনি। প্রজাপ্রতির পাখা রেঙে উঠেছে মাঝে মাঝে। ফিকশন, ইতিহাস নয়। গল্প আমাদের প্রিয় কবির। বিদ্রোহ ও সুন্দরের কারণে হিন্দুরা অনুভব করছেন, মুসলমানরা আঁকড়ে ধরতে চাইছেন তাদের একমাত্র নকিব, কমরেডরা খুঁজেছেন বি তের জয়গান উদ্গাতাকে। মাত্র দশটি বছর সময় পান কবি তার জীবন মেলে ধরার। সাম্প্রদায়িক মিলনের স্বপ্ন ছিল তার। চুরমার করে দিতে ছুটে আসে মহাযুদ্ধ, মম্বন্তর, দাঙ্গা। প্রতিকূল সময়ের ঝড়ে পাল তোলে হিংসা-অপবাদের ছুরি, অপমান। বিক্ষত কবিমনকে ধীরসন্তর্পণে গ্রাস করে দারিদ্র্য, আঘাত, ব্যাধি। সম্প্রদায়ের সমঝোতা না হতেই দেশ ভাগ। উপন্যাসের ময়ূরপঙ্খী কখনও চলে দুলকি চালে বাতাসের আবর্তে, কখনও ফিকশনের খরস্রোতে; স্বগত উচ্চারণে, কবিতায়, গানে, ভাষণে। বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম মানসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যে কবি, প্রবাহিত তিনি নিজ দুঃখনদীতে। কেউ নিতে পারেননি সে দুঃখভার।

সবার আগ্রহ অন্তর্গত মানুষটির গল্পে, কবিপ্রাণে। সমসাময়িকদের স্মৃতিবাসরে সযতনে কুড়িয়েছি সংলাপ। পথ গিয়েছে বেঁকে, দু’ধারের তৃণলতাও কথা বলে উঠেছে। ইথারে ভেসে বেড়ায় স্বগত সংলাপ। কথা ছিল তার গানের ভাষণের আড়াল। কেউ খুঁজবেন স্থান কাল পাত্র। শুধু মূল সুর খোঁজার চেষ্টা করেছি।

ছোট জীবন, ব্যাপ্তি বিশাল, প্রয়োজন হাজার পৃষ্ঠার। কাতিব অশ্রুরুদ্ধ, লিখেছেন অল্পই। তার কেউ নই আমি, তবু উত্তরাধিকারীদের একজন। লক্ষ্য অনাত্মীয় পাঠক পড়বেন ঘনিষ্ঠতম কবির কাহিনী। প্রজন্মের অশ্রুভরা চোখে নামাবে বিষাদের বৃষ্টি, যা আমার ইচ্ছা ছিল না। একাকী পুড়েছে যে কবির হৃদয়, জলসা শেষে ফিরে গেছেন প্রভুর কাছে। গ্রন্থের প্রতিবাক্য ভালবাসার অশ্রু দিয়ে গাঁথা, গীতশেষে প্রার্থনা।

বিদ্রোহী প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। অসহযোগের গান গেয়েছেন একদিকে, আবার রাজা-রানীর জয়গানও গেয়েছেন তাদের সঙ্গে নজরুলের তফাৎ বুঝবেন এই গ্রন্থে। যার ধর্ম তার কাছে। পৃথিবীতে এত মানুষ। প্রতি মানুষের সমর্পণ ও সম্পর্ক তার নিজ প্রভুর সঙ্গে আলাদা। ধর্ম বাইরে থেকে শনাক্ত করা গেলেও ভেতরে ঢোকার সাধ্যি কার, প্রতি মানুষের সঙ্গে বিধাতা সেখানে একাকী, নজরুল, আমার, আপনার সবার ক্ষেত্রে তাই।

হিন্দু-মুসলমানের সমঝোতা হয়নি। মাটির কলসী ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগে না। থাকব ভাইয়ের মত, হিংসার ঊর্ধ্বে।’

নজরুলমানস জানার জন্য তার ৫০টি কবিতা সংকলিত নানা স্থানে। এর মধ্যে মাত্র দুটি এখানে উল্লেখ করছি আমার উক্ত গ্রন্থ থেকে।

হজরত ওমর ফারুক (রা.)

হজরত ওমর ফারুক (রা.), ছিলেন ন্যায় ও সাম্যের প্রতিভূ। নবীর চার খলিফার একজন। তাকে দেখিনি, অনুভব করেছি। দুনিয়াতে জুলমতের অবসান হবে সেদিন, যেদিন ওমর ফারুককে আমরা চিনতে পারব। ওমরকে কেউ কাঁদতে দেখেনি। আমি দেখেছি, যখন শহীদদের তার কাছে নিয়ে আসা হল। তাদের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে তিনি কেঁদে উঠলেন। বললেন, হে আল্লাহ আমাকে শাহাদাতের মর্যাদা দিও। আমি শহীদ হতে চাই।

তিমির রাত্রি এশার আজান শুনি দূর মসজিদে

প্রিয় হারা কার কান্নার মত এ বুকে আসিয়া বিঁধে

আমির-উল-মুমেনিন…

 

খালেদ

খালেদ বিন ওলিদ না হলে ইসলামের বিজয় হতো না। আর আমি ইসলামের বিজয় না চাইলে এই কবিতা লিখতাম না।

খালেদ! খালেদ! ফজর হল যে, আজান দিতেছে কৌম,

ঐ শোন শোন, ‘আস্সালাতু খায়্র্ মিনান্নৌম’…

 

৪.

শান্তিনিকেতনের পুরো পরিকল্পনাই রবীন্দ্রনাথের, দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, পরিকল্পনা, শিক্ষক সংগ্রহ, অর্থ সংগ্রহ, সবারই মূলে রবীন্দ্রনাথ নিজে। বিশ্বভারতীর মতো একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা তার পক্ষেই সম্ভব ছিল। যদিও তার মৃত্যুর পর কিছু দিন ভালো চললেও বিশ্বভারতী হয়তো এতদিনে বন্ধ হয়ে যেত যদি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এর দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে না নিত। শান্তিনিকেতনের বিল্ডিংগুলো যেখানে কয়েকবার গিয়েছি, জায়গায় জায়গায় খসে পড়ছিল। সবচেয়ে যা খসে পড়ছিল তা হলোÑ রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারা, যা ছিল আশ্রমকে কেন্দ্র করে। শান্তিনিকেতনে এখন যারা পড়তে আসেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে হয়েছে আমূল পরিবর্তন, শিক্ষকরাও আর আগের মতো নেই। তাকে খুঁজে পাওয়া যায় সঙ্গীতসভায়, বসন্ত উৎসবে, বাউলমেলায় এ কথা সত্যি, কিন্তু যার কথা ভেবে রবীন্দ্রনাথ এই বিদ্যালয়ের হাতেখড়ি করেছিলেন তা আর এখন নেই এটাই সত্যি কথা। কোথায় সে আশ্রম, কোথায় সে নিবিড় শিক্ষা।

অনেকের মনেই কল্পনা বাসা বাঁধে, আবার সেখানেই শেষ। ভেবেছিলাম একটি পল্লীর কথা, যেখানে কয়েক ঘর শিল্পী বাস করবেন, যাদের দোতারায় ফুটে উঠবে ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, মুর্শিদা, দেহতত্ত্ব। ‘হীরামন মঞ্জিল’-এ আমার বাসাতেই প্রথম মিটিং হলো, সেখানে উদ্যোক্তাদের প্রধান হলেন জয়নুল আবেদিন, সঙ্গে কামরুল হাসান, অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদ, অধ্যাপক মনসুরউদ্দিন, কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজসহ আরো অনেকে। জয়নুল আবেদিন বললেন, আব্বাসী, তোমার কল্পনা ঠিকই আছে, কিন্তু আমার সঙ্গে পুরোপুরি মিলবে না। আমি ভাবছি একটি শিল্পীপল্লীর কথা, যেখানে বাংলাদেশের চারু ও কারুশিল্পীরা স্থান করে নেবেন, ছবি আঁকবেন সারাদিন। এর কিছু দিন আগে ঘুরে এসেছি ম্যানিলা, যেখানকার ‘ফোক ভিলেজ’-এ প্রতিদিন ১০ হাজার দর্শক প্রত্যক্ষ করেন লোকসঙ্গীত, কিনে নিয়ে যান নানা শিল্পকর্ম। আপনাতে আপনি বিকশিত সেই শিল্পপল্লী। অনেক চেষ্টা করলাম আমার আইডিয়াটি সবার মধ্যে সঞ্চারিত করতে, পারিনি।

দিন যায় কথা থাকে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রতিষ্ঠিত সোনারগাঁ জাদুঘরে তার স্বপ্নেরা দল মেলে, অথচ সেখানেও সব স্বপ্ন সফল হয়েছে তা বলা যাবে না। আমি যে স্বপ্ন দেখেছিলাম তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরিচিত জারি, মালজুরা, ভাটিয়ালি গানের শিল্পীরা দিনকয়েক আমার সঙ্গে টেলিভিশনে গান গেয়ে বিদায় নিয়েছেন, তাদের কেউ কেউ বৃদ্ধ, অবসর জীবনে। ওই গানগুলো তো চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল। কথাগুলো এ জন্য বললাম যে স্বপ্নে স্বপ্নে প্রভেদ থাকে।

নজরুলের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। নজরুল যে মুমিনকে তালাশ করেছিলেন তার বক্তৃতায়, তাদেরই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ১৯২৮ সালের পর অনেক পানি কর্ণফুলী দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এতদিনের মধ্যে একজন মুমিনও এসে বলেনি আমি নজরুলের স্বপ্নের জন্য এক বিঘা জমি দান করলাম, গ্রাম তো দূরের কথা। যদি ইসলামের মূল মানুষের মধ্যে গ্রথিত করার জন্য এ স্বপ্নের অবতারণা হয়ে থাকে, তাহলে জেনে রাখুন, এ স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে।

তবে একেবারেই মৃত্যু হয়েছে তাও বলা যাবে না। কয়েক মাস আগে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েশন সিরিমনিতে প্রধান অতিথি হওয়ার গৌরব অর্জন করি। প্রায় ১০ হাজার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ১০০ জন ছাত্র নির্বাচিত হলো বিশেষ লিডারশিপ কোর্সের জন্য। কোর্স ও কঠিন নিয়মাবলীর একটি কপি আমার হাতে এসেছিল। মুহূর্তে আমার মন চলে গেল নজরুলের সেই বক্তৃতার দিকে।

ভোর ৪টায় ওই ১০০ জন ছেলে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুতে মিলিত হন কুমিল্লার বার্ডের মসজিদে। সেখান থেকে শুরু কার্যক্রম। ওদের সঙ্গে কথা বলেছি। বাস্তবতার সাজুয্যে আধুনিক ও আদর্শ জীবনে উজ্জীবিত এরা। স্থির নিশ্চিত হলাম যে এদের মধ্যেই লিডারশিপ লুকিয়ে। ধর্মের গোঁড়ামি নয়, বরং ঔদার্য, মানবতাবোধ, অন্য ধর্মের প্রতি সহানুভূতি, এটাই ইসলামের মূল। নজরুল একেই শনাক্ত করেছিলেন তার স্বপ্নের শান্তিনিকেতন হিসেবে। কিছু সবুজ গাছপালা আর বিল্ডিং নয়, ১০০ ছেলেমেয়ে যারা জাতিকে নেতৃত্ব দেবে, তাদের মাঝেই বেড়ে উঠবে শান্তির সম্ভাবনা।

আমার বক্তৃতা ছিল এক ঘণ্টা, এর মধ্যে আধ ঘণ্টা গাইলাম নজরুলের বাঁধভাঙা গানগুলো, আর আধ ঘণ্টা বললাম প্রিয় নবী (সা.)-এর কথা। আমার শান্তিনিকেতন ভাবনার সঙ্গে নজরুলের ভাবনা মিশিয়ে দিলাম। বক্তৃতা শেষে ছেলেমেয়েরা আমাকে ও আসমাকে ঘিরে রইল। তারা বুঝতে পারল শান্তির আশ্রয় আমাদের মনেই। যতক্ষণ আমরা শান্তির উদ্গাতা, প্রিয় নবী (সা.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত, ততক্ষণ আমরা সফল।

 

Author: মুস্তাফা জামান আব্বাসী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts