নজরুল ও বাঁধনহারা

নজরুল ও বাঁধনহারা

নজরুল প্রথম জীবন থেকেই সচেতনমনস্ক কবি। কবিতায়-গানে আমরা বিদ্রোহ, বিপ্লব, সাম্য, স্বাধীনতা সম্পর্কে নজরুলের অনেক বক্তব্য শুনে আসছি। তাঁর কথাসাহিত্যেও স্বাধীনতা, সাম্য, বিদ্রোহী ভাবধারা প্রকাশ পেয়েছে। বাঁধনহারা, মৃত্যুক্ষুধা এবং কুহেলিকা এ তিনটি উপন্যাসেই কবির সমকালীন রাজনীতি ও সমাজ জীবনের ছাপ ব্যাপক এবং স্পষ্টভাবে মূর্ত। নজরুলের প্রথম উপন্যাস বাঁধনহারার ভিত্তি ব্যর্থ প্রেম। এর নায়ক নূরুল হুদা এবং নায়িকা মাহবুবার প্রেমের বিষয়টি এসেছে পরোক্ষভাবে। নূরুল হুদার বন্ধু রবিয়াল, তার স্ত্রী রাবেয়া, রবিয়ালের মা, রবিয়ালের ভাগনি সোফিয়া, সাহসিকা প্রমুখ চরিত্রের চিঠিপত্রের মাধ্যমে নূরুল হুদা এবং মাহবুবার ভালোবাসা ও তাদের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ঘটনা বিবৃত হয়েছে। এই প্রেমকাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের সেকালের সমাজ জীবন এবং পরিবেশের বহু চিত্র আমরা দেখতে পাই। এ উপন্যাসে বাংলাদেশের সমাজ জীবনের দুটি বিষয় খুবই স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমে আমরা দেখতে পাই সমাজ ও সংসারে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য। এগুলো প্রকাশ পেয়েছে নারীদের লিখিত পত্রে। দ্বিতীয়ত প্রকাশ পেয়েছে হিন্দু ও মুসলমানের ব্যবধান। নারীরা যে ঘরে-সমাজে বঞ্চিত-লাঞ্ছিত, নজরুলের কবিতায়-গানে তা বারবার ধ্বনিত হয়েছে। সমাজের উপেক্ষা, অবহেলা, অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য তিনি নারীদের ডাক দিয়েছেন। সাম্যবাদী ও নারী কবিতা রচনার আগে বাঁধনহারা উপন্যাসে বিভিন্ন নারী চরিত্রের জবানিতে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর ওপর পুরুষের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারিত। নায়িকা মাহবুবা একটি পত্রে তার সই সোফিয়াকে এ বিষয়ে লিখেছে, ‘সময় কাটিবে বলে ভাবি’জীর কাছে হতে দু’চারটে বই আর মাসিকপত্র সঙ্গে এনেছি, এই দেখে এরা তো আর বাঁচে না। মেয়েদের চিঠি লেখা শুনলে এরা যেন আকাশ থেকে পড়ে। ডাকে চিঠি দিলাম না, তা হলে তো লঙ্কাকান্ড বেধে যেত। তাই এই পত্রবাহিকা এলোকেশী বাগদীর মারফতেই খুব চুপি চুপি চিঠিটা পাঠালাম।…’ এর জন্য দায়ী কে? পুরুষরাই তো আমাদের মধ্যে এসব সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামি ঢুকিয়ে দিয়েছে। শিক্ষিত মানুষও যে নারীর স্বাধীনতা-সম্মান-অধিকার স্বীকার করে না সে কথাও প্রকাশ পেয়েছে মাহবুবার চিঠিতে। তার ভাষায়, ‘আজকাল অনেক যুবকই উচ্চ শিক্ষা পাচ্ছেন, কিন্তু আমি একে উচ্চ শিক্ষা না বলে লেখাপড়া শিখছেন বলাই বেশি সঙ্গত মনে করি। কেননা, এঁরা যত শিক্ষিত হচ্ছেন ততই যেন আমাদেরকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখছেন…’ নূরুল হুদার সঙ্গে বিয়ে না হওয়ায় আর্থিক কারণেই মাহবুবা এক বৃদ্ধ জমিদারকে স্বামীরূপে বরণ করে। এটাও সামাজিক অবিচার। সম্পদ ও সম্পত্তির জোরেই আমাদের সমাজের বৃদ্ধেরা তরুণী ভার্যা কেনেন। এই সামাজিক অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে মাহবুবা, ‘এইরূপ বিবাহ একটা অভিশাপ। আমার স্বামী আমার রূপকে চেয়েছিলেন রূপার দরে যাচাই করতে।…’ কিন্তু এর জন্য স্বামীকে খোঁচা দিয়ে লাভ নেই। এ তো আমাদের বাংলার অন্তপুরবাসী মুসলিম মেয়েদের চিরকাল একঘেয়ে কাহিনী। আমাদের সমাজে স্ত্রী-শিকারি অর্থাৎ স্বামীরা শব্দভেদী বাণ ছুড়ে শিকার করেন আমাদের। মাহবুবার স্বামী দেশের জমিদার শ্রেণির অহঙ্কারী প্রতিনিধ। মাহবুবার ভাষায়, ‘আমার স্বামী জমিদার…। রাজা ওরা পাড়া গেঁয়ে সংস্করণ। কত নারী তাকে আত্মদান করে ধন্য হয়ে বেহেশতে চলে গেছে হাসতে হাসতে।…’ তবে টাকার জোরে মাহবুবাকে বিয়ে করে সে জমিদার ঠকেছে। মাহবুবা বলেছে, ‘গয়না ও টাকা ছাড়া যে মেয়েলোক আরও কিছু চায় এই নতুন জিনিসটার সঙ্গে যখন পরিচয় হল তার আমার কৃপায় তখন এই হতভাগ্যের দুঃখ দেখে আমার মত পাষাণীর চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।’ মাহবুবার এই পত্রটি বাংলাদেশের পার্বতী আর মাহবুবাদের জীবনের করুণ পরিণতির ইতিবৃত্ত। হিন্দু-মুসলমানের ব্যবধান এবং বিরোধ বাংলার তথা ভারতীয় উপমহাদেশের একটি বিরাট সমস্যা। পাশাপাশি বহু বছর ধরে বাস করেও এরা একাত্ম হতে পারেনি। এর কারণ একাধিক। তবে নজরুলের এই উপন্যাসে অল্প কথায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের অমৈত্রীয় দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। রাবেয়া এ প্রসঙ্গে মাহবুবাকে লিখেছে, ‘হিন্দুদের বাড়িতে গেলে কোথায় যেন কি ব্যবধান থেকে অনবরত একটা অসোয়াস্তি কাঁটার মত বিঁধতে থাকে। আমরা তাদের বাড়ি গেলেই তারা হন আর না হন আমরাই বেশি সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি, এই বুঝি বা কোথায় কি ছোঁয়া গেল, আর অমনি সেটা অপবিত্র হয়ে গেল। আমরা যেন কুকুর বেড়াল আর কি।’ নজরুল ইসলাম মুসলমান বলেই এমন কঠিন কথা বলেছেন তা নয়। রবীন্দ্রনাথও ‘গোরা’ উপন্যাসে হিন্দুদের এই ছুঁৎমার্গের বিষয়ে নির্মম মন্তব্য করতে কুণ্ঠিত হননি। মন্তব্য এই, ‘একটি বিড়াল পাতের কাছে বসে ভাত খেলে কোনো দোষ হয় না, অথচ একজন মানুষ সে ঘরে প্রবেশ করলে ভাত ফেলে দিতে হয়, মানুষের প্রতি মানুষের এমন অপমান এবং ঘৃণা যে জাতিভেদে জন্মায় একে অসভ্যতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।’ বাঁধনহারা উপন্যাসের একটি নারী চরিত্র, হিন্দু-ব্রাহ্মণ। তার নাম সাহসিকা। তার সঙ্গে রাবেয়ার ভালোবাসা জন্মে স্কুলে পড়ার সময়। সাহসিকার মা ছিলেন রাবেয়ার শিক্ষয়িত্রী। ব্রাহ্মণদের মধ্যে কোনোরকম ছুঁৎমার্গ দেখেনি। এদের প্রসঙ্গে মাহবুবাকে রাবেয়া বলেছে, এদের সঙ্গে যে খুব সহজ সরল স্বাচ্ছন্দ্যে প্রাণ খুলে মিশতে পারা যায়, এইটেই আমাকে আনন্দ দেয় সবচেয়ে বেশি। কোন সংকীর্ণতা, ধর্মবিদ্বেষ, বেহুদা বিধিবন্ধন নেই। অথচ এখনও দেশের পনের আনা হিন্দুর সামাজিকতা… আচার-বিচারে ভরা। ভিতরে এত অসামঞ্জস্য ঘৃণা-বিরক্তি চেপে রেখে বাইরের মুখের মিলন কি কখনও স্থায়ী হয়? পাশাপাশি থেকে এই যে আমাদের মধ্যে এত বড় ব্যবধান। গরমিল  কি কম দুঃখের কথা?… এই অবমাননার মধ্যে হঠাৎ এই ব্রাহ্মণ সমাজের এত প্রতিভার ব্যবহার যেন একবুক আসোয়াস্তির মাঝে স্নিগ্ধ শান্ত স্পর্শের মত নিবিড় প্রশান্তি নিয়ে এসেছে। আমাদের ঘরের পাশের হিন্দু ভাগিনীগণ যখন এমনিভাবে মিশতে পারবেন, তখন একটা নতুন ধারা সৃষ্টি হবে আমার দেশে, এ আমি জোর করে বলতে পারি, এই ছোঁয়াছাঁয়ির উপসর্গটা যদি কেউ হিন্দু সমাজ থেকে উঠিয়ে দিতে পারেন, তাহলে হিন্দু-মুসলমানের একদিন মিল হয়ে যাবে। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, ব্রাহ্মণরা একেশ্বরবাদী, বর্ণভেদ, জাতিভেদের বিরোধী। এদের উদারতা দেখানো হয়েছে। নজরুলকে বিদ্রোহী কবি বলার পেছনে যুক্তি আছে। বিদ্রোহী রচনার আগে বাঁধনহারা গ্রন্থে তার বিদ্রোহী চেতনার প্রকাশ লক্ষ্যযোগ্য। রাবেয়াকে একটি পত্রে নূরুল হুদা লিখেছে, ‘মানুষকে আঘাত করে হত্যা করেই আবার আনন্দ আবার এ নিষ্ঠুর পাশবিক দুশমনী মানুষের ওপর নয়, মানুষের স্রষ্টার ওপর। এই সৃষ্টিকর্তা যিনিই হোন, তাকে আমি কখনই ক্ষমা করতে পারবো না, পারবো না। আমাকে লক্ষ জীবন জাহান্নামে পুড়িয়ে আবার কব্জায় আনবার মত শক্তি ঐ অনন্ত অসীম শক্তিধারীর নেই। তার সূর্য। তার বিশ্ব গ্রাস করবার মত শক্তি আমারও অন্তরে আছে। আমি তাকে তবে ভয় করব কেন? আপনি আমায় শয়তান বলবেন, আমার এ উদ্ধতা দেখে কানে আঙ্গুল দেবেন জানি। ওহ তাই হোক। বিশ্বের সব কিছু মিলে আমায় শয়তান, পিশাচ বলে অভিহিত করুক, তবে না আমার খেদ মেটে, একটু সত্যিকার আনন্দ পাই।’ বাংলা সাহিত্যে এই চিন্তা-চেতনা অভিনব অচিন্তনীয়। বিদ্রোহী, ধূমকেতু, সত্যবাদীতে এই চেতনারই প্রকাশ ঘটেছে নানাভাবে। বাঁধনহারাতে প্রশ্ন উঠেছে ধর্ম সম্পর্কে। পৃথিবীতে ধর্মের উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ, শান্তি, তার নৈতিক শক্তির জাগরণ। কিন্তু দেখা যায়, ধর্ম শেষ পর্যন্ত সামাজিক আচার-আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এ জন্য পৃথিবীতে ধর্মে ধর্মে কলহ-বিবাদ-এসে জিহাদ বাধে। ধর্ম সম্পর্কে সাহসিকার জবানিতে নজরুল ঘোষণা করেছেন, ‘প্রত্যেক ধর্মই সত্য-শাশ্বত সত্যের উপরই প্রতিষ্ঠিত এবং কোন ধর্মকে বিচার করতে গেলে তার এই মানুষের গড়া বইয়ের বিধান শৃংখলা দিয়ে কখনও বিচার করবে না।… মন্দিরে গিয়ে পূজা করা আর মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়াটাই কি ধর্মে সব সত্য? এগুলো বাইরের বিধি। গোঁড়া ধার্মিকদের ভুল তো ঐখানেই। ধর্মের আদত সত্যটা না ধরে এরা ধরে আছেন যতসব নৈমিত্তিক বিধিবিধান। এরা নিজের ধর্মের উপর এমনি অন্ধ অনুরক্ত যে, কেউ একটু নাড়াচাড়া করতে গেলে ফোঁস করে ছোবল মারতে ছোটেন।… ধর্ম কি কাচের ঠুনকো গ্লাস যে, একটুতেই ভেঙে যাবে। ধর্ম যে বর্মের মতই সহ্যশীল।’ বিদ্রোহী ও নাস্তিকতার পক্ষেও বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে বাঁধনহারায়। সাহসিকার মতানুসারে বিদ্রোহী হওয়াও তো একটা মস্ত শক্তির কথা। লাখ লাখ লোক যে জিনিসটিকে সত্য বলে ধরে রেখে দিয়েছে, চিরদিন তারা যে পথ ধরে চলেছে তাকে মিথ্যা বলে ভুল বলে তাদের মুখের সামনে বুক ফুলিয়ে যে দাঁড়াতে পারে তার সত্য নিশ্চয়ই এই গতানুগতির পথের পথিকদের চেয়ে বড়। বিশেষ করে বিদ্রোহী হওয়ার যেমন কি এমনকি পৈশাচিক আনন্দ রয়েছে তাতে? হায় বোন কে বলে দেবে সে কথা? মাহবুবার এই বক্তব্যে স্রষ্টার প্রতি নিঃসংশয় বিশ্বাসের অভাব ফুটে উঠেছে। নজরুল-সাহিত্যের আরো অনেক জায়গায় এরূপ নাস্তিকতা ও সংশয়ের ভাব ফুটে উঠেছে। বিষের বাঁশির ভূমিকায় নজরুল লিখেছেন, ‘এর বিষ জুগিয়েছেন আবার নিপীড়িতা দেশমাতা, আর আমার উপর বিধাতার সকল রকম অত্যাচার।’ বাঁধনহারা যখন রচনা করেন তখন নজরুল ইসলামের বয়স ২১-২২ বছর। বিয়েশাদি করেননি। সংসারও করেননি। অবশ্য ছোটবেলা থেকে ঘরছাড়া তিনি। মাহবুবা সোফিয়াকে লিখেছে, ‘যাদের ছেলেবেলা হতেই দুঃখ-কষ্টের মধ্যদিয়ে মানুষ হতে হয়, যাদের জন্ম হতেই টল খেয়ে, চোট খেয়ে বড় হতে হয়। তারা এই বয়সেই এতটা বেশি গম্ভীর আর ভাবপ্রবণ হয়ে ওঠে যে অনেকের চোখে সেটা অস্বাভাবিক রকমের বাড়াবাড়ি বলেই দেখায়। অতএব, যে জিনিসটা জীবনের ভেতর দিয়ে, নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে, অনুভব করিসনি, সেটাকে সমালোচনা করতে যাসনে যেন।’ যুবক লেখকের এ বক্তব্য রীতিমত অভিজ্ঞতালব্ধ বলেই মনে হয়। আরো বিস্ময় বোধ করি নজরুল যখন লেখেন, … যিনি যতই মানব চরিত্রের ঘন হন, তিনি নিশ্চয়ই নিজের মনকে পুরোপুরিভাবে নায়ক নূরুল হুদা বাঁধনহারা চরিত্র। রবিয়াল তাকে এক চিঠিতে লিখেছে, জানি যে, সে কোন বজ্রবাঁশী তোকে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিল, তোর এই বাঁধনহারা প্রাণটিকে জননী জন্মভূমির পায়ে ফুলের মত উৎসর্গ করে দিতে। রবিয়ালের স্ত্রী রাবেয়াও হুদাকে বাঁধনহারা বলে সম্বোধন করেছে। আমার খুব আশা ছিল, তার (মাহবুবার) রূপগুণের ফাঁদে পড়ে তোমার মতন সোনার হরিণও ধরা দেবে। বিশৃঙ্খল বাঁধনহারা জীবনের গতিও একটা শান্ত সুন্দরকে কেন্দ্র করে সহজ স্বচ্ছন্ধে বয়ে যাবে…? নূরুল হুদা শ্রেণির মানুষেরা ‘চির উদাসী, চির বৈরাগী’ ‘সৃষ্টির আদিম দিনে এরা সেই যে ছেড়ে বেরিয়েছে, আর তারা ঘর বাঁধলো না।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আমার বিশ্বাস, মাহবুবাটা এই বাঁধনহারাকে সইতে পারবে না বলে মিথ্যা ভয়ে তাকে মুক্তির নামে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে।

অবশেষে উপন্যাসের উপসংহারে নূরুল হুদা নিজেকে বাঁধনহারা বলে অভিহিত করেছে, ‘আমাদের বাঁধনহারা জীবননাট্যের একটা অঙ্ক অভিনীত হয়ে গেল।’ সঙ্গে সঙ্গে সে নির্দেশক ও নিয়ন্ত্রক বলে মেনে নিয়েছে। বাঁধনহারার নায়ক নূরুল হুদাকে প্রায় সব সমালোচকই নজরুল চরিত্রের প্রতিচ্ছায়া বলে অভিহিত করেছেন। হ্যাঁ, নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা, সংস্কারমুক্ত মন, তার সাহস এবং প্রগলভাতা নূরুল হুদার চরিত্রে আরোপিত হয়েছে। তবে প্রেমের শৃঙ্খলে বাঁধা। রেখে দিয়েছে, চিরদিন তারা যে পথ ধরে চলেছে, তাকে মিথ্যা বলে ভুল বলে তাদের মুখের সামনে বুক ফুলিয়ে যে দাঁড়াতে পারে তার সত্য নিশ্চয়ই এই গতানুগতির পথের পথিকদের চেয়ে বড়। বিশেষ করে বিদ্রোহী হওয়ার যেমন শক্তি থাকা চাই, তেমনি অধিকারও থাকা চাই। এ প্রসঙ্গে নজরুল রচনাবলীর সম্পাদক আবদুল কাদির যথার্থই বলেছেন, সাহসিকার পত্রে যে বিদ্রোহিতার আভাস আছে, তাহাই পরবর্তীকালে বিদ্রোহী কবিতায় পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে। নজরুল যখন লিখেন সৃষ্টিকর্তাকে ক্ষমা করতে পারবেন না, তখন মানুষ ধরে নেয়, তিনি সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করেন না, তিনি নাস্তিক। এ প্রসঙ্গও বাঁধনহারায় এসেছে। সাহসিকা স্পষ্টভাবে বলেছে, আমি… ভন্ড আস্তিকদের চেয়ে নাস্তিকদের বেশি ভক্ত, বেশি পক্ষপাতী।… এরা বিবেকের বিরুদ্ধে কথা বলে না, এরা যে সত্যবাদী।… আর এই বেচারা অন্ধ বিশ্বাসীর দল। বেচারারা কিন্তু না পেয়েই পাওয়ার ভান করে চোখ বুজে বসে আছে। পিতার মৃত্যুর পর অসহায় মাহবুবা তার সই সোফিয়াকে লিখেছে, বড় দুঃখের বাবাজীকে মনে করে শুধু কাঁদছি আর কাঁদছি। খোদা যদি অমন করে তাকে আমাদের মস্ত দুর্দিনের দিনে ওপারে ডেকে না নিতেন, তাহলে কি আজ আমাদের এমন করে বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে পরের গলগ্রহ হয়ে অবহেলার ভাত গিলতে হোত বোন?… আমি তাই খোদাকে জিজ্ঞাসা করছি, নিঃসহায় বিহঙ্গ শাবকের ছোট নীড়খানি দুরস্ত বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে তাঁর লাভ কি? হুদাকে প্রায় সব সমালোচকই নজরুল চরিত্রের প্রতিচ্ছায়া বলে অভিহিত করেছেন। হ্যাঁ, নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা, সংস্কারমুক্ত মন, তার সাহস এবং প্রগলভাতা নূরুল হুদার চরিত্রে আরোপিত হয়েছে। তবে প্রেমের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়তে নজরুলের অনীহা দেখা যায় না। বরং জীবনে বেশ কয়েকবার তার বিদ্রোহী রক্ত আঁচল বিজয় গর্বে উড়েছে। তবে তরুণ সৈনিক নজরুল জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাঁধনহারা উপন্যাসে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে মেলে ধরেছেন। নজরুলের আগে বাংলা সাহিত্যে নিরপেক্ষ দ্বিধামুক্ত প্রতিবাদ কমই চোখে পড়ে।

 

Author: সানজীদ নিশান চৌধুরী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts