পবিত্র ঈদুল আযহা : কুরবানির ইতিহাস ও তাৎপর্য

পবিত্র ঈদুল আযহা

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুইটি ধর্মীয় আনন্দ উৎসবের নাম “পবিত্র ঈদুল ফিতর” ও “পবিত্র ঈদুল আযহা”। আমাদের মাঝে দুইটি ঈদ আসে ভিন্নমাত্রায়, ধর্মীয় ভিন্ন ভাবগাম্ভীর্যে। আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য এবং বান্দা তার পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ ৩০দিন সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে পবিত্র রমাজান মাস শেষে পবিত্র ঈদুল ফিতর নামক ঈদ উৎসবে মেতে উঠে। আর ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের  ত্যাগ ও প্রতীকি কুরবানীর মাধ্যমে মনের সকল পাপাচারকে জবেহ করার মধ্য দিয়ে পালন করে পবিত্র ঈদুল আযহা। বাংলাদেশের মুসলমানরা যাকে পালন করে কুরবানীর ঈদ হিসেবে। এ দিনটিতে মুসলামনরা তাদের সাধ্যমত গরু, ছাগল, উট, দুম্বা কুরবানীর উদ্দেশ্য জবেহ করে।  

হিজরী বর্ষপঞ্জি হিসাবে আরবী জিলহজ্ব মাসের ১০ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত ৩দিন ব্যাপী ঈদুল ফিতর নামক ঈদ উৎসব করার বিধান রয়েছে।

ইসলামী পরিভাষায় এই ইবাদত হলো খালিছ ইবাদত, অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে কুরবানী নামক ইবাদত হলো একটি খাটি উপসনাধর্মী ইবাদত। কুরবানী শুধুমাত্র পশু জবেহ করা নয়। কুরবানী হচ্ছে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তারই নির্দেশিত পন্থায় নির্ধারিত পশু তার নামে উৎসর্গ করা। এর জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম কানুন আছে।  যার অন্যথা হলে  তা আর ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না।  আল্লাহ পৃথিবীতে যত প্রাণী মুসলমানের জন্য হালাল করেছেন তার সব প্রাণী দিয়ে কুরবানী করা হালাল করেন নি। পাশাপাশি কুরবানীর জন্য প্রাণীর নির্ধারিত বয়স ও বৈশিষ্ট্যের শর্ত বিদ্যমান।

ইসলামের রীতি নীতিতে যাকাত প্রদানের সামর্থ আছে এমন ব্যক্তির উপর ঈদুল আযহা উপলক্ষে কুরবানী করা ওয়াজিব। ঈদুল আযহা থেকে শুরু করে পরবর্তী ২ দিন কুরবানী জন্য নির্ধারিত সময়। আমাদের দেশে মুসলমানরা সাধারণত একটি গরু বা খাসী কুরবানী দিয়ে থাকেন।  তবে গরু বা মহিষের ক্ষেত্রে সর্বচ্চো ৭(সাত) ভাগ করা যায়। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ২,৩, ৫ বা ৭ জন মিলে একটি গরু কুরবানীতে শরীক হতে পারেন এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার অংশের গোশতকে সমান ৩ ভাগে ভাগ করে এক ভাগ গরীব, এক ভাগ আত্মীয় স্বজন এবং একভাগ নিজের খাওয়ার জন্য   রাখতে পারবেন, এটাই উত্তম।  

কুরবানীর গরু কমপক্ষে ২ বছর বয়ষ্ক এবং খাসীর ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১বছর বয়ষ্ক এবং নিখুঁত হতে হবে। নিজ হাতে কুরবানী করা উত্তম যদি সম্ভব হয়। কুরবানীর প্রাণীকে ১২ ঘন্টা পূর্বে প্রচুর পানি পান করিয়ে কুরবানীর পূর্বে সুন্দরমতো গোসল করিয়ে ঈদুল আযহার নামাজ পরবর্তী দক্ষিণ দিকে মুখ করে ধারালো ছুরি দিয়ে “বিসমিল্লা আল্লাহু আকবর” বলে  জবাই করা শ্রেয়।

প্রতিবছরের মত বছর সমাপনান্তে মুমিনদের জীবনে মহান ঈদুল আযহা ফিরে আসে। একারণে অন্য সময়ের মত না হলেও  বার বার আন্দোলিত হয় এই ঈদকে কেন্দ্র করে মুমিনের হৃদয়। যারা আল্লাহর প্রিয় মুমিন বান্দা তাদের কাছে ধীরে ধীরে বেড়ে চলছে ঈদ আনন্দের মাত্রাও। আসলে আল্লাহর এক পরীক্ষার ফল হিসেবে বান্দাদের জন্য এই ঈদ উৎসব এর সৃষ্টি।  সে পরীক্ষা বড়ই মধুর ও  মর্মান্তিক। কি সেই পরীক্ষা ? প্রতিটি মানুষের মাছে প্রতিনয়ত ঘুরপাক খায় পিতা কর্তৃক আপন পুত্রকে কোরবানী করার মত খোদা প্রেমের সেই উজ্বল দৃষ্টান্তের কথা। যা মুমিনের হৃদয়ে খোদা প্রেমের নবজাগরণ সৃষ্টি করে। ভাবিয়ে তোলে তাদেরকে। কতটুকু খোদার প্রেমিক হলে সম্ভব এমন ত্যাগ?  হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে আল্লাহ্ তাঁর সম্প্রদায়ের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের কবল থেকে রক্ষা করার পর তিনি তাদের ঈমান গ্রহণ করার উপর নিরাশ হয়ে হিজরত করলেন। জীবনের এমন মূহূর্তে মহান আল্লাহ্ পাক তাঁকে একটি সন্তানের সুসংবাদ দিলেন। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর বয়স যখন ৮৬ বৎসরে উপনীত হল তখন  তাঁর ঘরে হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর শুভাগমন ঘটল। জীবন সায়াহেৃ পাওয়া শিশুর প্রতি তাঁর ভালবাসার ছিল না কোন অভাব। শিশু সন্তানের ভালবাসায় মেতে উঠে যেন তিনি লাভ করলেন একটি নতুন জীবন। সন্তানকে নিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর একটি নবজীবনের যাত্রা। পিতার আশা ও ভালবাসা মধ্য দিয়ে বড় হতে লাগলেন শিশুপুত্র ইসমাঈল। তিনি তখন পিতার সাথে চলাফেরা করেন। অনেক ক্ষেত্রে কাজকর্মেও সহযোগিতা করেন স্বীয় পিতাকে। ঠিক এমনই এক মূহূর্তে হযরত ইব্রাহীম (আ:) কে আদরের শিশু ইসমাঈলকে কুরবানীর কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বপ্নে দেখানো হলো। আহ! একি? কি সাংঘাতিক পরীক্ষা, জীবন সায়াহেৃ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যাকে নিয়ে বেঁধেছিলেন স্বপ্নের বাসা। আপন করে যাকে কাছে পেয়েছিলেন। পিতা কর্তৃক সন্তানের প্রতি যতটুকু স্নেহ আদর সোহাগ ও ভালবাসার প্রয়োজন এর কোনটিতেই তাঁর পক্ষ থেকে সামান্যতম ক্রটিও ছিলো না। এমনই এক সন্তানকে এত তাড়াতাড়ি চিরদিনের জন্য বিদায় দিতে হবে তিনি কখনো ভাবেননি। কল্পনার জগতে কখনো এটা উদিত হয়নি। কিন্তু সন্তানের ভালোবাসার চেয়েও মহান প্রভুর প্রেম ও ভালোবাসা তাঁর অন্তরে শতগুণে বেশি ছিল। তাঁর জীবনের প্রতিটি কর্ম-ই ছিল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে। জাগতিক কোন প্রকার স্বার্থের লেশমাত্র ও ছিলনা তাঁর কর্মে। আর আল্লাহর প্রতি এমন প্রেম ও ভালবাসার ফলে আপন সন্তানকে তাঁর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে কোরবানী করে দেওয়া তাঁর জন্য কষ্টকর কিছুই ছিলনা। তাইতো স্বপ্ন বাস্তবায়ানের লক্ষ্যে আপন সন্তানের সাথে পরামর্শে বসলেন। বললেন! ও হে মোর আদরের দুলাল! আমি তো তোমাকে কুরবানীর ব্যাপারে স্বপ্ন দেখেছি। সুতরাং এক্ষেত্রে তোমার কি মতামত?  খোদা প্রেমে আসক্ত পিতার সন্তান তো অন্য কিছুর প্রেমে আসক্ত হতে পারে না । পিতার পরামর্শে সাড়া দিয়ে পুত্র বললেন! ও হে মোর পিতা! আপনি যে বিষয়ে নির্দেশিত হয়েছেন তাই করেন। অবশ্যই আপনি আমাকে আপনার প্রতি আরোপিত নির্দেশ পালনের ব্যাপারে ধৈর্য্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।

আদরের দুলালের পক্ষ থেকে এমন হ্যাঁ বাচক সাড়া পাওয়ার ফলে আল্লাহর আদেশ পালনে আর কোন প্রতিবন্ধকতা রইলনা হযরত ইব্রাহমী (আ:) এর  মনে। হযরত ইব্রাহমী (আ:) তাঁর স্ত্রী হযরত সারা (রা:) এর নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে শিশু পুত্রকে চির বিদায়ের সাজে সজ্জিত করে দিতে বললেন। এ পৃথিবীর বুকে আল্লাহর প্রেমের সম্মুখে ছেলে সন্তানের প্রেম ভালবাসার কোন মূল্য নেই। এটাকেই মহান প্রভুর সামনে প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে প্রাণাধিক প্রিয় ছেলেকে চিরতরে বিদায় দিতে হৃদয়ের সব ভালবাসাকে ধুয়ে মুছে বিদায়ের সাজে সজ্জিত করে ছেলেকে নিয়ে চললেন। ইতিমধ্যে শয়তান এসে হযরত সারা (রা:) কে বলল! ইব্রাহীম (আ:) কোথায় যাচ্ছেন তোমার সন্তানকে নিয়ে? হযরত সারা (রা:) বললেন, কোন প্রয়োজনে যাচ্ছেন। শয়তান বললো,  আরে তিনি তো তাকে জবাই করার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁকে নাকি তাঁর প্রভু এমন নির্দেশ দিয়েছেন। এ কথা শুনে হযরত সারা (রা:) বলে উঠলে,। তাহলে তো তাঁর জন্য মহান প্রভুর আনুগত্য করাই উত্তম, অত:পর শয়তান নিরাশ হয়ে হযরত সারা (রা:) এর নিকট থেকে ফিরে গেল। এবার কুমন্ত্রণার জন্য হযরত ইসমাঈল (আ:) এর নিকটে গিয়ে আশ্রয় নিল। বললো,  ওহে বৎস কোথায় যাচ্ছেন তোমার পিতা তোমাকে নিয়ে? হযরত ইসমাঈল (আ:) বললেন! তাঁর প্রয়োজনে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি আমাকে। শয়তান বলল! আরে তিনি তোমাকে জবাই করার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। তাকে নাকি তাঁর প্রভু এ মর্মে আদেশ করেছেন। হযরত ইসমাঈল (আ:) বলে উঠেলেন! আল্লাহর শপথ যদি তাঁর প্রভু তাঁকে এ মর্মে নির্দেশ দিয়ে থাকেন তাহলে তাঁর জন্য অবশ্যই এটা করা উচিৎ।  ইসমাঈল (আ:) এর থেকে এমন উত্তর শুনে নিরাশ হয়ে সর্বশেষে কুমন্ত্রণার জন্য টার্গেট হিসাবে গ্রহণ করল হযরত ইবরাহীম (আ:)কে। জিজ্ঞাসা করল, কোথায় যাচ্ছেন আপনার সন্তানকে নিয়ে ? উত্তরে তিনি বললেন!  বিশেষ একটি প্রয়োজনে নিয়ে যাচ্ছি তাকে। শয়তান বললো,  আপনি তো তাকে জবাই করার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। আপনি তো ধারণা করছেন যে, আপনার প্রভু আপনাকে এ মর্মে নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত ইব্রাহীম (আ:) বললেন! আল্লাহর শপথ, যদি তিনি আমাকে এ নির্দেশ দিয়ে থাকেন তাহলে অবশ্যই আমি তা পালন করব। নিরাশ হয়ে শয়তান চলে গেল।

ইব্রাহীম (আ:) স্বীয় উদ্দেশ্য স্থলে পৌছে শেষবারের মত  সন্তানের প্রতি একটু ভালবাসা ও যেন তাকে আল্লাহর নির্দেশ পালনে বিঘণ্নতার সৃষ্টি না করে সে জন্যে সন্তানের মায়াবি দুুটি চোখ বেধে কুরবানীর জন্য শোয়ালেন। ছুরি চালালেন আদরের সন্তানের গলায়। কিন্তু একি? কোন অলৌকিক শক্তি কাজ করছে এখানে। তিনি যত বারই ছুরি চালাচ্ছিলেন ছুরি হযরত ইসমাঈল (আ:) কে জবাই করার ব্যাপারে অকার্যকর হয়ে পড়ছিল। তিনি যেন বুঝতেই পারছিলেন না। আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতি দুম্বা জবাই হল হযরত ইসমাঈল (আ:) এর পরিবর্তে। ইতিমধ্যে হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর নিকট অদৃশ্য বাণী আসল। হে ইব্রাহীম! তুমিতো তোমার স্বপ্নের বাস্তবায়ন করেছ, স্বপ্নের উদ্দেশ্য তো তোমার সন্তান কে শুধু শুয়ানোর দ্বারাই অর্জনে হয়ে গেছে। আল্লাহ পাক তো হযরত ইব্রাহীম (আ:) কর্তৃক হযরত ইসমাঈল (আ:) কে জবাই করা চাননি। বরং আল্লাহ পাকের উদ্দেশ্য ছিল হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসার মোকাবেলায় স্বীয় সন্তানের ভালবাসার কোন মূল্য নাই এ বিষয়টির প্রমাণ করা। আর তা তো সন্তানের শোয়ানোর মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। ঐতিহাসিক মিনা প্রান্তরে আল্লাহর প্রেমে মত্ত হয়ে পিতা কর্তৃক স্বীয় পুত্রকে কুরবানীর মত হৃদয় বিদারক কাহিনী কিয়ামত পর্যন্ত খোদা প্রেমিকদের জন্য উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।                       
সৈয়দ মাসুদুর রহমান
 সৈয়দ মাসুদুর রহমান

Author: সৈয়দ মাসুদুর রহমান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts