প্রেমের মরা

প্রেমের মরা

জীবন সম্পর্কে জাহাঙ্গীরের দৃষ্টিভঙ্গি এখন একজন দার্শনিকের মতো। সে বলে এই দুনিয়াটা আসলে একটা স্বপ্নের মতো। মৃত্যুতেই মানুষের সে স্বপ্ন ভেঙে যায়। নশ্বর স্বপ্ন জেনেও মানুষ এখানে সুখের আশায় নিরন্তর ছুটে চলছে। তারা নিত্যধামের খবর নিতে চায় না, পরমের প্রেম চায় না, চায় শুধু ক্ষণস্থায়ী জাগতের আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য। মানুষ ভালোও বাসে, কিন্তু ভালোবাসলেই যে সব সময় সুখি হওয়া যায় না, তা তারা ভুলে যায়, কারণ তাদের সে ভালোবাসায় স্বার্থ জড়িত থাকে। কিন্তু জাহাঙ্গীরের ভালোবাসায় আজ স্বার্থ জড়িত নেই। চাতক পাখি যেমন বৃষ্টির আশা করে আকাশের দিকে আকুল চোখে চেয়ে থাকে, তারা অন্য পানি পান করে না, তেমন চাতকের মতোই জাহাঙ্গীরও শেফালিকে চেয়েছিলো। শেফালিও ঠিক সেভাবেই জাহাঙ্গীরকে  চেয়েছিলো। অবশেষে শেফালিকে হারিয়ে জাহাঙ্গীর এখন সর্বহারা। শেফালির প্রেমই তার ক্ষুদ্র জীবনের সম্বল। সে এখন দয়ালের কৃপার আশায় বেঁচে আছে। বড় আজব জিনিস এই ভালোবাসা ! এই ভালোবাসা রাজা বানায়, আবার ফকিরও করে। শেফালির ভালোবাসাই জাহাঙ্গীরকে আজ পথের কাঙাল বানিয়েছে।

***

জাহাঙ্গীরের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার দুর্গাপুর নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে। তার মা ভাই-বোন আছে। কিন্তু শেফালিকে হারিয়ে আজ সে ভবঘুরে। সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের সৈয়দ গেছু দরাজ (র) ওরফে কল্লা শহীদের মাজারে থাকে। কিছু মিললে খায়, না মিললে না-খেয়ে থাকে। সে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক পীর-ফকিরের দরবারেও যায়। পথে-পথে ঘুরে-ঘুরে সে দোতারা বাজিয়ে বাউল গান গায়। গগন হরকরার বিখ্যাত এ গানটি সে প্রায়ই গেয়ে থাকে-  “আমি কোথায় পাবো তারে/ আমার মনের মানুষ যেরে।

হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দিশে/ আমি দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।”

***

জাহাঙ্গীর-শেফালির ছিল বাল্যপ্রেম। বয়সে দুবছরের বড়-ছোট হলেও তারা একই ক্লাসে পড়তো। শৈশব-কৈশোরে এক সাথেই বেড়ে উঠেছে, এক সাথে স্কুলে আসা-যাওয়া করেছে। স্কুলে যাওয়ার পথে শেফালি প্রতিদিন জাহাঙ্গীদের বাড়ি এসে পেছন থেকে জাহাঙ্গীরের পীঠে খোঁচা দিয়ে বলতো-

– আর কত পড়বি, স্কুলে যাবি না? ওঠ।

***

জাহাঙ্গীরের দাদা ছিলো এলাকার একজন  বড় জোতদার। তার দু’শ বিঘা জমি ছিলো। দেড়’শ লোকের থাকার মতো একটি বৈঠক ঘর ছিলো তাদের। প্রতিদিন নাতি-নাতনিদের নিয়ে দাদা-দাদি আসর জমাতো। জাহাঙ্গীরের শৈশব-কৈশোর গ্রামের অন্য বালকদের মতো অফুরন্ত আনন্দেই কেটেছে। চল্লিশ বছর বয়সেও আজ যখন সে শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বেড়ায় তখন তাকে নিষ্কলঙ্ক  বালকের মতোই দেখায়। কিন্তু চোখ-মুখ দেখলেই বোঝা যায়, তার ভেতরে এক দুঃখের দরিয়া বয়ে চলছে। দয়ালের কৃপা ছাড়া আজ তার আর কিছুই চাওয়ার নেই। শেফালির স্মৃতি নিয়েই জীবনের বাকি সময়টি জাহাঙ্গীর পাড়ি দিতে চায়। একমাত্র শেফালিই তার ইহজীবনকে একমুখী করে দিয়ে গেছে। পরজীবনে কী হবে তা সে জানে না। এই জীবনে শেফালির স্মৃতিই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।

***

ওদের এলাকায় শেফালির মতো এতো সুন্দর মেয়ে খুব কমই ছিলো। খুব চনমনে স্বভাবের হলেও তার চোখদুটো ছিলো মায়াভরা। আর কণ্ঠস্বর ছিলো খুব সুরেলা। ঘরে বসে সে যখন কোরান তেলাওয়াত করতো মসজিদ থেকে যাওয়ার পথে মুসল্লিরা দাঁড়িয়ে থেকে তা শুনতো।

***

তাদের দুজনের বাড়ি কাছাকাছি। শেফালি খালার বাড়িতেই বেশি সময় কাটাতো। এভাবে তারা একে অপরের মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে পড়ে। শৈশবেই এক জন অন্য জনকে দেখলে খুশি হতো। তারা একসাথে খেলতো, একজন অন্যজনের প্রতি বাল্য অনুরাগ অনুভব করতো। এ অনুরাগ থেকে তারা মান-অভিমানও করতো। এভাবেই নিষ্পাপ আনন্দে দুজনের শৈশব ও কৈশোর কাটে। একদিন স্কুল থেকে আসার পথে শেফালিদের বাড়ির কাছে এসে জাহাঙ্গীর বলে-

– শেফালি!

– কী?

– আমাদের বাড়িতে চল।

– বিকালে যামু।

– মায় তোরে অহন যাইতে কইছে।

শেফালি বইখাতা নিয়েই জাহাঙ্গীরদের বাড়িতে গিয়ে তার খালারে ডাকে-

– খালা, তুমি আমারে আসতে বলছো?

– কই! কে কইছে?

– জাহাঙ্গীর কইছে!

খালা মুচকি হেসে দুজনের দিকে তাকায়। শেফালি ঠোঁট বাঁকা করে জাহাঙ্গীরকে ভেংচি কাটে।

– আমি অহন যাই খালা, বিকালে আসমু।

জাহাঙ্গীরের মা শেফালিকে না খেয়ে যেতে দেয় না। আজ সে ঘরে দেশি মুরগি রান্না করেছে। চপল-চঞ্চলা অথচ ধর্মপ্রাণা বোনঝিটিকে জাহাঙ্গীরের মা নুরজাহানের খুব পছন্দ।

***

জাহাঙ্গীরের বাবা হালিম মিয়া সংসারী মানুষ না। জুয়া খেলা আর যাত্রা গান তার নেশা। এসব করেই পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া সব সম্পত্তি সে বিক্রি করে দেয়। তখন হালিম মিয়া ছেলের পরীক্ষার ফিস-বেতনও দিতে চাইতো না। সিক্স পর্যন্ত পড়েই তাই জাহাঙ্গীরের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। লেখাপড়া ছাড়লেও শেফালিকে সে ছাড়তে পারে না। শেফালিও পারে না জাহাঙ্গীরকে ভুলে যেতে। বাড়ির পুকুর পাড়ে, বনে-বাদাড়ে জাহাঙ্গীর মনের দুঃখে বাঁশি বাজায় আর এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। একদিন বাঁশির সুর শুনে শেফালি পুকুরপাড়ে গিয়ে হাজির হয়।

– তুই যে সুন্দর কইরা বাঁশি বাজাস, তোর বাঁশির সুরে পরী নাইমা আসবো যে।

– বাঁশি বাজাইয়া আমি আমার পরীরেই ডাকি।  পরীতো প্রতিদিনই আসে।

– তুই পরী দেখছস?

– প্রতিদিনই দেখি। আমার পরী যে এখন আমার সামনেই আছে।

– কী বলছ! পরী কই!

– এই যে আমার পরী। জাহাঙ্গীর শেফালির হাত ধরে বলে

– আহারে! পরী না পেত্নী? আমি কি পরী নাকি?

– তুই পরীর মতোই সুন্দর। তোরে না দেখলে আমার ভাল্লাগে না।

– মিথ্যা কথা।

– আমি তোর মাথা ছুঁয়ে বলছি, সত্যি কথা।

– শেফালি!

– বল।

– আমি তোরে বিয়া করমু।

– ইস! কত সখ! এই বয়সেই বিয়ার চিন্তা! তুই পড়ালেখা ছাইড়া দিলি কেন? আর লেখাপড়া করবি না?

– ক্যামনে করমু? আব্বা আমার পড়ালেখার খরচ দেয় না।

– পড়ালেখা না করলে, আমার আব্বা তোর কাছে আমারে বিয়া দিবো না।

পড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাহাঙ্গীরের প্রতি শেফালির ভালোবাসায় ভাটা পরেনি, বরং এই ভালোবাসায় মমতা ও করুণা যোগ হয়েছে। আর জাহাঙ্গীরের কাছে শেফালি যেন হয়ে উঠেছে পরম আরাধ্য। দুজন এ প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়েছে- একজন অন্যজনকে কোন দিন ভুলে যাবে না। যত বাঁধাই আসুক, দুজন সারা জীবন এক সাথেই থাকবে। কিন্তু শেফালির পরিবারের  ইচ্ছা ছিলো অন্য রকম। একদিন চরম এক ঘটনার মধ্য দিয়ে জাহাঙ্গীরের মনে জগত- সংসারের প্রতি বৈরাগ্য চলে আসে।

***

জাহাঙ্গীরের দাদা আনসার আলী মুন্সি চট্টগ্রাম মাইজ ভাণ্ডার শরীফের ভক্ত। সে বছরে দুএকবার এলাকার ভক্তদের কাফেলা নিয়ে ভাণ্ডার শরীফ যায়। দাদার সাথে জাহাঙ্গীর কয়েক বার সেখানে গেছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন দরগায়- মাজারে যাওয়ার ভাগ্যও তার হয়েছে। সেই ভাগ্যই তাকে বরণ করে নিয়েছে। শেফালিকে হারিয়ে আজ সে উদাসী।

***

শেফালি ক্লাস নাইনে উঠার পর তার এক বিয়ের সম্বন্ধ আসলো পাশের গ্রামের মোল্লাবাড়ি থেকে। পাত্রপক্ষের পরিবার সৌদিআরব থাকে, দেশে আসে খুব কম। বিয়ের পর বউকে তারা সৌদিতে নিয়ে যাবে। এই সম্বন্ধ আসায়, তার পরিবার খুব খুশি। কিন্তু হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে বেঁকে বসলো শেফালি। একদিন তার মা নুরজাহান বেগম বললো,  

– এত ভালো সম্বন্ধ! করিমপুর মোল্লাবাড়ি। নামাজি ও পরহেজগার পরিবার। তুই ‘না’ করস কেনো?

মেয়ে চুপ করে থাকে। মা আবার বলে,

– শুনছি, ছেলেও নামাজি। পরিবারের সবাই সৌদি আরব থাকে। বিয়ার পরে তোরে সৌদি নিয়া যাইবো।

– আমি জাহাঙ্গীররে আমার মন দিয়া দিছি মা। হেরে ছাড়া আমি অন্য কেউরে চিন্তা করতে পারি না।

– এত পাকনা অইছোস?

– কথা কইলেও দোষ। তোমরা আমারে বিয়া দিতে চাও কেনো?

– সে আমারই বোন-পুত। তোরে আর কী কমু! একটা ভবঘুরে। ওর বাপে সব জমি বেইচা দিছে। কী খাওয়াইবো তোরে? এই কথা তোর বাপে শুনলে মাইরা ফালাইবো।

– আমি কি তোমরে বিয়ার কথা কইছি মা? আমারে বিয়া দেওয়ন লাগবো না।

– সারা জীবন কি তোমারে ঘরে খুঁটি দিয়া রাখমু?

মায়ের কথায় অভিমানে-অপমানে শেফালির ডাগর কালো চোখ দুটো ছলছল করে, টলমল করে। লাল হয়ে ফুলে ওঠে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়তে থাকে। মাও ক্ষোভে-দুঃখে সেখান থেকে চলে যায়।

***

আল্লাহর লাল-সবুজ নিশান উড়িয়ে ব্যানার লাগিয়ে গান বাজিয়ে বাস যাচ্ছে চট্টগ্রাম। জাহাঙ্গীর এ বাসের যাত্রী। পাহাড় আর গাছ-পালায় ঘেরা চট্টগ্রামের দৃশ্য দেখে জাহাঙ্গীরের মনটা জুড়িয়ে যায়। কিন্তু তার ভেতরটা হাহাকার করে। জানালার পাশে বসে সে বাইরে তাকিয়ে থাকে। বারবার তার চোখ ভিজে আসে আর গামছা দিয়ে মোছে। তার দাদা তার পাশে বসা।

– তর কি অইছে ভাই! কান্দছ কেরে?

– দাদা, শেফালিরে কি আমি পামুনা?

– কান্দিস না। বাড়ি গিয়া শেফালির বাপের কাছে আমি বিয়ার প্রস্তাব নিয়া যামু।

আনসার আলী মুন্সি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলে, শেফালির বাবা তাকে ফিরিয়ে দেয়। আনসার আলী অনেক অনুরোধ করে, মেয়ের নামে তার সব জমি লিখে দেয়ার কথা বলে, তাতেও তাদের মন গলে না। আনসার আলী হতাশ হয়ে ফিরে আসে।

***

তারপর থেকে জাহাঙ্গীর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়। অনেক দিন পরে একবার বাড়িতে আসে, কারো সাথে মিশে না, দুএকদিন থেকে আবার চলে যায়। ওদিকে শেফালির অবস্থা জাহাঙ্গীরের চেয়ে আরো খারাপ। একদিন মা করিমপুরের বিয়ে কথাটি আবার মেয়ে বলে,

– মা, তুই রাজি হয়ে যা। ফেরেশতার মতো ছেলে, পাক-পবিত্র জায়গা, নবীর দেশে থাকবি। এমন সম্বন্ধ কেউ ফিরাইয়া দেয়!

– তুমি আমারে জোর কইরো না মা। আল্লাহরে আইনা দিলেও আমি বিয়া বইমু না।

তারপর থেকে শেফালি ক্যামন পাগলের মতো হয়ে যায়। কোরান শরীফটি সারাক্ষণ বুকের মধ্যে ধরে রাখতো, কেউ নিতেও পারতো না।

শেষ দিকে সে জাহাঙ্গীরকেও চিনতো না।

না খেয়ে না ঘুমিয়ে শুকিয়ে হাড্ডিসার হয়ে একদিন কোরান শরীফটি বুকে নিয়েই শেফালি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

***

চৈত্র মাসের বাইশ তারিখ। চট্টগ্রাম নাজিরহাটের মাইজভাণ্ডার দরবারে লক্ষ-লক্ষ লোকের সমাগম। লোকে লোকারণ্য! ব্যাপক-বিশাল আয়োজন। এ এক এলাহি কাণ্ড! মজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী ভাণ্ডার শরীফের একজন পীর। আনসার আলী মুন্সি তার মুরিদ। জাহাঙ্গীর এবার তার মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে এসেছে। কয়েক বছর আগে যখন ভাণ্ডার শরীফ গিয়েছিলো, তখনই তার ভালো লেগেছিলো। এবারো তাঁর দরবারে গিয়ে বসলো তারা। আগের বার জাহাঙ্গীরের বয়স কম ছিলো, অতটা গভীরভাবে সে খেয়াল করেনি। আজ দেখতে পেলো- মুজিবুল বশরের চেহারায় ক্যামন একটা নুরানি ভাব, দেখেই জাহাঙ্গীরের মনে শ্রদ্ধা জাগে। সেখানে নবীর নামে মিলাদ-কিয়াম হয়। আবার ভক্তরা সামা-কাউয়ালি ও মুর্শিদি-ভাণ্ডারি গানে মাতোয়ারা হয়। জাহাঙ্গীর আজ  দেখতে পেলো-  “দেখে যারে মাইজভাণ্ডারে হইতাছে প্রেমের খেলা/

নুরের বাবা বসাইছে প্রেমের মেলা।”- এই গানের ভাবে ও তালে শ্রোতাদের অনেকেই নাচছে। নাচের মধ্যেও অনেকের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। এ এক অভাবনীয় ও বিস্ময়কর দৃশ্য। নেচে-নেচেও মানুষ কাঁদতে পারে! আশ্চর্য! এ ধরণের আধ্যাত্মিক পীর বা গুরুর দরবারে মানুষ জাত-কুল-মান বিসর্জন দিয়েই আসে। এসে প্রেমাস্পদের বিরহে, তাঁর করুণার আশায় ডুকরে-ডুকরে, ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে, বিনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদে। কখনো আবার মুর্শিদি-বিচ্ছেদী গান শুনে প্রেমের জোশে দোলে, সুরের তালে নাচে। এসব করে অনির্বচনীয় এক অনুভূতিও লাভ করে তারা। যতই তত্ত্বজ্ঞানী হোক, প্রেমহীন কঠিনহৃদয় এই মরমিয়া মানুষদের অচিন্তনীয় এই অনুভূতি কখনোই উপলব্ধি করতে পারবে না।

***

শেফালির কথা ভেবে জাহাঙ্গীরের চোখ দিয়েও অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সেও যে কখন সবার সাথে দাঁড়িয়ে তালে-তালে নাচতে লাগলো, নিজেও খেয়াল করেনি। নাতির দুঃখে বৃদ্ধ আনসার আলীর চোখে দিয়েও অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়ছে। গানের মাহফিল শেষ হলে আনসার আলী নাতিকে পীর সাহেবের নিকট নিয়ে যায়। নজিবুল বশরের চোখে-মুখে নুরানি ভাব দেখতে পায় জাহাঙ্গীর। কণ্ঠস্বর তার কাছে দরদমাখা মনে হয়। নজিবুল বশরের চোখের দিকে তাকাতেই পৃথিবীর অতৃপ্ত বাসনার বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে তার মন আনচান করে উঠে, অবিনশ্বরের বিচ্ছেদে তার চোখ দিয়ে আবারো অঝোরে অশ্রু ঝরতে থাকে। সে পাগল হয়ে যায়। অদেখা অসীম দয়াময়ের জন্য তার প্রাণ হাহাকার করে উঠে।

***

শেফালি প্রায়ই জাহাঙ্গীরকে স্বপ্নে দেখা দেয়। স্বপ্নে সে শেফালিকে বলে,

– তুই আমারে ছাইড়া চইলা গেলি পাগলি, আমি একলা ক্যামনে থাকি? আমারে নিয়া যাস না কেনো?

– তোর সময় হয় নাই, সময় হইলে তোরে ঠিকই আমার কাছে নিয়া আসমু। কিছুদিন একটু ধৈর্য ধইরা থাক রে পাগলা।

***

এমন সব স্মৃতি ও স্বপ্নের পরেও কি কেউ নতুন করে দুনিয়াদারিতে আকৃষ্ট হতে পারে? শেফালি যেন তার হৃৎপিণ্ডটিকে দেহের বৃন্ত থেকে বিচ্যুত করে দিয়েছে। রঙের দুনিয়ার প্রতি তার মন আর টানে না। একটাই জীবন। এই জীবনের বাকি সময়টা সে শেফালির স্মৃতি নিয়ে অবলীলায় কাটিয়ে দিতে পারবে। শেফালির অমর প্রেমের মরা মরে থেকেই বাকি জীবন সে জ্যান্তেমরা হয়ে বেঁচে থাকতে চায়। মজিবুল বশর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই তার অশান্ত-অস্থির মন অনেকটা শান্ত হয়। মৃত্যুর দরোজা দিয়ে এ জীবন পেড়িয়ে একদিন সে পরজীবনে পোঁছাবে ঠিকই। এই জীবনে সে এমন কর্ম করে যেতে চায়, যাতে সে পরজীবনে শেফালিকে পায়। শেফালি যে সেখানে তার অপেক্ষায় আছে।

 

জহির আহমেদ
জহির আহমেদ

Author: জহির আহমেদ

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts