ফিরে  দেখা

মিহিরদা কখন এলে তুমি?

যে তোকে আসার খবর দিল  সে বলেনি?

বলেছে। তারপরও তোমার কাছে জানতে চাই।

যাতো নিলু বিরক্ত করিস না।

আমি আবার কি করলাম?

দেখ তোমার জন্য কি এনেছি!

দেখ তো বাড়িতে আকবর এলো কিনা?

 

মিহির দা কি হয়েছে তোমার?

এত কম কথা বলছো!

আমার কিছু হয়নিরে পাগলী!

তুই কি কিছুই শুনিস নি? না বললে ভুল হবে, দাদা ভাই বলছিল দেশে নাকি যুদ্ধ শুরু হয়েছে ।ঢাকার অবস্থা নাকি খারাপ। মানুষ মেরে ফেলছে ধরে ধরে!! শোন মিহিরদা আমি কিন্তু যাবো তোমার সাথে,  কোথায়? যুদ্ধে।

পাগল কি আর সাধে বলি, তোকে আমি অন্য কাজ দেব।ঐ দেখ মিহির দা  দাদা ভাই আসছে। দাদা ভাই কিন্ত একা না। আচ্ছা যা তুই এখন।

নিলুফা মিহিরের কাছ থেকে সরে যায় বটে,তবে একটু দূরে ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে।একটা কৌতুহল কাজ করে নিলুর মধ্যে, ওরা কি কথা বলে শুনতে চায়।

মিহির বসে আছে পুকুর পাড়ে। এই পুকুরটা যে কাদের আজও নিলু জানে না।ওদের দুই পরিবার একই রকম ভাবে  ব্যবহার করে।মিহিরের পরিবার যদি হিন্দু না হতো  তাহলে নিলু বুঝতেই পারতো না যে ওর আব্বা কাকা আপন ভাই না।

ওরা কাছে আসতেই নিলু দেখলো যারা দাদা ভাইয়ের   সাথে এসেছে তারা সবাই ওর পরিচিত। শুধু তিনজন ছাড়া, এই তিনজনের পোশাকও আলাদা। এত আস্তে কথা বলছে যে নিজেরাই শুনছে কিনা নিলু বুঝতে পারলো না।

 

এই সময় নিলু শুনতে পেল সম্পা ওকে ডাকছে। নিলু দ্রুত পায়ে ওখান থেকে সরে গেল।নিলুর মনে হল এখনই কাউকে জানানো ঠিক হবে না।

শম্পা আর নিলুর নিত্যকার আড্ডা শেষে  যে যার বাড়িতে চলে গেল।

নিলু পড়তে বসেছে ঠিকই,  পড়ায় আজ তার মন নেই।মিহিরদাকে তার অনেক কিছু বলার আছে।

 

মিহির দা এবার যেন অন্য রকম হয়ে গেছে। ঢাকা থেকে এলে মিহিরদা রোজ সন্ধ্যায় আসতো।  এসেই বলতো, কাকীমা রাতে খেয়ে যাব কিন্তু!

ছোট বেলা থেকেই নিলু দেখে আসছে  মিহিরদা বেশির ভাগদিন  রাতের খাবারটা ওদের বাড়িতেই খায়।

হঠাৎই নিলুর ভাবনায় ছেদ পড়ে।দূরে পরপর কয়েকটা গুলির আওয়াজ। নিলুর বাবা দোকান বন্ধ করে বাড়িতে চলে আসছে মায়ের সাথে আস্তে আস্তে  কথা বলছে।

 

এই সময় কাকা  কাকিমাও এলো। সবাই যেন কি একটা  বিষয়ে কথা  বলছে।কিছুক্ষণ পর দাদাভাইও এলো।

নিলু বেরিয়ে ছিল, কিন্তু আকবর ওকে ঘরে পাঠিয়ে দিল। নিলু কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে  বুঝতেই পারেনি।

নিলু  এই নিলু ওঠ, মা ডাকছে,  দাদা ভাই মাকে বল আমি খাব না।

খেতে হবে না তুই ওঠ,  বাইরে যা।

কেমন যেন ভয়ার্ত গলা দাদা ভাইয়ের। ও ধড় ফড় করে উঠে বসলো,  রান্না ঘরের দিকে  পা বাড়াতেই শম্পা ফিস ফিস করে ডাক  দিল। ও অবাক হলো, শম্পারা সবাই এত রাতে!

 

অবাক আরে হলো কাকার পরনে ওর আব্বার কাপড় আার মাথায় টুপি।

শম্পা বললো, সোনাপুর গ্রামে পাক সেনারা আক্রমন করেছে। লোকজন গুলি করে মারছে পাখির মত, ঘর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়,  মেয়েদেরও ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

কি বলিস? তোকে কে বললো? দাদা। মিহিরদা? হুম,  তাই তো আমাদের আজই গ্রাম ছাড়তে হবে। মানে?

মনে হল তোরা আর আমরা এখনই এই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাব।

কোথায়? জানি না। নিলুর মাথায় কাজ  করছে না।

 

এমন সময় মিহিরদা বেশ কিছু লোকজন নিয়ে ওদের বাড়িতে এলো।  দাদাভাই ওদের খাবারের ব্যবস্থা করলো।এরই মধ্যে মা আর কাকিমা খিচুড়ি  রান্না করেছে।

 

নিলু দরজায় দাঁড়িয়ে ইশারায় মিহিরকে ডাক দিল।  মিহির কাছে এসে বললো, এখন কোন কথা না, তোর কাজ আমি সময় মত বুঝিয়ে দেব।

মিহির দা শোন,

আমি জানি তুই কি বলবি, আমারও তো অনেক কথা আছে।   নিলুর চোখে পানি এসে গেল।

আমরা স্বাধীন দেশে সব কথা বলবো, ঠিক আছে!

বলেই মিহির দাঁড়ালো না, ঘরে ঢুকে গেল।

মন খারাপ সবারই, মা কাকি।

 

মার চোখে পানি।নিলুর খুব কান্না পাচ্ছে। এই বাড়ি ঘর, এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। রাত তিনটার দিকে নৌকা ঘাটে এসেছে,  খবর এলো। তাদের দুই পরিবার সহ ঐ লোকগুলোও নৌকায় উঠলো।।

সবাই নিরব, কেউ কোন কথা বলছে না। নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই।নদীর বুক চিঁরে নৌকাটা যেন বিশ পঁচিশটা  জীবন্ত লাশ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

 

হঠাৎ  নিলু  হাতে স্পর্শ অনুভব করলো । এটাই চাই।  চেনা,  কিন্তু আজ অন্য রকম লাগছে। হাতের এই চাপটা বলে দিচ্ছে যেন মন খারাপ না করি। নিলু অন্য হাত দিয়ে হাতটা ছুঁলো।  নৌকার মধ্যে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিলু ভাবছে মিহিরদা কি করে  বুঝলো এটাই আমি।সবার অলক্ষে মিহির নিলুকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমু খেয়ে দ্রুতই সরে গেল।

 

শম্পা নিলুকে বললো, নৌকাটা থামছে কেন?

আমি জানি না।

মিহিরদা,  দাদাভাই  খুব আস্তে আস্তে  নিজেদের মধ্যে  কথা বলছে। মাঝি কুপিটা জ্বালিয়ে দিল, মা আব্বা  কাকা কাকিমার পা ছুঁয়ে সালাম করে একে একে ওরা নেমে গেল। সবার চোখেই পানি,  কেউ কোন কথা বললো না।

 

নৌকা ছেড়ে দিল। মাঝি কিছুদূর যাওয়া পর বললো নদীর ডান  বাঁকে একটা আর্মিদের ক্যাম্প আছে, সবাই সাবধান।

মাঝিদের পরামর্শে আমাকে আর শম্পাকে নৌকার খোলে পাঠিয়ে দি।,   দোয়া  দুরুদ পড়তে পড়তে আর্মি ক্যাম্পটা পার হলাম।

 

এভাবে  চলতে চলতে  আমরা একটা শরণার্থী শিবিরে পৌঁছালাম।

ভোর রাতের দিকে  আবার আমাদের  যাত্রা শুরু হলো। আমরা চললাম  শম্পার এক দাদুর বাড়িতে । উনি নিজেই নিতে এসেছেন।    উনার বাড়ি  শিয়ালদায়। আমরা দুদিন সেখানে থাকার  পর  দাদু নিজেই এসে বললেন, মাইল খানেক দূরে আমার একটা  বাড়ি আছে । খালিই পড়ে আছে।  এখানে যদি তোমাদের কোন অসুবিধা হয় তোমরা ঐ বাড়ি যেয়ে থাকতে পার। আমাদের কারো বুঝতে অসুবিধা হল না, আসলে সমস্যাটা হচ্ছে দিদিমার। কাকিমা যেন একটু চুপসে গেল। ম ই বুঝালো আমরা তো অনেক মানুষ,  মন খারাপ করছো কেন গীতা?

 

আমরা সেদিনই দাদুর  পরিত্যক্ত  বাড়িতে চলে গেলাম।একেবারে খারাপ না,  তবে নোংরা । অনেকদিন এ বাড়িতে কেউ আসে না। কাকিমার মন খারাপ যেন কমছেই না। মা বলল, আমরা একটা বাড়ি পেয়েছি এই কত।  তুমি আর মন খারাপ করে থেকো না গীতা। দুই কামরার বাড়ি,  রান্নাঘর, চাপকল,  সবই আছে। টালির ঘর,  মন্দ না।

 

মা আর কাকিমার হাতের ছোঁয়ায় দুই দিনে বাড়ির চেহারা বদলে গেল।

সপ্তাহখানেক পর  আব্বা আর কাকা  দাদুকে ডেকে কাজের যোগাড় করে দিতে  বললো।দুই দিন পরেই দাদু খোঁজ নিয়ে এলো, তবে সংকোচে। দোকানের কর্মচারী।আব্বা অভয় দিয়ে বললো,  জেঠামশাই এই কত!  আমাদের এখানে কে চেনে!!  কোন রকম চললেই হবে।

 

নিলু আর শম্পা  একেবারেই বদলে গেছে। কথা সবাই কম বলে, আব্বা আর কাকা থাকলে  একটু হাক ডাক দেয়,  ।

তাছাড়া মনেই হয় না কোন লোক আছে বাড়ি।

 

সেদিন মা আর কাকিমা রাতের রান্নার আয়োজন করছিল । এমন সময় মিহিরদা এলো, সাথে অচেনা একজন।  বললো, আমাদের কমান্ডার।দাদা ভাই ভাল আছে। প্রশিক্ষণ শেষে যুূূদ্ধের ময়দানে। আমাকে আর শম্পাকে ডেকে বললো, তোরা রেডি হয়ে নে।

মা বললো কোথায়?

মেডিকেল ক্যাম্পে, সেবিকার কাজ করতে হবে। কাকিমা বললো,  আবার মেয়েদের কেন?

আমরা সবাই যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ না করি , তবে যে দেশটাকে বাঁচাতে পারবো না মা।।

 

রাতের খাবার খেয়েই রওনা হলাম আমরা।  কমান্ডার কিছুটা যেয়ে আলাদা হয়ে গেলেন।উনার আরো কিছু কাজ আছে। আমাকে আর শম্পাকে আলাদা ক্যাম্পে দিল।প্রথম কয়েক দিন খুব কষ্ট হলো। এত রক্ত, এত কাঁটা ছেড়া, খুবই ভয়ানক অবস্থা! কেউ কেউ মারাও যাচ্ছে। রিনা নামে এক বড় আপা কাজ করছে  আগে থেকেই।উনিই সামলাচ্ছেন বেশি।

 

নিলু এখন অনেকটাই স্বভাবিক।একা থাকলে সবার কথা  মনে পড়ে।

আর মিহিরদা তো  সবসময়ই থাকে চিন্তায়, কল্পনায়।

 

এরই মধ্যে একদিন দাদাভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গেল।খবর আসলো, আট দশজন আহত।ওদের মেডিকেল ক্যাম্প পর্যন্ত আনা যাচ্ছে না।ডাঃ জুবায়ের যাবেন আর আমি।ওখানেই দাদাভাইয়ের সাথে দেখা।ওদের সুস্থ করার জন্য আমাকে দিন পাঁচেক থাকতে হল।ডাঃ সাহেব চলে আসলেন।

 

সবাই সিদ্ধান্ত নিল,  এই এলাকায় যতদিন যুদ্ধ চলবে, এটাই হবে অস্থায়ী ক্যাম্প।আর এখানকার দায়িত্ব নিলুর। অতএব পুনরায়  আসতে হলো

 

ততদিনে নিলু আয়ত্ব করে নিয়েছিল প্রাথমিক চিকিৎসা।মারাত্নক হলে মূলক্যাম্পে  পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এখানে দিন দুই পরে আদুরি নামে  বছর দশেকের একটা মেয়ে এলো। বেশ সাহসী । আমার সাথে সাথেই থাকতো।বাবা যুদ্ধে গেছে, মাকে পাক সেনারা তুলে নিয়ে গেছে। মেয়েটা খুবই আত্নপ্রাত্যয়ী। প্রতিদিনই নতুন নতুন আহত যোদ্ধা আসতে থাকলো।

 

কোন মাস তারিখ মনে নেই।তবে আবহাওয়া বলে দিচ্ছে  শীত আসি আসি  করছে।খবর পাই আমাদের জয় নিশ্চিত। অনেক জায়গা  হানাদার মুক্ত হয়েছে। মনে অনেক বেশি জোর পাই আজকাল।একটা জায়গা মুক্ত হলেই আমাদের এই এলাকা হানাদার মুক্ত হবে।

 

এরই মধ্যে একদিন  ঘটে গেল নিলুর জীবনের  সেই  ভয়ানক ঘটনা।দু জন লোক আহত অবস্থায় যাকে  নিয়ে এলো তাকে দেখে নিলু পাথর হয়ে গেল। আদুরীই প্রথম বললো, নিলু আপা তাড়তাড়ি ব্যান্ডেজ দাও, রক্ত  যে ভেসে গেল।লোক দুটো মিহিরকে রেখেই চলে গেল।গুলি বের করলে বটে, কিন্তু রক্ত কিছুতেই বন্ধ করতে পারছে না নিলু।ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে মিহিরের শরীর খানা। নিলু কিছুই  করতে পারছে না।নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে মিহির। নিলুর সব চেষ্টা ব্যার্থ করে  মিহির  চলে গেল।

নিলুকে কিছুই বলতে পারলো না।  শুধু শেষ মুহুর্তে হাতখানা চেপে ধরেছিল।নিলু আর  কিছুই  মনে করতে পারলো না।ওর যখন জ্ঞান ফিরলো তখন  মেডিকেল  ক্যাম্পে।

তারপর একে একে ঘটে গেল অনেক ঘটনা।

 

অনেক অনেক বছর বাদে আজ নিলুর চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে।

 

এমন সামাজিক পরিস্থিতিতে আটকে গেছে, যে নিজের ইচ্ছা বলে কিছুই নেই।মনে মনে শুধু বলছে,  মিহিরদা আমি পেরেছি।আমি পেরেছি মিহির দা। মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়  তোমার নামটা সংযোজন করতে। আমি বেঁচে আছি! অথচ মুক্তি্যোদ্ধার তালিকায় তোমার  নাম নেই, মেনে নিতে পারছিলাম না।  আজ আদুরীর কথাও মনে পড়ছে। সে কোথায় এখন!  ওর মাকে কি ফিরে  পেয়েছিল? মূলত আদুরীর জন্যই  সেদিন নিলু প্রানণ বেঁচে  গেছিল।ছোট্ট আদুরী সেদিন অনেক সাহসী  ভূমিকা নিয়েছিল।

 

নিলু আজও জানতে পারেনি,  মিহিরদার লাশটা কিভাবে সমাহিত হয়েছিল,!

 

হাজারও ভাবনায় ছেদ পড়লো নিলুর, কলিং বেল বেজে চলেছে  কতক্ষণ কে জানে! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো  ছেলের ফিরে আসার সময় হয়েছে।

 

শুরু হলো নিলুর বাস্তবতার লড়াই।

শেখজাদী নঈমা জব্বারী

Author: শেখজাদী নঈমা জব্বারী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts