বঙ্গবন্ধু: তিনি অবিসংবাদিত, তিনি কিংবদন্তী, তিনি জ্যোতির্ময়

কিংবদন্তীর মৃত্যু হয়না, যুগ থেকে যুগান্তর প্রদীপ্ত আলো হয়ে, আলোকিত করে সভ্যতা, বঙ্গবন্ধু তেমনই এক কিংবদন্তীর নাম। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত লেখা হয়েছে পৃথিবীতে এত লেখা বোধহয় কোন নেতাকে নিয়ে লেখা হয়নি। আমি বঙ্গবন্ধুর নামের উপর কিছু লিখব এমন যোগ্য কেউ নই, তবুও তাঁকে ভালোবাসি বলে তাঁর সম্পর্কে কিছু একটা লিখতে সাহস করে শুরু করলাম।

 

১৭ মার্চ, ১৯২০ টুঙ্গিপাড়ার এক নিভৃত পল্লীতে জন্ম নেয়া মা-বাবা আর প্রতিবেশীর আদরের সেই দুরন্ত খোকা, কৈশোরের বেড়াজাল ছেদ করে দুর্দান্ত যৌবনের তেজস্বী শেখ মুজিব। বাঙালীর যতগুলি অর্জন, ইতিহাস, প্রেরণা, উৎসাহ, স্বপ্ন তার সবটুকু জায়গাজুড়ে একটি অবধারিত নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিটি সংগ্রামী ও মুক্তিকামী জনতার কন্ঠস্বর, ইতিহাসের রাখাল রাজা, রাজনীতির সিংহপূরুষ, বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা, পরিপূর্ণ, পরিশুদ্ধ ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, বাংলাদেশ নামক দেশের স্বপ্ন দ্রষ্টা, বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, হাজার ইতিহাস।

 

আমরা সকলেই অবগত, শক্তি সংগ্রাম ও ভালোবাসার সিংহপূরুষ, বাঙ্গালীর স্বপ্ন দ্রষ্টা এই পরিশুদ্ধ  বাঙ্গালীকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট স্বপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙ্গালীর সংগ্রামের ফসল আর স্বপ্নকে স্তব্ধ করে দিতে উদ্যত হয়েছিল স্বাধীনতা বিরোধী দেশী বিদেশী চক্র। যার ধারাবাহিকতায় লোকান্তরিত মুজিবকে লোক চক্ষুর অন্তরালে সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে টুঙ্গিপাড়ার সেই নিভৃত পল্লীতে পৃথিবীতে জন্ম নেয়া খাঁটি মানুষের অন্যতম এক আদর্শকে চরম অমর্যাদাকর, অবমাননাকর অবস্থায় সামরিক জান্তার নীলনকশা অনুযায়ী দাফনের নামে প্রহসন করা হয়েছিল। ধিক সেই নরাধমদের যারা জাতির স্বপ্নদ্রষ্টার হত্যাকারী।

 

১৯৭৫ থেকে ২০১৭, যতবার এই ১৫ আগষ্ট এসেছে ততবারই লোকন্তরিত মুজিব জীবিত মুজিব অপেক্ষা বেশী প্রেরণার উৎসে আন্দোলিত হয়েছে এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিকামী প্রতিটি জনতার হৃদয় পটে।

 

টুঙ্গিপাড়ার সেই নিভৃত পল্লীতে জন্ম নেয়া খোকার মুজিব ভাই হয়ে ওঠা, মুজিব ভাই থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার ইতিহাস সবার কম বেশী জানা। স্কুলে পড়ার সময় থেকে ভিতরে রাজনীতির বারুদ নিয়ে যে খোকা বড় হয়েছে একটি দেশ সৃষ্টির মনোবাসনা নিয়ে তার জন্য তাঁকে কত ত্যাগ, কষ্ট, অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে তাও আমাদের সকলের জানা। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যর পতনের পর দেশ ভাগ হলে তিনি ভাবলেন আমরা কি পেলাম? এই চেতনার শিশুকে তিনি আপন মহিমায়  বড় করার স্বপ্নে ছাত্র আন্দোলন তরান্বিত করার জন্য ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তৈরী করলেন ছাত্রলীগ নামক ছাত্র সংগঠন, যার মধ্য দিয়ে তিনি আবির্ভূত হলেন স্বপ্ন বুননের কারিগর হিসেবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে যদি শুরু করি তা হলে আমরা দেখি তিনি তখনই নেতারদের মাঝে নেতৃস্থানীয়  নেতা। ৩২ বছর বয়সী তুখোড় মুজিব তখন স্বপ্ন বুনে দিয়েছেন বাঙ্গালীর হৃদয়পটে। এর মাঝে আওয়ামী মুসলিম লীগ, পরে আওয়ামী লীগ নামে যে সংগঠনে তিনি হাল ধরলেন তা পরবর্তীতে ইতিহাস সৃষ্টি করল।

১৯৫৮ সালে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করার পরই আইয়ূব খান তাঁর ভাষায় ‘পাকিস্তানের সংহতির’ প্রতি হুমকি স্বরুপ শেখ মুজিবকে চিহ্নিত করেন। বিশেষ করে ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত গোল টেবিল বৈঠকে বাঙ্গালীদের ‘মুক্তি সনদ’ ৬ দফা ঘোষণা করে শেখ মুজিবুর রহমান আইয়ূব খানের অপছন্দের ব্যক্তিতে পরিণত হন। পক্ষান্তরে ৬ দফা ঘোষণার পর সমগ্র বাঙ্গালী জাতি শেখ মুজিবকে তাদের প্রাণের নেতা হিসেবে বরণ করে নেয়। ৬ দফা ঘোষণার পরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা তথা আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা অসম্ভব বৃদ্ধি পাচ্ছে দেখে স্বৈরাচারী আইয়ূব খান নতুন চক্রান্তের আশ্রয় নেন। শেখ মুজিব ভারতের সঙ্গে যোগসাজস করে পূর্ব পাকিস্তানী সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ গড়ে তুলে আইয়ূব সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করছেনÑ এই অভিযোগে ১৯৬৮ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবুর রহামনকে ১নং আসামী করে ৩৫ জন সামরিক বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তথাকথিক ‘আগারতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করেন। এ মামলা দায়ের করার পর ক্ষোভে সমগ্র বাঙালী জাতি গর্জে উঠলো এবং এ মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবুর সহ অভিযুক্ত সকল আসামীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে সারা দেশে প্রচন্ড আন্দোলন গড়ে উঠে। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারীতে ব্যাপক গণআন্দোলনে আইয়ূবের পতন ঘটে। অবশেষে ২৩ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯ শেখ মুজিবুর সহ সবাইকে মুক্তি দিয়ে মামলাটির সমাপ্তি টানতে বাধ্য হয় স্বৈরশাসক। মুক্তির দিনে তৎকালীন ডাকসুর আয়োজনে রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রজনতার এক বিশাল গণসম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এর আগ পর্যন্ত নানা কার্যক্রম সত্ত্বেও তিনি বাঙ্গালীদের প্রধানতম নেতা না হয়েও সকলের মাঝে বিশ্বাস আর আস্থার জায়গা করে নিতে শুরু কেন।  আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তাঁকে বাঙালীর জাতীয় নেতায় পরিণত করলো।

 

১৯৬৯ সনের গণঅভ্যূখানে আইয়ূব খানের পতন হলো, সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। ইয়াহিয়া খান গণআন্দোলনের ফসল গণদাবীর কাছে মাথা নত করে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসের ৭ ও ১৭ তারিখে সমগ্র পাকিস্তানে প্রথম বারের মত সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেন। আওয়ামী লীগ উক্ত নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর সফল নেতৃত্বে জাতীয় পরিষদের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিন দফা বৈঠক করে চারদিন পরে রাওয়ালপিন্ডি ফিরে যাওয়ার সময় দেখলেন যে শেখ মুজিব অবধারিতরুপে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করে কারো সাথে কোন পরামর্শ না করে হঠাৎ ১ মার্চ বেতার ও টেলিভিশনে বক্তৃতা করে ৩ মার্চ আহুত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দেন। এ ঘোষণায় সমগ্র বাঙালী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষুব্ধ জনসমুদ্রে পরিণত হয় ঢাকার রাজপথ। বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তীব্র প্রতিবাদ জানান। ইয়াহিয়া খানের বক্তৃতা শেষে বাংলার জনগণকে ধৈর্য ধারণ করার অনুরোধ করে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে শেখ মুজিব ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে জনসভার সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন বলে ঘোষণা দেন।

 

অবশেষে এলো ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, বাঙালীর ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সকাল থেকে মুক্তিকামী জনতার স্রোত এসে মিলিত হতে থাকে তৎকালীন রেসকোর্স (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে। জনস্রোতে কানায় কানায় পুর্ণ হয়ে যায় সভাস্থল। উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শোনা। যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের কাছে শোনা ও ইতিহাস থেকে জানা- মাঠে সেদিন কত মানুষ ছিল হয়তো ১০ লাখ বা তারও বেশী, মনে হয় সারা বাংলাদেশ ভেঙ্গে পড়েছে রেসকোর্স মাঠে। বিকাল ৩.২০ মিনিটে মাইকের সামনে এলেন বঙ্গবন্ধু। তখন আকাশে একটা হেলিকপ্টার উড়ছিল। সেদিকে একবার তাকালেন। তারপর সামনে মানুষের দিকে গভীর দৃষ্টি ফেললেন। তিনি লেকটার্নের সামনে দাড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করলেন।

বঙ্গবন্ধু মে  যেন কথা বলছিলেন না, তিনি যেন বাঙালী-জাতীর সংগ্রামী ইতিহাসের একটা মুখবন্ধ লিখছিলেন, যাতে প্রতিফলিত হয়েছিল, বাঙালী চরিত্রের শ্রেষ্ঠ প্রকাশগুলো – তাঁর সাহস আর সংকল্প দেখে, তার আত্মদৃপ্ত এবং বলিষ্ঠ প্রত্যয়, তার সততা আর সৌজন্য তার ভিতরের আগুন এবং বারুদ সারা মাঠের মানুষ নিঃশব্দ শুনছিল সেই যাদুময় ভাষণ। যা সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে তাদের এক একজন যোদ্ধায় পরিণত করেছিল। এই রকম গভীর আর বজ্রকন্ঠের ভাষণ বঙ্গবন্ধু ও হয়তো আর দেননি। বক্তৃতাটি শেষ হলে কারো মনে কোন সন্দেহ ছিল না তিনি কি চাইছেন। তিনি যা চাইছিলেন উপস্থিত সকলে তাই চাইছিল Ñ বাংলাদেশের স্বাধীনতা! তার ভাষণে তিনি মানুষকে প্রস্তুত হতে বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি একটি সাহসী জাতির প্রত্যয়ী কিছু উচ্চারণ। ৭ মার্চের পর বাংলাদেশের ইতিহাস বদলে গেল – আমরা বুঝে নিলাম পাকিস্তানের সঙ্গে উদ্ভট গৃহস্থালীর দিন শেষ।

 

মাত্র বিশ মিনিটের ভাষণ। কিন্তু কি ব্যাঙ্গময়, জোতির্ময় ভাষণ। বাঙ্গালির সংগ্রামের ইতিহাস থেকে শুরু করে সংগ্রামের রূপরেখা, মানুষের করণীয় এবং পরোক্ষভাবে বললেন আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি- স্বাধীনতার একটি ঘোষণা সবই তিনি ঐ সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বলে দিলেন। তিনি দৃপ্তকন্ঠে বললেন- এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।  এই ঘোষনার মধ্য দিয়ে রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত সকল শ্রোতা বাংলাকে মুক্ত করার বজ্র কঠিন শপথ নিয়ে যার যার গন্তব্যে ফিরে গেলো।

 

আমরা জানি ৭ মার্চের ভাষণে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের সরকারী, বেসরকারী, কর্মকর্তা, কর্মচারী, কোর্ট- কাচারী, ব্যাংক, ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের উদ্দেশ্য করে বঙ্গবন্ধু কিছু নির্দেশ জারি করেন। যার  ভিত্তিতে ৮ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সমগ্র পূর্বপাকিস্তান শাসিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুসারে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে।

 

পূর্ব পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর শাসন চালু হয়েছে দেখে স্বৈরাচারী ইয়াহিয়া খান ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে। উদ্ভুত সমস্যা সমাধানের জন্য বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করার কুটকৌশল নিয়ে রাওয়ালপিন্ডি থেকে ঢাকা এলেন ইয়াহিয়া খান। তার পিছনে পিছনে জুলফিকার আলী ভুট্টোও ঢাকায় এলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করার জন্য। আলোচনার নামে প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তারা দুজন কালক্ষেপণ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও নতুন করে সেনাবাহিনীর লোক আনতে থাকলো বাঙালীদেরকে শায়েস্তা করার জন্য। আলোচনার নামে অনেক নাটক করে অপারেশন সার্চলাইটের নির্দেশ দিয়ে ভুট্টো Ñ ইয়াহিয়া  ২৫ মার্চ রাতে লোক চক্ষুর আড়ালে ঢাকা থেকে পালিয়ে যায়। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানের বর্বর সামরিক বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমনের মাধ্যমেই শুরু হয়ে যায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই তৎকালীন ইপিআর এর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত “স্বাধীনতার ঘোষণা”  সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

 

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দুইটি অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর Ñ ৭ মর্চের ভাষণের অংশ বিশেষ বজ্রকন্ঠ শিরোনামে প্রচার করা হতো। বজ্রকন্ঠ শুনে সারাদেশের মুক্তিকামী মানুষ কি রকম উদ্দীপ্ত হতো তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। আর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বজ্রকন্ঠ ছিল টনিকের  মতো। বঙ্গবন্ধু স্বশরীরে উপস্থিত না থাকলেও তার নির্দেশিত পথেই মুক্তিযুদ্ধকে পরিচালিত করেছিলেন তৎকালিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার। জাতি চিরদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতাকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

 

গ্রেফতারের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানের সামরিক শাসক পশ্চিম পাকিস্তানের লায়ালপুরের একটি নির্জন কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে আটক করে রেখে বিচারের নামে প্রহসন শুরু করে তাঁকে ফাঁসির আদেশ দিলেন। কারাগারে তার সেলের পাশে কবর খোড়া হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববাসি এবং তৎকালিন বিশ্বনেতৃবৃন্দের বিশেষ করে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কুটনৈতিক তৎপরতায় ও কঠিন চাপের দরুন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক বিচার কাজ সমাপ্ত করতে পারেনি।

 

অবশেষে দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জত এবং ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সমগ্র জাতি বঙ্গবন্ধুর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে। বিশ্ববাসীর প্রচন্ড চাপে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারী নিঃশর্তভাবে যথোপযুক্ত সম্মানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে দিয়ে লন্ডন পাঠিয়ে দেন পাকিস্তানের সদ্য দায়িত্ব নেয়া প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো। লন্ডনে অবস্থানকালে তৎকালিন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে যে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন তা ইতিহাসে নজিরবীহিন। বৃটেনের রাজকীয় বিমান বাহিনীর এক বিশেষ বিমানে করে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডন থেকে নয়াদিল্লী হয়ে ঢাকায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ। অবশেষে ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। স্বাধীনতাকামী বাঙালী বঙ্গবন্ধ কে ফিরে পেয়ে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পেলেন।

 

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফিরে এসে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের পূণর্গঠন, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র জমা নেওয়া, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণ এবং বীরাঙ্গনাদের পুণর্বাসন কাজ শুরু করেন। বীরাঙ্গনাদের পুণর্বাসনের কাজ শুরু করার জন্য কবি বেগম সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেন। কয়েক দিন পরে বেগম সুফিয়া কামালসহ পুণর্বাসন কমিটির নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে বললেন, বীরাঙ্গনারা তাদের বাবার নাম, ঠিকানা কিছুতেই বলতে চাচ্ছে না Ñ তাতে নিবন্ধনের কাজ এগুচ্ছেনা। কাল বিলম্ব না করে বঙ্গবন্ধু তাদেরকে বলে দিলেন, তাদের প্রত্যেকের বাবার জায়গায় শেখ মুজিব আর ঠিকানায় ধানমন্ডি ৩২ নং এর ঠিকানা লিখে দিতে। এছাড়া ঘরভাঙ্গা কারো কারো সংসারে জোড়া লাগিয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। যার নেতৃত্বে আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ পেয়েছি, লাল সবুজ পতাকা পেয়েছি সেই সিংহপুরুষ, মানব দরদী, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির পিতা।

 

পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল, বিজয়ের নয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র উপহার দিয়ে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুণর্গঠিত করে আমাদের দেশকে অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু। যে সময়ে আমাদের জাতীয় নেতা থেকে বিশ্বের শোষিত, বি ত, নিপিড়িত ও নির্যাতিত মানুষের নেতায় পরিণত হয়েছিলেন, ঠিক তখনই বিদেশের অর্থে লালিত পালিত এদেশের কিছু কুলাঙ্গার বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের সকলকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আবারও ধিক্কার জানাই সেই নরাধমদের যারা জাতির স্বপ্নদ্রষ্টার হত্যাকারী।

 

বিন¤্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সেই জনকের সকল সংগ্রাম আর অর্জনের প্রতিটি ইতিহাসের বাক। স্মরণ করছি তাঁর বিদেহী আত্মার,  স্মরণ করছি তাঁর পরিবারসহ ১৫ আগষ্টে নিমর্ম হত্যাকান্ডের শিকার সকল শহীদদের।

সৈয়দ মাসুদুর রহমান
সৈয়দ মাসুদুর রহমান

Author: সৈয়দ মাসুদুর রহমান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts