বহুমাত্রিক গুনসম্পন্ন দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব জনাব মোঃ সানাউল্লাহ খান(সোনা খাঁ)

বহুমাত্রিক গুনসম্পন্ন দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব জনাব মোঃ সানাউল্লাহ খান(সোনা খাঁ)

যাদু দেখানোর সময় যাদুশিল্পীর হাত আর চোখ যেদিকে যায় মানুষের দৃষ্টিও সেদিকেই ধাবিত হয়। চোখের পলকেই ঐন্দ্রজালিক শিল্পসৃষ্টি হতে দেখে দর্শক বিমোহিত হয় যার রেশ সহজে কাটেনা।

আমাদের সমাজেও এমন কিছু যাদুকর,প্রথা সৃষ্টির কারিগর যুগে যুগে আসেন যাদের জীবনাদর্শ অনুসরন করে মানুষ পায় নতুন পথের দিশা। জাগতিক মৃত্যু তাঁদের আদর্শকে মাটিচাপা দিতে পারে না। সৃজনশীল কাজ, দূরদৃষ্টি, বিচক্ষণতা,মানবিক মূল্যবোধ তাঁদেরকে অমর করে রাখে নতুন প্রজন্মের কাছে। 

এমন মহৎ গূণসম্পন্ন পরিবর্তনের স্বপ্নদ্রষ্টা একজন মানুষ ছিলেন জনাব মোঃ সানাউল্লাহ খান (সোনা খাঁ) তিনি নড়াইল সদর উপজেলার পংকবিলা গ্রামে ১৯১২ সালে জন্মগ্রহন করেন। বালক বেলা থেকে নিরলস পরিশ্রমী এই মানুষটি যেখানে হাত দিয়েছেন ফলিয়েছেন সোনা। নিজ নামের মাহাত্ম্যে তিনি আজো স্মরনীয় হয়ে আছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত নাহলেও তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত মানুষ। অন্তরের আলোয় আলোকিত মানুষটি তাই নড়াইলবাসীর কাছেঅমর হয়ে আছেন সমাজ উন্নয়নে রেখে যাওয়া তার অমূল্য অবদানের জন্য। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর দূরদৃষ্টির প্রখরতা শিক্ষনীয় হয়ে আছে। নড়াইলের অনেকপ্রথমএর পাশে তাঁর নামটি সোনালী অক্ষরে লেখা আছে। কিন্তু নতুন প্রজন্ম ইতিহাসগুলো জানেনা। আমরা মাঝে মাঝে কৃপণতা দেখাই। কিন্তু ইতিহাস মুছে ফেলার নয়। প্রকৃত সত্যের সন্ধান করতে হয়।তুলে দিতে হয় প্রজন্মের হাতে।লালন করতে হয়। তবেইতো সত্যিটা সামনে আসে। প্রজন্ম উপকৃত হয়। ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়।এটা আমাদের দায়িত্ব। চারটি রাজনৈতিক কালধারার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন জনাব সানাউল্লাহ খান। দেখেছেন বৃটিশ উপনিবেশবাদের শেষভাগ,দেশবিভাগ,ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ ওস্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্রমবিকাশ। নিজচোখে বারবার শোষিত বাঙ্গালীর অসহায়ত্ব দেখেছেন যা তাঁকে মানবতার অবিকল্প যোদ্ধার মর্যাদা দিয়েছে।যৌবন থেকে হাটতে শুরু করেন মানবতার পথে যা তাঁর শিরায় শোণিতে বহমান ছিলো জন্মলগ্ন থেকেই।

দেশ বিভাগের পুর্বেই যখন তাঁর পূর্ন যৌবন তখন তিনি তৎকালীন নড়াইল মহকুমা( বর্তমান জেলা) সর্বপ্রথম একটি মুসলিম হোটেলের গোড়াপত্তন করেন।নাম রেখেছিলেনইসলামিয়া হোটেল পাশাপাশি বেকারী ছিলো।অবস্থান ছিলো রুপগঞ্জের অধুনা লুপ্ত লঞ্চ ঘাটে। এটি তাঁর ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান হলেও কখনো তিনি ব্যবসায়ী মনোভাব নিয়ে হোটেলটি পরিচালনা করেননি। নৌপথ সেসময় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিলো। প্রশাসনিক কর্মকর্তা,স্কুল কলেজের শিক্ষক, সমাজপতি বা একজন সাধারন ছাত্রও ছিলেন তাঁর হোটেলের কাস্টমার। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ছাত্রদের তিনি ফ্রিতে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। নৌপথে দুরের ছাত্ররা ভিক্টোরিয়া কলেজে আসতো।তিনি তাদের খাওয়াতেন এমনকি প্রয়োজনে তিনি নিজ উদ্যোগে তাদের যাতায়াত ভাড়াও বহন করতেন। এটি ছিলো তার শিক্ষনুরাগীতার বহিঃপ্রকাশ।

তাঁর সকল প্রকার সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলো এই ইসলামিয়া হোটেল। নড়াইলের সামগ্রিক উন্নয়নে নেয়া যেকোন উদ্যোগে শরীক হতে তিনি থাকতেন সদা তৎপর।শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করেছেন আমৃত্যু। জীবদ্দশায় পংকবিলা সরকারি প্রাঃ বিদ্যালয়,আউড়িয়া ,পি,বি এস,এল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি রুপগঞ্জ জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক ছিলেন।নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল,শিব শংকর বালিকা বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। নড়াইল সরকারি মহিলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। রেড ক্রিসেন্ট রামকৃষ্ণ আশ্রমের নির্বাহী পর্ষদের আমৃত্যু সদস্য ছিলেন। এছাড়াও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অর্থ অনুদান দিয়ে গেছেন আমৃত্যু। তাঁর জীবনদর্শনে বহুমাত্রিকতা যোগ করেছিলেন।

বর্তমানে নড়াইলে সুলতান উৎসবে প্রতিবছর নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। কিন্তু চিত্রানদীতে নৌকাবাইচের রয়েছে এক গৌরবময় অতীত ইতিহাস। মোঃ সানাউল্লাহ খান নড়াইলের চিত্রানদীতে প্রথম নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা আয়োজনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।তখন তিনি মধ্য যৌবনে। ষাটের দশকের শুরুর দিকে মানুষকে চিত্ত বিনোদন দেবার চিন্তা থেকে তিনি নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা আয়োজনের কথা ভাবলেন।শুধু ভাবলেন তাই না সমমনা কিছু উদ্যোগী মানুষকে সাথে নিয়ে তিনি কোন এক ভরা বর্ষায় চিত্রা নদীতে প্রথম নৌকা বাইচের আয়োজন করলেন। সেই সময় একটি সফল প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে অর্থ যোগাড় করা ছিলো খুবই কষ্টসাধ্য। তবু নিরলস শ্রম এবং ব্যক্তিগত আর্থিক অনুদান দিয়ে তিনি ছিলেন ইভেন্টের প্রথম সফল উদ্যোক্তা আয়োজক।সেই থেকে শুরু। হাটে হাটে টিনের ঢেঁড়া পিটিয়ে সবাইকে জানিয়ে দেয়া হতো বাইচের দিন ক্ষণ। দারুন উৎসব মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতো নৌকাবাইচ।

তখন বাধাঘাট থেকে ফেরীঘাট পর্যন্ত বাইচের নৌকা আসা যাওয়া করতো তিনবার। পুরস্কার হিসেবে থাকতো পিতলের কলস।সেটাকে আবার বাইচের নৌকা ছাড়ার নির্দষ্ট স্থান বাধাঘাটে নদীর এপার ওপার দড়ি টানিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হতো দর্শক এবং বাইছাদের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য। আরেকটি মজার ব্যাপার ছিলো পুরস্কার দেবার পূর্বে বিজয়ী নৌকার মাঝিদের নৌকার উপর দাড়িয়ে জারি গানের আয়োজন। দেশের দূর দুরান্ত থেকে আসতো বাইচের নৌকা। পাতাম নৌকা,বাছারি নৌকা। মালিয়াটের নারায়ণ রায়ের নৌকাটি বৃহৎ এবং বিখ্যাত ছিলো সেসময়। মোঃ সানাউল্লাহ খান নৌকার চলনে নিজে উঠতেন এবং মাঝিদের দারুন ভাবে প্রণোদনা দিতেন।সুসজ্জিত নৌকাগুলিতে একজন জাগই এর নেতৃত্বে মানুষের সুখ দুঃখের সাথে জড়িত সারি গান সুর করে গাওয়া হতো।গাওয়ার তালে তালে সামনের চরাটে বসে ঝাঁজর,ঢোল বা কাঁসার থালা বাজিয়ে এক অপূর্ব সুর ছন্দময় পরিবেশ তৈরী করা হতো।ফলে বৈঠা টেনেও মাঝিদের ক্লান্তি আসতো না।দর্শকরাও প্রচুর আনন্দ পেতো।এ ধারা এখনো অব্যাহত আছে।

কালের বিবর্তনে অনেক কিছুতে এসেছে পরিবর্তন।সানাউল্লাহ খানের স্বপ্ন আজো প্রতিফলিত হয় চিত্রার বুকে সুলতান উৎসবে প্রশাসনিক উদ্যোগে।আজ এতোবছর পর মনে হয় তিনি শুধু স্বপ্ন দেখতেন তাই নয় স্বপ্ন দেখাতেন।এবং কাল বিলম্ব না করে স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিজেই উদ্যোগী হয়ে নেমেপড়তেন কাজে।নিজের সৃজন শীলতা,কল্পনাশক্তি,ইচ্ছাশক্তি এবংক্ষমতাকে সঠিকভাবে ব্যাবহার করে তিনি সবসময় একটি ইতিবাচক 

ফলাফল অর্জন করতেন। এটি ছিলো তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

২০১১ সাল থেকে মহিলাদের নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা সূচনা হয়েছে। এখানেও সানাউল্লাহ খান সাহেবের উত্তরসূরীরা উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মঃপ্রকাশ করেছেন।আগের মতো এখন আর আয়োজকদের অর্থ সংকটে পড়তে হয়না। বহুজাতিক কোম্পানী স্পন্সর করে। পুরস্কারের মান বেড়েছে। দর্শকদের আগ্রহেও ভাটা পড়েনি। কিন্তু নড়াইল জেলার নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার প্রথম আয়োজক এবং উদ্যোক্তা মোঃ সানাউল্লাহ খান আজ নেই। তিনি ২০০৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার মত স্বশিক্ষিত ত্যাগী মানুৃষ সমাজে বিরল, যে সর্বদা মানুষের কথা ভেবেছেন, মানবতার কথা ভেবেছেন। নড়াইলের নানামূখী উন্নয়নে আজীবন সম্পৃক্ত থাকা এই গুনী মানুষটির আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। তিনি তার সুমহান কর্মের মাঝে বেচে থাকবেন অনাগত কাল ধরে সাধারন মানুষের অন্তরে।

তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী জ্ঞাপন করছি।

kamrujjaman কামরুজ্জামান খান তুহিন
কামরুজ্জামান খান তুহিন

Author: কামরুজ্জামান খান (তুহিন)

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment