বহুমাত্রিক নজরুলঃ ভালোবাসায়  বেঁচে থাকবেন প্রেরণা, শক্তি হয়ে

বহুমাত্রিক নজরুল

সেদিনের ভোর প্রতিদিনের মত ছিল না। প্রতিদিনের মত রাত্রির গভীর অন্ধকার ভেদ করে এক ফালি নবীন আলো দিয়ে সেদিন ভোরের সূচনা হয়নি। তার পরিবর্তে ভোরের আলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বায়ুকোণে এক কালিমেঘ ঝড়ের প্রচন্ড হুঙ্কার দিয়ে সমস্ত আকাশ পরিব্যাপ্ত করে দিল। তারপর বাতাসের গোঙানী, গাছের নির্বাপিত শাখা- প্রশাখার মর্মর শব্দের মধ্যে নজরুল তার সুতীব্র চিৎকার ধ্বনি দিয়ে পৃথিবীতে তার আগমন বার্তা ঘোষণা করলেন। ‘দিনটা ছিল ১১ই জ্যৈষ্ঠ । সময়টা ছিল কালবৈশাখীর।”

প্রকৃতির বুকে ঝড়ের উন্মাদনার মধ্যে যেমন তার জন্ম, তেমনি বাংলা কাব্যধারার এক প্রচন্ড  প্রতিবাদের ঝড় নিয়ে তাঁর কবিত্বের পরিচয়  বলা যায়, নজরুল-কাব্য মানুষের অবক্ষয়িত, অচরিতার্থ, অবদমিত জীবনের এক আক্রোশ, বিদ্রোহের বলিষ্ঠ হুঙ্কার। বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের এটা ছিল এক তুফান, এ বিপুল প্রবাহগতি কবি নজরুল নিজেই।

এটা সর্বজন বিদিত, বাংলার মানুষের হৃদয়ের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ খ্রিঃ ২৪ মে, বাংলা ১৩০৬ সনের ১১ জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ৬ষ্ঠ সন্তান তিনি। কাজী ফকির  আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম। তিনি মাযারের খাদেমও ছিলেন। ১৯০৮ সালে পিতার অকাল মৃত্যুতে কিশোর কবি নিদারুণ দারিদ্রের মধ্যে পড়েন। অল্প বয়সেই গ্রামের মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ শুরু করেন। দারিদ্রের কারণে ও পিতার মৃত্যুর পর তার প্রাথমিক পড়াশুনা বাধাগ্রস্ত হয়, যার রেশ হিসেবে মাত্র ১০ বছর বয়সে তাঁকে জীবন জীবিকার সংগ্রামে নামতে হয়। গ্রামের মক্তব থেকে তিনি নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করে সেখানেই স্বল্প বেতনে মক্তবের সহকারী হিসেবে শিক্ষকতার কাজ শুরু করেন। মক্তবে পড়ার ও  শিক্ষকতার কারণে তিনি  অল্প বয়সেই ইসলামী বিষয়ে জ্ঞানার্জনের সুযোগ পান, এ সুবাদে পরবর্তীতে তিনি তাঁর সাহিত্যেকর্মে ইসলাম ও তার দর্শন বিষয়ে নানাবিধ লেখনীরও খোরাক পান।

ছোটবেলা থেকে নজরুল বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। জীবনের নানা বৈচিত্রে তাঁর জীবন সংগ্রাম কখনও থেমে থাকেনি সংগ্রামী পথের বাঁকে। তিনি একাধারে প্রাবন্ধিক, কবি, উপ্যনাসিক, গায়ক, নায়ক, অভিনেতা, সৈনিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রেমিক, বিদ্রোহী। তাঁকে আমরা তাঁর জীবনের ছন্দে ও দ্বন্দ্বে দেখি তিনি দুখু মিয়া, তিনি সাহসি এক সৈনিক, ২য় বিশ্বযুদ্ধের বাঙালী পল্টনের যোগদান করে তিনি সৈনিকদের প্রেরণার উৎসে পরিণত হন। যুদ্ধের জন্যে তিনি করাচী কিংবা মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত গিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। যোগ্যতা বলে তিনি হাবিলদার পদেও উন্নীত হয়েছিলেন।

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর পরই নজরুল তার চাকুরী হারালেন। মনের মধ্যে মহাযুদ্ধের স্মৃতি এবং হৃদয়ে পরাধীনতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দাবানল বহন করে বাংলায় ফিরে এলেন এই সৈনিক কবি। তাঁর লেখা কবিতায় বেরিয়ে আসতে লাগলো বিদ্রোহের বহ্নিচ্ছটা।

নজরুলকে বলা হয়, চির যৌবনের কবি। দুর্বার প্রাণ-প্রাচুর্যই যৌবনের নিশ্চিত প্রাণ-স্পন্দন, প্রথম মহাযুদ্ধের পর আশাভঙ্গ হেতু সেই যৌবন হয়ে ওঠে বিদ্রোহী। সকল প্রকার শাসন-শোষণ, শৃংঙ্খল ভাঙ্গার দুর্জয় সাধনায় সেই যৌবন নির্মম। নজরুলের কাব্যে ভেসে এলো বিদ্রোহী যৌবনের নির্বোধ পরাধীনতার গান। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও হলেন বিস্মিত। স্বীকার করে নিলেন নজরুলকে একজন প্রতিভাবান কবি হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বাংলা সাহিত্যে মধ্যাহৃ আকাশের সূর্যের মত তাঁর আলোক রশ্মি ছড়িয়ে দিয়েছেন, চারিদিকে রাবীন্দ্রিক বন্দনা জয়জয়কার তখনেই  বিদ্রোহের জয়ধ্বজা উড়িয়ে ধুমকেতুর মতো নজরুল ইসলাম দুর্বার পদ-বিক্ষেপে রবীন্দ্রনাথের পটভূমিতে আবির্ভূত হলেন। নজরুল তখন বিজয় কেতন উড়িয়ে বাংলা সাহিত্যে তার আগমনী বার্তা ঘোষণা করেছেন মাত্র। নজরুল অনেকটা কালবৈশাখীর ঝড়ের মত আবির্ভূত হন দিগন্ত কাঁপিয়ে। তিনি সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছিলেন। তাঁর বিদগ্ধ কন্ঠে বেজে ওঠেছিল-

“তোরা সব  জয়ধ্বনি কর

ওই নতুনের কেতন ওড়ে

কালবৈশাখীর ঝড়।”

 

এরপর তাঁর বিদ্রোহী কবিতাটিই প্রকৃতপক্ষে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে তাঁর প্রবেশের প্রথম ছাড়পত্র স্বরূপ। তাঁর কবিতায় দৃপ্তকণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করলেন –

“বল বীর,

বল, চির-উন্নত মমশির।

শির, নেহারি আমার নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির।”

 

কেবলমাত্র এই ‘বিদ্রোহী ’ কবিতাটির জন্যই বাংলা কবিতার আসরে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত হলেন। কবি নজরুল হলে গেলেন বাংলার বিদ্রোহী কবি।

যুদ্ধ হতে বাংলায় প্রত্যাবর্তনের পর নজরুল দেখলেন দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দী। এখানে ধনিক শ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদীদের নির্লজ্জ শোষণ ও অত্যাচারে সমগ্র সমাজে রচিত হয়েছে কংকাল পরাকীর্ণ এক বিশাল শ্মশান ভূমি। তিনি উদ্ধত কাপালিকের মত সেই শ্মশানভূমিতে দৃপ্ত কন্ঠে উচ্চারণ করেন-

“কারার ঐ লৌহকপাট

ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট

রক্ত জমাট, শিকল পূজার পাষাণ বেদী।

 

গম্ভীর কন্ঠে ঘোষণা করলেন –

“ আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস

আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশঃ

 

মানুষ যতদিন অজ্ঞতার আঁধারে বন্দী থাকে ততদিন সে নিজেকে চিনতে পারে না, সন্ধান পায় না নিজের শক্তির, কবি তার কবিতায় এ কথাটি অতি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। এখানে দেখা যায়, কাজী নজরুল স্বপ্নের কবি নন, ফুলের গন্ধ আর কোকিলের ডাক শোনার কবি নন, আকাশের চাঁদ দেখে প্রিয়ার ভাবনার কবি নন। তাঁর চোখের সম্মুখে শৃঙ্খলিত ভারতবর্ষ বিদেশীর কারা-প্রাচীরের অন্তরালে একান্ত নিরুপায়, অধীনতা আর পরাধীনতায় ক্লিষ্ট, অত্যাচারে নিষ্পেষিত, নিপীড়িত জনতার স্বপ্ন এখানে সমাহিত। এই সমাহিত কবর উপড়ে তিনি রচনা করতে চান মানবতার স্মৃতিস্তম্ভ।

তিনি শুধু সামাজ্যবাদের বিরুদ্ধেই ক্ষেপিয়ে তোলেননি সমাজকে, সমাজে যারা হেয়, যারা মানবতার সমস্ত অধিকার হারিয়ে দিনে দিনে ভগ্নস্বাস্থ্য, হতসর্বস্ব, নিঃস্ব হচ্ছে সেই দিনহীন সর্বহারাদের মধ্যে সর্বপ্রথম শোনালেন বন্ধন মুক্তির সংগ্রাম, মুক্তির গান-

“জাগো অনশন বন্দী উঠরে যত

জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত।

যত অত্যাচারের আজ বজ্রহানি

হাঁকে নিপীড়িত জনমন মথিত বাণী,

নব জনম লোভী -অভিনব ধরণী

ওরে ঐ আগত।”

ধর্মীয় জীবনের অন্ধকারময় গভীরতায় প্রবেশ করে ক্ষেপে ওঠেছে নজরুলের প্রাণমন। মোল্লা- পুরুতের দাপট সমাজকে নিয়ে চলেছে মধ্যযুগীয় গোঁড়ামির এক হানাহানির মধ্যে। যেখানে মক্কা, মদিনা, মসজিদ, মন্দির, মথুরা, বৃন্দাবন বিশ্ববাসী মানুষের কাছে কেবলমাত্র পবিত্র স্থান। কিন্তু মানব হৃদয়ের পবিত্রতার দিকে আমাদের কারো লক্ষ্য যখন নেই তখন মুক্তমনে কাজী  নজরুলের বলে ওঠেন-

“তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাহি মানুষের দাবি

মোল্লা পুরুতেই লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি।”

খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা!”

সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা, হাতুড়ী শাবল চালা।

এখানে কাজী নজরুল শুধু একজন কবিই নন, মানবতার একটি মূর্ত প্রতীক। বিশ্বে যেখানেই মানবতার অপমান নজরুলের দরদী মন সেখানেই আহত হয়েছে। কিন্তু তিনি দূর্বল চিত্তের মানুষ ছিলেন না। অন্যায়কারী যতই শক্তিধর হোক না কেন, তিনি তার প্রতিবাদ করতে একটুও দ্বিধান্বিত হননি।

নজরুল যুগে নারী-জাতির ব্যক্তিত্বকে সমাজ বিন্দুমাত্র মূল্য দেয়নি। সমাজের দোষে, মুহূর্তের দুর্বলতায় নারী পতিতায় পরিণত হচ্ছে। সমাজ তাদেরকে বাধ্য করেছে ঘৃণার অন্ন আহরণ করতে। মুহূর্তের চঞ্চলতাকে সংশোধন করে নেয়ার মানুষ নেই। কিন্তু যে পুরুষ এ নারীকে পতিতায় পরিণত করেছে তার শুভ্র গাত্রে কলঙ্কের ভাষায় তার প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে।

“ অসতী মাতার পুত্র যদি জারজ পুত্র হয়,

অসৎ পিতার পুত্র তার জারজ সুনিশ্চয়।”

তিনি নারীকে মহিমান্নিত করেছেন তার লেখনিতে-

তিনি লিখেছেন-

সাম্যের গান গাই-

আমার চক্ষে পুরুষ -রমনী কোন ভেদাভেদ নাই

বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির- কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

বিশ্বে যা কিছু এ পাপ তাপ বেদনা অশ্রু বারি

অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অধেক তার নারী।

দেশে যখন স্বাধীনতার আন্দোলন জোরদার হচ্ছে সেই সময় বিদেশীর চক্রান্তে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু- মুসলিম সমস্যা। স্বাধীনতা সংগ্রামে কান্ডারীকে ডেকে তিনি আদেশ করলেন-

“ হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?

কান্ডারী বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।”

তিনি লিখেছেন-

গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান

নাই দেশ কাল পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি

সব দেশে সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।

এখানে তিনি অস্প্রদায়িকতার কবি, সাম্যের কবি। এভাবে তিনি হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির মিলনমন্ত্র রচনা করেছেন, তিনি তার লেখার মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সবাইকে এক হয়ে সংগ্রাম করার আহ্বান জানান। তিনি মহাগ্রন্থ আল-কুরআন গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন। সেই সাথে পুরান, গীতা, মহাভারত এবং আরবী, ফারসী, সংস্কৃত বাংলার শব্দভান্ডারের দুর্লভ চাবিকাঠি তিনি আয়ত্ত করেন। তিনি উদাত্ত কন্ঠে রাগ-রাগিনীর জ্ঞানের সঙ্গে বাংলার কীর্তন, বাউল, জারি-সারি, ভাটিয়ালি গান রচনা করেন। সেই সাথে তার কন্ঠে ছিল ফার্সি গজলের মন মাতানো সুর।

 

তিনি যে বিরল প্রতিভার অধিকারী তা দেখা যায় তার সৃষ্ট গানে ও সুরে। কাব্যের জগত ছাড়া গানের জগতে তিনি নিজেই ছিলেন একজন গায়ক এবং তার প্রায় গানেই নিজে সুর দিয়েছেন। নজরুল সংগীতের বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। তিনি একাধারে গজল, শ্যামাসংগীত, দেশ প্রেমমূলক সংগীত, প্রেম সংগীত প্রভৃতি বিচিত্র ধরণের গান রচনা করেছেন এবং সুর দিয়েছেন। নজরুলের সমস্ত সাহিত্যের কথা বাদ দিলেও কেবল গানের জন্যেই তিনি সাহিত্য আসরে চিরদিন অমর হয়ে থাকতেন। অবশ্য তিনি স্বগর্বে আছেনও বটে।

আসলে তিনি নেই কোথায়, গল্পে, গদ্যে, উপন্যাসে যেখানে তিনি কলম ধরেছেন তার লেখনি হয়ে উঠেছে পদ্যময়, গদ্যময় আর গল্পে কথায় ছন্দময়, ব্যঙ্গ রস এর মধ্য দিয়ে মনের গহীন কোণে সুখ, দুঃখ, আনন্দ বেদনার বাস্তবতার গন্ধে, আলোয় উদ্ভাসিত দীপ্যমান।

এ কথা অবধারিত সত্য যে, ভাললাগা ও ভালবাসা সব সময় নৈকট্য বা সান্নিধ্যের উপর নির্ভর করে না। কারণ মানুষের প্রতি মানুষের যে দুর্বলতা তা নিতান্তই অনুভূতিগত ব্যাপার। যার ব্যক্তিত্ব, চিন্তা ও কর্ম, কারও অনুভূতিকে জয় করতে পারে, সে-ই তার চিন্তা ও ভাবনা রাজ্যে অধিশ্বর হয়ে বসতে পারে বসতে পারে ভালোবাসার মানস পটে। প্রাত্যহিক জীবনে মানুষ অনেকের সাথে অচ্ছেদ্য সম্পর্কে আবদ্ধ থাকলেও তার মনে যে ব্যক্তিগত আদর্শের জগৎ রয়েছে সেখানে সে নীরবে নিভৃতে সেই পুজ্য নমস্য ব্যক্তিটাকে স্মরণ করে ও ভালোবাসে। আমার হৃদয়ের সে অদৃশ্য ভালবাসা সব সময় যার নামে সদা উচ্ছসিত ও তরাঙ্গায়িত ও প্রেরণার উচ্ছল ঝর্ণাধারায় প্রবাহিত তিনি হচ্ছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যার কাব্যে শুনেছিলাম মৃত্যুঞ্জয়ী চির যৌবনের জয়ধ্বনি, শুনেছিলাম অগ্নিবীণার সুর। যিনি ধীর স্থির অচঞ্চল, বাংলা কাব্যে বয়ে এনেছিলেন দুর্বার কালবৈশাখী ঝড়, সেই বিদ্রোহী মানুষটিই আমার প্রিয় কবি। শুধু কাব্যে নয়, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ সব ক্ষেত্রেই  ছিল তার পদাচরণা। তিনি তার কাব্য ও অন্যান্য লেখার মাধ্যমে এই পরাধীন জড়তাগ্রস্থ সমাজের বুকে সঞ্চারিত করেছিলেন নব জীবনের শানিত ধারা, তার কবিতা, তার সংগীত সর্বহারাদের কান্নার বাণী। নজরুল একদিকে সর্বহারার কবি, যৌবনের কবি, স্বাধীনতার কবি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদী কবি। অন্যদিকে তার লেখা গানে, কবিতায়, উপন্যাসে আমি খুঁজে পাই প্রেমের আকুলতা। তাই এসব দিক দিয়ে নজরুল ইসলাম প্রেমের কবিও বটে।

নজরুল বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী হওয়ায় তাঁকে নিয়ে লেখার মধ্যে খেই হারিয়ে ফেলতে হয়। তাঁকে নিয়ে লেখাটাও দুরুহ।

বাঙালীর দূর্ভাগ্য, ধুমকেতুর মত আবির্ভূত প্রতিভা ও বিস্ময় যেমনি আকস্মিকভাবে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হয়েছিল, তেমনি আকস্মিকভাবে তাঁর বিলোপ ঘটে। ১৩২৭ থেকে ১৩৫২ মোট  ২৫ বছর তিনি সাহিত্য সাধনার সময় পেয়েছিলেন, এর মধ্যে নানা চড়াই উৎরাই।

হঠাৎ করে গতিময় জীবনের মাঝখানে দুরারোগ্য ব্যাধির নিষ্ঠুর আক্রমণে এ অগ্নিবীণা চিরদিনের তরে স্তব্ধ হয়ে যায়। সত্যি ভাবতে অবাক লাগে বিশ্বমানবতার মুক্তির জন্য যে কবির লেখনি আমাদের আন্দোলিত করেছিল, সেই কিনা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। কিসের জন্য, কেন? তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো আমাকে দারুণভাবে কষ্ট দেয়। বাকরুদ্ধ অন্তিম দিনগুলির কথা ভাবলে অশ্রু না এসে পারে না কোন দরদী মনের। তাঁর অপলক চাহনী আমাকে ব্যথিত করে যখন তার ছবি দেখি টিভি পর্দায়, তিনি কি যেন বলতে চান, বলতে পারেন না। কবি যেন তাঁর জীবনের ভিতরের অনেক ভিতরের স্পষ্ট ছবি দেখতে পেয়েই রচনা করেছিলেন –

‘‘তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না’’?

 

বাংলাদেশ স্বাধীনতার জন্য তিনি তাঁর চেতনার গভীর থেকে লিখেছিলেন বাঙালীর জয় হোক, বাংলার জয় হোক, জয় বাংলা। সেই প্রেরণার উৎস থেকে প্রবাহিত শব্দমালা জয়বাংলার শ্লোগানে  যখন স্বাধীন বাংলাদেশ, সেই স্বাধীন দেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবির প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখাতে এবং যোগ্যর মূল্যায়ন করতে কার্পণ্য না করার মানসে  ১৯৭২ সালে তাঁরই নির্দেশে বাংলাদেশ সরকার কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং তাঁর চিকিৎসাসহ যাবতীয় দায়িত্ব নেন। এ সময় কবিকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করেন। বাকরুদ্ধ আমার প্রাণের কবি গুরুতর অসুস্থ্ হয়ে পড়লে তৎকালীন পিজি হাসপাতাল বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালে অবশেষে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগষ্ট পরলোক গমন করেন।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় প্রেরণার উৎস। তাঁর লেখনী আমাদের প্রতিনয়ত শিক্ষা দেয় মানবতার মুক্তির। তিনি ব্যথিত মানবতার কবি, তিনি তো বিদ্রোহী যৌবনের কপালে জয়তিলক এঁকে দিয়ে তাকে ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাপার’ উত্তরণের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন। নজরুলের সৃষ্টি আজ সৃজনশীলতা ও আমাদের প্রাণে দোলা দেয়, উজ্জ্বীবিত করে যে কোন সংকটে, যে কোন প্রাপ্তির প্রত্যাশায়। তাইতো নজরুল মানবতার কবি, গণজাগরণের কবি, নিপীড়িত মানুষের কবি, বাঙালির হৃদয়ের কবি।

৪১তম মহাপ্রয়াণ দিবসে তোমায় বিনম্র শ্রদ্ধা। জয়তু নজরুল!

সৈয়দ মাসুদুর রহমান
সৈয়দ মাসুদুর রহমান

 

Author: সৈয়দ মাসুদুর রহমান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts