বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও তার সুভা

একজন কবির কাছ থেকে এর চেয়ে আর কি আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন দেখতে পারি? কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন একজন কবি যিনি ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮  টি নাটক, ১৩ টি উপন্যাস, ৩৬ টি প্রবন্ধও অন্যান্য গদ্য সংকলন এর প্রণেতা।  যা তাঁর জীবদ্দশায় ও তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গান তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি। তিনি দুহাজার চিত্রকল্পের সার্থক চিত্রশিল্পী এবং পঁচানব্বইটি গল্পের সার্থক গাল্পিক। কবি রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘সুভা’ তাদেরই অর্ন্তভুক্ত।  

বাংলা সাহিত্যে ‘সুভা’ একটি অনন্য নাম। মাত্র দুই পৃষ্ঠার একটি ছোটগল্পকে কেন্দ্র করে একটি সফল ছায়াছবি  থেকেই বোঝা যায় তিনি কতবড় মাপের একজন শক্তিমান গল্পকার। যার গল্পের লাইনে লাইনে শব্দে শব্দে থাকে ঠাস বুননের গল্পরা সব। সে সব গল্পগুলোকে পাঠ করতে পারলে দ্ইু পৃষ্ঠার একটা সার্থক ছোটগল্পই হয়ে ওঠে তিন ঘন্টাব্যাপী চিত্রায়নের এক সফল ছায়াছবি। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘সুভা’র প্রথমেই তিনি লেখেন- ‘মেয়েটির নাম যখন সুভাষিনী রাখা হইয়াছিল তখন কে জানিত সে বোবা হইবে। তাহার দুটি বড় বোনকে সুকেশিনী ও সুহাসিনী নাম দেওয়া হ্ইয়াছিল, তাই তাহার বাপ ছোট মেয়েটির নাম সুভাষিনী রাখে। এখন সকলে তাহাকে সংক্ষেপে সুভা বলে।’ এ থেকেই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঝপাৎ করে গল্পের নায়িকা সুভাষিনীর জন্মের সময় থেকে একেবারে বর্তমানে তার নাম ছেটে তার চরিত্রের সাথে মানানসই করে সুভাষিনীর  স্থলে ‘সুভায়’ নামিয়ে আনলেন অর্থাৎ যে কথা বলতে পারে না তার আর সুভাষিনী নামের দরকারটা কি? ‘সুভা’ই যথেষ্ট।

‘যে কথা কয় না সে যে অনুভব করে ইহা সকলের মনে হয় না। এই জন্য তাহার সাক্ষাতেই সকলে তাহার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে দুঃচিন্তা প্রকাশ করিত।’ এখানে কবি সুভার অন্তরের মর্মবেদনার কথা কলমের এক খোঁচাতেই   ঘোচাতে চেষ্টা করেছেন। চেষ্টা করেছেন উলঙ্গভাবে দেখাতে যে, ‘তাহার সাক্ষাতে’র মাধ্যমে। অর্থাৎ ‘চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হয়’ এর মতো সে যে বোবা কালা একটি মেয়ে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তা ভাবনা চেতনা  উন্মেষের প্রকৃত অবস্থা  চিত্রনণর চেষ্টা করেছেন। যে কালা বোবা সে যখন শুধু চোখের গোচর হয় তখনি তাকে নিয়ে ভাবে-ভাবায়। তাছাড়া নয়। সমাজের সব ক্ষেত্রেই আমরা আজ এ চিত্র দেখতে পাই। কিন্তু বেদনা কি কেউ কখনো ভোলে? পিতা মাতার মনে সে সর্বদ্ইা জাগরুক ছিলো’র মাধ্যমে সমাজের সমস্ত স্রোত  এক আর পিতা মাতা এক, সে কথা বুঝিয়েছেন কবি। রবীন্দ্রনাথ এখানে বাংলা মায়ের চরিত্র বিশেষভাবে যত্ন করে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ‘কারণ মাতা পুত্র অপেক্ষা কন্যাকে নিজের অংশ রূপে দেখেন। কন্যার কোন অসম্পূর্ণতা দেখিলে সেটা যেন বিশেষ রূপে নিজের লজ্জার কারণ বলিয়া মনে করেন।’ এখানে বাংলা মায়ের কুসংস্কারচ্ছন্ন মনকে চমৎকার আদল দিয়েছেন। কিন্তু পিতা? তিনি তো সকল কুসংস্কারচ্ছন্ন মানসিকতার উর্দ্ধে। তিনি যেন সত্যি সবকিছু ভুলে তার ছোট মেয়েটিক্ইে বেশি ভালবাসতেন।

‘মুখের ভাবে আজন্মকাল যাহার জন্য ভাষা নাই তাহার চোখের ভাষা অসীম উদার এবং অতল স্পর্শ গভীর। অনেকটা স্বচ্ছ আকাশের মতো, উদয়াস্ত এবং ছায়ালোকের নিস্তব্ধ রঙ্গভূমি। এ্ই বাক্যহীন মানুষের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো এক বিজন মহত্ব আছে। এই জন্য সাধারণ বালক বালিকারা তাহাকে এক প্রকার ভয় করিত। তাহার সহিত খেলা করিত না। সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন।’ এই লাইন কটির মাধ্যমে কবি সুভা চরিত্রটির বৈশিষ্ট্য আগাগোড়া চিত্রিত করেছেন। বিশেষ করে দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন চিত্রকল্পটির মাধ্যমে আমাদের বোধকে  শানিত করেছে। শনাক্ত করেছে, রক্তাক্ত করেছে।

‘প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পুরণ করিযা দেয়।’ এর মাধ্যমে কবি দেখেছেন নদীর কলধ্বনি, লোকের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, তরুর মর্মর প্রকৃতির এ্ই বিবিধ শব্দ এবং বিচিত্র গতি, ইহাও বোবার ভাষা। বড় বড় চক্ষু পল্লব বিশিষ্ট সুভার যে ভাষা তারই একটা বিশ্বব্যাপী বিস্তার। আসলে আমরা দেখতে পাই কবি রবীন্দ্রনাথের মতো ঝিল্লীরব পূর্ণ তৃণভূমি হতে শব্দাতীত নক্ষত্রলোক পর্যন্ত কেবল ইঙ্গিত, ভঙ্গি, সঙ্গীত, ক্রন্দন এবং দীর্ঘশ্বাস। কখনও কখনও ভাষাহীন পশুও যে মানুষের মনের ভাষা বেশ বুঝতে পারে, তাদের আপন বন্ধু হয়ে যায় সেটা কবি রবীন্দ্রনাথ খুব সুন্দর ভাবে দেখিয়েছেন, গোয়ালের দুটি গাভীর চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে। ‘তাহার কথাহীন একটি করুণ সুর ছিল। তাহাদের আদর করিতেছে, কখনও র্ভৎসনা করিতেছে, কখনো মিনতি করিতেছে তাহা তাহারা মানুষ অপেক্ষা ভাল বুঝিতে পারিত।’

‘সুভা’র আরও একটি সঙ্গী সরকারি সম্পত্তি অকর্মণ্য গোঁসাইদের ছোট ছেলে প্রতাপ। যে তাকে অতি আদরে ‘সু’ বলে ডাকতো। সুভাও চেষ্টা করতো- যেন মনে করো সুভা যদি জলকুমারি হইত, আস্তে আস্তে জল হইতে উঠিয়া একটি সাপের মাথার মনি ঘাটে রাখিয়া য্ইাত’… এবং গোঁসাইদের ছেলে প্রতাপকে কিছুতেই আশ্চর্য করিতে পারিতেছে না।’ এখানে কবি সরকারি সম্পত্তি অকর্মণ্য শব্দের মাধ্যমে প্রতাপের চরিত্রের এক সুন্দর চিত্র এঁকেছেন। যার নির্দিষ্ট কোন কাজ নেই তার জন্য যেন পৃথিবীর তাবৎ কাজ অপেক্ষা করে আছে। তার দায়িত্ব্ই এসে যায় সবার দায়িত্ব, যেমনভাবে সরকারের দায়িত্ব তার সমস্ত দেশের দায়ভার গ্রহণ করা। মূলতঃ সরকারি শব্দটির মাধ্যমে প্রতাপের প্রকৃত চরিত্রটি স্পষ্টভাবে চিত্রিত হয়েছে। কবি গল্পে প্রতাপ এবং সুভার মধ্যের ভালবাসার চিত্রটি যেভাবে মৌন হৃদয়ের  তলদেশ থেকে ঠান্ডা দিঘীর জলের মতো এঁকেছেন, ছায়াছবিতে সেভাবে দেখানো হয় নি। বরং ছায়াছবিতে প্রতাপ এবং সুভার মধ্যে ভালবাসার টানটান সামাজিক চিত্র চিত্রণ করা হয়েছে। নানা ঘাত প্রতিঘাত সামাজিক সমস্যা সব শেষে সুভাকে যখন কোলকাতা নিয়ে যাবার দিন ধার্য হয় সেদিন রাতে প্রচন্ড আবেগ মূক মানবতাকে দুই বাহুতে ধরে বলতে চায় ‘তুমি আমাকে য্ইাতে দিও না মা আমার মত দু‘টি বাহু বাড়্ইায়া তুমিও আমাকে ধরিয়া রাখো।’ এখানে প্রেমের, দেশপ্রেমের এক অত্যুজ্জ্বল চিত্র অংকন করেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তারপর কাহিনী সাবলীলভাবে এগিয়েছে। কোলকাতায় তাকে বরপক্ষের পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়া এবং ক্রমাগত সুভার চোখের জল দেখে ভাবলো ‘বালিকার হৃদয় আছে, এবং হিসাব করিয়া দেখিলেন, ‘যে হৃদয় আজ বাপ মায়ের বিচ্ছেদ সম্ভাবনায় ব্যথিত হ্ইয়া উঠিয়াছে সেই হৃদয় আজ বাদে কাল আমারই ব্যবহারে লাগিতে পারিবে।’ এ কথাটির মাধ্যমে কবি নিজে পুরুষ লিঙ্গের হয়ে পুরুষদের চরিত্র, মানসিক চাওয়া, তাদের ভাবমূর্তি অতি নিপূণভাবে বর্ণনা করেছেন। এভাবে সুভার চোখের জল শুধু তাদের প্রয়োজন লাগবে বল্ইে ক্ষান্ত হলো, একবারও বোঝার চেষ্টা করলো না কেন এই চোখের জল? কি বলতে চায় সুভা? সে সব মনোচেতনার কাছে না গিয়ে সে তার শারীরিক সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়লো।

যথাসময়ে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যাবার সপ্তাহ খানেক পর সকলে বুঝলো সুভাষিনী আসলে বোবা। কিন্তু সেটা বুঝলো না যে, সে আসলে কাউকে প্রতারণা করে নি এবং তার কোন দোষ নেই। তার চোখ সব কথাই বলেছিল, তারা তা বুঝতে পারে নি। সবশেষে যা হবার তাই হলো ‘এবার তাহার স্বামী চক্ষু এবং কর্ণন্দ্রিয়ের দ্বারা পরীক্ষা করিয়া এক ভাষা বিশিষ্ট কন্যা বিবাহ করিয়া আনিলো।’ অথচ সুভা যেদিকে তাকায় সেদিকেই তার অপরিচিত মুখ। সেই আজন্ম পরিচিত মুখগুলো দেখতে পায় না। তার ভেতরে যে অসীম অব্যক্ত ক্রন্দন বাজতে লাগলো অর্ন্তজামী ছাড়া আর কেহ তা শুনতে পায় না। সমাজের বাস্তবতা সুভার প্রতিটি চরিত্রের সাথে লেপ্টে আছে। সুভা এক সার্থক ছোটগল্প, তার বাস্তব প্রমাণ বাংলাদেশের সফল ছায়াছবি নির্মাণ।
    

ড. শাহনাজ পারভীন
ড. শাহনাজ পারভীন

Author: ড. শাহনাজ পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts