বুকের মধ্যে একটা মস্তবড় অন্ধকার, সেখানে একটুও আলো নেই!

rickshaw

গতকাল ধানমন্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালের অপোজিট থেকে রিক্সা নিলাম মোহম্মদপুরের উদ্দেশ্যে । রাত ন’টার মত বাজে, আট নম্বর ব্রিজের কাছাকাছি এসেছি তখন। লেকের পাশ ঘেষে যে ফুটপাত, রাতের বেলা সেটা অনেক লোকের ঘুমানোর জায়গা । মাস দুয়েক আগে এপথে রিক্সায় যেতে যেতে চোখে পড়েছিল একজন মা তার সন্তানদের পড়াচ্ছেন । রাস্তা এত ব্যস্ত ছিল যে, রিক্সা দাড় করাতে পারিনি । আজকে ওখানটাতে এসে মনে পড়লো আবার । লক্ষ্য করতে করতে যাচ্ছি আর ভাবছি, আজকে বোধহয় ওদেরকে পাওয়া যাবেনা । কিন্তু না, ওইতো বাচ্চাদের বই দেখা যাচ্ছে । রিক্সওয়ালাকে বলতে বলতেও কতকটা এগুলো।  রাস্তা ফাঁকা ছিল । একটু পিছিয়ে এসে পেলাম জায়গাটা । আজকে কেউ পড়ছেনা, তবে মেলানো রয়েছে দুটো বই একটা নীল রঙের ছেড়া পলিথিনের উপর, পাশে একজন মহিলা দাঁড়ানো । জানতে চাইলাম, কার বই এগুলো ? মহিলা বললো, আমার মেয়ের । বললাম, পড়ে ? মেয়েদেরকে ডাকতে ডাকতে জানালো, সুরভী স্কুলে পড়ে । সুরভী শব্দটি শুনে চমকে উঠলাম । কারণ SUROVI আমাদের UNIQUE II প্রকল্পের পার্টনার, শিশু শিক্ষা নিয়ে কাজ করে এটুকু জানি । সুরভী স্কুলের একটা খাতা দেখালো, বুঝলাম যে সুরভীর শহরের বস্তি এলাকায় স্কুল বেজড প্রাইমারী এডুকেশন প্রোগ্রামের কোনো একটি স্কুলে পড়ে ।

রিক্সাওয়ালাকে অনুরোধ করে কিছুক্ষণ কথা বললাম ওদের সাথে । মেয়ে দুটি একটু দূরে ছিল, কাছে এলে পরিচয় করিয়ে দিল এই তার দুই মেয়ে, তারা সুর করে সালাম দিল, আচ্ছালামু… আলাইকুম… । সালামের উত্তর দিয়ে জানতে চাইলাম, কি নাম, কোন ক্লাসে পড় ? বড়টি ৭ বছরের নাম সুমাইয়া ক্লাস ওয়ানে পড়ে, ছোটটির নাম সুমি, বছর পাঁচেকের, শিশু শ্রেণীতে পড়ে । ল্যাম্পপোস্টের আলোতে বেশ মিষ্টি লাগছিল দেখতে । মহিলার নাম কল্পনা, বয়স ৩০/৩১ হবে । জানলাম ওর স্বামী থেকেও নাই, নেশা করে জায়গায় জায়গায় পড়ে থাকে, ওদের কাছে আসে না । বউবাজারে বালুর মাঠে একজনের সাথে শেয়ারে কল্পনার একটি ছোট ঘর ভাড়া নেয়া আছে । ওখান থেকে মেয়ে দুটো স্কুলে আসতে পারেনা, তাই ওদেরকে নিয়ে ফুটপাতে পলিথিন বিছিয়ে থাকারে এই ব্যবস্থা করেছে । মুখে কথা আসছিলো না, শুধু বললাম, এইখানে মেয়ে দুটিকে নিয়ে তুমি রাতে থাকো ? বৃষ্টি এলে ??  কল্পনা জানালো, হঠাৎ বৃষ্টি এলে তো কিছু করার নেই, গাছতলায় পলিথিন মাথায় দিয়ে বসে থাকে আর যদি আগাম বুঝতে পারে তখন বালুর মাঠে ওর শেয়ারে ভাড়া করা ঘরে চলে যায়, তখন স্কুল কামাই দেয় মেয়েরা ।

পঞ্চাশ টাকা কল্পনার হাতে দিয়ে বললাম, ওদের কিছু খাবার জিনিস কিনে দিও (মনে মনে বললাম আমার উচিত ছিল কিছু নিয়ে আসা ) । সুমাইয়ার খাতার এক কোণে আমার নাম আর মোবাইল নম্বর লিখে দিলাম, জানতে চাইলাম মোবাইল আছে কিনা । কল্পনা মাথা নেড়ে না করলো । বললাম তবুও থাক, প্রয়োজনে যোগাযোগ করো । খাতাটা হাতে নিয়ে কল্পনা জানতে চাইলো, আপনার নাম আফরোজা বুলবুল ? বললাম হ্যাঁ । অর্থাৎ সে পড়ালেখা জানে কিছুটা হলেও । রিক্সা ছাড়তে শুরু করলে, সুমি এবং সুমাইয়া আবার সুর করে সালাম দিল ।

রিক্সায় বাকী পথ আসতে আসতে ভাবনায় আসছিল ৩০/৩১ বয়সী কল্পনা দুটি মেয়ে নিয়ে কি করে খোলা আকাশের নীচে ফুটপাতে ঘুমায় ? কোথায় ওরা টয়লেটে যায় ? কোথায় গোসল করে ? মিনিস্ট্রেসন হলে কল্পনা কিভাবে কি করে ? নিরাপত্তা শব্দটা কি ওরা জানে ? আবার ভাবলাম, হয়তো জীবন-যুদ্ধের অনেক কিছুই জানে কল্পনা । যে সমাজে তিন বছরের মেয়ে শিশু ধর্ষিত হয়, সেই সমাজের কল্পনারা অনেক কিছু জেনেই জীবন-সংগ্রাম মোকাবেলা করে, তাদের মতো করে ।

রাতদিন দেশের উন্নয়নের ফিরিস্তি শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যায় । কত ঘোষণা ! কত যে বক্তৃতার বাহার । টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা করা, দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ বানানো । আরও কত কি যে রাত দিন শুনায়, শুনি আবার হাতে তালিও দেই মাঝে মাঝে, এই আমরা, তথাকথিত ভদ্দর লোকেরা ।

অনেক এলোমেলো কল্পনা আসছিল মনে । কোথায় যেন একটা ইচ্ছা কাজ করছিল, কল্পনা, সুমাইয়া আর সুমিকে সহায়তা করার।  পরক্ষণে আবার মনে হলো, আমার এ ভাবনাকে পরিবার, সমাজ কেউ পাত্তা দিবেনা, ভাববে ঢং বা পাগলামী ।

সবমিলে ভাল লাগছিলনা মোটেই, মনে হচ্ছিল, বুকের মধ্যে একটা মস্তবড় অন্ধকার, সেখানে একটুও আলো নেই!

আফরোজা বুলবুল
আফরোজা বুলবুল

 

Author: আফরোজা বুলবুল

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts