রম্য কাহিনি/অনুপা দেওয়ানজী

পিঠে-রক্তবীজ-অনুপা দেওয়ানজী

শীতকাল আসলেই মা নানা রকম পিঠে বানাতেন।  ভাপা, চিতুই, চসি,পুলি , পাটিসাপটা, গোকুলপিঠা,চন্দ্রপুলি আরো কত রকমের!

দিদিমার কাছ থেকে শেখা মায়ের চিতুই পিঠে বানাবার কায়দা ছিলো একেবারেই অন্যরকম। খই ভিজিয়ে সেটা পিষে নিয়ে চালের গুঁড়োর কাইয়ের সংগে মিশিয়ে সেই চিতুই তৈরি হতপিঠেগুলি যেমন ফুলতো  তেমনি আবার মোলায়েমও হত।

সে পিঠের ওপরে তারপরে ছড়ানো হত নলেন গুড় দিয়ে তৈরি করা পাতলা ক্ষীর।    

ভারি চমৎকার লাগতো খেতে।  

এছাড়া নারকেল কুচো আর কিশমিশ দিয়ে রসের পায়েসও করতেন।

রসের কথায় মনে পড়ছে কাঁচা রস খাবার কথা।  

কোয়ার্টারের অদুরেই ছিলো পাশাপাশি দুটো খেজুর গাছতার একটা ছিলো খুব লম্বা আর সরু    আরেকটা ছিলো বেঁটেখাটো আর স্বাস্থ্যবান। গাছ দুটোকে আমরা বলতাম লরেল হার্ডি। কলেজের অন্যান্য গাছের সংগে এই গাছ দুটিকেও খেজুর গাছিকে বর্গা দেয়া হত। আমাদের দুই কাকা বাবা রাতে খাওয়া দাওয়ার পরে সেই খাটো গাছটায় উঠে রসের কলসী থেকে একটা বড় কেটলিতে সেই রস ঢেলে  নিয়ে আসতো। আর রাতেই আমাদের সবাইকে তা খেতে দিতো।অপূর্ব মিষ্টি আর ঠান্ডা সেই রসের স্বাদ যেন এখনো মুখে লেগে আছে। মাও খেতেন। বাবা কখনো তা জানতেই পারতেন না।

পরদিন সকালবেলায় গাছি যখন  রস সংগ্রহের জন্যে আসতো তখন দেখতো  ছোট গাছটায় রস তার অনুমানের চেয়ে অনেক কম  তখন সে গাছ তলায় দাঁড়িয়ে ইচ্ছেমতো রসচোরকে বকাবকি করতে  করতে হাঁড়ি নিয়ে চলে যেতো।

কাকা দুজনের হাসি তখন দেখে কে!

তবে কাকারা এটা করতেন শুধুমাত্র প্রথম কাটার রসের দিনটিতে। ২য় আর ৩য় কাটার রসের সময়ে নয়।  

 এক শীতে কেষ্টদা সাত দিনের ছুটি নিয়ে তার বউয়ের সাথে দেখা করতে গেছে।    

মা সেই শীতে পিঠে বানাতে বসলেন।   

পিঠে বানানো শেষ করে রান্নাঘর ঝাড়ু দিয়ে রিনাকে ডেকে বললেন,”ফুলঝাড়ুর আগাটা পুকুর থেকে  ধুয়ে আনতো।

আর শোন ধুয়ে এনে বারান্দার এক কোনে ভেজা দিকটা নিচু করে শুকোতে দিস।

রিনা এর আগে ঝাড়ু কিভাবে ধুতে হয় দেখেনি।সে ভালো করে ধুতে বলায় সে গায়ে মাখা লাক্স সাবানটা    নিয়ে ঝাড়ুতে ঘষতে আরম্ভ করলো। আর ঘষা দেবার সাথে সাথে সাবানের অর্ধেকটাই ঝাড়ুতে এমন ভাবে আটকে বসলো যে সে সাবান   আর কিছুতেই ঝাড়ুর গা থেকে ছাড়ে না। কাপড় ধোয়ার মত সে তখন জোরে আছড়ে আছড়ে ঝাড়ুটাকে ধুয়ে এনে বারান্দার এক কোনে রেখে  দিলো।

সকাল বেলায় ঘর ঝাঁট দিতে  গিয়ে মা দেখেন ঝাড়ুর গায়ে ঝাড়ু বলতে কিছুই নেই আর যে কটাও  বা আছে তা থেকে আবার লাক্সের গন্ধ বেরুচ্ছে।

তাড়া তাড়ি সাবানের কৌটো বের করে মা দেখে্ন লাক্স সাবানের অর্ধেকটাই শেষ আর বাদ বাকিটার  গায়ে লেগে আছে প্রচুর ঝাড়ুর আঁশ।

আমার মা ছিলেন যেমন রাগী তেমনি আবার খুব হাসিখুশিও।  

একহাতে সেই ঝাড়ু আর অন্য হাতে সাবান নিয়ে  বাবাকে সেটা দেখিয়ে সেই কাহিনি বলতে গিয়ে হাসির দমকে মা কিছুতেই আর  বলতে পারলেন না।

ওদিকে বাবা তখন কিছুতেই বুঝতে পারছেন না ঘটনাটা কি!

রিনা মাকে হাসতে দেখে খুব খুশি হয়ে বাবাকে বলে উঠলো , ‘বাবা আমি কালকে লাক্স সাবান দিয়ে ঝাড়ুটা   খুব সুন্দর করে ধুয়ে দিয়েছি তো মা তাই খুব খুশি হয়েছে।’

বাবা বললেন, ‘কিন্তু তোর মার হাতে যেটা দেখছি সেটা কি জিনিস?  ঝাড়ু বলে তো মনে হচ্ছে না ।’

অনুপা দেওয়ানজী
অনুপা দেওয়ানজী

 

Author: অনুপা দেওয়ানজী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts