হরিষে বিষাদ,  মায়ের চোখে জল

হরিষে বিষাদ মায়ের চোখে জল শামসুল আরেফিন খান

অবচেতন  মনে ডুবে থাকা অনেক  বেদনা বিধুর স্মৃতি  খুবই ভারি ।

কোন  কোন স্মৃতি আবার পাখির পালকের মত হালকা ।সে সব স্মৃতি

মনকে আপ্লুত করে আনন্দে ।খুশিতে মনটা ভরে ওঠে। ছোটবেলার

তেমন একটা  স্মৃতিকথা ভেবে মনে হচ্ছে কতই না সরল

আর বোকা ছিলাম তখন।আমার  চেয়ে এগার বছরের বড় ভাই ‘শ্রীকান্ত’

পড়ছিলেন বিছানায় শুয়ে।আমার  ৫ বছর ও ৩ বছরের বড় দুই

বোন আর আমি শুনছিলাম সে গদ্যকাহিনী তার শিয়রে বসে। সব কথা বুঝার বয়স

তখনও হয়নি।তবুও বললাম, ভাইজান  ওই জাগাটা আবার পড়েন। কোন

জাগা ? আমি বললাম, ওই যে কিলা কিলির গল্প ! ভাইজান পড়লেন, “খোট্টারা

কিলা কিলাকে আমাকে কাঁঠাল পাকা দিয়া”।হাসতে হাসতে আমার পেটে খিল

ধরে যেত! বার বারই ওই গল্পটা পড়ে শুনাবার বায়না ধরতাম।আমার

হাসির খোরাক যোগাতে যেয়ে তার আর বই পড়া  শেষই হ’ত না।কত বছর

হয়ে গেলো।সেই স্মৃতিটা এখনও জ্বল জ্বল করছে।কলকাতার সেই বাসা! পাঁচ

তালায়  খোলা ছাদসহ উত্তর দক্ষিণ খোলা বড় দুটো ঘর । মাঝখানে সিঁড়ি।

তার ওপর প্রায়  ৫ হাত চওড়া সুড়ঙ্গের মত  উপরি পাওয়া ২০ ফুট

লম্বা বাড়তি পরিসরে জমতো আমাদের  আসর । দক্ষিণের শেষ প্রান্তে মেঝে থেকে

ছাদ পর্যন্ত লম্বা লম্বি দাঁড়ানো মোটা শিকের ৬ ফুট চওড়া জানালা।সেখান থেকে দেখা

যেত সরাসরি নিচে অবাঙালিদের টালি বস্তি। মাঝখান দিয়ে একটা চিকন

রাস্তা্  যার নাম চুনা গলি।আমাদের ঠিকানাটা  একটু অভিজাত।১৮ ফিয়ার্স

লেন।গলির শেষে বড় রাস্তা সেন্ট্রাল এভিন্যূ।তার এক পারে বনেদি

সেন্ট্রাল হোটেল রেস্তোরা ও বার। রাস্তার যে দিকটা আমাদের বাড়ি সেই

 সেই প্রান্তে থিতু ছিল পাঁচ তলা ইসলামিয়া হাসপাতাল ভবন।তার পিঠে

অল্প ব্যবধানে আর একটি  চার তলা বাড়ি। তার তিন তালার

একটা মেসে বাস করে লেখাপড়া করতেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের  একজন সেরা ছাত্র।

তার অন্য আর এক পরিচয় তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিস্মৃত নায়ক কমান্ডার মোয়াজ্জমেরে জ্যেষ্ঠ সহোদর,

যশোরের কৃতি সন্তান আব্দুল খালেক।গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন।তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল

সহপাঠীদের পাঠচক্র।আমার পিতৃতূল্য ছোট চাচা আহাদ আলী খান  তার এক

সদস্য। ক্ষুদে সদস্য আমি। ওরা এ্যানাটমি পড়তেন গোল হয়ে বসে।মধ্যমনি হয়ে

আমি মাথার খুলি আর একটা লম্বা নলা হাড় নিয়ে নিঃশব্দে খেলতাম।কলকাতা

মেডিকেলের বড় ডাক্তাররা ছাত্রদের টানে আসতেন আমার অসুস্থ্ মাকে দেখতে।খালেক

সাহেব ও তাঁর পাঠচক্রের আসর বসতো আমাদের বাসায়ও।এসব ঘিরে

পাহাড়ের মত ভারি আমার অন্য এক বেদনাময় স্মৃতি।

১৮ ফিয়ার্স লেনের পাঁচ তলাটা আমার কাছে তাজমহলের মত এক স্মৃতিমন্দির।

পশ্চিম ঘরটা ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট।সে ঘরে থাকতেন শুধু আমার মা।আব্বা, চাচা

আর বড় ফুফু পালা করে সেবা শুশ্রুষা ও দিনরাত দেখভাল করতেন।

সে ঘরে আমাদের কারো প্রবেশাধিকার ছিল না।আমরা চার ভাইবোন বিকেল

বেলায়  খোলা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে শয্যাশায়ী মাকে দেখতাম।

বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না কোন ফ্লাটেই। মহাযুদ্ধ বলে কথ। উত্তর দক্ষিণে আড়া আড়ি

বাতাস বইতো। তাই গরম মালুম হ’ত না।ছাদ ছিল স্বাভাবিকের চাইতে একটু বেশি

উঁচু।খুব গরম পড়লে সারা রাত  আব্বার হাতে তালপাখা অবিরাম ঘুরতো আমার

মায়ের শয্যা পাশে।স্মৃতিগুলো খুব ঝাপসা।মার চেহারা মনে পড়ে না। খোলা দরজার

বাইরে দাঁড়িয়ে শুধু তাঁর শীর্ণ দেহের কেশহীন মাথার অংশটাই চোখে পড়তো।

আমার দেড়বছরের ছোট বোন তসলিমা নিউমুনিয়া হয়ে মারা গেলো।কলকাতা

মেডিকেলের সর্বোচ্চ প্রযত্নেও তাকে বাঁচানো গেলোনা।আমার আম্মা সেদিন কোন

নিষেধ মানেননি। উঠে এসেছিলেন ঘরের বাইরে।একটা ছোট চৌকিতে বসে তাকে নিজের হাতে শেষ গোসল দিয়েছিলেন।

আম্মার শরীর সেই যে ভেঙে পড়লো আর ভালো হ’লনা।তখনও এ্যান্টি বায়োটিক

আবিষ্কার হয়নি।বড় কবিরাজ, হোমিওপ্যাথ, কলকাতা মেডিকেলের বক্ষব্যাধির প্রফেসর

প্রাণপণ চেষ্টা করলেন। সেইসাথে ফুরফুরার পীর সাহেব এবং তাঁর চার খলিফার

একজন আমার দাদাজী মুনশি তাহের খাঁ দিনরাত তদবির করেও তাঁকে ধরে রাখতে

পারলেন না।মা চলে গেলেন। আমি অবুঝ। কিছুই জানলাম না।  ভাইদের মধ্যে

সবার বড় আমার ফুফাতো ভাই শামসুর রহমান।তিনি আমাকে ঈদের  পাজামা পাঞ্জাবি ও টুপি পরিয়ে দিলেন।আমি জিজ্ঞেস করলাম,

ভাইজান আমরা কোথায় যাচ্ছি? আজ কী ঈদ?  ভাইজান বললেন, চলো আমরা চিড়িয়াখানা

দেখতে যাবো।কিছুদূর রিকশায় যেয়ে ট্রামে চড়লাম।সন্ধে নামলো গোবরায়।ওটাই কলকাতার

সবচাইতে বড় গোরস্তান।মায়ের  মুখের ওপর থেকে কাফনের মোড়ক খুলে ফেলা হ’ল।দাদাজি

চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে দোয়া পড়ছেন।আব্বার চেখে নীরব অশ্রুধারা।অন্য সবাই

ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।আমার বুকের ভিতর কান্না গুমরে উঠছে।আব্বা ও তাঁর তিন ভাই

ধরা ধরি করে আমার মাকে কবরে নামালেন।আমার বুক ফেটে কান্না বের হ’ল প্রচন্ড

বেগে। আমি লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে। ২৫ জানুয়ারি, ১৯৪৪।আমার বয়স তখন ৩বছর ৮মাস।

যক্ষা হলে তখন কারো রক্ষা ছিল না।আমার নানাজী, তাঁর এক ভাই ও আমার একমাত্র খালা

যক্ষায় শেষ হলেন। শুণনছি কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ গুচ্ছের টাকা ব্যায় করেও তাঁর স্ত্রীকে

বাঁচাতে পারেননি।পন্ডিত জওহরলাল  নেহেরু তাঁর স্ত্রীকে সুইজারল্যান্ডে রেখে এসেছিলেন।

তাতেও কোন উপকার হয়নি্।টিবির অব্যর্থ ওষুধ স্ট্রেপটোমাইসিন আবিষ্কার হয়েছিল আরও

অনেক পরে।পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাও প্রাণ হারিয়েছিলেন একই অসুখে।

আম্মার মৃত্যুতে আমাদের গোটা সংসারের উপর আকাশ ভেঙে পড়লো।চাচাজি শেষ পরীক্ষায়

এ্যানাটমিতে ফেল করলেন। বন্ধুরা সবাই তাঁর সহায় হলেন।রেফার্ড পরীক্ষায় পাশ না করলে

পুরো একটা বছর নষ্ট হবে।এগিয়ে এলেন তাঁর একজন প্রফেসর।তিনি শর্ত রাখলেন বিয়ের।

মুর্শিদৃবাদ নিবাসী তাঁর এক অবাঙালি আত্মীয়ার সঙ্গে বিয়ের ঘটকালি করলেন।তাঁর বাড়িতেই

আমার ফুফুআম্মা ও আমি  পাত্রী দেখতে গেলাম।“কালো, তা সে যত কলোই হোক, আমি

দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ”।বাড়ি ফিরে ফুফুআম্মা কোন কথাই বললেন না।আমাকে

সবাই জিজ্ঞেস করলো, আরে ‘ফজল’ চাচি কেমন দেখলি। আমি বললাম,দেখতে খুব সুন্দর!

তবে সাতটা লাক্স সাবান দিয়ে গোসল করাতে হবে! সবাই আমার বুদ্ধির তারিফ করলো।

আমার মায়ের অভাব ঘুচলো।সে বছর আবার আমাদের বাড়িতে ঈদের তোড়জোড় শুরু

হ’ল।তখনও ২য় মহাযুদ্ধের রেশ চলছে। পারমানবিক বোমার  আগুনে  ‍পুড়েছিল সে

বছর হিরোশিমা নাগাসাকি।দেড়কোটি মানুষ মরেছিল যুদ্ধের আগুনে পুড়ে।৬৫

লাখ হিটলারের গ্যাস চেম্বারে।ছারখার হয়েছিল বার্লিন মিউনিখ শুধু না পুরো জার্মানি।

হিটলার  কী আত্মহত্যা করেছিল ? নাকি ছদ্মবেশে পালিয়েছিল আর্জেনটিনায়?

সে ব্যাপারে ইতিহাস অজও চূড়ান্ত রায় দেয়নি।নেতাজী সুভাষ বসুর

অন্তর্ধান না তিরোধান ঘটেছিল তাও  রয়েছে রহস্যাবৃত।১৯৪৫ সালের কথা।এর মধ্যে

৪৩-৪৪ এর  ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের তান্ডবে কেবল সুবে বাংলাতেই ৫০ লক্ষ আদম সন্তান চরম

খাদ্যাভাবে অনাহারে প্রাণ হারিয়েছিল।  ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশে ভারতের  সব

ধানের গোলা থেকে ধান, চালের আড়ত থেকে সমস্ত চাল হরণ করে সরকারি গুদামে তোলা

হয়েছিল।গম যব কিছুই বাদ পড়েনি। জার্মানিতে হিটলারের গণহত্যা নিয়ে কত কথা আছে।

কিন্তু বাংলায় চার্চিলের  গণহত্যার ব্যাপারে পন্ডিতরা মৌন কেন  তা বোধগম্য

নয় ।অবশ্য এখন যা বললাম তা আমার শৈশবের পটভূমি ও প্রেক্ষিত হলেও

সে সব কথা শুনেছি অনেক বড়বেলায়। জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের পরে।আমার জাগ্রত

স্মৃতিপটে মা হারানোটাই সবচেয়ে বড় ইতিহাস।অন্ততঃ  আমার কাছে।

মা হারাবার পরের বছর ঈদ এসেছিল নতুন সাজে।বাড়ির নতুন বৌএর মত।আমার

মায়ের  ফেলে যাওয়া সাজানো সংসার আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছিল।

কিন্তু বাজারে তখন আগুন ।যুদ্ধের গোনে কিছু লোক  রাতারাতি আঙুল ফুলে কলা

গাছ হয়েছে শুনে  আমি তো হেসেই বাঁচি না।  মানুষ কী কখনও কলা গাছ হতে পারে!

মধ্যবিত্ত ও  অল্প আয়ের  মানুষ পড়েছিল  মহা ফাঁপরে।কাপড় মহার্ঘ্। তবে রেশনে

খাদ্যদ্রব্যের সাথে ঈদের কাপড়ও পাওয়া গেলো! তাই রক্ষে।দুজন মুটে মাথায় করে

দু গাট্টি কাপড় নিয়ে এলো আমাদের পাঁচ তালায়।বিভিন্ন রঙের থান ও ছিট কাপড়।

চাচি আম্মা আমার বোনদের নিয়ে বসে গেলেন ঈদের কাপড় বানাতে। হাতে চালানো

সিঙ্গার মেশিন এসেছিল তাঁর বাপের বাড়ি থেকে। আমার সবার বড় বোন ও তার

সমবয়সী চাচতো ফুপাতো আরও ২ বোন সেলাই ফোঁড় শিখে নিলো।গ্রামের বাড়ি

পর্যন্ত সব স্বজনের জন্য  ঈদের কাপড় তৈরি হ’ল। বাড়ির নতুন বৌ এর

অভিষেক হ’ল।মেয়ে কালো না সাদা, সেটা সবাই ভুলে গেলো।মনটা বড়।

গরীবের সংসারে সেটাই অনেক বড় পাওয়া।সবাই তাকে ভালো বাসতে লাগলো।

আমার চাচি আম্মা আমাকে কোলে নিয়ে গিয়েছিলেন  বাপের বাড়ি মুর্শিদাবাদে।

পাড়া পড়শিরা সবাই কানাঘুষা করতে লাগলো, দেখো কান্ড! জামাই ডাক্তার

হলে কী হবে? দোজবেরে! তায় আবার একটা ধেড়ে ছেলেও আছে।চাচি আম্মা

বললেন, আরে ওতো আমার নিজের ছেলে! দেখছো না আমারই মত গায়ের রঙ!

মেয়েদের সেলোয়ার কামিজ ওড়না  সব বাড়িতেই তৈরী হ’ল সাড়ি লুঙ্গি কেনা

হ’ল।ছেলেদের গায়ের জামাটা গেলো দর্জী বাড়ি। সে ঈদে আমি  নতুন পাজামা

পাঞ্জাবি জুতা টুপি সবই পেলাম। আমি তখন পাঁচ বছর পেরিয়ে একটু বড় হয়েছি।

ঈদের জামাকাপড় পরতেই আম্মার শেষ বিদায়ের দৃশ্যটা চোখের উপর জল জল করে

উঠলো। আমার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসলো।বুকের ঢিপ ঢিপ বেড়ে গেলো।

বাড়ির পুরুষরা সবাই নামাজে গেলো। মেয়েরা সিমাই পায়েশ নিয়ে ব্যাস্ত। আমি

সবার অলক্ষে আম্মার  শূন্য ঘরের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। মেজো বোন

আমার আগেই এসেছে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে।মাটিতে বসে মাথাটা গুঁজে রেখেছে

আম্মার শূন্য খাটের কোনায় ।আমিও একইভাবে  কান্না চেপে খাটের অন্য এক

দিকে বসে মুখ গুঁজলাম।আব্বা, চাচা, বড়ভাই, বড়বোন সবাই একে একে এসে ঢুকলেন।

সবার চোখই পানিতে টল টল করছে আষাঢ়ের মেঘের মত।সেই দিন থেকে ঈদ

আমার মনে কখনও কোন আনন্দের  আবেগ স্মৃষ্টি করতে পারেনি।পরের বছর

ভোট হ’ল। শুনলাম মানুষ কলা গাছে ভোট দিয়েছে। আবার সেই বিস্ময় !কলা

গাছে ভোট দেয় কেমন করে ? অনেক কষ্টে বুঝলাম, মানুষটা ভালো না মন্দ তা

না দেখে হিন্দুরা কংগ্রেসকে আর মুসলমানরা মুসলিম লীগের মার্কায় চোখ বুজে

ভোট দিয়েছে।সেটাই কলা গাছে ভোট দেয়া। একদিকে “জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম”,

অন্যদিকে “লড়কে লেংগে পাকিস্তান” স্লোগান।মাঝখানটায় লাল ঝান্ডার মাতামাতি

“ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়”।সেই সব ধুম ধাড়াক্কা  আর

চেঁচামেচিতে কান ফেটে যাওয়ার জোগাড়।সেই হই হুল্লোড়ে সেবার ঈদটা যেন ভেসেই

গেলো।পরের বছর চন্দ্রমাসের পঞ্জিকা ধরে রোজার মাস আসলো গতানুগতিক নিয়মে।

ঈদ এলো রক্তমাখা  দাঙ্গার বিভীষিকা নিয়ে।সারাটা রোজা কাটলো সন্ধ্যা- সকাল

কারফ্যুতে। আব্বার সরকারি চাকুরির আয়ে এত বড়  একটা সংসার চলতো না।সকালে

বিকালে আরও দুটো পার্টটাইম করতেন। খুব সকালে যেতেন বাড়ির কাছে

বড় ব্যবসা কেন্দ্র কলুটোলায়। মুসলিম এলাকা।সেখানে এক মুসলমান  সওদাগরের

তেজারতি অফিসে ইংরেজি  চিঠিপত্র লেখার খন্ডকালীন  কাজ সেরে রোজকার

বাজার  সওদা নিয়ে বাসায় ফিরতেন।পাঁচ তালায় পানি উঠতো না। ভিস্তি  

আনতো পানি উটের চামড়ার তৈরী বড় ব্যাগে করে।তাই দিয়ে কোন রকম গোসল

সেরে নিতেন।তারপর নাকেমুখে দুটো খাওয়ার গুঁজে ঘড়ির কাটার সাথে পাল্লা

দিযে ছুটতেন রাইটার্স বিল্ডিং।দশটা পাঁচটা চাকুরি সেথানে।সন্ধ্যায় যেতেন বৌ

বাজারে।সেখানে এক মহাজনী অফিসে ইনকাম  ট্যাক্সের জন্যে পাকা খাতা তৈরীর

কাজ।৪৭ এর রোজায় কারফ্যুর জন্যে সে কাজটা কামাই গেলো। ভাগ্যিস, চাচাজী

ডাক্তারিটা পাশ করে ফেলেছিলেন।আব্বা প্রভিডেন্ড ফান্ড খালি করে কলাবাগানে

একটা চেম্বার করে দিলেন। কিছু টাকা বেচেছিল, তার সাথে মহাজনী অফিস

থেকে ঋণ নিয়ে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড মরিস গাড়ি কেনা হয়েছিল অল্প টাকায়।

কিন্তু দাঙ্গার সময় ডাক্তারি ব্যবসা মাথায় উঠলো।খুনোখুনির রুগীদের কাছে

পয়সা পাওয়া দূরে থাক, তাদের জন্য রেডক্রসের সহায়তায় বিনা পয়সায় ওষুধ

পথ্যের যোগান দিতেই হিমশিম খেলেন আমাদের নতুন ডাক্তার সাহেব। চাচি

আম্মার কোল আলো করে ইতোমধ্যে এসে পড়েছে দুই নতুন অতিথি। ছোট

দুই বোন পেয়ে আমিতো মহা খুশি।৪৭ এর ঈদ কাটলো চিন্তাভাবনা উদ্বেগ

উৎকন্ঠায়। রক্তের বন্যায় ভেসে গেলো সারা ভারত।দিখন্ডিত ভারতে জন্ম

নিলো  ভিন্ন দুটো দেশ । আমার মা ঘুমিয়ে রইলেন  গোবরায়।কিছুই

জানলেন না।শেষবারের মত আমরা দুভাই আব্বার সাথে য়েয়ে মার কবর

জিয়ারত করে চোখের জলে ভেজা ভালোবাসা রেখে এলাম।আমার দাদাজীর

ওহাবী ধর্ম মতে কবর পাকা করা বা কোনভাবে চিহ্নিত করা চলে না্।জীর্ণ

পড়ে রইলো।জীবনে কখনও আর সেখানে যাওয়া হয়নি।এমন কি একাত্তরেও না।

বছর শেষ না হতেই আমরা  কলকাতা ছাড়লাম। আব্বা ছুটলেন ঢাকায়।

আমরা উদ্বাস্তু হয়ে গেলাম যশোরে।বড়ভাই পড়তেন হেয়ার স্কুলে।বড় বোন

দুটো সাখাওয়াত মেমোরিয়ালে। তাদের লেখাপড়া চুলোয় গেলো।আমার আম্মার

সাধের সংসারটাও চুরমার হয়ে গেলো।এরপর জীবনে কত ঈদ এলো গেলো।

আমার মনে কোন প্রভাব ফেললো না।অবচেতন মনের সুপ্তি থেকে বিষণ্নতা এসে

আমার  অজান্তে জাগ্রত মনের ওপর মাকড়সার জাল বুনে দিয়ে গেছে জীবন

ভোর।তা নিয়ে আমার সংসারে অনেক অশান্তি হয়েছে! কেউ জানলো না হরিষে বিষাদ কেন?

মা ছেলের সম্পর্কে অনেক অশ্রুর পুঞ্জিভবন রয়েছে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই। ফরাসী

লেখক মোঁপাশা এঁকেছেন তারই এক করুণ চিত্র তাঁরই রচিত “মা” নামে বিশ্ব

সাহিত্যের ক্ষুদ্রতম “ছোট গল্পটিতে”।মায়াবিনীর প্রেমের শর্ত পূরণ করে মায়ের

কলিজা নিয়ে নরাধম পুত্র ছুটছে অন্ধকার দুর্গম পাহাড়ি পথের চড়াই উৎরাই

ধরে।অন্ধকারে হোঁচট খাওয়ায় থালা থেকে ছিটকে পড়লো মায়ের রক্তমাখা

হৃদপিন্ডটা।সেটা কুড়িয়ে থালায় তোলার সময় প্রেমোন্মাদ যুবক শুনতে পেলো

মায়ের কন্ঠস্বর,“বাবা, তোর কী খুব লাগলো”?

আমি ৫৬ সালে ঢাকা কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ি। বাংলা ক্লাসে অধ্যাপক আশরাফ

সিদ্দীকী ছোট গল্প মানে কী তাই ব্যাখ্যা করছিলেন।তাঁর মুখেই ‘মা’ গল্পটা প্রথম

শুনলাম।তখন থেকেই আমি সবাইকে বলতাম, আমার মা পৃথিবীর সবচাইতে

ভাগ্যবান নারীদের একজন। কোন ছেলের কাছ থেকে যন্ত্রণার ছ্যাকা না

খেয়েই তিনি ইহধাম ছাড়তে পেরেছেন।মায়ের জন্য সেটা পরম সৌভাগ্য।

ছেলের হাতে অভাগী মায়ের লাঞ্ছনার  বহু কথা শুনেছি, অনেক ঘটনা দেখেছি,

অনেক গল্প পড়েছি।কিন্তু এবার পশ্চিম বঙ্গের বশিরহাটে বিত্তবান বাপের

বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকারী সাত সন্তানের মাকে ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে অচেনা

রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা আর বাংলাদেশে সচ্ছল তিন ছেলের মার  গোয়াল ঘরে

মশারি ঢাকা গরুর পাশে মশারির বাইরে শোয়া ও  তাঁকে মৃত ভেবে শিয়ালে

খাওয়ার ঘটনা সব গল্পকে ছাড়িয়ে বিষাদসিন্ধু রচনা করেছে।হায়রে গর্ভধারিনী

মা!

জীবনের ৭৭ বছরে এসে খোঁজ পেয়েছি আরও ক’জন দুঃখিনী মায়ের। তাঁরা

থাকেন রাজধানী ঢাকার অদূরে উত্তরখানে বৈকাল স্কুল সংলগ্ন বৃদ্ধাশ্রমে।ছেলে

থাকতেও  তাদের ছেলে নেই।তত্ত্বতালাশ তো দূরের কথা, “কেমন আছ মা”?

এই ছোট্ট একটা কথা শুধাতেও কেউ আসে না।কারও একমাত্র ছেলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে

চিরকালের মত দেশ ছেড়ে বিদেশে সুখের সংসার পেতেছে।মায়ের খোঁজ নেয়ার

সময় কই তার? ঈদ আসতেই বৃদ্ধাশ্রমের সব অনাথিনীর চোখে অশ্রুর বন্যা

নেমেছে।সবাই একবার নয়নভরে  দেখতে চান নিজের নাড়ি ছেঁড়া ধন, প্রাণের

নিধি আদরের ছেলেকে। মেয়েদের ঘিরে  তাদের আশা প্রত্যাশা ও আবেগ

অনুভূতি একটু অন্যরকম।সে আর এক নির্মম বাস্তবতা।

শামসুল আরেফিন খান
শামসুল আরেফিন খান

 

 

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts