হয়নি তারে বলা

আমার খুব ইচ্ছা করে হাতে একগাছা কাঁচের চুড়ি পরে, খোঁপায় বেলি কিংবা গাঁদা ফুলের মালা জড়িয়ে প্রিয় মানুষটার হাত ধরে হাটতে। তার হাতে হাত রেখে দিগন্তে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। বসন্তবরণ কিংবা পহেলা বৈশাখে অন্যমেয়েরা শাড়ি, চুড়ি ম্যাচিং করে পরে যখন তাদের প্রিয় মানুষটির হাত ধরে হেঁটে যায় তখন আমারও খুব ইচ্ছা জাগে আমার প্রিয় মানুষটাকে সাথে নিয়ে এভাবে চলতে। আমি খুব করে চাই ফোনের ওপাশের মানুষটা আমার জন্য উদ্বিগ্ন থাক। আমার মনের ইচ্ছাগুলো, ভালোলাগাগুলো, খারাপ লাগাগুলো কারো কাছে শেয়ার করি। কিন্তু আমার ইচ্ছাগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায় । তাকে আর বলা হয় না, আমি তাকে বলতে পারি না। কিভাবে পারব? সে কাছে এলেই যে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। মনের মাঝে যেন সুনামি বয়ে যায়। আর মুখের মধ্যে কে যেন সুপার গ্লু লাগিয়ে দেয়। সে আমার একবছরের সিনিয়র। আমাদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে সে আর তার দুই বন্ধু উপস্থাপনা করেছিলেন। এটাকে ক্রাশ খাওয়া বলে কিনা জানি না। তবে তাকে দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। ব্যস্ সেই থেকে শুরু। তাকে যখনই দেখতাম বুকের ভেতর কেমন যেন করত। দুঃখ দুঃখ সুখ ভাব চলে আসত। এটা ভালোবাসা কিনা তা বুঝতে একবছর কেটে গেল। কিন্তু তাকে বলব কি করে? আমি তো মেয়েমানুষ। মেয়েরা কি আগে প্রোপোজ করে নাকি? মুখ ফুটে তাকে বলতে না পারলেও তার খোঁজ-খবর নিতাম। ক্যাম্পাসে যতক্ষণ থাকতাম তার আশেপাশেই ঘুরঘুর করতাম। একদিন আমাকে ডেকেছিল। আমার তো খুশিতে হার্টএ্যাটাক হওয়ার মতো অবস্থা। কিন্তু সে তেমন কিছুই বলেনি। তার একটা বই প্রয়োজন ছিল। আর বলেছিল, “আমি এত চুপচাপ থাকি কেন?” আমি মনে মনে বলেছিলাম- “হে মোর প্রিয়তম, আমি মুখে বলতে পারি না বলে কি আমার চোখের ভাষা পড়তে তোমার মানা?” “ভাইয়া কেমন আছেন” এই কথাটাও একদিনের জন্য আমার মুখ থেকে বের হয়নি। আরেকদিন আমি মাঠে একা বসে ছিলাম। কোথা থেকে এসে সে আমায় বলে বসল- “তোমার খুব মুড তাই না। কারো সাথে কথা বল না কেন? বড় ভাইয়া-আপুদের সাথে দেখা হলে ভদ্রতা দেখিয়ে কথা বলতে হয় তুমি জানো না?” আমি সেদিনও নিশ্চুপ ছিলাম। কি বলতাম তাকে যে, আপনাকে দেখলে আমার দম বন্ধ হয়ে যায়, আপনার সামনে আসলে আমার বুকটা দুরুদুরু কাঁপতে থাকে, আপনাকে আমি ভালোবাসি তাই আপনাকে ভাইয়া ডাকতে আমার যথেষ্ট আপত্তি আছে?
তাকে নিয়ে আঁকা স্বপ্নগুলো মনের মাঝেই শুধু তোলপাড় করত। আমার দিন কাটত না, রাতও ফুরাতো না। কেবল তার কথাই সবসময় মনে পড়ত, তাকে দেখতে ইচ্ছা করত। সেকি যে জ্বালা! যে জ্বলেছে সেই জানে। একদিন তার এ্যাকসিডেন্ট হল। আমি তাকে ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। আমার চোখের পানি যেন বাধ মানছে না। কিন্তু সেদিন আর একটা কারণে খুব কেঁদেছিলাম। আমি এতো কষ্ট করে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে এলাম আর ওনার ক্লাসমেট রুবি আপু এসে বলে- “বাবু তুমি ঠিক আছো তো?” উনি মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলেছিলেন- “না কিছু হয় নি।” আমার মনের মাঝে তখন টর্নেডো বয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল মরে যেতে পারলেই বুঝি বেঁচে যাব। কিভাবে যে সহ্য করেছিলাম উপরওয়ালাই জানে। আমি মাঝে মাঝেই নিজের অজান্তে কামনা করতাম, যেন রুবি আপুর অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায়। আর অপেক্ষা করতাম তার জন্য।
আসছে শুক্রবার তার আর রুবি আপুর বিয়ে। আমাকে দুজনেই দাওয়াত করেছে। কার দাওয়াত রক্ষা করব তাই ভাবছি। এই জীবনে আমার মনের কথা তাকে আর বলা হল না। পরজনমে বলতে পারব কিনা তাও জানি না। আমার মনের অব্যক্ত কথাগুলো মনের ঘরেই বন্ধ করে রাখলাম আজীবনের তরে।

Author: অঙ্কনা জাহান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment