শেখ​ মণির অস্ত্র আহরণ ও  মুক্তিযুদ্ধের হাতেখড়ি

শেখ ফজলুল হক মণি প্রশস্ত একটা ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন।স্থান, সাপ্তাহিক জনতা কার্যালয়, পুরাণ পল্টন, ঢাকা।উপর তালায় আওয়ামি লীগ অফিস।তারিখ, ১ মার্চ,১৯৭১। সময়, বেলা দুই ঘটিকা।সেই দৃশ্যপটে আবির্ভুত হলেন সিরাজুল আলম খান।তার সাথে লেখক।আমাদের দেখে মণি বললেন, ‘সিরাজ ভাই গাড়ি পেয়েছেন?’ সিরাজ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমাকে দেখিয়ে বললো, ‘শুধু গাড়িই না সেই সাথে একজন দক্ষ ড্রাইভারও পেয়েছি।’মনি আমাকে স্বাগত: জানিয়ে সৌহার্দ্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন।‘ভাই, কেমন আছেন।‘ প্রিয় সম্ভাষণে আমি আপ্লুত হলাম।যুবনেতা শেখ মনির সাথে আমার মিথষ্ক্রিয়ার বিস্তার তেমন প্রশস্ত নয়। ছাত্র রাজনীতির একটা ঝাপসা অতীত এবং সময়ের পেশাজীবী সংবাদকর্মী হিসাবে সবাই যেভাবে চেনে তিনিও আমাকে সেভাবেই বা তা’র চেয়ে একটু বেশিই চেনেন।ইতোমধ্যে গাড়ি থেকে নেমে এসেছেন ছাত্রলীগনেতা আব্দুর রাজ্জাক, রাকসু ভিপি মাজহারুল হক বাকী এবং ইঞ্জিনিয়ার কমল সিদ্দিকী।এদের মধ্যে কমল ও রাজ্জাক আমার ঢাকা কলেজের সহপাঠী।বাকীর সঙ্গে হালকা পাতলা পরিচয়।আমরা একসাথে হয়েছি ঘটনাচক্রে। প্রেসক্লাবের প্রবেশ পথে কিছুটা নাটকীয়ভাবেই আমরা একত্রিত হয়েছি। গন্তব্য এবং লক্ষ্য অস্পষ্ট রেখেই আমি ওদের রাইড দিয়েছি।

বেলা ১২টায় পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের বেতার ঘোষণার পর খবরের সন্ধানে ছুটে গিয়েছিলাম পূর্বাণী হোটেলে। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পার্লামেন্টারী পার্টির মিটিং করছিলেন।বাইরে লোকে লোকারণ্য।ভিতরেও মানুষ গিজগিজ করছে।দেশী বিদেশী সাংবাদিক, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন এবং পার্টি কর্মী বিপুল সংখ্যায় ভিড় জমিয়েছে।তিল ধারণের জায়গা নেই।নিরাপত্তা রক্ষীরা নিরূপায়।গেটের বাইরেও মানুষের জোয়ার।শাপলা চত্বর থেকে বায়তুল মোকাররম-মতিঝিল দিলকুশা জনতার পদভারে প্রকম্পিত।স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল এক জনসমুদ্র।আওয়ামি লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক তড়িঘড়ি শেষ করে বঙ্গবন্ধু বাইরে এসে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়ালেন।বললেন, ‘একটা সংখ্যালঘু দলের আব্দার ও জেদের ফলে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিসমাপ্তি হতে চলেছে।অনির্দিষ্ট কালের জন্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে।’ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অীধবেশন স্থগিত করেছেন শুনেই মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে।কয়েক হাজার মানুষ ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা দেখছিল।তারা হুটহাট বেরিয়ে এসে তুলকালাম ঘটিয়েছে।স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয থেকে শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে এসেছে।অফিস আদালত ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে সাধারণ মানুষ পথে নেমে এসেছে।হরতাল শুরু হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ভাবেই।চারিদিকে খন্ড খন্ড মিছিল।দাবানলের মত বিক্ষোভের আগুন দেশের প্রত্যন্তে ছড়িয়ে পড়ছে।বহু জায়গায় সেনাবাহিনীর সাথে মোকাবেলা হয়েছে।লন্ডনের ‘দি অবজার্ভার পত্রিকার ঢাকাস্থ সংবাদদাতার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘১ মার্চ প্রাণ আহুতির সংখ্যা দুই হাজার।’সেনা কর্তৃপক্ষের স্বীকারোক্তিতেই রয়েছে ১৭২ প্রাণহানির কথা।

ভিড় ঠেলে প্রেসক্লাব পৌঁছাতেই একঘন্টা পেরিয়ে গেলো।ক্লাবের প্রবেশ পথেই চার পাঁচজনের এক জটলার মুখে থমকে গেলাম।এগিয়ে এলেন প্রিয়বন্ধু ‘সখীর মা’।কলেজ নাটকের নারী চরিত্রের অভিনেতা।১৯৫৬ সালে ঢাকা কলেজের বার্ষিক নাটকে শাড়ি পরে পরচুলা লাগিয়ে সেই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বন্ধুবর সিরাজুল আলম খান।বন্ধু মহলে সেই খ্যাতিটা রয়ে গেছে। সেই নাটকের প্রযোজক ছিলেন পরম সুহৃদ মহীউদ্দীন খান আলমগীর।সিরাজের অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় আমরা কলেজ জীবনেই পেয়েছি।বিশ্ববিদ্যালয়ে তা’র হাতে জীয়নকাঠির পরশ পেয়ে ছাত্রলীগের পুনরুজ্জীবন ঘটেছিল বলা যায়্ ।মনি-রাজ্জাক-তোফায়েল –রব-শাজাহান সিরাজ-ইনু তা’র গুণমুগ্ধ সাথী।ভক্ত শিষ্যও অনেকেই।সিরাজ এগিয়ে এসে বললো, ‘দোস্ত, তোর জন্যেই অপেক্ষা করছি।’ওর মতলব বুঝতে কষ্ট হলো না।বললাম, ‘হেঁয়ালি রেখে বল কোখায় যেতে হবে।’ গাড়ির দরজা খুলে রাজ্জাক বাকী ও কমলকে পিছনের সিটে দিয়ে সিরাজ আমার ড্রাইভিং সিটের পাশে বসলো।পায়ে চটি, গায়ে পায়জামা পাঞ্জাবির ওপর ধূসর রঙের খদ্দরের মুজিব কোট চাপানো।বাম পকেট থেকে ‘বক মার্কা’ সিগারেটের প্যাকেট বার করে একটু থমকে বললো, ‘আরে এটা নয়, তোর তো আবার বু্র্জোয়া ব্রান্ড চাই।’ ডান পকেট থেকে ‘থ্রি-ক্যাসেলস’ বার করলো।‘আগে বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া, তা’রপর অন্যকাজ।’আমি একটা সিগারেট তুলে নিলাম। লাইটার ধরলো সিরাজ।এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে বললাম, ‘ভড়ং ছাড়।কোথায় যেতে হবে তাই বল্।’–‘পুরাণো পল্টন।’ মিছিলে মিছিলে তখন তোপখানা রোড সরগরম।‘সংবাদপত্র’লেখা গাড়ি বলেই রক্ষা! পেট্রল পাম্পের গলি দিয়ে এগিয়ে আওয়ামি লীগ অফিসের সামনে থামলাম।

দুটো বড় কামরা নিয়ে সাপ্তাহিক জনতার অপিস।শেখ মনি আমাদের নিয়ে পাশের ঘরে ঢুকলেন।এক গাদা পুরাণো কাগজের স্তুপ সরিয়ে বের করলেন সাদা কাপড়ে মোড়া একটা তিন চার ফুট লম্বা বান্ডিল।ভারি বেশ । ধাতব বস্তুই হবে।এটা নিয়ে কেউ কোন প্রশ্ন করলেন না।ভিতরে কী আছে তা পরিষ্কার জানা হলো না।অন্যেরা জানেন বলেই মনে হলো।বাইরে এসে ভোক্সওয়াগন গাড়ির সামনের বনেট তুলে দিলাম। কনসাইনমেন্ট লোড হতেই সারথীর নির্দেশ মতই পঙ্খীরাজ ছুটলো।পথে তখন উদ্বিগ্ন ক্ষুব্ধ মানুষের ভিড় আরও বেড়েছে।আমার মনে তখন এ্যাডভেঞ্চারের শিহরণ। কী আছে বান্ডিলে? প্রশ্নটা বার বার মনের ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে।অস্ত্র তো বটেই! কিন্তু কী ধরণের? বন্দুক, রাইফেল,নাকি তা’র চেয়েও ভারি কিছু! কেউই কোন কথা বলছে না। সিরাজ একটার পর একটা সিগারেট ধ্বংস করে চলেছে। ঘোরা পথে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছালাম।সেখানে তুমুল উত্তেজনা।ছোট ছোট জটলা।স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল গোটা এলাকা।ইকবাল হলের পিছনের দিকে ক্যাফেটারিয়া ঘেঁষে যে লন্ড্রিটা ছিল তা’র সামনে যেয়ে আমাদের যাত্রা বিরতি ঘটলো।অপেক্ষমান ছিলেন দীর্ঘদেহী ছাত্র নেতা মার্শাল খসরু।চোখে মুখে সাহস আর বলবীর্যের দীপ্তি।আমি তাকে আগেও দেখেছি।কলাভবন চত্বরে আকাশে পিস্তলের গুলি ছুঁড়ে ছাত্র সভায় জঙ্গী নিনাদে সোচ্চার হ’ত।খসরু-মন্টু-সেলিম তখনকার খুব পরিচিত তিনটি নাম্।মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে ঘটেছিল তাদের সাহসী উপস্থিতি। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘ওরা এগারোজন’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করে খসরু খ্যাতিমান হয়েছিলেন।

সিরাজের ইশারায় খসরু গাড়ির কাছে এগিয়ে এলেন।বান্ডিলটা বলিষ্ঠ হাতে তুলে নিলেন গাড়ি থেকে।আমরা তখন সবাই বেশ রোমাঞ্চিত।খসরু মার্শাল কায়দায় মোড়ক উন্মোচন করতেই সাতটা চকচকে নল দৃশ্যমান হলো।খসরু জিজ্ঞেস করলেন, ‘দাদা এগুলো কোথাকার মাল? ‘সিরাজ বললো, ‘বায়তুল মোকাররম অস্ত্র ভান্ডার সাফাই করে আমাদের কয়েকজন সাহসী কর্মী এগুলো পৌঁছে দিয়েছে পার্টি অফিসে।’ খসরু সামরিক কায়দায় সালাম ঠুকে বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য অস্ত্রের প্রথম চালান গ্রহণ করলেন আনুষ্ঠানিকভাবেই।বললেন, ‘নাই মামার চেযে কানা মামাই ভালো।’  রাইফেল অবশ্যই,  তবে টু-টু বোর। সহজ বাংলায় পাখি শিকার করার বন্দুক!

সিরাজ এতে দমবার পাত্র ছিল না। ‘ আর কিছু না হোক ট্রেনিং তো চলবে! তারপর বাংলা হবে ভিয়েৎনাম।আমরা শত্রুর অস্ত্র কেড়ে নেবো্ ।সেই অস্ত্র দিয়েই যুদ্ধ করবো।এটা দিয়েই কাজ শুরু হোক। প্রশিক্ষণ আরম্ভ কর।আমরা প্রস্তুত হই আগে । তারপর দেখা যাবে।’ সাবধান এখনও নেতার অনুমোদন পাইনি।নেতা জানলেন না । কিন্তু শত্রুর অজানা রইলো না কিছুই।

আগের দিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকালে তেজগাঁও সংসদ ভবন চত্বরে বঙ্গবন্ধু ও নবনির্বাচিত বাঙালি সাংসদদের সম্মানে ঢাকা চেম্বারের দেয়া সম্বর্ধনার জবাবে বঙ্গবন্ধু এমনি একটা অনাকাঙিক্ষত পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।চেম্বার সভাপতি মতিউর রহমান যে স্বাগতঃ বক্তব্য পাঠ করেছিলেন সেটা রচনার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।‘বাঙলার আকাশে আজ দূর্যোাগের ঘনঘটা।সামনে ভয়ানক অমানিশা।কান্ডারি তুমি শক্ত হাতে ধর হাল।ঝঞ্ঝা উত্তাল সাগরে তুমি তোল পাল।তরী কর পার তোমার মঞ্জিল মকসদে।সাত কোটি বাঙালি আছে তোমার সাথে।রাত যত ঘন কালো হবে সকাল ততোই শুভ্র হবে!’ বঙ্গবন্ধু এ মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করেননি।

সেদিন (১ মার্চ) বিকেলে ঢাকা চেম্বারে যেতেই সভাপতি মতিভাই বললেন আমাদের বিশ্লেষণ সঠিক হয়েছে।সেখানে উপস্থিত ছিলেন উত্তরাঞ্চলের সাংসদরা প্রায় সবাই।সভাপতির বক্তৃতার খসড়া ইতেপূর্বে যথন আমি পড়ে শুনিয়েছিলাম তথন হারাগাছের সাংসদ আব্দুল অওয়ালসহ আরও কয়েকজন দ্বিমত পোষণ করেছিলেন।তারাও আজ অভিনন্দন জানালেন।চারিদিকে তখন ব্যাপক গুঞ্জন।একই অস্ফুট আওয়াজ।স্বাধীনতা! স্বাধীনতা! তা’র চেয়ে কম কিছু না।নাথিং শর্ট অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স।বাঙালি এবার শুধু শুধু মার খাবে না।লড়াই লড়াই লড়াই চাই – লড়াই করে জিততে চাই।চেম্বার নেতারা অস্থিরভাবে জানতে চাইলেন, আজকেই কী ঘোষণা আসবে, নাকি দেরি হবে! আর কত রক্ত ঝরবে বলুনতো!

কিন্তু না, ১ মার্চ উষ্কানিমূলক হত্যাযঞ্জ সত্ত্বেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধৈর্যেের চরম পারাকাষ্ঠা দেখালেন।স্বাধীনতা ঘোষণা না করে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন।দেশবাসীকে পুরোপুরি প্রস্তুত না করে হঠকারিতার পথে পা বাড়াবার বিরূপ পরিণতি সম্পর্কেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন।ধৈর্য্ ধারণ করলেন ২৫ মার্চ পর্য ন্ত।

২৫ মার্চ ৭১, মধ্যযামিনী অতিক্রান্ত হতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধখ্যাত এম-২৫ মার্কিন ট্যাঙ্ক সজ্জিত পাক বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর তাদের সশস্ত্র প্রতিরোধের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার আগেই হায়েনার মত ঝাপিয়ে পড়লো।৩০ মার্চ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ লিখলোঃ‘‘CAUGHT COMPLETELY BY SURPRISE,SOME 200 STUDENTS WERE KILLED IN IQBAL HALL,HEAD-QUARTERS OF THE MILITANTLY ANTI –GOVERNMENT STUDENTS UNION, AS SHELLS SLAMMED INTO THE BUILDING AND THEIR ROOMS WERE SPRAYED WITH MACHINE GUN FIRE.”কামানের গোলা আর মেশিনগানের গোলাবৃষ্টিতে বিধ্বস্ত হলো সরকার বিরোধী জঙ্গী ছাত্রদের প্রধান ঘাঁটি ইকবাল হল।দুইশত ছাত্র সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো।পত্রিকাটি আরও লিখলোঃ দুদিন পরেও পোড়া অনেকগুলো লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল ঘরের ভিতরে ও বাইরের আঙ্গিনায়। আরও কতকগুলো মৃতদেহ ভাসছিল নিকটবর্তী জলাশয়ে।চিত্রকলার একজন ছাত্র ইজেলের পাশেই হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে ছিল মৃত অবস্থায়। সাতজন শিক্ষক নিজেদের বাসায় নিহত হন।আউট হাউজে আশ্রয় নেয়া ১২ জনের একটি পরিবারকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment