বিপ্লবী মনোরমা বসু মাসীমা/ আফরোজা পারভীন
বিপ্লবী মনোরমা বসু মাসীমা
মনোরমা বসু (১৮৯৭-১৯৮৬) একজন বিপ্লবী। স্বাধীনতা সংগ্রামী। যে বিপ্লবীরা জীবন দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনেছিল তাদের একজন মনোরমা বসু। তিনি ভারত ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবনবাজি রেখে লড়েছেন।
পূর্ব নাম ছিল মনোরমা রায়। মনোরমা রায়ের জন্ম ১৮৯৭ সালের ১৮ নভেম্বর, বরিশাল জেলার বানারীপাড়া থানার নরোত্তমপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে। বাবা নীলকন্ঠ রায় ও মা প্রমদাসুন্দরী রায়। মনোরমা বাবা-মা’র পঞ্চম সন্তান। তাঁর পারিবারিক পরিবেশ ছিল অনুকূল। এই পরিবেশ মনোরমা বসুকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। তাই, মাত্র এগারো বছর বয়সে ক্ষুদিরাম বসুর আত্মত্যাগে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। দেশপ্রেম, সমাজসেবা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণে দলমত-নির্বিশেষে সকলের কাছে কমরেড মনোরমা বসু, ‘মাসিমা’ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন সাম্যবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত। যে- কোনো অন্যায়-অত্যাচার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক ও সমাজসেবক। স্বদেশী আন্দোলন ও সাম্যবাদী আন্দোলনের লড়াকু নেতা ছিলেন মনোরমা বসু মাসিমা। নারীমুক্তির আন্দোলনকে তাঁর শ্রম-মেধা-প্রজ্ঞা ও সময় দিয়ে বেগবান করে তোলেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি তাঁর মনকে স্পর্শ করে। ১৯২৫ সালে মাহাত্মা গান্ধী রাজনৈতিক প্রচারণা এবং তহবিল সংগ্রহের জন্য বরিশাল এলে মনোরমা বসু নিজের গহনা দান করেন। বরিশালে গান্ধীর সাথে এই সাক্ষাৎ তাঁকে আরো উজ্জীবিত করে তোলে। তিনি ব্রিটিশদের শৃঙ্খল থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার জন্য বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। তাঁর নেতৃত্বেই বরিশালে ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ গড়ে ওঠে এবং তিনি এ সংগঠনটির সম্পাদক হন। এ সংগঠনের মাধ্যমে তিনি নারীসমাজকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেন। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে মহিলাদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯২১-২২ সালে ‘চরকা ধরো/ খদ্দর পরো’ আন্দোলনে গ্রামে গ্রামে নারীদের তিনি চরকা কাটার কাজ শেখাতেন। তিনি ১৯৩০ সালে বরিশাল শহরের কংগ্রেস নারীকর্মীদের সাথে যোগ দেন। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে স্থানীয় নারীদের নিয়ে কাজ করেন তৃণমূল পর্যায়ে। ১৯৩২ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি প্রথম কারাবরণ করেন। রাজনৈতিক কারণে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেন, আত্মগোপনেও তাঁকে থাকতে হয়েছে। অনেক কষ্ট স্বীকার করেছেন; তবুও কখনো হাল ছেড়ে দেননি, আদর্শের প্রশ্নে মাথা নত করেননি। আজীবন আদর্শ ধারণ ও লালন করেই কাজ করে গেছেন সাহসিকতার সাথে। এসময় থেকে তিনি বিপ্লবী ‘মনোরমা বসু মাসিমা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৩৮ সালের পর তিনি কমিউনিষ্ট মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হন।
টাকার অভাবে মনোরমার স্কুল শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাভাবে বিধবা মা প্রাইমারি স্কুল পাশের পর তাকে লেখাপড়া ছাড়িয়ে দেন। মাত্র তের বছর বয়সে মনোরমার বিয়ে হয় বরিশালের বাঁকাই গ্রামের বিপত্নিক জমিদার চিন্তাহরণ বসুর সাথে। ভাগ্য ভালো ছিল। স্বামী ছিলেন উদারমনা ও প্রগতিবাদী।
স্বামীর সহযোগিতায় ও সমর্থনে মনোরমা সংসারধর্ম পালনের পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজেও যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯০৫ সালে শুরু হওয়া বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি মানুষের হাতে হলদে সুতোর রাখী বেধে দেশমাতৃকার জন্য বিপ্লবী কাজে উৎসাহ যোগাতেন।
১৯০৮ সালে ক্ষুদিরামের ফাঁসি তাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। মনে মনে শপথ নেন, একদিন তিনি দেশ থেকে ইংরেজদের যেতে বাধ্য করবেন। ১৯২৪ সালে বরিশালে আসেন মহাত্মা গান্ধী। সেসময় গান্ধীজির বক্তৃতা এবং ঐ জনসভায় চারণ কবি মুকুন্দ দাসের গান তাঁকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে।
প্রগতিবাদী স্বামীর প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতায় তিনি স্বদেশি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। জমিদার বাড়ির রক্ষণশীলতা ও বিধিনিষেধ অতিক্রম করে তিনি মুক্ত জীবনে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে তিনি জমিদার বাড়ি ছেড়ে বরিশালে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বে স্বদেশি আন্দোলনে মহিলাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। শুধু বরিশাল শহরেই নয়, সমগ্র বরিশাল অঞ্চল জুড়েই ব্যাপক সংখ্যক নারীকে তিনি সংগঠিত করে নারী অধিকার আদায়ে তীব্র আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলেছিলেন। যে সময় তিনি নারীদের অধিকার সচেতন করে তুলতে ও আন্দোলনমুখী করতে পেরেছিলেন; সেই সময় মেয়েদের ঘর থেকে বের হওয়াই ছিল অনেক কঠিন কাজ। সেই কঠিন কাজটি করতে পারার মাধ্যমেই মাসিমা হয়ে উঠেছিলেন একজন তুখোড় সংগঠক।
তিনি শুধুমাত্র ভারতবর্ষের মুক্তির জন্য আন্দোলন করেননি। তিনি আন্দোলন করেছেন মানুষের মুক্তির জন্য। বরিশাল শহরে নিজ বাড়িতেই তিনি গড়ে তোলেন ‘মাতৃমন্দির’ । কুমারী মা, স্বামী পরিত্যক্তা, বিপথগামী ও আশ্রয়হীনা মেয়েদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে এই ‘মাতৃমন্দির’। আর্থিক সমস্যার সমাধানের জন্য তিনি বাড়িতে বাড়িতে মুষ্টি-ভিক্ষার ঘট বসান। পাশাপাশি চালু করেন মেয়েদের বিদ্যালয়। স্কুলবাড়ি তৈরি করবার জন্যে শহরের উকিল, শিক্ষক এবং অন্যরা চাঁদা করে ৩০০ টাকা তুলে দিলে মনোরমা তাঁর গলার হার বিক্রি করে ২৫০ টাকা সংগ্রহ করলেন। এই ৫৫০ টাকা পুঁজি করে বিদ্যালয়ের বাড়ি তোলার কাজে হাত দেয়া হল।
এখানে মেয়েরা যে শুধু পড়াশোনা করত তা নয়, লণ্ঠণের ফিতা, সুতার কাজ এবং নানারকম কুটির শিল্পের কাজ শিখিয়ে তাদের স্বনির্ভর করে তোলা হতো। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে শত শত কুমারী মা এবং স্বামী পরিত্যক্ত মহিলা যাদেরকে তিনি আদর- স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, তারাই তাঁকে মায়ের মত আপন ভেবে ‘মাসিমা’ বলে ডাকতো।
ক্রমে সমগ্র পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন, মাসীমা। অসহায় মেয়েদের স্বাবলম্বী করতে তিনি গড়ে তোলেন ‘নারী কল্যাণ ভবন’, শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশের জন্য ‘মুকুল-মিলন খেলাঘর আসর’, সাধারণ মানুষের জ্ঞানের জন্য ‘পল্লীকল্যাণ অমৃত পাঠাগার’, নারী জাগরণ ও নারী অধিকার রক্ষায় ‘নারী আত্মরক্ষা সমিতি’, ‘মহিলা সমিতি’ ও ‘মহিলা পরিষদ’সহ নানা সংগঠন। মাতৃমন্দির এখন বরিশাল শহরের মাতৃমন্দির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। আজীবন তিনি এ মাতৃমন্দির আশ্রমটি পরিচালনা করেছেন।
মাতৃমন্দিরের এই কঠিন কাজ করার পাশাপাশি মনোরমা বসু রাজনৈতিক কাজেও কঠোর পরিশ্রম করতেন।১৯৩০ সাল থেকে ভারতে কংগ্রেসের ডাকে শুরু হয় আইন অমান্য আন্দোলন। আন্দোলনে অংশ নিয়ে জীবনে প্রথম ৬ মাসের জেল ও ১৫০ টাকা জরিমানা হয় মনোরমা মাসীমার।
১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন তিনি । ১৯৪৩ সালে কলকাতা শহরের মতো বরিশালেও মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গড়ে তোলেন মনোরমা বসু। তিনি এর প্রথম নির্বাচিত সম্পাদক হন।
১৯৪৩-৪৪ সালে দুর্ভিক্ষ ও মহামারির সময় লঙ্গরখানা, চিকিৎসালয় ও উদ্ধার আশ্রম স্থাপন এবং পুনর্বাসন কাজে কমরেড মনোরমা সর্বক্ষণিক স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। শুধু বরিশাল শহরেই ১৪ টা লংগরখানা খোলা হয়। বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাদ্য, বস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করে তা সেইসব লংগরখানায় বিলিয়ে দিতেন। মেডিকেল টিম পরিচালনা করে বাঁচিয়ে তোলেন হাজারো দুস্থ মানুষকে। বরিশাল জেলার বিভিন্ন নারী আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, সমাজসেবামূলক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক নতুন শাসকদের শাসন ও শোষণ জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। দেশভাগের পর যখন দলে দলে হিন্দুরা ভারতে চলে যায় তখনো তিনি নিজের মা মাটিকে আঁকড় দেশেই থেকে যান। ১৯৪৮ সালে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সামিল হন সরকার বিরোধী আন্দোলনে।
১৯৪৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মনোরমা বসু কলকাতায় ছিলেন। এই সময় যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে মেয়ে বাসনার মৃত্যু হয়। এর মধ্যে মে মাসে মনোরমা বসুর কাছে ঢাকা থেকে টেলিগ্রাম যায়। ঢাকায় প্রাদেশিক মহিলা সম্মেলন হবে, তার প্রস্তুতির জন্য উপস্থিত থাকতে বলা হয় তাকে। মনোরমা বসু ঠিক করলেন, দেশে নিজ ঘরে বরিশালেই যাবেন। মেয়ে মারা গেছে মাত্র তিন দিন, তবুও তিনি রওনা হলেন। পাকিস্তান পুলিশ অকথ্য নির্যাতনের পর গ্রেফতার করে তাকে, ভেঙে দেয় তাঁর সাধের মাতৃমন্দির। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে দেখা দেয় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। দামের এই উর্দ্ধগতির প্রতিকার চেয়ে ৫ জুন বুভুক্ষু মেয়েকে নিয়ে বরিশালে মিছিল করেন তিনি। পুলিশ তাদের উপরে লাঠিচার্জ করে। মহিলা সমিতির ৪ জন নেত্রীসহ ৮ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এসময় প্রায় ১০ মাস বিনাবিচারে কারাগারে আটক ছিলেন মাসীমা। ১ বছরের জেল হয় মাসীমার। একই সময় জননিরাপত্তা আইনে আরও তিন বছর কারাভোগ করেন। তিনি ছিলেন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত। গ্রেফতার হবার মাত্র ১৮ দিন আগে মারা যায় তার মেয়ে বাসনা। শেষ দুই বছর মনোরমা বসু ছিলেন রাজশাহী জেলে। সেই জেলে তাঁর সঙ্গে বন্দি ছিলেন কমরেড নলিনী দাস, ইলা মিত্র, ভানু চ্যাটার্জি, অপর্ণা, অমিত, সুজাতা। রাজশাহীর আগে মনোরমা বসু কিছুদিন কাটিয়েছেন সিলেট জেলে। সিলেট জেলে তাঁর সহবন্দিদের মধ্যে ছিলেন অপর্ণা পাল চৌধুরী, অমিতা পাল চৌধুরী, সুষমা দে প্রমুখ। জেলে বসেও তিনি সংগঠন গড়েছেন আর একের পর এক কবিতা লিখেছেন। কয়েদিদের জন্য লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছেন। জেলে বসে চলতো পার্টি শিক্ষা, নারী অধিকারের শিক্ষা, অধিকার আদায়ের শিক্ষা; চলতো নানা রকম হাতের কাজের শিক্ষা। ১৯৫২ সালের ২৫ এপ্রিল তিনি মুক্তি পান। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে সারা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গন চঞ্চল হয়ে ওঠে । একুশে ফেব্রুয়ারির দেড় মাসের মাথায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা হয়। পরের বছর ১৯৫৩-এর জানুয়ারি মসে হাজী মোহম্মদ দানেশের নেতৃত্বে গণতন্ত্রী দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। একই বছর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি গঠন করা হয়। এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই ১৯৫৪ সালের ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন। নির্বাচনে মনোরমা বসু ছিলেন সোচ্চার।
১৯৫৪ সালের ১০ মে তাঁর স্বামী চিন্তাহরণ বসুর মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর কিছু দিনের মধ্যেই গভর্ণরের শাসনের কারণে তদানীন্তন পূর্ববাংলায় রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। প্রদেশব্যাপী শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। অন্য অনেকের সঙ্গে মনোরমা বসুর নামেও জারি করা হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। তিনি তখন আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু সেই অবস্থার মধ্যেই কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য গণসংগঠনের কাজকর্ম চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৫৬ সালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করা হলে বরিশালে ফিরে আসেন তিনি। আত্মগোপন অবস্থা থেকে আত্মপ্রকাশের পর ‘মাতৃমন্দির আশ্রম’-এর কাজে ব্যস্ত থাকেন। কমিউনিস্ট পার্টি তখন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। ১৯৬২ ও ৬৪’র স্বৈরাচার আইয়ুববিরোধী গণআন্দোলন এবং ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে মহিলাদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও মাসিমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে এর প্রতিরোধেও এগিয়ে আসেন তিনি। ১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ বরিশালের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। এবছর দেশের দক্ষিণ উপকূল জুড়ে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হয়। মনোরমা দেশের বিভিন্নস্থানে গিয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করেন। তিনি মানুষের কাছ থেকে সাহায্য সংগ্রহ করে, বন্যায় বিপর্যস্ত বিভিন্ন জেলার দূর্গত মানুষের কাছে তা বিলিয়ে দেন। সন্দ্বীপ ও পটুয়াখালির নিম্নাঞ্চলের বন্যার্ত মানুষের মাঝে তিনি ব্যাপকহারে ত্রাণ বিতরণ করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও তাঁর ছিল অগ্রণী ভূমিকা।মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মনোরমা বসু জুন মাসে ভারতে চলে যান । ভারতে গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা, অর্থ সংগ্রহ, নারীদের সংঘটিত করা ইত্যাদি কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। আবার পার্টি সংগঠনের কাজে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন। পার্টির কমিউন হিসেবে মাতৃমন্দিরে দায়িত্বপালন শুরু করেন। নলিনী দাস, মুকুল সেনসহ বেশ কয়েকজন পার্টি- নেতার দেখাশোনার ভার গ্রহণ করেন তিনি। কমরেড মনোরমা ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বরিশাল জেলা শাখা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীমুক্তি আন্দোলনকে আরো গতিশীল করে তোলেন। মহিলা পরিষদের উদ্যোগে বয়স্কা মহিলাদের জন্য কালীবাড়ি রোডের চন্ডীসদনে বৈকালিক স্কুল স্থাপন করেন । মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ পরিষদের সহ-সভাপতি ছিলেন। ’৭৪ এর দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় মাসিমা অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। এরই মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামীদের সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি আন্দামান যান। সোভিয়েত নারী কমিটির আহ্বানে সোভিয়েত ইউনিয়নেও যান। ’৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর তিনি পার্টির নির্দেশে আবারো আত্মগোপনে যান । আত্মগোপনে থেকেই খেলাঘর, উদীচী, ছাত্র ইউনিয়ন, মহিলা পরিষদকে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। মানবতার স্বার্থে তিনি কাজ করে গেছেন আজীবন। তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে। তাঁর অবদান চিরঅম্লান। তাঁর জীবদ্দশাতেই প্রখ্যাত সাহিত্যিক সাংবাদিক শিল্পী-সংগ্রামী কমরেড সত্যেন সেনের লেখা ‘মনোরমা মাসীমা’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ১৯৮৩ সাল থেকে তিনি বার্ধক্য আর নানা জরায় পীড়িত হতে থাকেন। নারী জাগরণের অন্যতম পুরোধা, মহিয়সী নারী কমরেড মনোরমা বসু মাসিমা তাঁর কর্মবহুল সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৮৬ সালের ১৬ অক্টোবর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মাতৃমন্দিরে। মনোরমা বসুর মৃত্যুর পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি তাঁকে ১৯৯২ সালের ১১ মার্চ মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করে। তাঁকে ১৯৯৭ সালে শেরেবাংলা পদক (মরণোত্তর), ১৯৯৮ সালে মহিলা পরিষদ কর্তৃক সম্মননা (মরণোত্তর), ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বেগম রোকেয়া পদক (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। তাঁর রেখে যাওয়া যাবতীয় সম্পত্তি নিয়ে ২০০১ সালে গঠন করা হয় ‘মনোরমা বসু মাসিমা স্মৃতি ট্রাস্ট’।
তাঁর শারীরিক মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন সংগ্রামী কর্মকান্ডে, তারুণ্যদীপ্ত মিছিলের অগ্রভাগে, প্রেরণার উৎস হয়ে। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন নারীমুক্তিসহ গণমানুষের মুক্তির কাফেলায়। জন্ম জন্মান্তর বেঁচে থাকবেন তিনি সবার মাসীমা হয়ে।
তথ্যসূত্র: বায়ান্নর ৫২ নারী, সুপা সাদিয়া


Facebook Comments Sync