নারী:  সমতার সংগ্রাম কবে শেষ হবে/ আফরোজা পারভীন 

Screenshot

নারী দুটি অক্ষর, একটি শব্দ। একটি অনিবার্য শক্তির নাম। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবখানেরই নারীর রয়েছে অপরিসীম অবদান ও ত্যাগ।  দিন রাত পরিশ্রম করে নারী। তারপর তারা নানা বৈষম্য, অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। একদিন দুদিন নয়, দিনের পর দিন। মুখ বুজে সেইতে হয় এসব নিপীড়ন। 

প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিবসটি পালিত হয় নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতার দাবিকে স্মরণ করতে, উদযাপনের জন্য নয়। কাজেই দিনটি একটি আনন্দের দিন, উৎসবের দিন একটা মনে করা ভুল। শুধু পুরুষ নন, যেসব নারী তা মনে করেন তারা বুল করেন। এটি তাদের অধিকার বুঝে নেয়ার দিন।  

নারী দিবসের ইতিহাস খুব পুরোনো। এ আন্দোলনরে সূচনা করেছিল মূলত শ্রমজীবী নারীরা।  বিংশ শতকের শুরুতে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে নারীরা কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ পরিবেশ এবং ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারী দিবসের স্বীকৃতি আসে। পরে বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আজ নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। শিক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য—সবখানেই নারীর উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। এক সময় যে নারীদের ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ভাবা হতো, আজ তারা রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও অংশ নিচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী রাষ্ট্রপ্রধান, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা ও সমাজনেতাদের সাফল্য সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও নারীর অগ্রগতি লক্ষণীয়। শিক্ষার হার বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ নারীদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে, তৈরি পোশাক শিল্পে লাখো নারী কাজ করছেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতেও নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতিতেও নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান।

তবে অগ্রগতির এই চিত্রের পাশাপাশি কিছু কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে। এখনও অনেক নারী সামাজিক বৈষম্য, সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও অর্থনৈতিক অসাম্যের শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের শ্রম ও অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায় না। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে জীবনযাপন করেন। ফলে নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সমতার সংগ্রাম এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষা ও সচেতনতা। শিক্ষিত নারী শুধু নিজের জীবনই বদলে দেন না; তিনি পরিবার ও সমাজের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একটি শিক্ষিত মা তার সন্তানদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, জ্ঞান ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে পারেন। তাই নারীর শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এছাড়া আইনগত সুরক্ষা ও সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তনও জরুরি। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, সেই আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সমাজে নারীর প্রতি সম্মান ও সমতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি—সব জায়গাতেই নারী-পুরুষ সমতার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরে—নারীর অগ্রগতি ছাড়া কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক; তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে উঠতে পারে।

সুতরাং নারী দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়। এটি একটি অঙ্গীকারের দিন—সমতার, মর্যাদার এবং মানবিকতার। নারীকে সম্মান করা মানে শুধু একজন মানুষকে সম্মান করা নয়; বরং একটি উন্নত ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে তোলা। যখন সমাজের প্রতিটি নারী নিরাপদ, সম্মানিত ও স্বাধীনভাবে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে, তখনই প্রকৃত অর্থে নারী দিবসের লক্ষ্য পূরণ হবে।

আফরোজা পারভীন
আফরোজা পারভীন