ভূতের গল্প / বেবী নাসরিন

ভূতের গল্প

ভূতের গল্প

ভূতের গল্প / বেবী নাসরিন 

 

লাশ পোড়াতে পোড়াতে রামগোপাল আজ ক্লান্ত। তাগড়া জোয়ান শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে টপটপ করে। ঘাম মুছতে মুছতে মাটিতে বসে পড়ে।

খিদায় পেট চোঁ চোঁ করছে।

হাঁক পাড়ে রমেশ, 

: বাড়ি যাবি। চল খেয়ে আসি।

: চলো,আমিও যাবো।

রামগোপাল ও রমেশ নোয়াপাড়া একই গ্রামের বাসিন্দা। নমোশূদ্র  পাড়ায় তাদের বাড়ি। শব পোড়ানো তাদের পেশা। অনেক রাতে বাড়ি 

ফেরে । দুপুরে সুযোগ পেলেই বাড়ি নাওয়া- খাওয়া করতে আসে ।

: রামদা,শুনছো?

: কি হয়েছে ক? 

: সুনীলের মাতো  মরিছে!

: তাই নাকি।

 : সুনীল তার মারে খুব যত্ন করে। সাংঘাতিক ভালোবাসে । চল তাড়াতাড়ি সৎকার করতে হবে।

বেড়াঘেরা মাটির ঘরে বসবাস করে। নুন আনতে পান্তা ফুরায় । অভাবের সংসারে মায়া মমতার কমতি নেই। একজনের খাবার তিন, চার জন খেতে হয়। তাতে ও দুঃখ নেই। এখন তাদের দিন ফিরেছে। দিন ফেরাতে তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়। পুরোনো পেশার পাশাপাশি নতুন পেশা। খামার ব্যবসা । প্রত্যেক বাড়িতে ছাগল গরু শূকর, মুরগি রয়েছে। শাক সবজি ফল গাছ মেয়েরা দেখাশুনা করে। ঘরে বাইরে সবাই ব্যস্ত।

: কৈ গো রামদা চলো যাই ।

: এই তো চল ।

: সুনীলের মাকে নেয়ার জন্য সে পালঙ্ক বানাইছে। পালঙ্কটা বেশ সুন্দর।

: তাই! তুমি দেখিছ ?

: হ দেখিছি। বড্ড চমৎকার! 

: পা চালাও। চল চল আগাই।

ওরা পৌঁছে দেখলো সুনীলের মায়ের লাশ তখনো  পৌঁছায়নি। 

বেলা গড়িয়ে গেল পৌছোতে।

: পালঙ্কে ওঠাইনি?  কি গো সুনীল দাদা পালঙ্ক কৈ ?

: এখনো পাঠায়নি।!!

: তাইলে থাক সৎকার শুরু করো ।

শুরু হলো কাজ । পালঙ্ক এলো তারপর । 

: সুনীল দাদা,পালঙ্কটা আমারে দিবা ?

: তুই নিবি? কত দিবি ক?

: তুমি কতো নিবা ?

: তিনশো টাকা দিতি হবে।

: অত পারবো না। ২০০টাকা দেব।

: তোরে দিবানী কিন্তু অন্য কারো কাছে ৩০০/- নিব ।

: ঠিক আছে নিয়া যায় । টাকা কাল পাবা ।

: ঠিক আছে কাল দিস ।

দুইটা লোক এসে বলছে,  ভাইয়া গেট কোন দিকে ? উওর দিকে। তারা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

কি হলো !!! মানুষ নাকি অন্য কিছু।

রামদা আর সুনীল একসাথে পা বাড়ালো।

আচ্ছা তুই দাড়া আমি মোমবাতি জ্বালিয়ে আনি । একসাথে কিছুদূর এলো একটা ভ্যান রিকশা করে। পালঙ্কটা দু’জন রাতের অন্ধকারে নিয়ে চলল । লোক দুইটা পিছনে খাটের উপর বসে আছে।

: তোমরা আইছো কি করে ?

: আসলাম 

ভ্যানচালক বলল, 

: নামো কষ্ট হয় । 

: নামতে তো আসি নাই । :টানো জোরে।

অগত্যা চলল।

: কিছুদূর গিয়ে দেখল, তারা নেই।

রামগোপালের গা ছমছম করে উঠল । বাড়ির সামনে এসে পালঙ্ক ধরাধরি করে উঠালো। বাড়িতে আসলে তার খিদে লেগে যায়। বৌয়ের সাফ কথা গা ধুয়ে ভাত খাবে, এসো। পালঙ্ক পেয়ে বৌ মহাখুশি। ডগমগ

সুরে বলল, যাক্ এতোদিন পর একটা স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে।

রামগোপাল নেয়ে এলো  পুকুর থেকে। খিদে পেয়েছে তাই বাড়া ভাতে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল।

: কি রানছিস? লবণ কম।

: লবণ একটু নিতি পার না।

বলে একদলা লবণ পাতে ফেলে দিল।

দিয়ে বৌ খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।

: কি হয়ছে তোর? খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাস।

এমন খুশি এই প্রথম।

: তুই খাইছিস কৃষ্ণা? 

: এইতো খাবো ।

: এতো রাতে খাসনি কেন?

: ছেলেপেলেদের সাথে খেয়ে নিবি নইলে বুঝেছিস অম্বলে ভুগবি।

: বুঝলাম ।

: খাইয়ে চল, নতুন পালঙ্কে বিছানা পেতে আমরা দু’জন ঘুমাব । কৃষ্ণার অন্তরে খুশির ঢেউ খেলে গেল। এত খুশি সে কখনো হয়নি। খাওয়ার শেষে নিজে খেয়ে  স্বামীর দিকে পান বাড়িয়ে দিল ।

পান খেতে খেতে গল্প জুড়ল দু’জন । ছেলের বিয়ে দিতে হবে। 

: মেয়ে পছন্দ হয়েছে । চলো আশির্বাদ করে আসি।

: আচ্ছা ,  খরচের যোগাড় করো ।

: রাত হোল, ঘুমাবা না ?

:  হ্যাঁও,  ঘুমাবো চলো।

রাত গভীর।ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘরের টিনের চালে ঠাস ঠাস করে ইঁটপাটকেল নিক্ষেপ করছে কারা। ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। বাইরে এলো । কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অগত্যা আবার এসে শুয়ে পড়ল দু’জন। ঘুমে অচেতন হয়ে পড়লে  আবার মনে হোল পালঙ্ক উড়ছে, হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে। কিছু ক্ষণ পর ঠাস করে ফেলে দিলো।  ঘরটা কেঁপে উঠলো। এভাবে সারা রাত জ্বালাতন করালো। ভুতের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বিনিদ্র কাটালো ওরা। কৃষ্ণা চিৎকার করে থর থর করে কাঁপতে লাগল। ওকে শান্ত করতে গিয়ে নিজে হিমশিম খেতে লাগল। রাম বলল,

: এই কৃষ্ণা চেঁচামেচি করিস না।

তারপর বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল। অনেকে ছুটে এলো। 

কি হয়েছে গো ?

: ও কৃষ্ণা, কৃষ্ণা চেঁচামেচি করিস কেন?

: কিছু না কাকিমা, ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে এমন করছে। 

সকালে উঠে সুবোধ কবিরাজের কাছে গেল। সব শুনে কবিরাজ বলল,

: আরো বড় ক্ষতি হয় নাই এটাই রক্ষা। এমনটা হবে আমি আঁচ করতে

পেরেছি। এই নাও ব্যবস্থা। পানি পড়া আর তাবিজ। আর ঐ পালঙ্কটা তুমি যে দাম বলবে সেই দামে বিক্রি করে দেবে । 

সখের জিনিসটা বিক্রি করতে হবে। মনটা একটু খঁচখচিয়ে উঠলেও  সে ব্যস্ত হয়ে উঠল ।আর একটি রাতও নয় । এটা আজই বিক্রি করতে হবে। বাজারে নিয়ে চলল,

: কতো তোমার পালঙ্কটা?

: কত দেবেন ? যা বলব তাই দেবেন?

: দেব ।বলেই দেখ না বাপু । এত দামি জিনিস নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। এটা বলেই হনহনিয়ে চলে গেল।

এ কেমন বিপদে পড়ল রামগোপাল!!!

মাথা খেলছে না এই খাট নিয়ে সে কি করবে! আবার একজন নেড়েচেড়ে দেখলো।সেও চলে গেল। অনেকক্ষণ পরে একজন কাষ্টমার এলো। 

: তোমার পালঙ্কটার দাম কত?.

: আপনে দাম কয়া নিয়া যান ।

: কেমন কথা ! আপনি দাম বলেন তারপর ।

: এক দামে বেচবো ভাবছি । কত দিবেন কন ? আপনি দাম কন ।

: পঞ্চাশ টাকা হবে?

: হবে, নিয়ে যান ।

পালঙ্ক নিয়ে গেল। 

একথা বলে রাম গোপাল হাফ ছেড়ে বাঁচলো।

লম্বা পা ফেলে সে বাড়ির দিকে রওনা হলো ।

 

বেবী নাসরিন
বেবী নাসরিন