বিদ্যা বনাম বিজ্ঞান / নাসরীন মুস্তাফা

Screenshot

পদার্থবিদ্যা আর পদার্থবিজ্ঞান কী একই বিষয়? বিদ্যা আর বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য কি?

অধুনাকালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চ্যাটজিপিটি’র কাছে জানতে চাইলে জবাব মিলল, বিদ্যা (Knowledge) ও বিজ্ঞান (Science) দু’টি ভিন্ন ধরণের জ্ঞান বা শিক্ষার ক্ষেত্র। 

বটে!

আরও বিশ্লেষণ করে চ্যাটজিপিটি বলে,

বিদ্যা সাধারণভাবে কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা বোঝায়, যা মানব জীবনের নানা দিক যেমন ধর্ম, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি ইত্যাদির উপর হতে পারে। এটি একদিকে তত্ত্ব, নীতিমালা, মূল্যবোধ, ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান হতে পারে, যা কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে না হলেও মননের মাধ্যমে অর্জিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সংস্কৃতির ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন, ধর্মীয় শিক্ষাগুলি। বিদ্যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, ও মূল্যবোধের গভীর উপলব্ধি।

অন্যদিকে বিজ্ঞান হল একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সংগৃহীত জ্ঞান যা পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং প্রমাণের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়। এটি প্রকৃতির নিয়ম ও ঘটনাগুলিকে বোঝার জন্য প্রাকৃতিক এবং সামাজিক দিকগুলি বিশ্লেষণ করে। বিজ্ঞান সুনির্দিষ্ট তত্ত্বের মাধ্যমে পরীক্ষিত ও প্রমাণিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। উদাহরণ হচ্ছে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, মহাকাশবিদ্যা, সাইকোলজি ইত্যাদি (চ্যাটজিপিটি দিব্যি কিন্তু বিজ্ঞানের উদাহরণ হিসেবে পদার্থবিদ্যা, মহাকাশবিদ্যার কথা বলছে!)। বিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করা।

বিদ্যা ও বিজ্ঞানের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। আরও পার্থক্য? চ্যাটজিপিটি জানাল,

বিদ্যা মূলত মানবিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তা থেকে উদ্ভূত হয়, যেখানে তত্ত্ব ও দর্শন প্রাধান্য পায়। বিজ্ঞান পরীক্ষণ ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করে। বিদ্যার লক্ষ্য হল মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি বোঝা এবং মানসিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন করা। অন্যদিকে বিজ্ঞানের লক্ষ্য হচ্ছে প্রকৃতি ও বিশ্বের বিভিন্ন দিকের ব্যাপারে যুক্তিপূর্ণ, প্রমাণিত জ্ঞান অর্জন ও তার ব্যবহার করা। বিদ্যা অনেক সময় ব্যক্তিগত বা সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে হতে পারে, যা প্রমাণিত না-ও হতে পারে। আর বিজ্ঞান আবিষ্কার ও তথ্যের ভিত্তিতে প্রমাণিত ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞান প্রদান করে। এইভাবে, বিদ্যা ও বিজ্ঞান একে অপরের পরিপূরক হলেও, তাদের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতিতে মূল পার্থক্য রয়েছে। 

এবার জানতে চাই, পদার্থবিদ্যা আর পদার্থবিজ্ঞানের মাঝে পার্থক্য কি? 

চ্যাটজিপিটি সেকে-ের মধ্যে জবাব দেয়,

পদার্থবিদ্যা (Physics) এবং পদার্থবিজ্ঞান (Physical Science) একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হলেও, এগুলির মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত, এ দুটি শব্দ প্রায় সমার্থক হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, তবে এর মধ্যে কিছু দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিভাষার পার্থক্য রয়েছে।

যেমন? 

যেমন, পদার্থবিদ্যা হলো একটি নির্দিষ্ট শাখা, যা প্রকৃতির মৌলিক নিয়মাবলী, শক্তি, গতিবিধি, এবং ব¯‘র সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে। এটি পদার্থের গঠন, আচরণ এবং এর বিভিন্ন শক্তি বা শক্তির ক্ষেত্রগুলো বিশ্লেষণ করে। পদার্থবিদ্যা মূলত প্রকৃতির মৌলিক গঠন ও নিয়ম সম্বন্ধে তাত্ত্বিক গবেষণা এবং মডেলিং পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। এর উদাহরণ হচ্ছে নিউটনের গতি সূত্র, তাপবিদ্যা, বৈদ্যুতিক বিদ্যুৎ, কোয়ান্টাম তত্ত্ব, আপেক্ষিকতা ইত্যাদি।

অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞান একটি বৃহত্তর ক্ষেত্র যা পদার্থবিদ্যা (Physics), রসায়ন (Chemistry), এবং জীববিজ্ঞান (Biology) সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে। এটি সব ধরনের প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে পদার্থবিদ্যা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পদার্থবিজ্ঞান শব্দটি সাধারণত পদার্থবিদ্যা ও এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিজ্ঞানগুলির সম্মিলিত অধ্যয়ন বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, পদার্থবিজ্ঞান বলতে শুধুমাত্র পদার্থবিদ্যা নয়, রসায়ন বা জীববিজ্ঞানও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

এতক্ষণের আলোচনায় স্পষ্ট যে, বিদ্যা বলতে বোঝায় কোনো বাস্তব জ্ঞানের ক্ষেত্রে “সঠিক জ্ঞান”। বিদ্যা শব্দের মূল হল বিদ (সংস্কৃত: विद्), যার অর্থ হল “বিবেচনা করা”, জ্ঞাতা, সন্ধান করা, জানা, অর্জন করা বা বোঝা। আর বিজ্ঞান হলো প্রকৃতিসম্পর্কিত জ্ঞান। বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাকৃতিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা ও বর্ণনা করেন। চ্যাটজিপিটি না বললেও আমরা জানি, বিদ্যা এবং বিজ্ঞান, দু’টোই বাংলা শব্দ। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ডঃ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের লেখা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস বিষয়ক বই ‘বঙ্গসাহিত্যে বিজ্ঞান’-এ বিদ্যা ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা পাওয়া যায়। ডঃ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পরিচয় আমাদের জানা। পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘকালীন মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় তিনি বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের সৌজন্যে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদের মাধ্যমে বইটি প্রকাশ করেন। এর ভূমিকায় ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্য বিশারদ অধ্যাপক সুকুমার সেন লিখেছিলেন, “বিজ্ঞানের চর্চা ও বিজ্ঞানের পাঠ্য বই লেখা যে এদেশে ইউরোপীয়রাই আরম্ভ করেছিলেন এবং কিছুকাল পর্যন্ত চালিয়েছিলেন, তা শ্রীমান্্ বুদ্ধদেব দেখিয়েছেন। প্রথমে তাঁরা “বিদ্যা” কথাটি ব্যবহার করতেন। এ রীতির রেশ এখনও রয়ে গেছে “পদার্থবিদ্যা”, “উদ্ভিদবিদ্যা” ইত্যাদিতে। তার পরে এল “বিজ্ঞান” কথটি ঊনবিংশ শতাব্দের চতুর্থ দশকে  “বিদ্যা”র মতই জ্ঞানবিজ্ঞান এই ব্যাপক অর্থে। সাময়িক-পত্র “বিজ্ঞানসেবধি” নামেই তার স্বাক্ষ্য। কিছুকাল পর্যন্ত “বিদ্যা” ও “বিজ্ঞান” দুই-ই চলছিল, তবে “বিজ্ঞান” এর ব্যবহার বাড়তির মুখে। শেষে “বিজ্ঞান” এর পক্ষে বোধ করি চরম রায় পাওয়া গেল ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে যখন বঙ্কিমচন্দ্র ‘বিজ্ঞানরহস্য’ বের করলেন।”

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই কবি, সঙ্গীতকার, দার্শনিক, গণিতজ্ঞ ও চিত্রশিল্পী দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা সুখপাঠ্য প্রবন্ধ ‘বিদ্যা এবং জ্ঞান’ (পর্ব-১) প্রকাশিত হয়েছিল বঙ্গদর্শন পত্রিকার পঞ্চম বর্ষ দশম সংখ্যায়। তিনি লিখেছেন, “যাঁহারা বিদ্যাধনে ধনী তাঁহাদের বলে সুপন্ডিত। যাঁহার জ্ঞানরত্নের খনি তাঁহাদের বলে পরম জ্ঞানী। যাঁহারা দুইই একাধারে তাঁহাদেরকে বলে সোনার সাহাগা। ইহাতেই বুঝা যাইতেছে যে, বিদ্যা ও জ্ঞানের মধ্যে প্রভেদ কিছু না কিছু আছে। সেই প্রভেদটির গুরুত্বের প্রতি আমি আজ আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিব মনে করিয়াছি; সেই সঙ্গে বিদ্যা ও জ্ঞানের দুই ভিন্ন পথের ঠিকানা নির্দেশ করিব।

বিদ্যা নানা, আর, ভিন্ন ভিন্ন বিদ্যা ভিন্ন ভিন্ন সত্যের অনুশীলনে ব্যাপৃত। জ্ঞান এক, আর, সেই এক জ্ঞানের লক্ষ্য এক ও অদ্বিতীয় সত্য। বিদ্যা ও জ্ঞানের লক্ষা যেমন ভিন্ন পথও তেমনি ভিন্ন। বিদ্যার পথ হচ্ছে অসুরব্যতিরকের পথ, জ্ঞানের পথ হচ্ছে যোগের পথ। বলিলাম অসুরব্যতিরকের পথ, তাহা পদার্থটা কি? পদার্থটা আর কিছু না, জ্ঞতব্য ব¯‘তে স্বজাতীয় লক্ষণের অশ্বর।

বিদ্যার পথ সকলের নিকটে পরিচিত জ্ঞানের পথ সকলের নিকটে হয় তো অপরিচিত। এই ¯’লে বিদ্যার বাঁধার মধ্য ¯’ান হইতে যাত্রা আরম্ভ করিয়া জ্ঞানের নিভৃত গুহা গহবরের পথ অভিমূখে  ধীরে ধীরে পা বাড়ানোই সিদ্ধ। জ্ঞান তেমনি কিরূপে বিদ্যাকে গুপ্ত ভাবে সাহায্য প্রধান করে, তাহার কতকটা সাহায্য পাওয়া যাইতে পারে।”

অধ্যাপক সুকুমার সেনের লেখা থেকে জানতে পারি, ইংরেজদের আসার আগে বাংলাভাষায় বিজ্ঞান চর্চার কোনো হদিশ নেই। পুরনো পুঁথি তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন, যেখানে মশাল-হাউই ইত্যাদি আতশবাজির মশলার কিছু ফর্মুলা লেখা ছিল। একে বিজ্ঞানচর্চা বলা যায় না, বড়জোর “ফলিত রসায়নচর্চার একমাত্র স্বাক্ষ্য” হিসেবে ভাবা যেতে পারে বলে তিনি মত দিয়েছেন। বিজ্ঞানে পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য, এটাই বিজ্ঞানকে অন্য বিদ্যা থেকে পৃথক করেছে। প্রাকৃতিক শক্তির প্রতি আগ্রহ আমাদের পূর্বপুরুষদের পর্যবেক্ষণে আগ্রহী করেছিল সত্যি। তবে তা মূলতঃ দীর্ঘজীবন বা চিরজীবন লাভের জন্য তন্ত্রমন্ত্র জানার উদ্দেশ্যেই হ’ত। যারা তন্ত্রমন্ত্র জানতেন, তারা ছিলেন ‘ডঙ্ক’, যা কালে কালে ‘ডাক’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এরাই হাজার-দেড় হাজার বছর আগের বাংলার ‘বিজ্ঞানী’, যদিও একালের বিজ্ঞানীরা তা মানতে রাজি হবেন বলে মনে হয় না। কেনো মানবেন? ডাকদের বিদ্যা বিদ্যা-ই ছিল, তা কিছুতেই পর্যবেক্ষণলব্ধ ফলাফল তথা বিজ্ঞান নয়। তবে ডাকদের বিদ্যা কিন্তু‘ ‘বিদ্যা’ হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়েছিল। কালে কালে বিদ্যা চর্চাকারীদের নাম হয়ে গেল ‘বৈদ্য’। পাল আমলের শেষার্ধে, আনুমানিক একাদশ শতাব্দীর একজন বাঙালি পন্ডিত ও আয়ুুর্বেদ চিকিৎসার অনুশীলনকারী এবং গবেষক বিখ্যাত হয়েছিলেন, যাঁর নাম চক্রপাণি দত্ত। তিনি ব্রাক্ষ্মণ ছিলেন এবং একটি সম্ভ্রান্ত বৈদ্য পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বলে উইকিপিডিয়ায় তথ্য আছে। 

ভারতবর্ষের প্রাচীন বিজ্ঞানীদের কথা কত শুনেছি, তাঁরা অনেক বই লিখেছিলেন বলে জানি। এঁদের মাঝে বাঙালি বিজ্ঞানী খুঁজতে গেলে হতাশ না হয়ে উপায় নেই। এজন্যই কি অধ্যাপক সুকুমার সেন বলছেন, ইংরেজরা এসে বাঙালিদের বিজ্ঞানসাহিত্য শিখিয়ে গেছে? এ পার্থিব জগৎ মায়ার সংসার, এই ছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের ভাবনার প্রিয় বিষয়। অধ্যাত্মসর্বস্ব বাঙালির মনে সামগ্রিকভাবেই বাস্তবের হাওয়া দিয়েছিল ইংরেজ শাসন। 

অথচ ঐতরেয়-ব্রাক্ষণে বলা আছে, ‘যখন কেউ বলবে আমি এ ব্যাপার চোখে দেখেছি, তখনই সেটা ঠিক সত্য বলে গ্রহণ করবে।’ এরপরও প্রাচীন ভারতবর্ষ এবং আমাদের বাংলায় দর্শনের অংশ হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়েছে বিদ্যা। বিজ্ঞান পশ্চিমা সভ্যতা থেকে আগত শিক্ষা। কালে কালে দর্শনের ছায়ায় এসে বিজ্ঞান, শিক্ষা, জ্ঞান ও বৃত্তি তথা বৈধ এবং সত্য জ্ঞান বলতে যা বোঝায়, তার সবটাই বিদ্যার আওতাভুক্ত বলে গৃহীত হয়েছিল। নিজস্ব ব্যাখ্যায় এভাবেই ব্যাখ্যায়িত হ’ল বিদ্যা ও জ্ঞান- বিদ্যার মাধ্যমে সত্তার পূর্ণতা ও পরিপূর্ণতার পর জ্ঞানের সূচনা হয়। এর অর্থ কি নির্বাণ লাভ? নাকি বিদ্যা লাভ করতে করতে মরে যাও, এরপর হয়তো জ্ঞানের সূচনা ঘটবে! এই দর্শন থেকে এখনও কী মুক্তি পেয়েছি আমরা? নইলে পার্থিব মায়ার সংসারে বিদ্যা নামক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকলেও বিজ্ঞানের সাধনায় আগ্রহ কেনো কম? যত আবিষ্কার সব পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের। 

বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে বিজ্ঞান তথা পশ্চিমা জ্ঞান তুলে ধরতে অনেক কৌশল নিতে হয়েছিল ইংরেজ সরকারকে। ১৮১৩ সালে বৃটিশ পার্লামেন্ট বছরে এক লাখ টাকার অনুদান ঘোষণা করেছিল ভারতবর্ষে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান-শিক্ষা প্রচারের উদ্দেশ্যে। ১৮১৭ সালের ২০ জানুয়ারি তারিখে এই লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হ’ল হিন্দু কলেজ। হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার এডওয়ার্ড হাইড ইস্ট প্রস্তাবিত হিন্দু কলেজে শিক্ষার পরিকল্পনা জানিয়ে ১৮১৬ সালে সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, যাতে তিনি লিখেছিলেন, কলেজে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দুস্তানী, ফার্সি ইত্যাদি ভাষার সাথে শিক্ষা দেওয়া হবে Òarithmatic (this is one of the Hindu Virtues), history, geography, astronomy, mathematics ইত্যাদি। কলেজের নিয়মকানুন প্রণয়নের জন্য গঠিত সাবকমিটির রিপোর্টের শুরুতেই বলা ছিল, ÒThe primary object of this institution is the tuition of the sons of respectable Hindoos, in the English and Indian languages and in the literature and Science of Europe and Asia  ফলতঃ ভারতবর্ষের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাতেও ইউরোপের সাহিত্য ও বিজ্ঞান চর্চা শুরু হ’ল।

শ্রীরামপুর মিশনের মাধ্যমে ইংরেজ মিশনারীরা শুরু করল বাংলায় বিজ্ঞানসাহিত্য প্রচারে ‘দিগদর্শন’ পত্রিকার প্রকাশ। কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটি লন্ডনের বৃটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি থেকে পাঠানো নানা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির সাথে সঙ্গতি রেখে বিজ্ঞানবিষয়ক বই প্রকাশের উদ্যোগ নিল। ‘দিগদর্শন’ এবং কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটির উদ্যোগেই যাত্রা শুরু করেছিল বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্য। আর সেই বিজ্ঞান সাহিত্য আলোচনার পীঠস্থান হয়ে উঠল হিন্দু কলেজ।  যদিও কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া শুরু হয়েছিল প্রথমে ইংরেজিতে, দ্রুত তা বাংলায় শুরু হ’ল এবং এর ফলে বাংলা ভাষাভাষীরা ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হ’ল। দীর্ঘকালীন ‘বিদ্যা’ অর্জনের অভ্যেস ‘বিজ্ঞান’ চর্চায় পরিবর্তিত করতে বাঙালির কাছে প্রিয় মাধ্যমগুলোকে কাজে লাগানো হয়েছিল। যেমন, পদ্যের ব্যবহার। বাংলা গদ্যের জনক বলা হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে। এর আগ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য পদ্যকারদের দখলে ছিল। পুঁথির মতো দীর্ঘ পদ্য দুলে দুলে পড়া হবে, যিনি পড়বেন তাকে ঘিরে বসে শুনবেন শ্রোতারা, এ-ই তো ছিল বাংলার সাহিত্য চর্চা। বাংলা ভাষায় পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে লেখা প্রথম অংক বই ‘মে-গণিত’, যার বাংলা নাম ‘অঙ্কপুস্তকং’। কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটি চুঁচুড়া অঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোর প্রধান পরিদর্শক রবার্ট মে-এর লেখা বইটি প্রকাশ করেছিল। ধাঁধাগুলো ছিল কবিতায়। রবার্ট মে বুঝতে পেরেছিলেন, কবিতার পাতে শুষ্ক গণিতের অন্ন দিলে বাঙালি না খেয়ে পারবে না। সত্যিই তা-ই। বইটিতে কয়েকটি ধাঁধা ছাড়া বলার মতো তেমন কিছুই ছিল না, তবুও এদেশিয় পাঠকরা লুফে নিয়েছিল। একটির উল্লেখ করছি।

“মহীতে বসেছে পক্ষ আহারের তরে।

শঙ্কর কহিল ভুজ যোড় করি শিরে।

বসূর কাছে বাণ এসেছে কৃষ্ণ বড় সুখী।

ঘোড়ার উপর রাম বসেছে বেদে সমূদ্র দেখি।

রসের কাছে পাখি বসেছে খাবে হেন বাসি।

তার কাছে পঞ্চানন কোলে করে শশী।

অনূপচন্দ্র ভট্ট কহেন শুন কায়¯ে’র বালা।

সকল চাঁদের মধ্যে রন্ধ্রে তবে গাঁথিবে মালা।।”

আরেকটি কৌশল ব্যবহার করেছিলেন ইংরেজ লেখকরা। ভারতীয় দর্শনে গুরু-শিষ্য বিষয়টি খুব জনপ্রিয়। গুরুমুখী বিদ্যা না হলে বিদ্যার দাম নেই, এমনই বিশ্বাস আমাদের। গুরু-শিষ্যের কথোপকথন স্টাইলে উইলিয়াম ইয়েটস অনুবাদ করলেন ফার্গুসনের ‘জ্যোতিবির্দ্যা (An easy introduction to Astronomy for young persons)’, জন ক্লার্ক মার্শম্যান লিখলেন ‘জ্যোতিষ ও গোলঅধ্যায়’, পিয়ার্সন লিখলেন ‘ভূগোল ও জ্যোতিষ’। কথোপকথনে শিষ্য প্রশ্ন করছেন, গুরু উত্তর দেওয়ার মাধ্যমে বিজ্ঞানের তথ্য জানাচ্ছেন। চেষ্টা করা হয়েছে ভাষা সহজ ও প্রাঞ্জল রাখার। মাঝে মাঝে ছোট ছোট কাহিনীর অবতারণা, যেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ এর বিজ্ঞানময় সংস্করণ! ১৮২৪ সালে প্রকাশিত উইলিয়াম ইয়েটস এর ‘পদার্থবিদ্যাসার’ বইটির পুরো নাম ছিল ‘পদার্থবিদ্যাসার, অর্থাৎ বালকদিগের জন্য পদার্থবিদ্যাবিষয়ক কথোপকথন-Elements of Natural Philosophy and Natural History in A Series of Familiar Dialogue, Designed for the Introduction of Indian Youth থেকে কিছুটা তুলে ধরছি বিষয়টি বোঝানোর জন্য:

“পৃথিবী সম্বন্ধে আলোচনা

শিষ্য। পৃথিবীর সৃষ্টি হইল কেন?

গুরু। প্রাণিবর্গের বসতির নিমিত্তে। পৃথিবীর অন্তরে ও উপরে ২ লক্ষ প্রাণী বসতি করিয়া সুখী হইবে এই জন্যে পৃথিবীর সৃষ্টি হইল।

শিষ্য। পৃথিবী কিসের উপরে স্থাপিত আছে?

গুরু। কোন ব¯‘র উপরে পৃথিবী ¯স্থাপিত নয়, কেননা তাহা হইলে পৃথিবীর গমন কি প্রকারে সম্ভব হইতে পারে? এই জন্যে প্রাচীন লোকেরা বলিয়াছেন যে, পরমেশ্বর পৃথিবীকে শূন্যভাগে রাখিয়াছেন।

শিষ্য। তবে কি আমাদের বসতি¯স্থান যে পৃথিবী সে কি শূন্যে ভ্রমণ করে?

গুরু। হাঁ, কেবল পৃথিবী নয়, গ্রহগণও শূন্যে ভ্রমণ করে।”

পৃথিবী সৃষ্টির কারণ গুরুর কাছ থেকে জেনে সেকালের শিষ্য তৃপ্ত হলেও একালে তা ধোপে টিকবে না। আবার একেবারে উড়িয়ে দেবেন একালের পাঠক, সেরকম ভরসাও পাচ্ছি না। নিরেট বৈজ্ঞানিক তথ্যের চেয়ে দার্শনিকতার মোড়কে সাজানো বিজ্ঞান এখনো বাঙালির পছন্দের বিষয়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, ইয়েট্স এদেশের পাঠকের মনের ভেতর রাজত্ব করতে থাকা ‘অধ্যাত্ম্যবাদ’কে বিজ্ঞান আলোচনায় সাদরে অন্তর্ভুক্ত করেছেন সম্ভবতঃ পাঠকদের মন জয় করার উদ্দেশ্যে। গুরু-শিষ্যের আলোচনায় কীভাবে ‘পরমেশ্বর’ এসেছেন, সেই উদাহরণ দিচ্ছি, ‘পৃথিবী সম্বন্ধে আলোচনা’ থেকে

“শিষ্য। আঃ মহাশয়, যে শক্তি দ্বারা এই সমস্ত সৃষ্ট হইয়া প্রথমাবধি প্রচলিত হইয়া এই কাল পর্যন্ত স্ব ২ পথে রক্ষিত আছে সে শক্তি কি আশ্চর্য্য!

গুরু। পরমেশ্বর নিজশক্তিদ্বারা পৃথিবীর সৃষ্টি করিয়া আপন বুদ্ধির কৌশলে আকাশ বিস্তার করিয়া তন্মধ্যে তাহাকে স্থাপিত করিলেন।”  

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান আলোচনা ইউরোপিয়রা শুরু করলেও তাদের কৃত্রিম ও জটিল ভাষার হাত থেকে উদ্ধার করে বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্যের গোড়াপত্তন করেছিলেন যিনি, তিনি অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬)। ১৮৪১ সালে তত্ত্ববোধিনী সভার অনুমতিক্রমে অক্ষয়কুমারের প্রথম বই ‘ভূগোল’ প্রকাশিত হয়েছিল। নানাবিধ ইংরেজ লেখকের ভূগোল বিষয়ক বইয়ের সাহায্য নিয়েছিলেন, সরাসরি অনুবাদ না করে সহজ বাংলায় নিজের মতো করে তথ্য জানাতে চেষ্টা করেছেন। সফল হয়েছিলেন তিনি। বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্য জনপ্রিয় হয়েছিল। 

‘বাহ্যব¯‘র সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধে বিচার’ শিরোনামে অক্ষয়কুমারের লেখা নিবন্ধ থেকে কিছুটা উদাহরণ দিচ্ছি

“মাধ্যাকর্ষণ দ্বারা পৃথিবী¯’ সমস্ত বস্তু‘ ভূতলে বদ্ধ হইয়া রহিয়াছে। সেই সাধারণ নিয়মের অনুগত থাকাতে, মানবদেহও ঊর্দ্ধে উত্থিত হইতে পারে না। কিন্তু‘ মনুষ্য বেলুন যন্ত্র সহকারে ঊর্দ্ধগামী হইতে পারেন বলিয়া, লোকে জ্ঞান করিতে পারে, যে তিনি পৃথিবীর আকর্ষণ অতিক্রম করিয়া যান। বস্তু‘তঃ, আকর্ষণ অতিক্রম করা দূরে থাকুক, ইহা ঐ আকর্ষণ শক্তিরই কার্য্য। যেমন শোলা ও তৈল জলমধ্যে নিমগ্ন করিয়া দিলেও ভাসিয়া উঠে, সেইরূপ বেলুন যন্ত্র বায়ুর মধ্য দিয়া ঊর্দ্ধগামী হয়। পৃথিবী বায়ুকেও যেমন আকর্ষণ করে, বেলুন যন্ত্রকেও তেমনি আকর্ষণ করে। কিš‘ বেলুন যন্ত্রে যে বাষ্প থাকে, তাহা এরূপ লঘু, যে সমুদয় বেলুন তাহার আয়তন-প্রমাণ বায়ু রাশি অপেক্ষায় লঘুতর হইয়া ঊর্দ্ধগামী হয়। অতএব, এ¯’লে পৃথিবীর আকর্ষণ-ক্রিয়ার কিছুমাত্র ব্যতিতক্রম ঘটে না।”

‘পরমেশ্বর ঘটাইতেছেন’ জাতীয় ব্যাখ্যা এড়িয়ে নিরেট বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপস্থাপন সেকালের বাঙালি পাঠক গ্রহণ করেছিলেন বলে বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্য ঠিক পথে ছুটতে শুরু করেছিল। লেখক অক্ষয়কুমার দত্তের সাথে সাথে সেকালে পাঠককেও এর জন্য ধন্যবাদ জানানো জরুরি। 

অক্ষয়কুমারের সবশেষ বইটির নাম ‘পদার্থবিদ্যা’। এর আগে, ১৮২৪ সালে উইলিয়াম ইয়েটস এর ‘পদার্থবিদ্যাসার’ এবং ১৮৪৭ সালে পূর্ণচন্দ্র মিত্রের ‘পদার্থবিদ্যাসারঃ’ প্রকাশিত হয়েছে। এই দুইটি বইকে পুরোপুরি পদার্থবিজ্ঞানবিষয়ক বই বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, কেননা কেলমাত্র পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা না থেকে ছিল জ্যোতির্বিদ্যা, ভূ ও ভূগোলবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা ইত্যাদি। পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে সার্থক বইটি লিখেছিলেন অক্ষয়কুমার। ১৮৫৬ সালে প্রকাশিত এই বইটির আলোচ্য বিষয় ছিল জড় ও জড়ের গুণ (Matter and its general properties)। বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্যকে নিরেট বিজ্ঞানের আলোচনাকে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত করে দিতে পেরেছিলেন। পরবর্তীকালের বিজ্ঞান সাহিত্যিকরা এই ধারাটি বজায় রাখতে চেয়েছেন। পূর্বপুরুষের অভ্যেস মাঝে মাঝে বিচলিত করেছে, পুরোপুরি পশ্চিমী বিজ্ঞান আলোচনায় আবদ্ধ থাকতে দেয়নি। রামেন্দ্রসুন্দও ত্রিবেদী’র ‘প্রাণময় জগৎ’ গ্রস্থ’ যেমন দেখি, তিনি প্রাণের বিজ্ঞানসম্মত বর্ণনার পাশাপাশি প্রাণের রহস্য সন্ধানেও ব্যস্ত থেকেছেন। প্রমথনাথ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘আকাশ ও ঈথার’ গ্রন্থে’ বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তাধারার মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। বৈজ্ঞানিকের বিজ্ঞান সাহিত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর ‘অব্যক্ত’। ভারতীয় সংস্কৃতি ও সাধনার প্রতি নিষ্ঠাবান জগদীশচন্দ্রের ‘অব্যক্ত’ পড়লে বোঝা যায়, অণু-পরমাণু থেকে শুরু করে বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডে সবখানে মহাশক্তির উপস্থিতি অনুভব করেছেন তিনি। ‘আকাশ-স্পন্দন ও আকাশ-সম্ভব জগৎ’ শীর্ষক প্রবন্ধের উপসংহারে লিখেছিলেন, ‘যে শক্তি আদিম জীববিন্দুকে মনুষ্যে উন্নত করিয়াছে, যাহার ঊচ্ছাসে নিরাকার মহাশূন্য হইতে এই বহুরূপী জগৎ ও তদ্বৎ বিস্ময়কর জীবন উৎপন্ন হইয়াছে, আজ্রি সেই মহাশক্তি সমভাবে প্রবাহিত হইতেছে। ঊর্দ্ধাভিমুখেই সৃষ্টির গতি; আর সম্মুখে অন্তহীন কাল এবং অনন্ত উন্নতি প্রসারিত।’ 

বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিভাগের মাঝে কোনো বিভেদ তিনি দেখতে পাননি। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য উৎসর্গীকৃত বলে ভাবতেন তিনি, আর তাই পেটেন্ট বাণিজ্যের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন।    

শুরুতেই যে বলছিলাম, বিদ্যা মানবিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তা থেকে উদ্ভূত হয়, যেখানে তত্ত্ব ও দর্শন প্রাধান্য পায়। আর বিজ্ঞান পরীক্ষণ ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করে। পশ্চিমা বিশ্ব বিদ্যার মায়ায় পড়েনি, পড়েছিলাম আমরা। বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্য সেই অবস্থা থেকে উঠে আসতে সময় নিয়েছে। এই কাজে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেক বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর ‘বিশ্বপরিচয়’ এর ভূমিকাতে তিনি লিখেছেন, ‘বড়ো অরণ্যে গাছতলায় শুকনো পাতা আপনি খসে পড়ে, তাতেই মাটিকে করে উর্বরা। বিজ্ঞান চর্চার দেশে জ্ঞানের টুকরো জিনিসগুলি কেবলই ঝরে ঝরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাতে চিত্ত-ভূমিতে বৈজ্ঞানিক উর্বরতার জীবধর্ম জেগে উঠতে থাকে। তারি অভাবে আমাদের মন আছে অবৈজ্ঞানিক হয়ে। এই বৈদন্য কেবল বিদ্যার বিভাগে নয়, কাজের ক্ষেত্রে আমাদের অকৃতার্থ করে রাখছে।’

সহজ ভাষায় বিজ্ঞান আলোচনা কতটা হৃদয়গ্রাহী হতে পারে, তা জানতে প্রত্যেক বিজ্ঞান লেখকের উচিত ‘বিশ্বপরিচয়’ পড়া। তিনি লিখেছেন, ‘তথ্যের যাথার্থ্যে এবং সেটাকে প্রকাশ করার যাথাযথ্যে বিজ্ঞান অল্পমাত্রও স্খলন ক্ষমা করে না।’

অর্থাৎ, বিজ্ঞান মানে বিজ্ঞান-ই। এর আর কোনো অর্থ নেই।

নাসরীন মুস্তাফা
নাসরীন মুস্তাফা