চন্দনের গন্ধ ৭/ আফরোজা অদিতি

চন্দনের গন্ধ ৭/ আফরোজা অদিতি

পর্ব ৭

লাইব্রেরী নামের এই ঘরে কোন আলমারি নেই, কোন তাক নেই। মেঝেতে মাদুরের ওপর বইগুলো রাখা।

একটা চেয়ার একটা টেবিল আর একটা ইজিচেয়ার আছে। ঐ টেবিলের ওপর কলমদানীতে কলম, কাগজ আর পেপারওয়েট রাখা। ঐ সব জিনিষ দুধসাদা রঙের। কলম,কাগজ আর পেপারওয়েট নিজে

কেনেনি তিসু; এগুলো ঐ ছবির মানুষটা ওর চোখের সম্মুখে রেখে গেছে এখানে। সেদিন ছবির মানুষটা ওর দিকে এগিয়ে আসতেই খুব ভয় পেয়েছিল। তখন অদৃশ্য কণ্ঠ শুনতে পেয়েছিল।

‘ভয় পাস্ নে এইগুলো সব তোর জন্য। এই কলম যখন হাতে নিবি তখন অনেক কিছু লিখতে পারবি।’

শুধু কথার কথা নয়; তিসু দেখেছে যখনই এই কলম কাগজ হাতে নিয়েছে ওর ভেতর অদ্ভূত সুন্দর সব ভাষা তৈরি হয়ে গেছে। কাগজের পর কাগজ জমে উঠেছে লেখায়। অনেকদিন তিসু কলম হাতে

নেয়নি, আজ খুব কলম ধরতে ইচ্ছা করলো। তিসু এই ঘরে এসে চেয়ার টেবিলে বসে। কিছু লেখার পর উঠে এসে ইজিচেয়ারে বসে। কতক্ষণ আগে এই ঘরে এসেছে কতক্ষণ ইজিচেয়ারে বসেছিল তা মনে নেই। হঠাৎ বিপুলের চিৎকার; বিপুলের চিৎকারে নিজের মধ্যে ফিরে আছে

তিসু। ঘর থেকে সাততাড়াতাড়ি বের হয়ে আসে। এই ঘরে ঢোকার সময় বিপুলকে বারান্দায় খেলতে দেখেছিল। এখন দাদির কোলে চেতনাহীন। চোখে-মুখে জলের ছিটা দিচ্ছে বিপুলের মা, রায়না। মিনিট পাঁচেক পরেই চোখ খোলে বিপুল। চোখ মেলতেই দাদি জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি

চিৎকার করলে কেন দাদুভাই?’ বিপুলের ছোট্ট মুখখানা তখনও ফ্যাকাশে রক্তশূন্য হয়ে আছে। কথা বলতে চেষ্টা করে। অনেকটা সময় নিয়ে বলে,

 

‘দিদা, এত্ত বড়ো এক লম্বা মানুষ, ঐ ছাদের সমান আমাকে গলা টিপে ধরতে এসেছিল।’ 

কথা বলেই দাদির বুকে মুখ লুকায়। দাদি আদর করে। কিছুক্ষণ পর শান্ত হয় বিপুল। ওর দিদার কোলে বসে থাকে। হঠাৎ উঠানের জামগাছের দিকে আঙুল তুলে বলে,

‘ঐ দেখ দিদা, ঐ দেখ এখনও ওখানে পা ঝুলিয়ে বসে আছে ঐ লম্বুটা।’ সবাই ওদিকে তাকায়।  কিন্তু কেউ কিছু দেখতে পায় না।

‘ওখানে কী আছে? কোথায় কী আছে কেউ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তুমি শুধু পাচ্ছ! বাঁদর ছেলে!’ মা বলে। মায়ের কথা শুনে আবার দাদির বুকে মুখ লুকায়। এবার বিপুল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। ওর কান্না দেখে শাশুড়ি, ছেলেবউ, রায়নাকে ধমক দেয়।

‘তুমি থাম তো বউমা। আমি দেখছি।’ শাশুড়ির কথায় রায়নার মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। মনে মনে ভাবে, ‘আমার ছেলে যেন আমার নয়! আমি যেন ওর কেউ না।’ রায়না এসব কথা ভাবছে। ওদিকে দাদি আর নাতির সঙ্গে কথাবার্তা চলছে।

‘লম্বা মানুষটাকে কোথায় দেখেছ দাদুভাই।’

‘ঐ খানে; ঐ খান থেকে জামগাছে চলে গেছে।’ ভয়ে ভয়ে হাত তুলে তিসুর ঘরের দিকে দেখায় বিপুল; তারপর জামগাছের দিকে। এবারে অবাক হওয়ার পালা তিসুর।

‘আমার ঘরে!’

‘হ্যাঁ, চাচি। তুমি ঘর থেকে চলে গেলে আমি খেলছিলাম তখন…ওমা, ও দাদি’ কথা শেষ না করে আবার চিৎকার দিয়ে চেতনা

হারিয়ে ফেলে। শুধু বিপুল দেখছে, ওরা কেউ কিছু দেখতে পাচ্ছে না!

বিকেলে খুব জ্বর আসে বিপুলের। জ্বরের উপশম হচ্ছে না। পরদিন-তারপর দিন জ্বর কমছে না, সারছেও না! ডাক্তার আসছে সকাল-বিকাল! জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে, চমকে উঠছে। রক্ত পরীক্ষা, এক্স রে করা হয়েছে কোন অসুখ ধরা পড়ছে না। জ্বর চলছে বিরামহীন।

‘কী করি বল তো তিসু।’ রায়নার কন্ঠে উদ্বিগ্নতা। মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।

‘ধৈর্য ধরো দিদি। ভালো হয়ে যাবে বিপুল।’ রায়নাকে সান্ত্বনার কথা বললেও তিসু কম চিন্তিত নয়। কী হয়েছে ওর ঠিকই বুঝতে পারছে তিসু। কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারছে না।

বিপুলকে বাঁচাতে হবে। বিপুল না বাঁচলে চলবে না। সকলের আদরের মানিক, একমাত্র বংশধর।

তাছাড়া বিপুলকে খুব ভালোবাসে তিসু। নিজের জীবনের থেকে তো কেউ বেশি ভালোবাসতে পারে না তবুও ওর মনে হয় নিজের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসে বিপুলকে! কিছুক্ষণ ইতস্তত: করে রায়নাকে বলে তিসু, ‘দিদি একটা কথা বলব যদি কিছু না মনে করো।’

‘কী মনে করব বলো। বল।’ চোখ মুছতে মুছতে ওর মুখের দিকে তাকায় রায়না। তিসু জা’-এর দিকে একবার তাকিয়ে জানালার বাইরে বাতাসে দোলায়িত বাগানবিলাসের দিকে তাকিয়ে বলে,

‘যদি তুমি বিশ্বাস করো দিদি, মাকে বলো একটা তাবিজ এনে দিতে পারো। মা-তো শা-পীরসাহেবের ওখানে যান।’ ওর কথা যেন এই পৃথিবী থেকে আসছে না, অন্যজগত থেকে ইথারের ভেসে আসছে! রায়না অবাক হলেও বলে, ‘এই কথা বলতে ইতস্তত: করছো কেন? ছেলের জীবন-মরণ যেখানে, সেখানে বিশ্বাস অবিশ্বাস কি কোন কাজ করে তিসু।’ ওরা কথা বলতে বলতে শাশুড়ি ঘরে এসে বিপুলের মাথার কাছে দাঁড়ায়।

‘এই যে দুজনেই আছ দেখছি। আমি তাবিজ এনেছি। তাবিজ আমি বেঁধে দিচ্ছি আর পানি পড়া খাইয়ে দিয়ো প্রতিদিন তিনবার চা চামচের দুই চামচ।’ বিপুলের দিদা খাটে ওর পাশে বসে বলে, ‘এই দাদু, উঠ তো। হাত দাও এটা বেঁধে দেই। এটা বাঁধলে কেউ আর তোমাকে ভয় দেখাতে পারবে না।’ শাশুড়ি তাবিজ বেঁধে দেয় বিপুলের বাঁ হাতে। তাবিজ

বেঁধে দিয়ে রায়নার দিকে ফিরে ওকে বলে, ‘ শোন বউমা, তুষারকে আবার বলো না এসব কথা।

আমার ছেলে তো আবার তাবিজ-কবচে বিশ্বাস করে না। তাবিজ-কবচ বিশ্বাস না করলে কোন ফল দেয় না।’ রায়না আর শাশুড়ি-মা যখন কথা বলছিল তখন তিসু পড়া-পানির বোতলের মধ্যে একটা পুরিয়ার সাদা সাদা গুঁড়া ঢেলে দেয় আর একটা পুরিয়ার গুঁড়া বালিশের নিচে ছড়িয়ে দেয়। এই  পুরিয়া সেই বাঁশিওয়ালা-বাবা দিয়ে গেছে। ওদের কথাবার্তার মাঝেই এসে দিয়ে গেছে তিসুর হাতে।

আফরোজা অদিতি
আফরোজা অদিতি
%d bloggers like this: