মানুষটার দ্বিতীয় জন্ম কিংবা প্রথম মৃত্যুর পর/ নাসরীন মুস্তাফা

মানুষটার দ্বিতীয় জন্ম কিংবা প্রথম মৃত্যুর পর

মানুষটা এমন কাজ না করলে অন্ততঃ বেঁচে তো থাকত! তা-ই বা বলছি কেন? মানুষটা তো বেঁচে আছে। বলেন ভাই, বেঁচে গেছে। বড় বাঁচা বেঁচে গেছে। কিন্ত আপনি বলেন তো, এ কেমন বেঁচে যাওয়া বেঁচে যে গেল, সে কি কি সে-ই মানুষ? সেই মানুষের মৃত্যু ঘটে গেছে, এমন কথাও তো অনেকে বলছে। বলছে না?

সেই মানুষ। মানুষটা আসলে সে-ই ছিল। যখন যা মনে হয়েছে, করেছে। মনে নেই, সেই যে একবার এক দিনমজুরের ঘরে মাঝরাত্তিরে ঢুকে গেল? লোডশেডিং ছিল বলে দিনমজুরের বউ ভেবেছে, তার নিত্যদিনকার মিনসেই বুঝি এয়েছে। ছেলেমেয়েরা অত রাত অব্দি জেগে ছিল না। তবুও নানা রকম খেলনা, খানাখাদ্য নিয়ে মাঝরাত্তিরে বাড়ি ফিরে বাপ্ যদি ঘুম থেকে ডেকে তোলে, তখন ঘুম ঘুম চোখে ছেলেমেয়েরা মনের আনন্দে বাপকে জড়িয়ে ধরে খুশির প্রকাশ ঘটিয়ে আবারও তো ঘুমিয়ে যেতে পারে, না কি? তেমনই নাকি ঘটেছিল। এমনকি দিনমজুরের বউ নিত্যদিনকার মুখ ঝাপটানি থামিয়ে তার জন্য আনা চিকনপেড়ে শাড়ি- ব্লাউজ-পেটিকোট আর কাঁচের চুড়ির বদলে সোনার চুড়ি দেখে নিজেকে উজাড় করে দিতে প্রস্তুত ছিল। পরদিন ফিরে আসা দিনমজুর যতই হঠাৎ এক কাজে আটকে গিয়ে আসতে পারেনি বলে, ততই আবিষ্কার করে বউ আর ছেলেমেয়েরা হঠাৎ কানে কম শুনছে আর হঠাৎই তার দিনপোড়া ঘেমো গন্ধওয়ালা শরীরে ভালোবাসা খুঁজছে। এক সময় দিনমজুরও হয়তো বিশ্বাস করতে চায়, সে-ই এসেছিল, সে-ই। হয়তো বিশ্বাস হয়ও। হয়তো বিশ্বাস না হলেও চেপে যায় আর দশটা সামাজিক মানুষের মতো। হয়তো চাপতে না পেরে কিংবা মানতে না পেরে বউকে একদিন যদি চুলের মুঠি ধরে বিদেয় করে, তাহলেও কেউ অবাক হবে না। কেনো না, বউ তাড়ানো স্বাভাবিক ব্যাপার কি না বলেন। আর বউটা…আপনি বলুন তো, নিজেকে উজাড় করে দেওয়া বউটা একবারও কি বুঝতে পারেনি ভিন্ন খেলোয়াড় মাঠে নেমেছিল তার? হয়তো ভেবেছিল, মিনসে’র আজ হল’টা কি! হয়তো এরপর সেই খেলা খুঁজতে খুঁজতে জীবনটা বয়ে গেছে তার। হয়তো ভেবেছিল, হঠাৎ পাওয়া উদ্দামতা বিভ্রান্তিই কেবল – এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।

মানুষটা আসলে দিনমজুরের জীবনের একটা রাতের স্বাদ চেখে দেখতে চেয়েছিল বলে শুনেছি। এভাবে নানান জীবনের স্বাদ চেখে দেখার বিলাসিতা ছিল তার। ঐ যে একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিল মনে আছে? বলেছিল, যে জীবন ফড়িংয়ের কিংবা দোয়েলের, সেসব জীবনে ঢুঁ মারা সম্ভব হয় না বলে তার দুঃখের শেষ নেই। আর আনন্দ এ-ই, যখনি যা ইচ্ছে হয়েছে, তা-ই করেছে সে। অঢেল অর্থসম্পদ তার ইচ্ছে পূরণ তো করেছেই, নতুন নতুন ইচ্ছেকে জাগিয়ে দিয়েছে ক’দিন পর পর।

এই যে বলছি, মানুষটা এমন কাজ না করলে অন্ততঃ বেঁচে থাকতো, তা তো এক প্রকার ইচ্ছে পূরণেরই খেসারত। মানুষের সব স্মৃতি সাজানো থাকে মস্তিষ্কে, কেবল মাত্র মায়ের গর্ভে কাটানো সময়টুকুতে কি ঘটে তার হদিস নেই। মানুষের জন্মের সাথে সাথে জন্ম নিতে থাকে জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার স্মৃতিরা। প্রথম কান্নার স্মৃতিটুকু জাগিয়ে তুলেছিল। এরপর জানতে চেয়েছিল আরও পেছনের কথা। স্মৃতিকোষে নেই। অগত্যা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, গর্ভেই ফিরতে হবে তাকে। জলজ্যান্ত একটা মানুষ গর্ভে ঢুকে যাবে, জলজ্যান্ত মস্তিষ্কের স্মৃতিকোষে সাজাবে গর্ভকালীন স্মৃতিগুলো এবং জলজ্যান্ত মানুষ হেতু গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসবে স্মৃতিগুলো সাথে করে। বিশেষ করে প্রসবকালীন সময়ের যুদ্ধকালীন স্মৃতির দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। সমুদ্র থেকে প্রবালসমেত ঝিনুক কুড়ানোর মতো করে স্মৃতি কুড়িয়ে জীবনে ফিরবে, মানুষটা এমনই ভেবেছিল বৈকি। 

প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার একটা মানুষ বাস করবে দশ মাস দশ দিন, শুনেছি সেরকম একটা গর্ভই বানানো হয়েছিল। একেবারে মায়ের গর্ভের মতো সুযোগসুবিধা সেখানে। গর্ভের ভেতরে এক বেলুন, তাতে আরামদায়ক উষ্ণ তরলের মাঝে মানুষটা ঢুকে গেলে তার নাভিতে পুষ্টিনল সংযুক্ত করা হয়। মানুষটা তো মানুষ। তার তো আর ভ্রুণ থেকে শরীর তৈরির হ্যাপা নেই, তাই না? এরপরও মানুষটার চাপাচাপিতে ভ্রুণাবস্থার কাছাকছি নেওয়া হয়েছিল নাকি শরীর। হৃৎপিন্ড রক্ত পাম্প করলেও নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নেওয়ার পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরীরে অক্সিজেন ঢোকা আর কার্বন ডাই অক্সাইড বের করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আর কিছু না। না কিছু দেখতে পাওয়া, না কানে শোনা, না কিছু ভাবা, কোন্নো কিছু না। বুঝতেই পারছেন, ধনকুবের এক জলজ্যান্ত মানুষ যার বয়স হয়েছিল একান্ন বছর তিন মাস সাতাশ দিন, সে কি না ভ্রুণ শরীরের মতো কাজহীন-ভাবনাহীন এক সময় কাটিয়েছে। আমরা হা করে তাকিয়ে থাকতাম ব্রেকিং নিউজের জন্য, তাই না? কবে না শুনি, গর্ভপাত ঘটে গেছে! কবে না শুনি, গর্ভের সন্তান নড়ছে না! কবে না শুনি, বেলুন ফেটে পানি বেরিয়ে গেছে, তাই না?

এসব আমরা শুনিনি। শুনেছি, ষোল সপ্তার মাথায় মানুষটার কানকে কাজ করতে দেওয়া হয়। এতে গর্ভের ভেতর থেকে মানুষটা শুনতে পেত বাইরে কি কি ঘটছে। মনে আছে, গর্ভের ঠিক পাশে জাস্টিন বিবারের কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছিল? বেচারা বিবার, আশি বছর বয়সী শরীর নিয়ে ‘এরকম স্টেজে এর আগে গাইনি’ বলে কেশেপেঁদে একেবারে যা তা। নতুন গান গেয়েছিল- তোমায় গান শোনাবো, তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ!

সবাই আসলে জেগে ছিল, বলেন! সাতাশ সপ্তার মাথায় চোখ খুলেছিল মানুষটা, গর্ভের ভেতর ঢুকে পড়া আলোর আনন্দ দেখে কী ভেবেছিল, ভাবতে গেলে আমার কী যে লাগে! দশ মাস দশ দিন যেদিন হ’ল, উত্তেজনায় অনেকেই হৃৎস্পন্দনের তাল হারিয়ে চিৎপটাং হয়েছে, আমারও মনে হচ্ছিল এই বুঝি গেলাম। কোনোমতে নিজেকে সামলেছি। আপনিও? বেশ বেশ। আসলে প্রতি মুহূর্তে ধারাভাষ্য হচ্ছিল, শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসার যে যুদ্ধ আপনি-আমি একদিন করেছিলাম, তা-ই বুঝি করছি! সেদিন জয়ী হলেও আজ হবো কি না, সেই দুঃশ্চিন্তা সাংঘাতিক! অমানুষিক, বলেন!

নিয়মিত বিরতিতে কৃত্রিম প্রসব ব্যথার মতো তীব্র কম্পন পাঠানো হচ্ছিল বেলুনের ভেতরের তরলে। গর্ভ ভেতরের সবকিছু নিয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল নিজের ভেতর, আবার ফিরছিল আগের আকারে, আবার কুঁকড়ে যাচ্ছিল ভেতরে। ভেতরের সবকিছু, সেই তরলভর্তি বেলুন, বেলুনের ভেতর ভাসমান মানুষটার কী হাল ভাবতে ভাবতে ঘুমাতে পারিনি গোটা রাত্তির। এইসব যন্ত্রণাকাতর স্মৃতি সংগ্রহের জন্য নিজেকে এভাবে সঁপে দেওয়া ঠিক হ’ল কি না তা নিয়ে দিনভর, রাতভর আলাপ করছিল সকলে। টেস্ট ম্যাচের মতো দল কত রান করল, সেই স্কোরের মতো মানুষটার শরীর গর্ভ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে ঠিকঠাক কতটুকু ঘুরলো, কতটুকু এগুলো, সেইসব স্কোর অনেক বেশি মনোযোগ কেড়েছিল আমাদের, তাই না? তবে সবচেয়ে বেশি হল্লা হ’ল কী নিয়ে, তা তো বলাই বাহুল্য। গর্ভ বানিয়ে দেওয়া আর এতদিন গর্ভের দেখভাল করা বহুজাতিক কোম্পানিটার সিইও নির্লজ্জের মতো ঘোষণা করেছিল, প্রসবের যুদ্ধে হেরে গেলে এত দিন ধরে গড়ে ওঠা স্মৃতিসম্পদ হাতছাড়া হয়ে যেতে বলে তারা এখনি মানুষটা মস্তিষ্কের সাথে সংযোগ ঘটিয়ে স্মৃতি সংগ্রহ করতে চায়। এর মানে কি? কী নিষ্ঠুরের মতো বলতে চাইছে, মানুষটা প্রসবের সাথে সাথে মরে যেতে পারে! গর্ভেই মেরে ফেলেছে কি না এই সন্দেহে মানববন্ধন শুরু হয়ে গেল। নিরাপদ জন্ম সব শিশুর অধিকার, বহু পুরনো শ্লোগানটাই আবার ফিরে এল আমাদের চিৎকারে। এর ফলে স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত হ’ল। গর্ভের অন্ধকারে একটা মানুষ যুদ্ধ করছে, সেই মানুষটা এই পৃথিবীর বীর হয়ে উঠল। সবাই মানুষটার জন্মের জন্য অপেক্ষায় ছিল। প্রার্থনার ঝড় উঠেছে। কেঁদেছে কতজন! 

এরপর, এই তো একটু আগে আমরা দেখলাম, গর্ভ থেকে বিপুল বেগে তরলসমুদ্র মন্থন করে উদগিরণ ঘটল মানুষটার। উলঙ্গ ফ্যাকাসে শরীর তরলের ভেতর পড়ে ছিল নিঃশ্চুপ। শব্দ ছিল না লাইভ দেখতে থাকা কারোর মুখে। দ্রæত শরীরটাকে পরিস্কার করে তোয়ালে পেঁচিয়ে রাখা হ’ল ট্রেতে। ধারণা করা হচ্ছিল, সুস্থির হয়ে উঠলে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জেগে উঠে মানুষটা নিশ্চয় বলবে, ইচ্ছেপূরণ হয়েছে। এখন আমি নতুন ইচ্ছে পূরণের কথা ভাবছি।

নতুন ইচ্ছে কি হতে পারে? জন্মগ্রহণের স্বাদ নিতে পারা মানুষটা কি এবার মৃত্যুর স্বাদ নিতে চাইবে? আমি এরকম কত কি ভাবছিলাম, জানেন? এরপর আর সবার মতো আমার সব ভাবনা কষে চড় বসিয়ে দিল আমার গালে, যখন শুনলাম প্রায় ছয় ফুট লম্বা শরীরের সদ্যোজাত এক শিশু তারস্বরে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছে, যে কান্না যে কোনো শিশুর কান্না থেকে একেবারেই আলাদা করার যো নেই।

পুরো ঘটনার সমাপ্তি ঘটিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে যা বললেন কর্তাব্যক্তিরা, তা হচ্ছে- মানুষটার মস্তিষ্কের স্মৃতিকোষে গর্ভকালীন ঘটনার কিছুই পাওয়া যায়নি। কান্না থেকে হুঁশ এসেছে তার, শুরু হয়েছে স্মৃতি তৈরির কাজ। এর অর্থ, মানুষটা আরেকবার জন্ম নিয়েছে। 

এই আরেকবার জন্ম নেওয়ার অর্থ কি সে-ই মানুষটার জন্ম নেওয়া? আমার তো মোটেও সেরকম মনে হয় না। এ তো সত্যি সত্যিই এক নতুন জন্ম। নতুন জীবনের জন্য যাত্রা। এর অর্থ, সেই মানুষটার মৃত্যু ঘটেছে। আহা রে, মানুষটা এমন কাজ না করলে অন্ততঃ বেঁচে তো থাকত! এই মানুষটা কিছুতেই সেই মানুষটা হতে পারে না। কিন্তু শরীর তো সেই মানুষটার। তাহলে কী করে বলি, সেই মানুষটা বেঁচে নেই! বলেন ভাই, বেঁচে গেছে। বড় বাঁচা বেঁচে গেছে। কিন্ত আপনি বলেন তো, এ কেমন বেঁচে যাওয়া? মানুষটার দ্বিতীয় জন্ম কিংবা প্রথম মৃত্যুর পর বেঁচে যাওয়াকে মানুষটারই বেঁচে থাকা কীভাবে বলতে পারি, বলুন তো!

নাসরীন মুস্তাফা
নাসরীন মুস্তাফা