আমার সাতকাহন – ১ / ছন্দা দাশ

আমার সাতকাহন 4

আমার সাতকাহন 3

ধারাবাহিক রচনা

আমার সাতকাহন/ ছন্দা দাশ

পর্ব  -১

 

আমার সমস্ত সুখের স্মৃতি আমার শৈশবকে ঘিরে। তাই অবসরে আমার সমস্ত ভাবনা জুড়ে থাকে শৈশবের স্মৃতি। এক এক দিন আসে এক এক ভাবনা জড়িয়ে।কোন কোন  দিন দিনগুলো যেন বড় বেশি আলোকময়,বড় বেশি উজ্জ্বল।

 

আজ ভোরে দরজা খুলেই দেখি কুয়াশা ঢাকা চারধার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু  তার মধ্যই এক রসওয়ালা আসছে রসের হাঁড়ি নিয়ে এদিকপানে।নিমেষেই  আমি ফিরে যাই আমার গন্ধমাখা শৈশবের পৌষে।ঠিক এমনি সময়েই বলতাম “হা রে রে রে,রে রে আমায় ছেড়ে দেরে দেরে। যেমন ছাড়া বনের পাখি মনের আনন্দেরে।”বছরের শেষ সময়।বার্ষিক পরীক্ষাও শেষ।নেই পড়ার অত্যাচার,মায়ের বকুনী। শুধু খেলা আর খেলা।নাটক,পৌষের মেলা।ঘুম ভাঙার আগেই বাইরে

বারান্দায় রস নিয়ে রসওয়ালার ডাক। প্রথম কাটার

রস নিয়ে এলাম গিন্নীমা।আমার মাও ঝকঝকে বালতি

ভর্তি রস নিয়ে আমাদের বলতেন, একগ্লাস করে খেয়ে

নাও। খেতে ইচ্ছে করছে না একথা বলার সাহস নেই । মা বলেছে, আমরাও সোনামুখ করে খেয়ে নিতাম সবাই। এখনকার বাচ্চাদের এমন অনুগত এখন দেখি না। বরং এর উল্টোটাই এখন যেন স্বাভাবিক।

 

মা রস নিতে নিতেই রসওয়ালাকে বলে দিতেন আবার শেষ কাটার রস দিয়ে যেতে।আমার মা সব সময় নিয়ম

মত চলতেন।প্রয়োজনের বেশি কখনো কিছুই গ্রহণ

করতে চাইতেন না।সময়ের বাইরেও যেতে পছন্দ করতেন না।ঘড়ির কাঁটা চলতে ভুল হতে পারে আমার মায়ের  কখনই না।বেলা দেখেই বলে দিতেন সময় কত? রসওয়ালার পরে আসত মিষ্টিওয়ালা। মিষ্টির মতই ছিল

তার স্বভাব। মুখখানাও তার বড় মিষ্টি । বিশ্ববিদ্যালয়ে পরবর্তিতে এম,এস,সি ক্লাসে Evolution পড়াতে পড়াতে শিক্ষক যখন একদিন বললেন, কোন কোনো পরিবার বংশ পরম্পরাগতভাবে একই পেশায় নিযুক্ত থাকলে তার

প্রভাব তার চেহারায়ও এসে যায়। সেদিন ক্লাশে বসে

আমার মিষ্টিওয়ালার মুখখানি  ভেসে উঠে। সেই মিষ্টিওয়ালা তার ঘর থেকেই এসব মিষ্টি তৈরি করে

কলেজ ক্যাম্পাসের অধ্যাপকদের বাসায় বিক্রি করতেন। তার তৈরী প্যাড়ার স্বাদ এখনো আমি ভুলিনি। মায়ের

নির্দেশ ভোর ছটার মধ্যেই বিছানার মায়া কাটাতেই হবে।

এ নিয়মের ব্যাতিক্রম হবে না। কারণ মা খুব তেজস্বিনীও। আমার মায়ের পরে যাকে আমরা ভয় পেতাম, শ্রদ্ধা করতাম সে আমাদের  বড়দি অনুভা হোর সরকার। আমরা পাঁচ বোন দুই ভাই। চার বোনের পর প্রথম ভাইটি যখন হয় সেদিন কেমন আনন্দের উৎসব হয়েছিল আমি দেখিনি, জানিও না। তার কারণ আমি এই ভাইয়ের পর পৃথিবীতে এসেছিলাম।  আমার পরে আর একটি ভাই।

এই সাত ভাই বোন চাঁদের হাটের মতো আনন্দ আর ভালোবাসায় বড় হয়েছি। তা আজও আমাকে জাগিয়ে রাখে।

বড়দি আমাদের মায়ের মতো। আদর আর শাসন দিয়ে  আমাদের বড় হবার রাস্তা তৈরি করে দিয়েছেন।

বড়দি সবসময় আমাদের শাসন করতেন, পড়াতেন । তবে তার শাসন ছিল উপদেশ মূলক গল্প দিয়ে। আমরাও মেনে নিতাম তা আনন্দের সাথে । পরবর্তীকালে সেটা আমাদের জীবনে কল্যাণ বয়ে এনেছে।

 

মেজদি অনুপা দেওয়ানজি (ইরা) ছিল স্নেহের এক প্রতিমূর্তি। সারাজীবন আমি তার কাছ থেকে মায়ের মত স্নেহ,ভালেবাসা দুহাত ভরে নিয়ে গেছি। বিনিময়ে তেমন কিছু দিইনি। দাদা আজও ফোনে আমাকে বলে,

অঋণী হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার চেষ্টা করবি। কিন্তু আমরা যে কত রকম ঋণে প্রতিদিন আবদ্ধ হই। শুধু কি অর্থঋণ? ভালোবাসার দায় যে আরও বড় ঋণ!

 

আমাদের সংসারে ‘কেষ্ট ‘নামে পরিবারের একজন সদস্যদের মত কাজের লোক ছিল যে আমাদের কোলে পিঠে বড় করেছে। সবরকম কাজই করতো। তবুও মা আমাদের কিছু কিছু কাজ ভাগ করে দিয়েছিলেন। বড়দির কাজ ছিল ছোটভাই বোনেদের পড়ানো আর শাসন করা।মা বলতেন বড়জন হচ্ছে জাহাজের ক্যাপ্টেন। সে যে পথে

চলবে বাকীরা সে পথ অনুসরণ করবে। বাকীদের কি কাজ মনে নেই। আমার কাজ ছিল রোজ সবার জুতো

মুছে মুছে আবার সাজিয়ে রাখা । আমি ছোট ছোট হাতে

সব সাজিয়ে বাবার জুতোয় কালি লাগিয়ে একটা কাপড়

দিয়ে ঘষে ঘষে চকচকে করবার চেষ্টা করতে চাইতাম। প্রায়ই বাবা এসে আমাকে উঠিয়ে কাজটি করে দিতেন

মা দেখার আগেই। এখনো সে স্মৃতি আমাকে কাঁদায়!

এ কাজটি করেই আমার ছুটি।বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে মাঠ,ঘাট,বাট,ধানক্ষেত,পাখির বাসা, এমন আরও কতো কি!

(চলবে)

ছন্দা দাশ 
ছন্দা দাশ
%d bloggers like this: