আমার সাতকাহন-৩ / ছন্দা দাশ

আমার সাতকাহন 4

আমার সাতকাহন 3

আমার সাতকাহন-৩ / ছন্দা দাশ।

 

কোন সকালে মাঠে এসে দেখতাম কেউ নেই। হয়তো আগেই ওরা খেলতে এসে অন্য কোথাও মেতে আছে। আমি তখন একাই হাঁটতে থাকি। তখনও সকালের নরম প্রকৃতি গা ঝাড়া দিয়ে ওঠেনি। খেজুড়েরা তাদের কলস ভরা রস গাছ থেকে নামিয়ে জড়ো করছে। আমি কলসহীন কোন গাছের নীচে হাঁ করে দাঁড়িয়ে পড়ি। গাছের মিষ্টি রস ফোঁটা ফোঁটা মুখে এসে পড়ে। এর স্বাদ গ্লাস ভর্তি রসের স্বাদের চাইতে আলাদা। পর মুহূর্তেই চোখ পড়ে বরই গাছের দিকে। হলুদ রঙ ধরা বরই দেখে মুখে পানি এসে যায়।মাটি থেকে ঢিল কুড়িয়ে ছুঁড়েই দিতেই ঝর ঝর করে বরই মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। তাই কুড়িয়ে কলেজের ভিতর গেইটে আসতেই পেয়ে যাই আশ পাশের গ্রামের গরু ছাগল চড়াতে আসা শিশুর দল মার্বেল বা ডাংগুলি খেলায় মত্ত। সব ভুলে ওদের সাথেই মেতে উঠি খেলায়। তাদের না পেলে হাঁটতে হাঁটতে অন্য পাশের গেইট পেরিয়ে আসি যেখানে বিশাল এক দিঘী যা লালা দিঘী নামে পরিচিত। সে আমার মামাবাড়ির দিঘী। দিঘীর পাড়ে বিশাল বট গাছ যার থেকে নেমে আসা ঝুরি কালের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। দিন দুপুরেও গাছের কোটরে নিম পেঁচা ডাকে। আর তক্ষক তো আছেই। অন্য পাড়ে হরি মন্দিরের সিঁড়ি দিঘীর স্বচ্ছ টলটলে জলের মধ্য চলে গেছে। তখন আমার মনে হত সিঁড়ি বেয়ে জলে নামলে যক্ষপুরীতে যাওয়া যাবে। যেখানে রাজকন্যা বন্দী হয়ে আছে। আমার দাঁড়িয়ে থাকা পাড়ের কাছে আকন্দ গাছের ঝাড়। আর আছে কচু বন, চোরকাঁটা। কচুপাতা নিয়ে আকন্দের ডাল ভেঙে তার রস পাতায় জমা করি। চোরকাঁটা গিঁট দিয়ে আকন্দের রস নিয়ে ফুঁ দিতেই ছড়িয়ে পরে ফেনার মত ছোট ছোট বেলুন।মহানন্দ সে মুহূর্ত!

 

আবার কোন সকালে বন্ধুদের পেয়ে যাই দিঘীর পাড়ে। হয় লাটিম হাতে নয়ত নাটাই হাতে।লাটিম ঘোরতেও আমি ভালোই পারতাম।আবার কখনো দেখি ওরা লাইন বেঁধে দিঘীর জলে কি দেখছে।এক ছুটে গিয়ে দেখি গ্রামের ঐ ছেলে মেয়ের দল দিঘীি থেকে শাপলা তুলছে। তিন কোণা সিঙাড়ার মতো এক ধরনের মূলও তুলতো, আর তুলতো ভাতফল নামে এক ধরনের ফল। তার খোসা খুললে ভাতের মত ছোট ছোট দানা বেরুতো। আমার সে ফলের স্বাদ ভালো লাগত না। বরং দিঘীর পাড়ে ছোট ছোট ঝোপে এলেনা নামে যে টক টক ফল ছিল সে ফল মুঠো ভর্তি নিয়ে খেতে খেতে আরেকটু এগিয়ে গেলেই দেখা হয়ে যেত স্বর্ণদির সাথে। কলেজের পাশেই তাদের ঘর বাড়ি।প্রয়োজনে ওরা মাকে কাজ করে দিত আবার গল্প করতেও আসতো।কাজ শেষ মা যখন সেলাই হাতে বারান্দায় বসতেন ওরা আসতো তখন। এমন আরও অনেকে আসতো। কখনো আমি চুপটি করে মায়ের একপাশে এসে বসে শুনতাম সে গল্প।বেশ লাগতো আমার শীতের উত্তাপ নিতে নিতে  গল্পের ভিতরে ঢুকে যেতে। স্বর্ণদি আমাকে বলতো খুড়িমার কাছে যাচ্ছি। বড় মাছ ধরা পড়েছে। ঘোষ পুকুরে জাল ফেলেছে আজ। আমি হেসে লাফাতে লাফাতে এগিয়ে যাই। তখন হাঁটতাম না লাফিয়ে যাওয়ার বয়স।সামনেই শ্যাম রায়ের হাট। কেউ কেউ বলতো হাটখোলা। আমার বেশ লাগে এ নাম।

 

নামের সাথে বাংলার আবহমান রূপ যেন জড়িয়ে থাকে। হাট নেই আছে বেশ কিছু দোকান আর ডাকঘর। কখনো ঢুকি ডাকঘরে।আমাদের চিঠি এলো কিনা দেখে নিই। ডাকঘরে ঢুকলেই মনে হত এখানে কি এক সময় রতন থাকতো। ডাকঘরের পেছন দিকটায় জংগলে ঘেরা। অনেকদিন মনে করতাম শরৎচন্দ্রের বিলাসী এই জংগলে থাকে।কেন মনে করতাম আজ আর মনে নেই।হাটখোলার মাঝখানে বিশাল পাকুড় গাছে রাজ্যের পাখির বাস। তার নীচে বসে জুতো সেলাই করে যে মুচি সে বিহার থেকে এসেছে। বাংলা ভালো বলতে পারে না। একমাত্র ছেলে শান্তলালকে নিয়ে থাকে হাটেই।বাবারা শান্তলালকে পড়বার সমস্ত সুযোগ করে দিয়েছেন।শান্তলাল নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় হয়েছিল পরে। সেই মুচির পাশে বসেও দেখতাম কি করে জুতো সেলাই করতে হয়।তখন চোখে যে রাজ্যের বিস্ময়

 

এই হাটখোলায় ছোটখাটো যে মেলা বসতো বাসার কাছে বলে আমরা যে কতবার আসতাম আর যেতাম কিন্তু বড় যে মেলা বসতো তখনো ওখানে যাবার বয়স হয়নি।কারণ সে মেলা ছিল মাইল খানেক দূরে।তখন আমাদের কাজের মানুষ কেষ্টদার সাথে বড়দি, মেজদি, সেজদি, ছোড়দি পাশের বাসার প্রিন্সিপ্যাল মাখন লাল নাগের ছেলে মেয়েরা (উনি কোলকাতার লোক) একসাথে মেলায় যেত। তখন তো কেউ শহরে তেমন আসত না। সে মেলা ছিল সবার আকর্ষণ। মেজদি সব সময় তার পয়সা থেকে আমার জন্য সুন্দর সুন্দর খেলনা নিয়ে আসতো। বেলুন বাঁশি, লারেলাপ্পা চুড়ি,পানির বল,সকাল বিকাল,তালপাতার সেপাই,স্প্রিং-এর বুড়ো,টম টম গাড়ি। কেষ্টদা মায়ের আদেশমত  ঝুড়ি বোঝাই করে মাথায় নিয়ে আসতো যে জিনিষ তা অন্য সময় পাওয়া যেত না। শীতল পাটি,তাল পাতার পাখা, ঝাড়ু মারকা বলে একরকম  সব্জী। মেলা আসলেই বোঝা যেত। কারণ পেঁ পুঁ শব্দে সকাল থেকে রাত পাড়া মুখরিত। মেলার আর এক আকর্ষণ ছিল চনা মনার ঠ্যাং, লাল বুট সাদা বুট,ঢাকাই বড়ই। আমরা যখন মেলায় যেতাম তখন আর বড়দিরা মেলায় যেত না।

 

আমি,দাদা (অরুনাংশু হোর), ছোট ভাই (অমলাংশু হোর) আর পাশের বাসার ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হাবিবুর রহমান সাহেবের (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) ছেলে তুষার,সাগর,প্রবাল এরা।আমরা প্রথমেই গিয়ে উঠতাম নাগরদোলায়। ভয়ে চোখ বন্ধ করে রাখতাম কিন্তু মনে খুশির বন্যা! আর ছিল বাইস্কোপ দেখা। যে লোকটি তা দেখাতো তার পরনের কাপড় অনেক রঙে রঞ্জিত।আমরা একচোখ বন্ধ করে বাকী চোখ দিয়ে দেখতাম কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়ে লোকটি গান গাইতে গাইতে  ছবি বদল করতো। এরকম “অস্ট্রেলিয়া নাম শুনেছো চক্ষে দেখ নাই, ওগো নিতু নাম শুনেছো চক্ষে দেখে যাও।”আব্বাসের মা পোলা পালিছে কেমনে দেখে চাও,ওগো নিতু আইস দেখে এসব শিখে নাও “ মেলায় জুয়া খেলাও হতো। একটাকা দিলে দুটাকা এমন কি একশ টাকাও হয়ে যায়।আসলে ওদের লোকই এসব পেয়ে মানুষকে আকর্ষণ করতো। সব বড় মানুষ খেলত। একবার কি এক আকর্ষণে আমি ওদের পায়ের ফাঁক গলিয়ে  চারআনি ছেড়ে দিলাম।লোকটি বোর্ডটি ঘুরিয়ে দিতেই আট আনা। আমি তা নিয়েই এদিক ওদিক না তাকিয়ে একছুটে কেষ্টদার হাত ধরি।

(চলবে)

ছন্দা দাশ 
ছন্দা দাশ
%d bloggers like this: