একাত্তরের বীরাঙ্গনা  /অনুপা দেওয়ানজী

অনুপা দেওয়ানজী

 

 

রিংকু তার প্যান্টের পকেটে হাত দিতেই মনে পড়ে গেল আসার সময়ে খুব কুয়াশা ছিল বলে সে মোবাইলটা রুকস্যাকের  ভেতরেই রেখেছিল।সেখান থেকে আর বার করা হয়নি। 

চা খেতে গিয়ে রুকস্যাকটা খুলেই ওটা বার করতে গিয়েও আবার ভেবেছিল চাটা খেয়েই ওটা বার করবে।

 কিন্তু তার আগেই রিয়া আর সে মেঘের পেছন পেছন ছুটতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলবে তা কে জানতো !

এখন পথ হারিয়ে বুঝতে পারছে কি বোকামিটাই না সে করেছে।

বাবা আর মা নিশ্চয় ফোন করছে।  তাদের না পেয়ে কি করছে কে জানে?

রিয়াটার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। ভয়ে,ক্লান্তিতে  আমসির মতো শুকিয়ে মুখটা এতটুকু হয়ে গিয়েছে।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ জঙ্গলের ভিতরেই খুব সরু একটা পথের মত দেখতে পেয়ে রিংকু রিয়ার হাত ধরে সেই পথটাতে এসে দাঁড়ালো ।

  পথটা আঁকাবাঁকা হয়ে একটা  খাড়া পাহাড় বরাবর চলে গিয়েছে।পাহাড়ের চুড়ায় দেখা যাচ্ছে একটা পর্ণকুটির। 

পাহাড়টা এত খাড়া যে ওই পাহাড় বেয়ে  উঠতে গেলে  কতদিন যে লাগবে তা ভেবে দুজনে শিউরে উঠলো।  এরই মধ্যে তাদের দম যেন ফুরিয়ে এসেছে। তারপরেও ওই পর্ণকুটিরে  নিশ্চয় কেউ থাকে।

 তাঁর কাছে যেতে পারলে পথের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে ভেবে  তারা যে করেই হোক ওই পাহাড়ের চূড়ায় উঠবে সিদ্ধান্ত নিলো।

অনেক কষ্টে বেশ কিছুদূর এগিয়ে যেতেই  ওরা  দেখে একজন আদিবাসী বুড়িমা সেই পথটা দিয়েই তরতর করে নেমে আসছেন।

বুড়িমাকে দেখে তারা যেন প্রাণ ফিরে পেলো। নিশ্চয় তিনি এখানকার সব কিছুই চেনেন।

বুড়িমা এই গভীর জঙ্গলে ফুটফুটে দুটি ছেলেমেয়েকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

: তোমরা এই গভীর জঙ্গলে একা একা কেমন করে এলে? কোথা থেকে এসেছো? পথ হারিয়ে ফেলেছো বুঝি?

 আদিবাসী হলেও বুড়িমাকে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে দেখে রিংকু বুড়িমাকে  তাদের বিপদের কথা বুঝিয়ে বলতেই বুড়িমা বললেন,

: তোমরা কোন ঝর্ণার ধারে পিকনিক করতে এসেছিলে?

রিংকু ঝর্ণার নাম বলতেই বুড়িমা বললেন তোমরা তো অনেক দূর পথ চলে এসেছো। আমার সাথে চল আমি তোমাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবো।

রিয়া আর রিংকু তাঁর কথায়  যেন প্রাণ ফিরে পেলো। তারা দুজনেই বুড়িমার কথায় আশ্বস্ত হয়ে তাঁর সাথে সাথে পথ চলতে লাগলো।

যেতে যেতে রিংকু জিজ্ঞেস করলো,

: বুড়িমা এই পাহাড়ের কোন জায়গায় থাকে?

বুড়িমা ঘুরে দাঁড়িয়ে উপর দিকে আঙ্গুল তুলে সেই পর্ণকুটিরটি দেখিয়ে বললো,

: ও-ই যে আমার বাড়ি।তোমরা তো আমার বাড়ির পথ ধরেই এগিয়ে যাচ্ছিলে। পথটা তোমাদের জন্যে অত সহজ নয়। আমার অভ্যাস আছে বলে আমি রোজ একবার করে নেমে আসি কাজের জন্যে।

রিয়া জিজ্ঞেস করলো ওই বাড়িতে আর কে কে থাকে?

বুড়িমা বললেন আর কে থাকবে গো মা। আমি একাই থাকি।

রিয়া  জিজ্ঞেস করলো,

: একা একা কেন থাকো? তোমার ভয় লাগে না? তোমার ছেলেমেয়েরা তোমাকে দেখে না?

বুড়িমা বললো ছেলেমেয়ে থাকলে তো খবর নেবে?

রিংকু জিজ্ঞেস করলো আর কেউ নেই?

বুড়িমা বললো,

: ছিলো তারা আমাকে দূরদূর করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে?

রিয়া আর রিংকু দুজনেই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

: তাড়িয়ে দিয়েছে?  সে কি! কেন তাড়িয়ে দিয়েছে  বুড়িমা? বলবে আমাদের? 

বুড়িমা বললেন সে অনেক কথা। ১৯৭১সালেই আমার বিয়ে হয়। তখন সবে আমার ১৫ কি ১৬ বছর হবে। চারিদিকে তখন রাজাকার আর পাক সৈন্যদের ভয়ে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। আমরাও বিভিন্ন জঙ্গলে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতাম। ধরা পড়ার ভয়ে একই জঙ্গলে বেশিদিন থাকতাম না। কিন্তু  তারপরেও আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান আমাকে পাকিস্তানিদের হাতে ধরিয়ে দেয়। পাকিস্তানিরা তো আমাদের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর চিনতো না। চেয়ারম্যান ধরিয়ে না দিলে আমি ধরা পড়তাম না।

ধরা পড়ার পরে ওরা আমাকে তুলে নিয়ে যায় একটি ক্যাম্পে। এরপরে সেই ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে সেখান থেকে যে আরও কত ক্যাম্পে নিয়ে অত্যাচার করেছে সেই অত্যাচারে আমি আধমরা হয়ে গেলাম।

এর মধ্যে এক মেজর আমাকে দেখে কি ভেবে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তোলে। কিন্তু তার সুস্থতার  উদ্দেশ্য  ছিল সে নিজে আমার উপর অত্যাচার করবে । তাও একা নয়,  তার বন্ধুদের নিয়ে। ক্যাম্পে শুধু আমি একা ছিলাম না। শত শত মেয়ে ছিল। ভাবতাম এভাবেই হয়তো একদিন মরে যাবো। দেশের খবর কিছুই জানতাম না।

এক সময়ে সেই ক্যাম্পেই দেখি মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা এসে বললো আমাদের দেশ এখন স্বাধীন। তোমরা সবাই মুক্ত।  নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাও।

সবাই আনন্দের সাথে ছুটে বেরিয়ে এলাম। দীর্ঘ নয় মাস পরে মুক্ত আলোবাতাসে এসে কি যে ভালো লাগছিলো তা আর বলার নয়!

প্রথমেই ছুটে গেলাম শ্বশুরবাড়িতে । কিন্তু ওরা আমাকে দেখেই দূরদূর করে তাড়িয়ে দিলো। স্বামী ঘেন্নায় ফিরেও তাকালো না।

এরপর গেলাম বাবা মার কাছে। বাবা মা নিশ্চয় মেয়েকে তাড়িয়ে দেবে না। কিন্তু আমার সেই বোঝা যে কত ভুল ছিলো যখন তাঁরা আমাকে বললেন আমাকে বাড়িতে আশ্রয় দিলে নাকি আমার ছোট বোনদের বিয়ে হবে না।গ্রামের লোকেরা বললো,  আমি গ্রামে থাকলে  গ্রামও নাকি নষ্ট হয়ে যাবে।

তখন মনে মনে বললাম,  জঙ্গলে গিয়েই থাকবো । জঙ্গল নিশ্চয় আমাকে দেখে ঘেন্নায় ঠেলে দূরে সরিয়ে দেবে না।

তাই নিজেদের গ্রাম থেকে অনেক দূরে যেখানে আমাকে কেউ চিনবেনা তেমন একটি জঙ্গলে এসে নিজের জন্যে ডেরা বাঁধলাম।

কিন্তু খাবো কি?

 এজন্যে কারও ক্ষেতে খামারেই কাজ করি লোকালয়ে কখনও যাই না। 

বুড়িমা বলতে বলতে হঠাৎ কথা থামিয়ে বললেন,  ওই যে শুনতে পাচ্ছো ঝর্ণার শব্দ? একটু এগিয়ে গেলেই ঝর্ণা দেখবে।

 রিংকু আর রিয়া দেখে সত্যিই তারা যেখানে এসে থেমেছিলো সেই জায়গাতেই বুড়িমা তাদের নিয়ে এসেছেন। দেখা যাচ্ছে সবার ছোটাছুটি।

বুড়িমা তাদের পৌঁছিয়ে দিয়ে বিদায় নিতে চাইলে রিয়া আর রিংকু তাঁকে ছাড়তে চাইলো না। কিন্তু বুড়িমা কিছুতেই তাদের সাথে যেতে চাইলেন না। বললেন,

: আমি মানুষের মধ্যে যাই না। মানুষ এখনও বীরাঙ্গনাদের দেখলে  মুখ ফিরিয়ে নেয়। অথচ এতে আমাদের কি অপরাধ বলতে পারো? 

তারপর রিয়া রিংকুর  মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

 আশীর্বাদ করি অনেক বড় হও।  বড় হয়ে একদিন তোমরা মানুষের এই ভুল শোধরানোর দায়িত্ব  নেবে আশা করি ।

এই বলে ধীরে ধীরে আবার নিজের পথে এগিয়ে যেতে লাগলেন।

%d bloggers like this: