উন্মোচিত আত্মার গান/ মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান

নজরুল ইসলাম খান

 

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় ইডেন মহিলা কলেজে অধ্যাপনা করার সুযোগ আসে। যতদূর মনে পড়ে, আমার লেখা মাস্টার্সের একটি বই তৎকালীন প্রফেসর বিলকিস বানুকে সৌজন্য কপি দেয়ার জন্য তার বিভাগে যাই। পরিচয়ের পর তিনি আমাকে গেস্ট লেকচারার হিসেবে জয়েন করতে অনুরোধ করেন। এরপর দীর্ঘদিন ঐ বিভাগে গেস্ট লেকচারার হিসেবে লেকচার দিয়েছি। বিভাগে প্রয়োজনীয় নিয়মিত শিক্ষক না-থাকার কারণে আমাকে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই সুবাদে ক্লাস নেয়াসহ নানা কাজে আমি যুক্ত হই। ইতোমধ্যে বিভাগের শিক্ষা সফর উপলক্ষে কিছু দায়িত্ব এসে যায় আমার উপর। বিলকিস আপা কিছু শিক্ষার্থীকে দায়িত্ব ভাগ করে দেন, সাথে আমাকেও তা দেখাশোনার ভার অর্পণ করেন। মনে পড়ে ছাত্রীরা আমাকে কোনো কাজ করতেই দেয়নি। ওরাই সব করেছে, আমি ওদের সঙ্গ দিয়েছি মাত্র। আমি ওদের কাছে শিক্ষা সফরে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা চাইলাম। এখনো মনে আছে সেই তালিকায় আমার চেনা-জানা একজন ছাত্রীর নাম না-দেখে ওর সঙ্গী পপিকে জিজ্ঞাসা করলাম। জানতে পারলাম ওর নাকি শিক্ষা সফরে যেতে বাসার পারমিশন লাগবে। যাই হোক, একসময় তানিয়ার পারমিশন এলো। আমরা মজা করেই শিক্ষা সফরে রওয়ানা হলাম।

 

খুব সকালে কুমিল্লা কোর্টবাড়ির পথে দাউদকান্দি এলাকায় পৌঁছামাত্র আমার শরীর কিছুটা খারাপ হয়ে গেল। সকালে জার্নি করার অভ্যাস না-থাকায় এমনটা হতে পারে অথবা প্রচুর গরমের প্রভাবে। আর যানজট তো ছিলই কিছুটা। ছাত্রীদের সেবাযত্নে কিছুক্ষণ পর বেটার ফিল করলাম। তাকিয়ে দেখি আমার অনার্সের ছাত্রী পপি আমাকে বাতাস করছে। ওর বাড়ি নরসিংদীতে। স্বভাবত কারণে ওর বাসে যাতায়াত করার অভ্যাস ছিল। সে-কারণে বাস জার্নির বেশ ভালো প্রস্তুতি ছিল ওর মধ্যে। হাতপাখা থেকে শুরু করে যেসব জিনিস বাসের যাত্রায় প্রয়োজন পড়বে তার সবকিছুই ছিল ওর কাছে। কোর্টবাড়ি পৌঁছার আগেই আমরা পথিমধ্যে যাত্রাবিরতি করি। এ-সময়ে সবার আগে পপিকে ওর হলের কয়েকজন বান্ধবী আমার সাথে ছবি তোলার আগ্রহ প্রকাশ করে। ছবি তুলে সময়টা বেশ ভালোই পার করলাম। ইতোমধ্যে অনেক ছাত্রীর সাথে ছবি তোলা হলো। পপিদের বান্ধবীদের একটা গ্রুপ ছিল। তানিয়া ওর কাছের বান্ধবী, ওর সাথে আমার তেমন সখ্য ছিল না যতদূর মনে পড়ে। ওদের অনার্স কোর্স শেষ হতেই বোধহয় আমি চলে আসি, মাস্টার্সের কোনো ক্লাস নেয়া হয়নি। 

 

পিএইচডি শেষে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে যোগ দিই। তখন ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ততার কারণে ছাত্রীদের আর কোনো খোঁজখবর রাখা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার সময়ে আমার কলেজ প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ আসে। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করি ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কলেজ। কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্বে একটি স্কুলও প্রতিষ্ঠা করি। স্কুলের গাড়িতে তখন যাতায়াত করি। ঐ দিন গাড়ি না-থাকায় যাত্রাবাড়ি থেকে ‘বিকল্প’ বাসে উঠি। পেছন থেকে স্যার-স্যার শব্দ শুনতে পাই। কণ্ঠটা পরিচিত কিন্তু চেহারা মেলাতে পারছি না। এরমধ্যে শুনলাম, স্যার আমি ‘পপি’। যাক, এতক্ষণে চিনতে পারছি আমার ছাত্রী পপিকে। অনেকদিন পর দেখা, ওর গেটআপ মেকআপ কিছুটা পরিবর্তন। ফোন নাম্বার বিনিময় হলো কি না মনে নেই। হলেও দীর্ঘদিন ওর সাথে আর কোনো যোগাযোগ ছিল না।

 

হঠাৎ একদিন বসুন্ধরা মার্কেটে পপির সাথে আবার দেখা। এবার অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা হলো। পপিও সম্ভবত ঈদের কেনাকাটার জন্য এসেছিল। এবার ফোন নাম্বার বিনিময় হলো, কথা হলো। কয়েক দিনের মধ্যে ফেসবুকেও যুক্ত হলাম। মাঝেমধ্যে কথা হয়, ওর কাছে অন্যান্য ছাত্রীর খোঁজ নেয়া শুরু হলো। অনেকের নাম স্মরণ করিয়ে দিয়ে তানিয়ার কথা বলল। তানিয়ার সাথে আমার কোনো যোগাযোগ আছে কি না জানতে চাইলো। ও আমাকে তানিয়ার নাম্বার দিবে বলেও ২/৩ বছর চলে গেল। তবে আমি পপির কাছে জেনেছি, আমার ব্যাপারে ও তানিয়াকে অবহিত করেছে। আমি ভাবলাম তানিয়া আমার কথা জানলো, অথচ ও আমার কোনো খোঁজ নিল না। এ-কারণে আগ্রহ করে পপির থেকে তানিয়ার ফোন নাম্বার আর নেয়া হলো না। পরে কোনো একদিন গল্পচ্ছলে পপি জানালো ওরা দুই বান্ধবী আমার কলেজে বিএড ট্রেনিং করবে। আমিও ভাবলাম এই সুবাদে ওদের সাথে আবার দেখা হবে, কথা হবে। ওদের সাথের সময়গুলোর কথা মনে হলে বেশ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়তাম। ওদের কিছু ছবি আমার অ্যালবামে আছে জানতাম কিন্তু দেখলে মন খারাপ হবে তাই খুব বেশি দেখা হতো না। ফেসবুকের কল্যাণে পপির কাছে থাকা ছবিগুলো আমাকে দেয়ার পর তানিয়াকে ভালোভাবে শনাক্ত করি। পপিকে বলি, আজই ওর নাম্বার আমাকে দাও, আমি কথা বলতে চাই।

 

তানির নাম্বার দেয়ার কয়েক দিনের মধ্যে তানি আমাকে ফোন করে। ওর ফোন পাওয়ার সময় আমি কী যেন একটা কাজে ব্যস্ত ছিলাম। খুব বেশি কথা বলতে পারিনি। ওকে বললাম, আমি দু-একদিন পরে তোমাকে ফোন দেবো। ১৬ বছর পর আমার একজন প্রিয় ছাত্রী আমাকে ফোন দিলো কিন্তু কথা বলতে পারলাম না, এই ভেবে পরের দিন আমিই ওকে ফোন দিই। বিস্তারিত খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করি। ফোনে যতদূর জানলাম তাতে ওর সাথে আরো কথা বলার আগ্রহ বৃদ্ধি পেল। বোধহয় আমার কথায় ওর তেমন তৃপ্তি হয়নি, এই ভেবে আবার ফোন দিই। কথা হলো, প্রতিদিন জানছি তানিকে।

 

এই ষোলো বছরে তানি বেশ পরিপক্ব হয়েছে এটা ভালোভাবে বুঝতে পারলাম। বিশেষত ওর প্রফেশন আর আমার প্রফেশন এক হওয়ায় পরস্পরের মধ্যে বোঝাপড়া বেশ ভালোই হলো। ও আমার সম্পর্কে জানতে চাইলে আমি ওকে বলতে লাগলাম। দেখলাম আমার সম্পর্কে ওর একটা ভালো ধারণা পূর্ব থেকেই আছে; যা আমি আজই জানলাম। এভাবে ওর সাথে আমি ফোনালাপে জড়িয়ে পড়ি এবং নতুন এক তানিকে আবিষ্কার করি। আমার জানা অস্পষ্ট বিষয়গুলো ওর সাথে শেয়ার করি। ওর থেকে একটা ভালো সমাধান পেতে থাকি। ও আমার ফোন কলের অপেক্ষায় থাকে। আমিও ওর ফোন কল মিস করি। এরই মধ্যে কোনো একটি বিষয় নিয়ে ওর সাথে দ্বিমত পোষণ করি। আমার দ্বিমত পোষণ করাটা ওর ভালো লাগেনি। আমিও ওর দ্বিমত পোষণ করায় মেজাজ খারাপ করি। মনে মনে দারুণ কষ্ট পেতে থাকি। পরে জানতে পারি ও আমাকে খুব মিস করছে এবং কষ্ট পাচ্ছে। 

 

সিদ্ধান্ত নিই ওর বিদ্যালয়ে একদিন হঠাৎ উপস্থিত হবো। ঠিকানা চাইলে ও ভাবে, আমি সত্যি বুঝি ওর কাছে আসছি। আমিও আসার একটা চিন্তা করি। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এরই মাঝে ওর মানসিক অবস্থাটা বোঝার আমার একটা সুযোগ হয়। সকালবেলা কলেজে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি ঠিক এমন সময় সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের ফোন কল। স্যার আপনার নামে ভৈরব বাজার থেকে একটা গিফট প্যাকেট এসেছে। ঠিকানা দিলে আমরা পৌঁছে দিতে পারি। আমি কলেজের ধানমন্ডির ঠিকানা দিলাম। ওকে ফোন দিলাম কী কেন পাঠিয়েছ? স্বভাবসুলভ উত্তর। সময় ক্ষেপণ না-করে গিফট প্রাপ্তির অপেক্ষা করতে লাগলাম। সকাল-দুপুর পেরিয়ে অবশেষে বিকালে গিফটের প্যাকেট হাতে পেলাম। খোলার আগ্রহ সামলাতে পারলাম না। খুলে আমার পছন্দের এবং অতি প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস দেখতে পেয়ে ওকে আবার আবিষ্কার করলাম। বুঝলাম ও আমাকে দূর থেকে কতটা ভালোবাসে। আমার হৃদয়ে এক ধরনের কম্পন অনুভব করলাম। বুঝলাম কেউ আমাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, অনেক অনেক মিস করে।

 

তানি সাধারণত বিকাল ৫:০০টার মধ্যে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে। আমাকে ফোন দিয়ে ওর কাজিন ডা. ফারহানার দুর্ঘটনার কথা জানায়। মেডিকেলে যায় সেখান থেকে ডা. ফারহানাকে বাজিতপুর জহিরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে রেফার করে। ও চলে যায় মেডিকেলে, আমার ক্রমশ খারাপ লাগতে থাকে। আমি জানি এখন ও আর আমাকে ফোন দিতে পারবে না। কিন্তু আমার ভাবনা ভুল প্রমাণ হয়। যাওয়ার সময় পুরোটা পথ আমার সাথে অনলাইনে যোগাযোগ রাখে। বারবার ফোন দিয়ে ডা. ফারহানার শারীরিক অবস্থার জানান দেয়। ফারহানা নিজে ডা. হওয়ার কারণে ওর পায়ের হাড় একটা ভাঙা নিয়েও তানিয়ার সাথে সেলফি তোলে। দেখলাম আর ভাবলাম হাসপাতালের বেডে সেলফি! বাহ তানিয়ার সময়টা ভালোই কাটছে। মনে হলো আমি যেন পুরো হাসপাতালটা দেখছি, জানছি। আগ্রহ জমলো একবার ঘুরে আসার। সবুজে ভরা মাঠের ছবি আমাকে অনেকদিন কাঁদাবে।

 

তানি পড়াশোনায় ভালো। যা বলে শুদ্ধ বলে যা লেখে জেনেশুনে লেখে। আমার খুব পছন্দ হয় ওর ভাবনাগুলো। পপি একদিন জানতে চায় তানির সাথে আমার কথা হয় কি না। আমি জানালাম মাঝেমধ্যে কথা হয়। শুধু যে কথা হয় না আরও যে কিছু বিনিময় হয় তা কি পপি জানে? না, জানে না। ওকে বলার খুব ইচ্ছা আমার। কারণ মানুষের সময় সবসময় একরকম যায় না। পপি আমাকে অনেক সঙ্গ দিয়েছে। তবে ওর সাথে মনের আলাপ করিনি কখনো। ভাষার বিনিময় হয়েছে, এখন আর তাও হয় না। হায়রে পৃথিবী! হায়রে মানুষের মন! বিশেষত নারীর মন। আকাশের মেঘের মতোই বদলায়। জীবনে এর বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছি, জেনেছি। এ নিয়ে আমার অনেক কষ্ট আছে, আছে বিস্তর অভিযোগ, অনেক অভিজ্ঞতাও আছে। আমি খারাপ কিছু বহন করে বেড়াই না। আমার ভালো স্মৃতিগুলো হৃদয়ের মাঝে জমা রাখি, খারাপগুলো ছুড়ে ফেলি। আর এ-কারণেই আমি আজও ভালো আছি।

 

প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে আমার বেশ লেখাপড়া আছে। আছে বাস্তব অভিজ্ঞতাও। তবুও প্রতিনিয়ত আমি নতুন নতুন অভিজ্ঞতা আবিষ্কার করছি। জানতাম প্রেম একধরনের মোহ, মানুষের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে। কিন্তু আমার জীবনে আমি ভিন্ন কিছু আবিষ্কার করেছি। প্রেম ধ্বংস করে না, প্রেম সৃষ্টি করে। আমি সদা সৃষ্টিশীল মানুষ। যেখানে সৃষ্টি নেই সেখানে আমি কেন? এ-প্রশ্ন আমার মনে হাজারও বার জেগেছে। আমার আর অন্য দশজনের সাথে মেলে না। যে-কারণে আমার বন্ধুর সংখ্যা হাতে গোনা। আমার বন্ধুর তালিকা এত ছোট যে, আমার সাথের লোকজন আমার বন্ধুর নাম বলতে পারে না। আমার মেঝ ছেলে তো মাঝেমধ্যে মজা করে বলে, ‘বাবা, তোমার জন্য একটা ক্যুইজ, তোমার একজন বন্ধুর নাম বলো তো?’

 

যাক ও বুঝতে পেরেছে, আমার সেই অর্থে তেমন কোনো বন্ধু নেই। কারণ আমার কাছে বন্ধুর সংজ্ঞা হচ্ছে ‘যাকে যে কোনো সময় ফোন দেয়া যায়’। জানি এই সংজ্ঞা কোনো বইপুস্তকে নেই, কেউ শুনলে বুঝতে পারবে না আমি কী বোঝাতে চেয়েছি। তবে এই সংজ্ঞার আমিই আবিষ্কারক। বন্ধু মানেই যাকে কোনোরূপ চিন্তা-ভাবনা বা সময়জ্ঞান ছাড়াই ফোনে কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। বন্ধু সে নয়, যাকে ফোন দিতে অনেক ভাবনা ভাবতে হয়। যাকে কোনো কিছু শেয়ার করতে পূর্বাপর ভাবতে হয়, সে বন্ধু হতে পারে না। বন্ধু কেউ কাউকে বানাতে পারে না। কখন যে কার সাথে কী বন্ধুত্ব হবে তা আগেভাগে বোঝা মুশকিল। বিশেষত প্রফেশনাল লাইফে। এখানে কেউ কারো বন্ধু নয়। একজন আরেকজনের প্রতিযোগী। কথায় আছে ‘কলিগস আর নট ফ্রেন্ডস’ , কলিগ কখনো বন্ধু হয় না। তবে এরই মাঝে বন্ধুত্ব হচ্ছে, বন্ধুর জন্য জীবন বাজি না-রাখলেও খানিকটা এগিয়ে যাচ্ছে একথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। আমাদের স্কুল-কলেজ লাইফের বন্ধুত্বের সংজ্ঞা আজকাল খুবই বেমানান হবে। আজকাল যে-ধরনের বন্ধুত্ব হচ্ছে, তাতে মাঝেমধ্যে মনে হয় আমিই বেমানান। আর সে-কারণেই আমার তেমন ভালো বন্ধু নেই। প্রায়শ আমি তীব্র বন্ধুত্বের সংকটে ভুগি।

 

জীবন চলার পথে মানুষের বন্ধুর প্রয়োজন হয়। অথচ সেই বন্ধু নির্বাচন-প্রক্রিয়া মোটেই সহজ নয়। প্রকৃত বন্ধু খুঁজে পেতে অনেক সময় লাগে। বিশেষত কেউ যদি মনের মতো বন্ধু খোঁজে। জানি না অন্য মানুষের বন্ধু বানানোর প্রক্রিয়া কেমন। আমার প্রক্রিয়া যেন ভিন্নতর, তা আমার দেয়া সংজ্ঞা থেকেই ভালো বোঝা যাচ্ছে। আমি সদাই ব্যতিক্রম কিছু পছন্দ করি। অন্যসব মানুষে যা করে, যা ভাবে তা আমার সাথে সবসময় ম্যাচ করে না। অনেক কারণ খুঁজেছি, তেমন বিশেষ কোনো কারণ খুঁজে না-পেলেও বুঝেছি আমি যা চাই তা অন্যের মতো নয়। আমার মন বলে বন্ধু আমার এমনই একজন, যার মাঝে আমার ছায়া দেখতে পাবো। আমার চিন্তা-চেতনায় রুচিবোধে তার সাথে কোনো পার্থক্য থাকবে না। পার্থক্য থাকলে তার সাথে বন্ধুত্ব হয় কী করে। যাদেরকে আমি বন্ধু ভাবি তাদের মাঝে আমার পছন্দের সময়গুলো মেলানোর চেষ্টা করি, জানি আমার চিন্তার সাথে সবাই একমত হবে না। তাতে আমি মোটেই চিন্তিত নই। আমি আমিই। আমাকে অন্যের সাথে মেলালে তো আর আমি থাকি না। আমি প্রতিনিয়ত আমার অস্তিত্ব বন্ধুর মাঝে খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা করি। আমার অনুভব বন্ধুর অনুভবের সাথে মেলানোর চেষ্টা করি। সব সময় এই ভাবাবেগের মিল হবে এমন কোনো কথা নেই, তবে অধিকাংশ মিলে যাবে এটাই বাস্তবতা।

 

দুনিয়ার জীবনটা বড়ই কঠিন, এখানে কেউ কারো নয়। মানুষ একথা জানার পরও কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না। চলার পথে কেউ কারো ওপর নির্ভর করছে। এই নির্ভরতা মানে বন্ধুত্ব। আর বন্ধু মানে নির্ভরতা। যাকে আমি বন্ধু ভাবি সে আমার সুখ-দুঃখে সাথি হবে এমনটা যেমন চাই, তদ্রুপ তার সবকিছুতে আমি নাক গলাতে ভালোবাসি, কিন্তু এমন বন্ধু পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। বিশেষত এই ডিজিটাল যুগে। যেখানে বন্ধু নির্বাচন করা সহজ কিন্তু বন্ধুত্ব ধরে রাখা বেশ কঠিন। তবে এ-যুগের মানুষদের মাঝে এ নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। আজকাল চিরস্থায়ী বন্ধত্বে মানুষ বিশ্বাসী নয়। হালকা মেজাজের বন্ধুত্ব বলা যায় একে, খাও দাও ঘোরো ফেরো মাস্তি করো। সময় হলে দোস্তি করো। চোখের সামনে যা দেখি বড্ড আফসোস হয়। এ-অবস্থা অব্যাহত থাকলে এক সময় হয়তো বন্ধু কী জিনিস তা বোঝাতে অভিধানের সাহায্য নিতে হবে। জানি না সেদিন আমার মতো লোকের বন্ধু নির্বাচনের সংজ্ঞা কোনো কাজে লাগবে কি না।

 

কয়েক বছর আগে সদ্য প্রয়াত একজন অভিনেত্রীর উপস্থাপনায় টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠান দেখতাম। ‘ও বন্ধু আমার’ অনুষ্ঠানটি আমি নিয়মিত না হোক, প্রায়শ দেখার চেষ্টা করতাম। যারা গেস্ট হয়ে আসতেন তাদের একজন সেলিব্রেটি, অন্যজন থাকতেন সেলিব্রেটির বন্ধু, যাকে আমি চিনতাম না। তবে তিনি যখন বন্ধুর সংজ্ঞা দিতেন এবং ছোটবেলার বন্ধুত্বের কথা বলতেন তখন প্রায়শ আমার চোখ থেকে ২/৪ ফোঁটা পানি পড়তো। আমি ভাবতাম এই পানি আসার কারণটা কী। আমি মেলানোর চেষ্টা করে মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে এরকম বন্ধুত্ব বোধহয় এখন আর হয় না। কিন্তু না, আমার ধারণা একেবারে সত্য নয়। ১৪ আগস্ট ২০১৮ সালের কথা যদি আমি মনে করি তবে আমার ধারণা মিথ্যা প্রমাণ হবে।

 

সেদিন আমি বাসায় একাকী ছিলাম, বাসায় কেউ নেই। নানা বিষয় মাথায় উঁকি দিচ্ছে। লেখালেখির চেষ্টা করছি কিন্তু মন বসছে না। মনে না-চাইলে লেখা যায় নাÑএ-কথা লেখকমাত্র জানেন। হঠাৎ আমার ফোনে রিং বেজে উঠলো। নাম্বারটা আগে মোবাইলে সেভ দেখে কিছুটা অবাক হলাম। নাম্বার সেইভ আছে অথচ কল করা হয়নি। আর কী করে কল করবো তার সাথে যে আমার দীর্ঘ ষোলো বছরের যোগাযোগ নেই। ফোনে কিছুক্ষণের জন্য কথা হয়। অনেক বিষয় শেয়ারিং হয়। যে-বিষয়ে কথা বলার ইচ্ছা ছিল তা বলা হলো না, বলার মন ছিল বলা যায়। কেন যে বলতে পারলাম না তা জানি না, তবে বলতে না-পারলেও এমনি বুঝে যায় আমার অব্যক্ত কথাগুলো। ক্রমেই আমাকে সঙ্গ দেয়ার চেষ্টা করে। ‘কী কথা তাহার সাথে’ এই বাক্যের সার্থকতা-ব্যাপকতা খুঁজতে থাকি। কী কথা বলি ওর সাথে আর ও কী কথা শোনে। অবাক হই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হচ্ছে কিন্তু কথা শেষ হচ্ছে না। ‘দেখা না-হলে একদিন, কথা না-হলে একদিন হৃদয়ের ভিতরে করে চিনচিন’ এই গান জীবনে বহুবার শুনেছি কিন্তু এর মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারিনি কোনোদিন। আস্তে আস্তে আমি মর্ম বুঝতে লাগলাম। কথা বলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করলাম।

 

আমি সারাজীবন সময়ের গুরুত্ব দিয়েছি। অযথা কথা বলে সময় পার করবো এটা তো হতে পারে না। তাই ভাবনায় পরিবর্তন আনলাম, কথায় যেন সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় তার চেষ্টা করলাম। মানুষ তার কল্পনার সমান বড়, তাই কল্পনাকে রঙিন কাগজে সাজাতে লাগলাম। তার রং ছড়িয়ে দিলাম ওর মাঝেও। তীব্র অনুভূতির পরিবর্তন হলো তানির মাঝে। মাঝখানে ২ দফায় ৪/৫দিন কথার বিরতি হওয়ায় ওর তীব্রতা আমি দারুণভাবে উপভোগ করেছি। ওর স্বভাবটা আমার সাথে খুব মিলে যায়। মনের ভেতরটা সাদা। এমন সাদা মনের মানুষ আজকাল পাওয়া যায় না। আমি তো কত খুঁজেছি, পাইনি। আর এমন সাদা মনের মানুষের জীবনে আবার কাদা লাগানোর মানুষের অভাব নেই। তাই জানার চেষ্টা করলাম। মনের মতো উত্তর পাইনি। তবে বাকি উত্তরের জন্য আমি অপেক্ষাও করিনি। কারণ ওর উত্তরটা আমার জানা আছে ভালোভাবে। তারপরও ওর মুখ থেকে শোনার তীব্র ইচ্ছা ছিল। সব ইচ্ছা পূরণ করতে নেই।

 

আমার কল্পনায় একটা ভালোবাসার মানুষ থাকে বরাবর, যার সাথে অন্য কারো সাথে মিল খোঁজার চেষ্টা করি না। কল্পনার মানুষটাকে জানানো জরুরি ভেবে মাঝেমধ্যে জানানোর চেষ্টা করি, তবে শোনার মানুষ নেই। আমিও জানি বলার চেয়ে শোনার কাজটা বেশ কঠিন, তাই মনের মানুষটাকে কী করে কষ্ট দিই। না, তারপরও যে তাকে শোনাতে হবে আমার মনের কথা। শুরুতে এসব কথার কোনো গুরুত্ব সেই কল্পনার মানুষটি বুঝতে পারে না। বুঝলেও প্রকাশ করে না, কারণ একবার প্রকাশ করলে যে বারবার প্রকাশ করতে ইচ্ছা হবে। তখন তার পাশে কে থাকবে। আমাকে নিয়ে কেউ চিন্তা করতে ভয় পায়। কেননা আমাকে কেউ কোনো সংজ্ঞায় ফেলতে পারে না। আমি কি তার বন্ধু না শিক্ষক নাকি অন্যকোনো স্বজন। এসব নিয়ে কেউ ভাবেনি তা নয়। আমার জানামতে এর সংখ্যা কম নয়। তবে অনেকে সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। আমি ভাবলাম ওর বয়স কত? ও কিবা সমাধানে পৌঁছাবে। এমন ভাবনা মিথ্যা প্রমাণ হলো ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালের এক গভীর রজনীতে।

 

রুটিনমতো আমি ঘুমিয়ে পড়ি। গরমের কারণে বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিলো। কেউ আমাকে ফোন করবে এমন ভাবনা নিয়ে ঘুমানো যায় না। ফোন আসেনি, তাই একটা ফোন করা যায়, কোনো সমস্যা নেই। ফোন রাখার ইচ্ছা ব্যক্ত করতেই বাধাগ্রস্ত হলাম, কথা আছে। কী কথা তাহার সঙ্গে বলতে বলতে অনেক কথা হলো। আমার ইচ্ছাগুলো এমনভাবে ব্যক্ত করলাম যাতে বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দেয়। আমি ঘুমাতে পারি। না, তা হলো না। আমার ধারণা বদলাতে লাগলো। ওর উত্তরগুলো দিতে লাগলো। মেলাতে লাগলাম পূর্বাপর সবকিছু, কিছুই যেন মিলছে না। আমি কার সাথে কথা বলছি, আবার পরিচয় জানার চেষ্টা করলাম। দারুণ উপভোগ্য রাত! আরবি সাহিত্যের কবি ইমরাউল কায়েসের কবিতা পড়েছি, আজ যেন সে কবিতা মিলে যাচ্ছে জীবনের পরতে পরতে। আহ, রাতটা যদি একটু বড় হতো! কিন্তু না, আজানের ধ্বনি কানে এসে গেল, ঘুম আসে না। ঘুম আর হলো না। সকালে দুজনার অফিস। আমি দু-এক ঘণ্টা পরে যেতে পারবো কিন্তু ওর সরকারি চাকরি।

 

মেজাজ ঠিক থাকে না। এসব চাকরি কেন মানুষ করে, কীভাবে করে। কী দরকার এসব চাকরির। চাকরি কি আমাকে এমন একটা রাত ফেরত দিতে পারবে? জানি এর উত্তর হবে ‘না’।

 

২০১৮ সাল আমার জীবনে অনেক ভোগান্তির বছর। নানা কারণে অনেক ঝড়ঝাপটা সহ্য করে যাচ্ছি। বিশেষত কলেজ প্রতিষ্ঠার জীবন আমাকে অনেক কাঁদায়। কারো সাথে শেয়ার করতে পারি না। যাকে আমি শেয়ার করি, কেউ আমাকে এক প্রস্থ পত্র ধরিয়ে দিয়ে বলে যে ‘আমি আর পারছি না’। এমনটা যে আজই নতুন শুনেছি তা নয়, অনেকবার শুনতে হয়েছে। মেনে নিয়েছি আরো শুনতে হবে। যাক এসব নিয়ে লিখতে বিষয় হারিয়ে যাবে। 

 

২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময় আমার ভাবনার পরিবর্তন আনার চেষ্টা করি। মানুষের ভালোবাসা পাওয়া সহজ কিন্তু তা ধরে রাখা মোটেই সহজ কাজ নয়। আর ধরে রাখার জন্য যা দরকার তার কিছুটা আমার ঘাটতি আছে তা আমি ভালো করেই জানি। তো জেনেশুনে কেন বিষ পান করলাম। এসব বলে আর লাভ নেই। ঝামেলা আমার নিত্যসঙ্গী তাই বলে কি প্রেম-ভালোবাসা হবে না। মানুষ জানে আমাকে দিয়ে হবে না। তার পরেও কেউ যদি স্বেচ্ছায় ভালোবাসা নির্বাসনে দিতে চায়, আমার কী করার। ভাবছিলাম একটা বিরতি নেব, না, বিরতি নেয়া হলো না। কী লাভ এমন বিরতি নিয়ে! জীবনে ফেলে আসা দিনগুলো ফিরে আর আসবে কি কখনো! সময় নষ্ট করা আমার স্বভাবে নেই। দিন শেষে চিন্তা করি সারাদিনের কর্মফল নিয়ে মেলে না, কখনো মেলে। এই নিয়ে হতাশা কাজ করে না কখনো, জীবনযুদ্ধে আমি অনেকটাই পথ পাড়ি দিয়েছি একা একাই। বাকিটা পথে সঙ্গীর কী প্রয়োজন, এভাবনা আমাকে ভাবায় প্রতিনিয়ত।

 

২০১৩ সালের পর ভেবেছি আমার ভাবনার পরিবর্তন আনবো কিন্তু পারিনি। বাকি জীবনেও হয়তো হবে না ভেবে ২০১৮ সালকে গুডবাই জানানোর কথা থাকলেও আবার ওয়েলকাম করলাম। তানি তোমাকে থ্যাংকস। তুমি আমার ভাবনার অনেক পরিবর্তন এনেছ। তোমাকে দোষ দিচ্ছি না, শুধু জানাতে চাই ‘নারী, তুমি কি না পারো’। এই শিরোনামে আমার একটি কবিতা লেখা আছে। কোনো পাঠকের চোখে পড়বে কি না জানি না। কেউ যদি আমার লেখা কবিতাগুলো পাঠকের সামনে তুলে দেয় খুশি হবো। বড় বোন জয়নব আপা আদর করে আমার নাম রেখেছিল নজরুল ইসলাম, যেন আমি কাজী নজরুলের মতো কবিতা লিখতে পারি। বোনের সে-আশা কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে। তবে বোনকে আমি কিছু দিতে পারিনি। আমার বড় হওয়ার পেছনে বড় বোনের অসামান্য অবদান রয়েছে। ‘নারী’ নিয়ে লেখা কবিতাটিতে আমার ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছেÑকারো কারো এমন মনে হতে পারে। আসলে তেমনটা উদ্দেশ্য ছিল না, এটা আমার উপলব্ধি মাত্র। ক্ষোভ যদি হবে তবে আবার ‘তানি’ কেন?

 

ভালোবাসার রং নীল। এর ব্যাখ্যা অনেকে জানে না, কে কী জানে আমি তা জানি না, তবে আমার বিশ্বাস ‘তানি’ তা জানে।

 

বেশ কিছুদিন যাবত আমার মন-মেজাজ একদম ভালো নেই। যা আমি করতে চাই তা করতে পারি না। আমি লিখতে পছন্দ করি, পড়তে ভালোবাসি। কিন্তু আমাকে দিয়ে সে-কাজ হচ্ছে না। মেজাজ খারাপ হচ্ছে, এর কোনো সুরাহা করতে পারছি না। তাই আজ কলম নিয়ে বসে পড়লাম। যা লিখলাম তা কোনোদিন ছাপা হবে কি না জানি না, তবে একজন পড়বে আমার বিশ^াস। যদি তার হাতে এই লেখা পড়ে। ইতোমধ্যে আমার লিখিত বইগুলো প্রকাশ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। জানি না আলোর মুখ কবে দেখবে। লেখার পর তা প্রকাশ না-হলে লেখায় আর মন বসে না, জীবনে কত যে লিখেছি তা যদি প্রকাশ করা যেত প্রকাশনা জগৎ সমৃদ্ধ হতো নিঃসন্দেহে।

 

অপেক্ষা আমাকে কাঁদায়। জানি অপেক্ষা করার যন্ত্রণা মৃত্যুযন্ত্রণার চেয়েও কঠিন। তারপরও অপেক্ষা করে যেতেই হয়। কেউ বলে অপেক্ষা নয়, ধৈর্যের পরীক্ষা মাত্র। জীবনে এমন পরীক্ষায় কতবার যে অবতীর্ণ হয়েছি তার হিসেব রাখিনি। কোথায় রাখবো ডায়েরি যে অনেক আগেই পূর্ণ হয়েছে। ডায়েরির পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলে নতুন পাতা যোগ করবো? না, তা করার দরকার নেই। জীবন ডায়েরিতে সংরক্ষণই যথেষ্ট। এমন ডায়েরির থেকেই মাঝেমধ্যে অনেক কিছু লিখে যাই।

 

ইডেন কলেজে যখন অধ্যাপনা করি তখন বেশ কয়েকজন ছাত্রীর সাথে আমার সখ্য গড়ে ওঠে। ঐ সময় আমার আয়-রোজগার খুব একটা ভালো ছিল না। কেবলই আমি প্রফেশনাল লাইফে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। ডালিয়া নামে অনার্সের এক ছাত্রী একদিন কথা আছে বলে সময় চাইলো। আমাকে ও এবং ওর এক বান্ধবী, নাম ঝর্ণাÑবাসায় পড়ার প্রস্তাব দিলো। আমার খুব ইচ্ছা নেই বাসায় পড়ানোর। কারণ ঐ সময় আমি পিএইচডির কাজ নিয়ে বেশ ব্যস্ত আছি। ২/৪ বার ডালিয়া বলাবলির পর রাজি হলাম পড়ানোর জন্য। শর্ত ছিল ২/১ মাস পড়াবো। ওরাও রাজি হলো, আমি পড়ানো শুরু করলাম। পড়ানোর খবর ছাত্রীহলে অন্য ছাত্রীদের কাছে দ্রুত পৌঁছে গেল।

 

সুমি নামের আরেক ছাত্রী ওদের বান্ধবীদের নিয়ে আলাদা ব্যাচে পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করলো। সুমিকে আমি আগে থেকেই ভালো চিনতাম। আমার সাথে ওর বেশ চেনাজানা ছিল। বিশেষত কলেজের স্টাডি ট্যুরের সময়। ওদেরকেও বললাম আমি ২/৩ মাস পড়াতে পারবো। কেননা আমি গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত আছি। ওরাও সম্মত হলো। আমি ওদেরকে সকাল ৬-৮টা এবং বিকাল ৪-৬টা পর্যন্ত পড়াতাম। সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই ওরা দরজায় কড়া নাড়তো। তাড়াহুড়ো করে ওদের টেবিলে যেতাম, একটানা ৮টা পর্যন্ত পড়াতাম। ছাত্রীরা ইডেন কলেজে চলে যেত আর আমি চলে যেতাম আইডিয়াল কলেজে। আইডিয়াল কলেজে সকাল ৯টা থেকে আমার ক্লাস থাকতো। আইডিয়ালের ক্লাস শেষ করে ১০.৩০ ইডেনের ক্লাসে যোগ দিতাম। ততক্ষণে ক্লাস রুমটি কানায় কানায় পূর্ণ হতো। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করতো স্যার কখন আসবেন। ডিপার্টমেন্টের সামনে অনেকে অপেক্ষা করতো। আমার সাথে কুশল বিনিময় করতো। প্রতিটি ক্লাসেই মেয়েরা আনন্দ উপভোগ করতো, মনোযোগ দিয়ে আমার লেকচার শুনতো। আমিও নবীন লেকচারার হিসেবে হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে পাঠদান করতাম।

 

এই বিভাগের প্রায় সব মেয়ে সাধারণ শিক্ষা থেকে পাস করার কারণে আরবিতে তেমন পারদর্শী ছিলো না। এটা জেনে বুঝে ওদেরকে পাঠদান করাতাম। ওরা বেশ উৎসাহ নিয়ে ক্লাসে অংশ নিত। যতদূর মনে পড়ে নারায়নগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, সাভার এসব দূর-দূরান্ত এলাকা থেকে ছাত্রীরা এসে আমার ক্লাসে লেকচার শুনতো। ক্লাসে সবাই আমার অপেক্ষায় থাকলেও তানি, পপি, ডালিয়া আরো অনেকে যারা হলে থাকতো তারা আমার প্রবেশের ২/১ মিনিট পরেও ক্লাসে প্রবেশ করতো। একদিন তানিকে জিজ্ঞাসা করি ক্লাসে দেরি করার কারণ কী? সোজা উত্তর মাথাব্যথা। রাতে ঘুম হয়নি। ব্যক্তিগত যোগাযোগ না-থাকার কারণে ঘুম না-হওয়ার কারণ আর জানা হয়নি। মনের ভিতর তীব্র ইচ্ছা ছিল ঘুম না-হওয়ার কারণ জানার। কারণ জানতে অপেক্ষা করতে হলো ১৬টি বছর। কীভাবে যে সময় চলে গেল বুঝতে পারলাম না। ১৬ বছরই যে আমি কারণ জানার অপেক্ষায় ছিলাম তা-ও না। তানির নির্ঘুম রাতের খবর হয়তো জানা হয়নি, তবে অনেকের এই নির্ঘুম রাতের খবর আমার কাছে আছে। আজ আমাকে যদি কেউ এই প্রশ্নের সহজ-সরল উত্তর না-ও দেয়, তবুও আমি বুঝতে পারি।

 

ইডেনে অধ্যাপনাকালীন আমার এসব বিষয়ে খুব কম জ্ঞান ছিল। বিশেষত প্রথম ভালোবাসা বিষয়ে। আমার ছাত্রী সুমী একটু খোলা মনের মানুষ ছিল। ও মাঝে মাঝে আমার জন্য গোলাপ ফুল নিয়ে আসতো। আর এসব দেখে আমি বিরক্ত হতাম। বুঝতাম না ও কেন আমাকে ফুল দেয়। যখন কিছুটা বুঝেছি তখন আমাকে ও বলেছেÑস্যারের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা বলতে কিছু নেই। আছে শুধু লেখাপড়া আর গবেষণা। ওর একথাটার তেমন একটা গুরুত্ব আমি ঐ সময় দিইনি কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, আমি ওর ঐ কথাটার মর্ম ততটা উপলব্ধি করতে পেরেছি। যখন বুঝতে শুরু করলাম তখন ওর কোনো খোঁজখবর আমার কাছে ছিল না। ৩/৪ বছর পর ওর বড় বোন সলিমুল্লাহ কলেজের লেকচারার, তার সাথে দেখা। সে জানালো ওর বর্তমান অবস্থা। খুশি হলাম শুনে। এরপর ২/১ বার ফোনে কথাও হয়েছে, একবার নিউ মার্কেটে দেখাও হয়েছে। অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ হলো। আলাপ হলো না শুধু সেদিনে মন্তব্যটা নিয়ে। মনেও ছিল না, মনে করার চেষ্টাও করিনি। যখনই মনে হয়, তখনই শপথ নিই কোনো একদিন লিখে ফেলব, ওকে জানাব কিনা তাও জানি না। হয়ত পাঠক হয়ে একদিন জানবে ওর স্যার কী লিখেছে ওকে নিয়ে। ভালো থাকিস সুমি।

 

সকাল ১০.৩০ থেকে ইডেনে প্রবেশের মাধ্যমে আমি অন্য একটা জগতে প্রবেশ করতাম। সময়টা দারুণ কেটেছে বলবো, বিলকিস আপার সাহচর্য আমার মনকে আজও নস্টালজিক করে দেয়। তখন সম্ভবত ১.০০টায় ক্লাস শেষ হতো। ক্লাস থেকে বেরিয়ে রাতের লিখিত পা-ুলিপি নিয়ে চলে যেতাম কম্পিউটারে। বন্ধুবর সাঈদ ভাইর একটা কম্পিউটার বিজনেস অফিস ছিল কাঁটাবনে। ৩টা পর্যন্ত অপারেটর রফিক ভাইর সাথে থিসিস নিয়ে কাজ করতাম, ৪টায় যেহেতু বাসায় ব্যাচ শুরু হবে, তাই তাড়াহুড়ো করে দুপুরের লা  সেরে পড়াতে বসে যেতাম। ৬টায় ওরা চলে যেত। আমিও ওদের সাথে বাসার ব্যক্তিগত কাজকর্মের জন্য বের হতাম। ছাত্রীরা মাঝেমধ্যে বলতো স্যার কোনো বিশ্রাম নিলেন না? বিশ্রামের সময় কোথায়? সামনে যে আমার অনেক কাজ। লম্বা আমার কাজের ফিরিস্তি। ব্যক্তিগত কাজকর্ম শেষে বাসায় ফিরে বড় ছেলে আসিফের পড়াশোনার খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করতাম। ওকে ওর মা-ই পড়াতেন।

 

সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত লেখালেখি তেমন একটা হতো না। পড়াশোনা করতাম, আর ওদের ঘুমানোর অপেক্ষায় থাকতাম। ওদের ঘুম নিশ্চিত হলেই আমি লেখার টেবিলে কলম চালাতাম। রাতে যা লিখবো আগামীকাল কম্পোজ হবে। লিখতে না-পারলে অপারেটর বসে থাকবে। এভাবে প্রতি রাতে থিসিস লিখতাম। মাঝে মাঝে কিছু ফরমায়েশি লেখাও লিখতে হতো। তখন আমি জাতীয় পত্রিকায় কলাম লিখি। গবেষণা জার্নালেও আর্টিকেল লিখি।

 

রিসার্চ আর্টিক্যাল লেখায় তেমন পারদর্শী ছিলাম না। একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আব্দুর রশিদ ভাই আমাকে একটা আর্টিক্যাল লিখতে বললেন, আমি লিখে তাকে দেখালাম কিছু সংশোধনী ছিল, আমি এসব থেকে অনেক শিখেছি। এরপর থেকে আমার লেখায় তিনি খুব আস্থা রাখতেন। তার সাথে আমার ৪/৫টি আর্টিক্যাল আছে। আমার লেখা আর্টিক্যাল দিয়ে অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রসেফর পদে উন্নীত হয়েছেন। এর মধ্যে আমার একজন শিক্ষকেরও নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

 

পিএইচডি থিসিসের কাজগুলো নিজে নিজেই করেছি। প্রুফ রিডিংসহ সকল কাজ নিজ হাতে সম্পাদন করার চেষ্টা করেছি। আসলে ঐ সময় আমার লেখালেখির হাত অনেক পরিপক্বতা পায়। আমি অনুভব করেছি যা কিছু লিখতে হাত দিতাম, শূন্য থেকে শতকে পরিণত হতো।

 

ইডেনের দিনগুলো বেশ ব্যস্ততায় কেটেছে আমার। ইডেন কলেজে অধ্যাপনার আগে এই কলেজ সম্পর্কে খুব একটা ভালো ধারণা ছিল না বলা যায়। একেবারে একটা নেগেটিভ ধারণা নিয়ে অধ্যাপনা শুরু করি। কিন্তু শেষ করি পজিটিভ ধারণা নিয়ে। বিশেষত ওখানকার শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। চমৎকার একটা পরিবেশ আছে ইডেন কলেজের ক্যাম্পাসে। যদি কেউ জীবনকে অন্যভাবে সাজাতে চায় সে যেন ইডেন কলেজকে বেছে নেয় শিক্ষার জন্য। এই কলেজে অধ্যাপনা না-করলে আমার এই পজিটিভ ধারণা তৈরি হতো না।

 

একবার বিভাগে একটা নোটিশ এলো, ভালো ছাত্রীদের পুরস্কার দেয়া হবে। বিলকিস আপা আমাকে দায়িত্ব দিলেন শ্রেষ্ঠ ছাত্রী নির্বাচন করার জন্য। আমি বিগত দিনের রেজাল্ট ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে ৩/৪ জনের নাম জমা দিলাম ম্যাডামের কাছে। এখান থেকে তিনি ১জনের নাম অধ্যক্ষ ম্যাডামের কাছে পাঠাবেন শ্রেষ্ঠ ছাত্রী পুরস্কারের জন্য। কে শ্রেষ্ঠ ছাত্রী হবে, ছাত্রীর নাম আমি জানতাম, তবে প্রকাশ করিনি। কারণ অন্যান্য ছাত্রী কী মনে করবে এই ভেবে। যা হোক, যেদিন শ্রেষ্ঠ ছাত্রীর নাম ঘোষণা করা হলো আমি নিজেকে সার্থক মনে করলাম। এই ছাত্রীকে আমি গড়ার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। ছাত্রীরও চেষ্টা ছিল। ও যেদিন শ্রেষ্ঠ ছাত্রীর পুরস্কার হিসেবে ক্রেস্ট গ্রহণ করে সেদিন দেখেছি অন্যান্য ছাত্রী ওকে এবং আমাকে একটু বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করল। আমি জানতাম এটা হবেই, তাই হয়েছে। আমি থেমে যাইনি, ভেবেছি আমি থেমে গেলে এমন ছাত্রী আর তৈরি হবে না।

 

কয়েকজন ছাত্রী আজও আমাকে অভিযুক্ত করে হয়তো মনে মনে। এমন একজন ছাত্রী কিছুদিন আগে আমার ফোন নাম্বার জেনেও ফোন করেনি। এটাই হয়তো মূল কারণ। যদিও শ্রেষ্ঠ ছাত্রীর পুরস্কার পাওয়া সে-ছাত্রীর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। জান্নাত, তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থাকো।

 

বিভাগীয় প্রধান বিলকিস আপার সাথে আমার চিন্তা-চেতনার বেশ মিল ছিল। ওনার বইয়ের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। পড়াশুনা করতে পছন্দ করতেন। একবার বিভাগে একটি সেমিনার প্রতিষ্ঠার আগ্রহের কথা প্রকাশ করলেন। আমারও মনঃপূত হলো। এই সেমিনার তৈরি করার জন্য কত যে কষ্ট হয়েছে তা আজও মনে পড়লে শরীরে শিহরণ জাগে। তেমন একটা বাজেটও ছিল না বই কেনার জন্য। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সৌজন্য কপি ও অধিক কমিশনে বই সংগ্রহ করা হলো। বাইতুল মোকারম থেকে বই আনতে হবে, ভাড়ার টাকা নেই। একজন ভক্তকে সাথে নিয়ে অনেক দূর এসে আর পারছিলাম না; ভক্ত বলল, স্যার, ভাড়া আমি দেবো, আপনি একটি সিএনজি ভাড়া নিন। বই নিয়ে আসলাম। এবার সেমিনার প্রস্তুত করার পালা, বিলকিস আপাকে নিয়ে নিউ মার্কেট গেলাম সেমিনার কক্ষের প্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় করার জন্য। মনে পড়ে আজও, আপা নিজের পকেটের টাকা দিয়ে আমাকে কিছু খাওয়ালেন। খুবই সৎ প্রকৃতির একজন শিক্ষানুরাগী প্রফেসর বিলকিস বানু। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহের কিছু বইও আছে ইডেনের সেমিনারে। বহুদিন যাওয়া হয় না। কীভাবে সেমিনারটি আছে জানতে ইচ্ছা করে। মাঝখানে বছর ৬/৭ আগে ক্যাম্পাসে গিয়ে রুমটি তালাবদ্ধ পাই। দেখা যায়নি চক্ষু মেলিয়া আমার সেই সেমিনার কক্ষটি। আশা করি আরো সমৃদ্ধ হয়েছে সেমিনার কক্ষটি। 

 

যারা বন্ধুত্ব করেন, প্রেম-ভালোবাসায় কিছুটা সময় ব্যয় করেছেন তারা সবাই স্বীকার করবেন আপনার বন্ধু যখন বুঝে ফেলবে আপনি তাকে খুব পছন্দ করেন, তখন একধরনের অবহেলার শিকার হবেন আপনি। আপনি তো আছেনই তার জীবনে, তাকে ছেড়ে আর কোথায় যাবেন আপনি। প্রেম-ভালোবাসায় পড়েছেন আর এমন পরিস্থিতির শিকার হননি এমন কথা বলা বেশ কঠিন। অবশ্য এটা দোষেরও কিছু না। খানিকটা সময় আপনাকে ক্লান্ত মনে হবে। আপনি অবহেলা শুরু করলেন আর অমনি আপনার ভেতর মেরাথন শুরু হবে। তানির নাকি ম্যারাথন শুরু হয়, প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। এখন আমি ক্লিয়ার হলাম।

 

বেশ কয়েকদিন যাবত মনে হচ্ছে কোনো অবহেলার শিকার হচ্ছি আমি, আর তানির মনেও একই প্রশ্ন। আমি মনে হয় ওকে অবহেলা করছি। শুনলে আমি অবহেলার নতুন সংজ্ঞা আবিষ্কার হলো কিনা ভাবি। না, তা হয়নি। তবে স্টাইল বদলেছে মনে হয়। যাকে দিন-রাত যখন খুশি ফোনে পাওয়া যেত এখন তেমনভাবে পাওয়া যায় না। ফোনে চার্জ ছিল না, ফোনটা তালিমি-তাজওয়ারের হাতে ছিল, কখন সাইলেন্ট করেছি মনে করতে পারছি নাÑআর কত কী অজুহাত। বারবার ফোন কেটে দেয়া হচ্ছে। ভাবলাম তানি জরুরি কোনো কাজে আছে।

 

৯টায় ক্লাস আছে। ওর এটা নিত্যদিনের ডিউটি। পৃথিবী ধ্বংস হলেও নাকি এই নিয়ম পাল্টাবে না। ৯টা বাজে ফোন দিলাম, একই অবস্থা। এবার আমার অফিসে যাওয়ার পালা। জানি ফ্রি হলে ফোন দেবে। না, সে জানা ভুল হয়। অনেকক্ষণ পর ফোন আসে আর অজুহাতের কথা শোনায়। আমার এসব শোনার আগ্রহ কম। জানি অজুহাত দিলে কত কী বলা যায়, যুক্তির শেষ নেই।

 

প্রায় শত কিলোমিটার দূরে থাকে তানি। ওখানে যা করে আমি হৃদয় দিয়ে অনুভব করি। ওর ২৪ ঘণ্টার রুটিন এখন আমার প্রায় মুখস্থ। রুটিনের সাথে এখন মেলাতে পারছি না। নিজের ভেতরের একটা জগৎ আছে যেখানে ও বসবাস করে। চাইলে বের করা যায় না। বের করলেও যে ভালো থাকতে পারব এমনটাও বলা যায় না। ২/১ বার চেষ্টা করেছি, সফল হইনি একবারও।

 

অবহেলায় তৈরি হয় বিচ্ছেদের মিনার। আমি এতে এখন আর মন খারাপ করি না। কারণ একটা কিছু তো অর্জন হচ্ছে আর তা হচ্ছে লেখালেখির উপাদান। যার জন্য লিখতে পারছি তাকে ধন্যবাদ যে দিতেই হয়। আমার পক্ষ থেকে এমন ধন্যবাদ পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা কম দীর্ঘ নয়। আমার ছাত্র-ছাত্রী যেমন আছে, আছে আমার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন। এ-তালিকায় আছে আমার স্ত্রী সন্তানের নামও। কেউ বুঝে আমাকে লেখার উপাদান তৈরি করেছে আবার কেউ না-বুঝে। যে না-বুঝে করেছে সে যখন জানবে যে, তার জন্য লেখালেখি করছি, বড় ভালোই লাগবে তার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই লেখা কি তার গোচরে আসবে কখনো? হয়তবা না। এটা ভাবাই সমীচীন।

 

যৌবনে ২৪ ঘণ্টা কলম চালাতে পারতাম। এখন ২/১ ঘণ্টা পর হাত ব্যথা করে। এটা স্বাভাবিক, অন্য কিছু নয়। তবে এমন হলে আমার যে কত লেখা বাকি তা আমি কীভাবে লিখে শেষ করবো। সব লেখকই তার জীবদ্দশায় সব লিখে শেষ করতে চায় কিন্তু কোনো লেখক কি পেরেছেন? না, এই তৃপ্তি কারোরই নেই। সব লেখকের মধ্যে এই হতাশা কাজ করবেই। মাঝেমধ্যে ভাবি এসব করে কী লাভ হবে। আমিও লেখক মানুষ। লেখালেখি করলেই তো পারি। সময়টা বেশ কাটবে। কিন্তু না, তা কি হয়? জীবনে যারা কমবেশি লেখালেখি করেছেন এমন লোকের সাথে বেশ জমিয়ে আড্ডা দিয়েছি। জেনেছি লেখার উপাদান নাকি চায়ের আড্ডাখানায় কিংবা প্রিয়ার অবহেলায় পাওয়া যায়। চা খাওয়ার অভ্যাস আমার একদম নেই। কেউ জোর না-করলে আমি খাই না, কেউ মনে না-করলে কাউকে খাওয়াতেও মনে থাকে না। তবে কেউ অফার করলে মাঝেমধ্যে চা পান করি। তাই চায়ের আড্ডায় আমি উপাদান খুঁজে বেড়াই না। 

 

আমার লেখালেখির প্রধান উপাদান তৈরি হয় অবহেলায় আর বিড়ম্বনায়। অপেক্ষায় তো বটেই। কেউ আমাকে উপেক্ষা করলে আমার ভালোই লাগে। জানি সে আমাকে না-জেনেই উপেক্ষা করছে। মানুষ এখন আর কেউ কাউকে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করে জানতে চায় না। তাই সামান্য যোগাযোগে যেমন সম্পর্ক তৈরি হয় তেমনি সামান্য অবহেলায় তৈরি হয় বিচ্ছেদের মিনার।

 

বেশ কয়েক বছর যাবত আমার লেখালেখি পরিমাণে কম হচ্ছে। এর মূল কারণ হিসেবে আমি বারবার উল্লেখ করেছি যে, আমি এখন ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। সকাল-সন্ধ্যা আমাকে কলেজ প্রতিষ্ঠান নিয়ে ভাবতে হয়। লেখালেখির সময় কোথায়? তবে যাই লিখি সবাই ভাবে আমি এত কিছু করার পর সময় কোথায় পাই। স্বভাবসুলভভাবে যে উত্তর সবাই দেয়, আমিও বলি ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। সবাই যখন কর্ম থেকে বিশ্রামে থাকে, লেখক তখন চিন্তার জগতে বিচরণ করে। ভাবনার জগতে সে ঘুরে বেড়ায়, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে অতি দ্রুত তা লেখায় রূপান্তর করতে হয়। না হয় খানিক পর সে লেখা হারিয়ে যায়। সে-জন্য অন্য মানুষের জীবনযাত্রার সাথে লেখকের জীবনযাত্রার একটু পার্থক্য আছে। অনেক কাজে লেখক যোগ দিতে পারে না। তার যে মন নেই, তা না। আর দশজনের মতো তারও মন চায় হৈ-হুল্লোড় করে জীবন কাটাতে কিন্তু লেখক পারে না। কারণ তাকে যে প্রতিদিন লেখার উপাদান খুঁজে বেড়াতে হয়। যখন উপাদান পাওয়া যাবে তখনই টেবিলে বসতে হবে। লিখতে না-পারলে ভেতরে যে-বেদনা তৈরি হয় সে-বেদনার রং-ই বোধহয় নীল।

 

অনেক ভালো বিষয় চিন্তা করেও ভালো কিছু লিখতে পারিনি। আবার চিন্তা ছাড়াও অনেক ভালো বিষয় লিখে ফেলেছি। লেখার এই ব্যাপারটা লেখক মাত্র বুঝবেন। নাট্যকার সেলিম আল-দীনের একটা টিভি সাক্ষাৎকার দেখেছিলাম অনেক বছর আগে। উনি এখন আর বেঁচে নেই। রাতে স্ত্রীর সাথে মন খারাপ করতেন। ঘুমের অবস্থায় রাত ২টার সময় বাথরুমের ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার আওয়াজ শুনতে পান। সারাদিন একটি বিষয় নিয়ে চিন্তা করেও লিখতে পারেননি। শব্দ শুনে লেখার আইডিয়া আসে। অমনি স্ত্রীকে রেখে লেখার জন্য লাইট জ্বালালে স্ত্রী চিৎকার করে। সে তো আর জানে না সেলিম এখন না-লিখলে সকালে আর মনে থাকবে না। এটা শুধু সেলিম আল-দীনের জন্য প্রযোজ্য নয়, প্রতিটা লেখকেরই এমন হয়। যদিও এই যুক্তি স্ত্রীরা মানতে নারাজ। তারা মনে করে সংসারের সবকিছু সামলেও লেখা যায়। হাতে সময় থাকলেই লেখা যায়। এটা এমন কী ব্যাপার যে সারাক্ষণ ধ্যান মেরে থাকতে হবে। ধ্যান যে কেন করতে হয় তা লেখক ছাড়া অন্যকে বোঝানো দায়। 

 

বাসায় মাঝে মাঝে লেখার সময় পাই কিন্তু লেখার আইডিয়া পাই না। আইডিয়া এবং সময় এক করা যায় না।

 

বেশ কিছুদিন যাবত বাবার জীবনস্মৃতি নিয়ে লেখার প্ল্যান করছি কিন্তু হয়ে উঠছে না। ভাবতে ভাবতে অনেকটাই সময় চলে গেল। এবার ভাবছি আর ভাবনা নয়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে লিখে শেষ করবো। ২০১৯ সালের বইমেলায় যেন বইটা প্রকাশ করতে পারি। কিন্তু ২০১৯ সালও শেষ হচ্ছে প্রায়।

 

আমার জীবনে যেসব নারী প্রেমাস্পদ হয়ে এসেছে তারা সবাই না-হলেও ৩ জন নারীর কথা আমি স্মরণ করতে পারি, যারা আমার লেখালেখিকে পছন্দ করতেন। আমি লিখি, বই প্রকাশ করি এটা মনে-প্রাণে চাইতেন। ক্ষেত্র বিশেষ কেউ কেউ প্রুফ দেখা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরে সাহায্য করতেও এগিয়ে এসেছেন। কলেজ প্রতিষ্ঠার পর এমন একজন বন্ধুর কথা মনে পড়ে, যে কিনা আমার সাথে দেখা হওয়ার আগেই আমার লেখা পড়েছে। প্রথম পরিচয় হওয়ার পর জানতে চেয়েছিল আমি কি লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছি? নানা প্রতিকূলতার কথা জেনে তিনি আমার সকল কাজের দায়িত্ব নিয়ে আমাকে লিখে যেতে অনুরোধ করেন। তার উৎসাহে ঐ সময় আমার বেশ কিছু লেখালেখি শুরু হয়। বই আকারেও প্রকাশ হয়।

 

ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় ২০১৩ সালে। যেদিন আমি বুঝতে পারলাম আমি তাকে আর কাছে পাবো না। তিনি আমার আর কোনো কাজের সহযোগী হবেন না। তবে ঐ সময়টা বেশ স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বেশ কিছু কাজ করেছি ঐ সময়ে। অনেকগুলো লেখা জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। তখন আমি জাতীয় পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করি, ওয়ার্কশপে বিভিন্ন প্রবন্ধ উপস্থাপন করি। পত্রিকার এসব লেখা ও ওয়ার্কশপে উপস্থাপিত প্রবন্ধগুলো নিয়ে পরবর্তীকালে বই প্রকাশ হয়েছে। আজমত আরা আমার জীবন থেকে দূরে থাকলেও মনের গহিনে আছে অবিরত। ভালো থেকো তুমি ওগো বন্ধু আমার। 

 

অনেক কিছু দিয়েছ তুমি আমাকে, দিয়েছ আমার প্রতিষ্ঠানকে। আইইসি তোমার কাছে ঋণী থাকবে চিরকাল। যাত্রাবাড়ি থেকে ধানমন্ডিতে কলেজ স্থানান্তরের পর স্বাভাবিকভাবে লেখালেখির ছন্দপতন হয়। অফিসিয়াল কাজ সামাল দেয়ার মতো কাউকে পাইনি তখনো। বন্ধুবর ইউসুফ ভাই জানালেন একজনের কথা। অফিসে সাক্ষাতের জন্য ডেকে আনলেন তাকে। দেখে মনে হলো লেখালেখিতে তেমন কোনো অবদান রাখতে না-পারলেও অফিস নিয়ে আমাকে আর ভাবতে হবে না। আমার চিন্তা যেন বাস্তবে সত্য হলো।

 

দীর্ঘদিনের হিসাবনিকাশের ঝামেলা বেশ সুন্দরভাবেই সামলে নিলেন লিমা। আমি যখন বুঝতে পারলাম আমার অফিস ঠিক আছে, তখন আমি লেখালেখিতে আবার মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করলাম। দূর থেকে ও দেখতো আমি যেন কী নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আস্তে আস্তে জানলো যে আমি শুধু কলেজের অধ্যক্ষ নই, লেখকও বটে। আমার লেখালেখির সাথে কমবেশি পরিচিত হলো। আমাকে লেখার জন্য সময় বের করে দিলো। এই প্রথম আমাকে ও পরামর্শ দিলো, আমি যেন বইগুলো আমার প্রমিনেন্ট পাবলিকেশন থেকে প্রকাশ করি। অর্থ যোগানের আশ্বাসও পেলাম। ওর সাহস দেখে মনে মনে দোয়া করতে লাগলাম ওর ইচ্ছা যেন পূর্ণ হয়। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে ২০১৫ সালে আমার লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশ হয়। ওকে দেখে মনে হবে না এই জগতের মানুষ, কিন্তু ও  শেষ পর্যন্ত আমার বইগুলো প্রকাশে সহযোগিতা করে প্রমাণ করলো ও আমার একজন ভালো বন্ধু।

 

মাঝে মাঝে একা একা শাহবাগ যেতে ইচ্ছা করতো না, ওকে নিয়ে যেতাম যাতে প্রকাশনা সম্পর্কে একটা ধারণা লাভ করে। এখন বলা যায় আমার অবর্তমানে ও এইসব প্রকাশনা বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। তবে কেউ কেউ এ নিয়ে অনেক কথা ছড়িয়েছে। আমি তো জীবনে এসব পাত্তা দিইনি কোনোদিন। জানি না ও এসব উপেক্ষা করে কতদূর যেতে পারবে। আমার প্রমিনেন্ট পাবলিকেশনের হিসাব-নিকাশ ওর জানা আছে। কতটুকু সংরক্ষণ করেছে জানি না। কলেজটি বারবার স্থানান্তর হওয়ায় বেশ কিছু ঝামেলায় আছে ও। ওর মাথায় এত ঝামেলা যে, এখন ও এসব সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। মন দিয়ে ফোন করতে পারছে না। তবে আমাকে বারবার তাগিদ দিচ্ছে আমি যেন আমার লেখাগুলো তাড়াতাড়ি বই আকারে প্রকাশ করে যাই। আমার অবর্তমানে আমার ছেলেদের যেন এর অনুসন্ধানে বেগ পেতে না হয়। কারণ ইতোমধ্যে আমার লেখার অনেক পা-ুলিপি হারিয়ে গেছে। অনেক খুঁজেছি, পাইনি। তবে কলেজে থাকতে পারে এমন ধারণা থেকে লিমা খুঁজে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। জানি না পাওয়া যাবে কি না। আর বিষয়গুলো নিয়ে দ্বিতীয়বার লেখার আমার আর কোনো আগ্রহ নেই। জীবনে অনেক লেখা হাতছাড়া হয়েছে, পাইনি। কেউ পেয়ে থাকলেও গুরুত্ব দেয়নি।

 

আমার বাসা থেকেও অনেক লেখা গায়েব হয়েছে। আমার লেখালেখি বাসার লোকজন তেমন একটা পছন্দ করে না। মুখে না-বললেও তাদের আচরণে বেশ ভালোই প্রকাশ পায়। আমাকে কেউ যদি লেখালেখিতে সহযোগিতা করে তাকে আমি ভিন্ন চোখে দেখি।

 

২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমি বুঝতে পারলাম লিমা আমার লেখালেখিতে আর সহযোগিতা করতে পারছে না। কী করব অনেক দিন ধরে ভাবছি। এফবিতে বন্ধুর সংখ্যা প্রায় ৪০০। এদের মধ্যে কেউ কেউ আমার লেখা পছন্দ করে, তবে তাদের কেউ এমন নয় যে, আমাকে প্রকাশনায় হেল্প করবে। ভাবনার জগৎ বিস্তৃত করতে লাগলাম। আর ভরসা করতে লাগলাম মহান আল্লাহর উপর। সবাই তো আমার মনের কষ্টটা বুঝবে না, শেয়ার করা যায় না সবার সাথে। আগেই বলেছি আমার ছাত্রী তানি আমার কাজগুলো পছন্দ করে। ওর সাথে শেয়ার করতে লাগলাম আমার ইচ্ছাগুলো নিয়ে। কোনো কিছু না-ভেবেই আমার এসব কাজে ওর সমর্থনের কথা জানায়। সেপ্টেম্বর মাসে একটা সমস্যার কথা ওকে জানাতেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এ-ঘটনার পর ওর ওপর আস্থা ফিরে পাই।

 

এখন প্রতিদিন খবর নেয়ার চেষ্টা করে আমার লেখালেখির। মাঝখানে লেখা শুরু করেও লেখা হয়নি। বারবার খোঁজ নিবে তাই শপথ নিলাম বইটা এবার লিখেই শেষ করবো। কাজে হাত দিলাম। সারাদিন অফিসিয়াল কাজের ফাঁকে ফাঁকে লেখার চেষ্টা করি। এতে লেখার প্রচুর ব্যাঘাত ঘটে। যা লিখতে চাই তা আর হয় না। যা হয় তাও মন্দ নয় ভেবে লেখা থামাচ্ছি না। মনের অজান্তে অনেক লেখা হয়ে যাচ্ছে ভেবে এবার লেখার ইতি টানবো না বলে ইচ্ছা পোষণ করেছি।

 

জানি না কোন ঝামেলা এসে আবার কলম থামিয়ে দেয়। এমন ঘটনা জীবনে বহুবার ঘটেছে। আমিও নাছড়বান্দা, বাধা পেলে সে কাজ বেশি করে করি। আমার ছাত্রী তানির সাথে নাকি এ-বিষয়টা একদম মিলে যায়। যখন কোনো বিষয়ে ওর মতের সাথে আমার চিন্তার মিল হয় অমনি চিমটি কাটে। প্রথম দিকে বুঝতে পারিনি। এখন বুঝি আর বেশ এনজয় করি। আমার চেয়ে ওর মধ্যে আবেগটা বেশি লক্ষ করি। বিশেষত আমার চিন্তার সাথে ওর চিন্তা মিলে গেলে ও বেশি আবেগতাড়িত হয়, খুশি হয় দারুণভাবে, উল্লাস করে গলা ফাটিয়ে। আমি ওর কাছে এমনই একজন গুরু, যাকে ও জীবনের সব কথা বলার সাহস রাখে। জীবনের এই পর্যন্ত নাকি এমন শেয়ার করার লোক ও পায়নি। শুরুতে বিশ্বাস হতো না, এখন ওর আবেগ দেখে সারাদিনের রুটিন দেখে মনে হয় ওর মণিকোঠায় আমার জন্য একটা ছোট্ট স্থান আছে।

 

কোনোদিন আমার লেখা না-হলে কৈফিয়ত চায়। বড্ড ভালো লাগে কেউ আমাকে তাগাদা দেয়, সাহস যোগায় ভাবতে ভালো লাগে। সারাদিনের রুটিনে অনেকটা সময় আমার নামে বরাদ্ধ করার লোক এখন বেশি নেই। বলা যায় ২/১ জন মাত্র। তানির নাম কি বাদ দেয়া যায়? না, বাদ তো দূরের কথা ও তো এখন আমার ভাবনার অনুষঙ্গ। প্রতিক্ষণ ওকে নিয়ে ভাবি। ওর জীবনটাও খুব যে মসৃণ তাও না। অনেক ভালো মনের মানুষ অনেক ভালো চিন্তা করে। তারপরও মনে হয় ভালোভালো জিনিসগুলো ওর থেকে অনেক দূরে বাস করে। আমার সাথে যতক্ষণ কথা বলে মনে হয় না পৃথিবীতে ওর আর কোনো কাজ আছে বা কেউ ওর জন্য কাঁদে। মুখে বলে না কষ্টের কথা কিন্তু ভেতরটা পুড়ে ছারখার হয় প্রতিনিয়ত। ভদ্রলোকের সন্তান বলে পাশের মানুষগুলোকে বুঝতে দেয় না। নিজেকে আড়াল করে রাখে, ওর পৃথিবীতে অন্য কাউকে বিচরণ করতে দেয় না। এটা ওর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

 

এক সময় মনের সবকটা জানালা খোলাই ছিল। আস্তে আস্তে সব জানালা বন্ধ করেছে। বলা যায় শুধু দরজাটা খোলা রাখে, তাও সবসময় না, যখন ও প্রয়োজন মনে করে। যে-দরজা দিয়ে ওর পারমিশন ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারে না। অনেকে প্রবেশের চেষ্টা করেছে, বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে, ফিরে গেছে কষ্ট নিয়ে কিন্তু আমি যে কখন প্রবেশ করলাম তা আমরা কেউই জানি না। আমি কি জোর করে প্রবেশ করেছি? না, ও বলে আমার অপেক্ষায় ছিল ১৬ বছর। কথাটি শুনে অবাক হলাম, তা কী করে সত্য হয় অথচ আমি জানি না। ও আমার মতো একজনের অপেক্ষায় ছিল হয়তো। আমি যেন তারই প্রতিচ্ছবি মাত্র।

 

বেশ কিছু বিষয় ওর সাথে আমার শেয়ারিং হয়। এর মধ্যে অন্যতম বিষয় হচ্ছে আমার লেখালেখির জগৎ। একসময় আমি নিয়মিত জাতীয় পত্রিকাগুলোতে লেখালেখি করতাম। এ বিষগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে একটা বই লিখেছি। বইটির নাম দেয়া হয়েছে ‘আত্মিক জ্ঞান’। বইটি বেশ কয়েকবার প্রকাশনার দারপ্রান্তে এসেও আলোর মুখ দেখেনি আজও। বই প্রকাশনায় ওর আগ্রহের কথা জেনে এখন বলা যায় দিন-মাস গুনছি। জানি না সকাল হবে কি না।

 

বলাবাহুল্য, এ-যাবত বইটা বেশ কয়েকবার প্রকাশকের হাতে গিয়েছে, প্রশংসিত হয়েছে, আবার ফেরত এসেছে। আমি জানি এ-বইটি সুখপাঠ্য তো হবেই ব্যবসা সফলও হবে। একটি বই প্রকাশ করা সহজ, বইটিকে মার্কেটিং করা, ব্যবসায় বাণিজ্যের তালিকায় নেয়া মোটেই সহজ নয়।

 

ছাত্রজীবন থেকে আমি প্রকাশনা শিল্পের সাথে জড়িত। একটি ব্যবসা সফল বইয়ের চেহারা যেমন হয় তা আমার জানা আছে। ভালো বই হলেই পাঠক গ্রহণ করবে এমন কোনো কথা নেই। পাঠকের প্রয়োজন কতটুকু মেটাবে সেটাই বিবেচ্য বিষয়। আমার লেখা এই বইটি পাঠকের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

ইডেন কলেজে চাকরির সুবাদে পরিচয় হওয়া তানি এখন আমার চিন্তার জগতের সাথে জড়িয়ে আছে। ছাত্রজীবনে ওর এমন কোনো কর্মকা- মনে পড়ে না, যে ওকে আমার ভালো লাগবে। ওর সাথে তেমন একটা সখ্যও ছিল না। আগেই বলেছি ওর বান্ধবী পপির সাথে খানিকটা আলাপ-পরিচয় ছিল। তানির কথা মনে হলে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে হালকা রঙের সালোয়ার কামিজ পরা একটা মেয়ে হোস্টেল থেকে মাঠের মাঝের রাস্তা দিয়ে হেঁটে ক্লাসে আসছে। মাথায় চুলগুলো বেশ লম্বা ছিল হয়তো। পপির দিকে তাকালেই ওর ডান-বামে তানিকে পাওয়া যেত। খুব শান্ত স্বভাবের মেয়েটা এখন এত কথা বলতে পারে যা মেলানো যায় না আগের স্বভাবের সাথে। প্রাইমারি স্কুলে চাকরির সুবাদে গলাটা লম্বা হয়েছে বৈকি। কিন্তু এত সুন্দর কথা বলার স্টাইল ও কোথা থেকে রপ্ত করলো আজও জানা হয়নি। খানিকটা চেষ্টা করে যা বুঝেছি তা আমার চিন্তায় আনতে চাই না। কষ্ট বাড়াতে চাই না। তবে সময়ের ব্যবধানে ও এখনও ভালো আছে, এমনটা আমি ভাবি।

 

দোষ-গুণে মানুষ, তাই মানুষের দোষ-গুণ বিচার করলে বন্ধত্ব করতে সহজ হয় এবং দীর্ঘদিন একসাথে থাকা যায়। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় কারো দোষ আর না-খুঁজি। ওর মধ্যে অনেক দোষ আছে, এমনটা কি আমার লেখায় বোঝা যাচ্ছে? না,  মোটা দাগে যদি চিন্তা করি তাহলে বলতে হবে ‘তানি, তুমি নিজেকে চেনো’। কেউ যদি নিজেকে চিনতে পারে সে নিজেকে বদলাতেও পারে। এই বেলায় খুব বেশি বদলানোর প্রয়োজন নেই। শুধু তোমার কষ্টটা ভেতরে চেপে রাখার অভ্যাসটা পরিবর্তন করলেই চলবে।

 

বন্ধু হিসেবে তোমার কোনো সমালোচনা আমি করতে পারবো না। তা কি হয়? নাÑকরা যাবে, করা উচিত, সমর্থন করো তুমি! ‘রাগ’ শব্দটা তোমার অভিধানে না-থাকলে ভালো হতো। আবার রাগ না-থাকলে প্রেমের সাধ মিটতো কী করে জানি না। ‘রাগ’ আছে বলেই বন্ধু তানি তুমি আছ। এটা তোমার অলঙ্কারও বটে। থাকুক না কিছু অলঙ্কার তোমার একদমই নিজস্ব। ও রাগের কথা বলছি! যাক দারুণ একটা বিষয় নিয়ে শেয়ার করছি। প্রয়োজনে আমার থেকে নিতে পারো তুমি সুবিধামতো, প্রচুর আছে আমার, বেশ তো আছে তোমারও। তবে হ্যাঁ, আমার আর দরকার নেই। পুরোটাই নিতে পারো। আমি এখন বিপরীত চিন্তা করি। আমি আর এসব বাজে সম্পদ আমার কাছে গচ্ছিত রাখবো না ভাবছি। জীবনে এর বহু যাতনা আমাকে সহ্য করতে হয়েছে। এখনো করে যাচ্ছি অবিরত। আর পারছি না। তবে আমার জালালী মেজাজটা নাকি কারো কারো কাছে ভীষণ পছন্দের। প্রশংসাও পেয়েছি, ভর্ৎসনাও কম হয়নি। বন্ধুরা বলে, আমার নাকি অসম্ভব রকমের গুড পার্সোনালিটি আছে। মেয়েরা হামেশাই বলে বেড়ায় এই পার্সোনালিটির কারণেই নাকি সবাই আমাকে ভালোবাসে। প্রথমেই সবাই এই পার্সোনালিটির প্রেমে পড়ে। এসব শুনে আবার এই বাজে স্বভাবটা ছাড়তে ইচ্ছে করে না। ভাবছি কী করব, নিজের কাছে রাখবো, নাকি তানির কাছে জমা রাখবো।

 

পার্থিব জীবনের নারী-পুরুষের প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে আমার প্রচুর সন্দেহ আছে। বিশেষ করে স্বার্থের কাছে যখন এই প্রেম-ভালোবাসা হেরে যায়। প্রেমের চেয়ে কাউকে যখন আবেগটা দেখাতে পারি না তখন ভালোবাসার মানুষটি ভুল বোঝে। হয়তো দুটোই মুখ্য। তারপরও প্রাধান্য দেয়ার বিষয় আছে। জীবনব্যাপী যদি শিক্ষা হয় জীবনব্যাপী ভালোবাসা করতে দোষ কোথায়? কিন্তু এখন দুনিয়ার মানুষগুলো কেন জানি পার্টটাইম ভালোবাসা করতে আগ্রহী বেশি, দিনে দিনে এই প্রকোপ বাড়ছে। মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাশ্চাত্য সভ্যতায় অনেক আগেই প্রভাব ফেলেছে, অধুনাকালে বাংলাদেশেও এর অনেকগুলো রপ্তানিকারক কোম্পাানি বেরিয়েছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় যেমন ভূমিকা রাখছে, তেমনি হাল ফ্যাশনের নারী-পুরুষের চাহিদা তো বটেই। সদ্য গ্রাম থেকে উঠে আসা তরুণ-তরুণীদের চাওয়া-পাওয়া বেশ তফাত লক্ষ করা যায়। সভ্যতা যেভাবে এগুচ্ছে একসময় আমার তানির মতো মানুষগুলো ব্যাকডেটেড হয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই কিছুটা আঁচ করছি।

 

আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি, তখন সিনিয়ারদের মুখে শুনতাম আমাদের অধঃপতনের কথা। শিক্ষকদের মুখে হতাশার কথা শুনতাম। আর এই সামান্য সময়ের ব্যবধানে এখন আমরা কী শুনাবো জাতিকে, অনেক পরিবর্তন এসেছে। শ্রদ্ধাবোধ, স্নেহ, ভালোবাসা শব্দগুলো মনে হয় হারিয়ে যেতে বসেছে। কার দায় এসবের জন্য। জানি কেউ দায় নিবে না। দায় আমাকে আর তোমাকেই নিতে হবে। সময়ের ভাবনায় আমরা এখন প্রায় অচল বলা যায়। সচল করতে হলে আমাদের বদলাতে হবেÑকী বদলাতে হবে? আবেগ, প্রেম-ভালোবাসা নাকি জীবন-যৌবনের আকাক্সক্ষাÑ জানি এ-প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হবে না। কেউ কি চাইলেই এসব বদলাতে পারে? হয়তো কেউ পারে কিন্তু আমরা যে বদলাতে পারবো না। নৈতিকতা, শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসার যে অধঃগতি দেখছি তা থেকে নতুন প্রজন্মকে সাবধান করা দরকার। কিন্তু কে শুনবে আমাদের সে সাবধানতার বাণী? জানি শুনবে না, কেন শুনবে ওরা। তাদের ধারণা ওরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জানে, ভালো বোঝে। আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া ওরা ভালোই চলতে পারে। তাহলে কেনই বা তারা আমাদের সতর্কবাণী আমলে নেবে? থাক আমরা বলি কোনো দরকার নেই আমাদের কথা শোনার, তোমরা তোমাদের মতোই জীবন গড়ো। তবে একথা বলতে পারি, সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন তোমরা আমাদেরকে খুঁজবে সেই অমীয় বাণী শোনার জন্য। কিন্তু সেদিন কি পাবে আমাদের খুঁজে? না, তোমরা সে-পথ হারিয়েছ বেশ আগেই!

 

বেশ কদিন যাবত প্রচ- গরম হাওয়া বের হচ্ছে। কোনো জায়গায় কোনো স্বস্তি নেই। নেই প্রেম-ভালোবাসার মানুষের সাথেও কোনো যোগাযোগ। রাতের তীব্র গরমের হাওয়া সহ্য করে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে কাটিয়েছি। জানি সকালে কথা হবে তানির সাথে। বেশ কিছুদিন যাবত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে সকালের ফোন কল করার। সময় কম, অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি, কথা কম হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই কলটা খুব জরুরি। সারাদিনের অফিসের সকল ঝক্কিঝামেলা সামাল দেয়া কঠিন হবে। সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত কোনো ফোনরিসিভ হচ্ছে না। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে কেউ ফোন কেটে দিচ্ছে কিন্তু কেন? প্রশ্নের জবাবের জন্য পেরেশানি বাড়ছে। কোথায় কাকে ফোন দিলে ওর খবর পাওয়া যাবে। নানা ভাবনায় আমি আছন্ন। আমার স্বভাব হচ্ছে কাউকে না-পাওয়া পর্যন্ত প্রেসার বেড়ে যায়। যা ভাবলাম তাই হলো। অনেক প্রেসার মনে হচ্ছে, ক্রমে শরীরটা খারাপ হতে লাগলো। অফিস সময় পার হয়ে যাচ্ছেÑরেডি হয়েও পা চলছে না। 

 

যাও, তোমাকে আর ফোন দিব না। একটা ফোন কাউকে না-দিলে আর কী হবে। সিদ্ধান্ত নিলাম আজ আর ফোন কল হবে না। বাসা থেকে বের হলাম অফিসের দিকে, নানা বুদ্ধি মাথায় আসে, অনেক প্রশ্ন জমা হয় মাথায়। একটা কিছু করতে হবেÑ সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। কিছুদূর যেতেই এক পরিচিত ভদ্রলোকের সাথে দেখা। ভাবছি তেমন কথা বলবো না। বাহ! লোকটা আমাকে ছাড়ে না। কথা আর শেষ করে না। মনে মনে ভাবি, কখন যে লোকটার সাথে খারাপ ব্যবহার হয়ে যায়। এখন যদি কেউ ফোন করতো ফোনের উছিলায় চলে যেতাম। দারুণ ছিল সেই মুহূর্তটা। ফোন আসে, তানিও হাসে। স্যার কেমন আছেন? এই তো আছি। তুমি? ভালো আছি স্যার। ভাবলাম যদি ভালোই থাকবে তো আমি কেন, ফোন ছেড়ে দিলাম। কথা বলার আগ্রহ কমিয়ে দিলাম। কথা বলবো নাÑ এমন শপথ নিলাম না। তবে ভাবনায় রাখলাম হয়তো এমনটা হতেও পারে।

 

সারাদিন প্রচ- গরমের মধ্যে লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। অফিসের এসি খুব একটা অন করি না। তবে গরম হলে অন করি আর বেশি বেশি লিখি, ভাবি এসির বিলটা তো ওঠাতে হবে তাই না! সারাদিনে বেশ ভালোই লিখলাম। সন্তুষ্ট হতে পারলাম না তারপরও। মন যে খারাপ তা টের পাচ্ছি, কারণ লেখায় ভাষার ব্যবহার মনের মতো হচ্ছে না। লেখার মাঝে বিরতি দিই, আর ফোন কলের অপেক্ষা করি কিন্তু কথা বলার প্রয়োজন মনে করি না। সারাদিন কথা হয় তারপরেও কথা শেষ হয় না, আজ এমন কেন মনে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ফোন আসে, খুব একটা কথা বলতে মন চায় না। একটা কথা শুনতে মন চায়, তা আর শোনা হয় না। বলে না কেন? আসে না কেন? ভাবখানা আর ভালো লাগে না। 

 

সকাল দুপুর বিকেল গড়িয়ে আকাশে সন্ধ্যা নামে। লেকের পাড়ে সময় কাটাই, কত যে প্রেমিক যুগল চোখে পড়ে কোনো কিছুতেই শান্তি খুঁজে পাই না। কিছুদূর যেতেই দেখি এক জোড়া প্রেমিক হাতে হাত রেখে কথা বলছে। বেশ রোমান্টিক দৃশ্য। আমাকে আকর্ষণ করে না। কারণ এই লেকের পাড়ে বহু যুগলকে দেখেছি তারা হাতে হাত রেখে শপথ করে, আর পরক্ষণেই মতের অমিল হলে সবকিছু ছুড়ে মারে। বিশ্বাস হয় না এসব অভিনয়।

 

তানির সাথে তো এমন কোনো অভিনয় হয়নি আমার। মনের ভেতর যেন রোমান্টিকতা অনুভব করছি। ফোন কি দেয়া যায়? কেমনে দিই, বড্ড যে দেরি করে ফেলেছি। যাক শরীরের মেদটা কমাই। হাঁটাহাঁটি করছি, ভাবছি এই ধানমন্ডি লেকে কত প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের স্মৃতির মিনার তৈরি করেছে। আবার কত মানুষের দুঃখ-কষ্টের সাক্ষী এই লেকের গাছপালা তরুলতা। কেউ কি শিক্ষা নিয়েছে এখান থেকে, প্রতিদিন কত অশ্রু ঝরে এই লেকে। কত বন্ধন তৈরি হয় এখানে, কত যে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে এখানে। সময়ের ব্যবধানে ধরন পাল্টেছে কিন্তু পাল্টায়নি প্রেমের মোহ। ভালোবাসার পরশ পেতে যারা ভালোবাসে তারা একবার হলেও এখানে আসেন। কালের সাক্ষী হয়ে আছে আমাদের ধানমন্ডি লেক।

 

বাসায় ফিরে গরমের তীব্রতায় ভালোবাসার তীব্রতা তেমন অনুভব হয়নি। শরীরটা তো ভাল যাচ্ছে না। বিশ্রামের পর ফোন কলের চেষ্টা, তবে সফল হয়নি। কথা বলার তেমন আগ্রহ তৈরি হলো না। রাত ১২টার দিকে তানি ঘুমিয়ে যায় কিন্তু আমার ঘুম আসে না। আকাশে মেঘের ডাকাডাকি। অপেক্ষা করছি বৃষ্টির, অনেক তর্জন-গর্জন কিন্তু বৃষ্টির নামে বাতাসের আনাগোনা শুরু হলো কেবল। বৃষ্টির ভাবখানা দেখে ছোটবেলায় ক্ষেতখামারে কাজের দৃশ্য মনে পড়ে যায়। বর্ষাকালে ধানের বীজ তৈরির সময় বাবা আর দাদা (বড় ভাই) মিলে হালচাষ করতেন। ক্ষেতে পানি না-থাকলে থালা-বাটি নিয়ে আমি ও আমার ছোট ২ ভাই-বোন পাশের ক্ষেত থেকে পানি দেয়ার চেষ্টা করতাম। ক্ষেত পুরাটা ভেজাতে পারতাম না। একপাশে দিতে দিতে অন্যপাশ শুকিয়ে যেত। কোনোভাবে বাবা বা দাদার ইচ্ছামতো ক্ষেত পানি দিয়ে ভেজাতে পারতাম না। মাঝেমধ্যে রাগ করে বলতো শরীরে কি আর শক্তি নেই তোদের? দাঁড়া আজকে যদি তোরা খেতে বসিস। আসলে তোরা কোনো কাজের না। যাক এর মাঝে কাজ শেষ হতো। আমরা মন খারাপ করে বাড়ি ফিরতাম। এত কষ্ট করেও কারো মন পেলাম না। রাতের বৃষ্টি দেখে তাই মনে হয়েছে সব ফেরেস্তা মিলেও পানি দিয়ে মন ভেজাতে পারলো না এই পৃথিবীর মানুষের!

 

অনেকক্ষণ পর খানিকটা স্বস্তি ফিরে এলো জীবনে। ফোনে কথা হবে তানির সঙ্গে। মনে মনে কত যে আনন্দ অনুভব করি তা বলে বোঝানো যাবে না। বারবার ফোনটা হাতে নিই, ফোন করা হয় না। কেন ফোন করবো ভাবি। ফোনের যৌক্তিকতা কী, যাক ফোন পেলাম, কেন জানি কথা বলার আগ্রহ দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। ভাবলাম কী কমে যাচ্ছে? বারবার মনকে প্রশ্ন করি, কোনো সদুত্তর পাই না। কী উত্তর আমি আশা করি জানা আছে কারোর?

 

দুদিন যাবত মন তেমন একটা ভালো নেই। চেষ্টা করছি মন ভালো করার জন্য। সকালে অফিসে আসার কথা থাকলেও একটু দেরি হবে ভাবছিলাম। রাতে তেমন ঘুম হয়নি। কিন্তু সকাল হতেই রুটিন ভিন্ন মনে হলো। আমার মেঝ ছেলে নাসিফ কোচিং-এ যাবে। ওকে পৌঁছে দিয়ে ধানমন্ডি লেকের পাড় দিয়ে হেঁটে অফিসে আসছি। ভাবছি ফোনে কথা হবে তানির সাথে। কিন্তু তা হলো না, সম্ভবত ব্যস্ত আছে। কয়েকদিন আগে আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধু ফেইস বুকে লিখেছিলেনÑ

“আপনি যখন কাউকে ফোন দিয়ে কথা বলার জন্য উদগ্রীব থাকবেন তখন সবাইকে ব্যস্ত পাবেন। অনুরূপ কেউ যখন আপনার সাথে কথা বলার জন্য ফোন দিবে তখন আপনি ব্যস্ততার জন্য কথা বলতে পারবেন না”। 

তানির বেলায় তাই হলো। জানলাম কম্পিটিশনের জন্য ছাত্রীকে মিনা সাজাচ্ছে। 

 

ব্যস্ততার পর কথা হয়, আমার থেকে দীর্ঘ বিরতি কামনা করে, সাময়িক ছুটি চায়। কারণ অনেকদিন যাবত আমরা কথা বলছি কোনোরূপ বিরতি ছাড়া। ওর ধারণা বিরতি নিলে আমাদের সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি পাবে। আমার ধারণা একজন আরেকজনকে বুঝতে পারবো আরো ভালোভাবে। বিষয়টি শোনার পর আমি কী যেন ভাবছি, আর মুখ থেকে বউ শব্দ বেরিয়ে গেল। এ-শব্দ নাকি একদম পছন্দ না ওর। জীবনে যারা ওর সামনে এ-শব্দ উচ্চারণ করেছে তারা সবাই অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে। জানতে পারলাম জীবনে নাকি ও কাউকে ‘আই লাভ ইউ’ বলেনি। বলল কেন জানি আপনাকে আমি বেশ কয়েকবার এ-বাক্য বলেছি। আর নিজের উপর অনেক রাগ হয় এই জন্য যে, আমি শপথ নিয়েছিলাম আমি জীবনে এ-বাক্য কারোর জন্য ব্যয় করবো না। তা আমি রাখতে পারলাম না। আমার কিছু শব্দের ব্যাপারে এলার্জি আছে। এর মধ্যে প্রেম, বিয়ে, বউ, ভালোবাসা, ডার্লিং, প্রেমিকা ইত্যাদি। জানতে চাইলাম এর কারণ কী? ও বলবে না। তবে এ-আলোচনার পূর্বে যেসব বিষয় আমার সাথে শেয়ার করেছে তাতে মনে হয়েছে এসব শব্দে যদি এলার্জি থাকে তাতে ওর কোনো দোষ নেই। 

 

বউ তো বলাই যাবে না। মাত্র ২/৪ দিন প্রেম করেই কেউ কাউকে বউ বলে সম্বোধন করবে এটা ও মানতে নারাজ। দুই দিনের বৈরাগী ভাতেরে কয় অন্ন। এমন দৃষ্টান্ত কানে আমার সহ্য হলো না। কান এমন শব্দ শুনতে রাজি না। আবার ভাবছি মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। সবারই পছন্দ অপছন্দ থাকতে পারে। আমার ভেতরে যেন কোনো অ্যাকশন রিঅ্যাকশন তৈরি না হয় তাই দ্রুত আজকের কাজে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করলাম।

 

জাহিদ আসবে এটিএন নিউজ থেকে। বেশ কয়েকদিন যাবত আসার জন্য যোগাযোগ করছে। কী নিয়ে কথা হবে জাহিদের সাথে, মন কি ভালো আছে? কথা কি ভালোভাবে বলতে পারবো? আমার মন যে এখন ভালো নেই। দুই দিনের বৈরাগী আমি। আমি জানি এ-শব্দটা তানি আমাকে বলেনি, তবুও ভেতরে ভেতরে মানতে পারছিলাম না। প্রতি-উত্তর দেয়ার চেষ্টায় অন্যসব সময় চেষ্টা করলেও এখন আর করলাম না, থেমে গেলাম। আমি বড়, ও আমার বয়সে ছোট, জ্ঞানবুদ্ধিও কম হবে ভেবে ফোন করবো না বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। ইতোমধ্যে জাহিদ প্রবেশ করলো। কুশল বিনিময়ের পর জাহিদ আমাকে শিক্ষামূলক একটি অনুষ্ঠান করার প্রস্তাব দিলো এটিএন নিউজে। বিস্তারিত জানালো, অফিসের সাথে আমার নামে নাম নজরুল নামে এক ভদ্রলোকের সাথে আলোচনা করলো। আজই বিকাল ৩টায় আসবে।

 

এর ফাঁকে ড্রাইভার ঠিক হলো। ভৈরব যাব বলে ভাবছি কোথায় যাব কী করবো, আদৌ কি যাওয়া হবে? যেতে হবেই, না হয় আমার শিক্ষকরা মাইন্ড করবে। যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা আছে। ২৫ তারিখ একটা সম্ভাবনা আছে। সেলিম সাহেবকে ফোন করলাম ২৫ তারিখের ব্যাপারে। তিনি ২৮ তারিখের কথা জানালেন। তারপর আমি ২৮ তারিখের পর ছাড়া ঢাকা ত্যাগ করতে পারছি না। এ-কথা তানিকে আর বলা যাবে নাÑও মাইন্ড করবে। পপি এসব জানে না, তবে আমি আসবো তা জানে। ওরা অপেক্ষা করছে দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেখা হবে। কী কথা হবে তা জানি না, কেমন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে তাও জানা নেই কারো। একটা আবেগ, একটা উৎকণ্ঠা কাজ করছে। আমার কোথাও কারো অফিস বা বাড়িতে গেলে বলে যেতে ইচ্ছা করে না। বাড়তি একটা চাপ অনুভব করি। যখন ইচ্ছা চলে যাব, কোনো যোগাযোগ করি না, চাপও অনুভব করি না কিন্তু এখানে কী করে না-বলে যাই! এরা যে আমার শিষ্য। একজন যে আমাকে খুবই ভালোবাসে। যদিও সে জানিয়েছে দীর্ঘ বিরতির পর তার মনে যদি আমি রেখাপাত করতে পারি, সেই শর্তে ভালোবাসা। এসব আমি আমলে দিই না। কারণ আমি জানি ‘নারীর মন আকাশের মেঘের মতোই বদলায়’। প্রেম-ভালোবাসা বিশেষত গুরু-শিষ্যের প্রেম-ভালোবাসা অন্যরকম। যা অন্যদের সাথে তুলনা করলে চলবে না, মিলবে না। এ-কথা বারবার শুনেছি কানে, গুরুত্ব দিইনি জীবনে। এখন শুধু গুরুত্বই পায়নি, জীবনে স্থান করে নিয়েছে হৃদয়ের গহিনে।

 

আমার আরেক ছাত্রী মিনম আমাকে প্রায়ই বলতো, স্যার, আপনাকে যে কখন ভালোলেগেছে আমি টের পাইনি। কেন যে আপনাকে ভালো লাগে তার উত্তর নেই আমার কাছে। জানতে চাইলে বলতো, এসব বলেকয়ে ঘোষণা দিয়ে হয় না, নিজের অজান্তে হয়ে যায়। ও এখন আমেরিকা আছে। যাওয়ার আগে বলেছিল কত কী করবে আমার জন্য। আর এখন যোগাযোগটুকুও নেই আমার সাথে। আমি ইচ্ছা করেই যোগাযোগ এক সময় করতাম না। ওর সংসার আছে, আমার কারণে যেন তা নষ্ট না-হয়। এফবি আইডিটাও ভুলে গেছি। আমার আইডিটা ওর খেয়াল আছে নিশ্চয়। আমি যে নিজের নামের পরিচয়ে আছি। ওর বাবা অবশ্য আমার সাথে রীতিমতো যোগাযোগ রাখে। ওর ভালোমন্দ খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করি। ভালো থাক মিনম সব সময়ে।

 

তানির সাথে বারবার বিরতি নেয়ার প্রশ্ন আসছে কেন। ৫/৭ দিন পরপরই একথা বলে আমাকে, শুরুতে আমি বুঝতে পারিনি। কারো সাথে কোনো সম্পর্ক হলে তাতে আমার বিরতি কেন? কথা শুরু হলে শেষ কি আর করা যায়? সকলের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। কেউ কেউ ক্লান্ত হতে পারে, নতুন সাবজেক্ট না-ও থাকতে পারে। নতুন নতুন বিষয় সামনে না-এলে তো কথা বলা যায় না। আমি অধ্যাপনা করি দীর্ঘ ২৫ বছর। আর ও শিক্ষকতায় আছে প্রায় ১৬ বছর। অভিজ্ঞতার কমতি নেই কারো।

 

জানার খুব আগ্রহ নিয়ে একটা গবেষণার পরিকল্পনা করবো ভাবছি মনে মনে। মনে মনে যে গবেষণা করে তার কী নাম দেয়া যায় তা নিয়েও গবেষণা চালাতে হবে। আমার ধারণা এসব গবেষণার মধ্যদিয়ে একটা ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। অনেকদিন কেন মানুষ বন্ধত্ব সম্পর্ক টেনে নিয়ে যেতে পারে না। আজকাল কি এ-কারণেই সবাই বন্ধু পাল্টায়। জানি না, এর পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। তবে আমার মতো করে ওর কারণ জানবো, প্রয়োজনে অনেকদিন অপেক্ষা করবো। আমি যাদের সাথে কথা বলি কারো না কারো একটা কিছু আলাদা ক্যারেক্টার আছে। এটাই তানির নতুন কোনো ক্যারেক্টার কি না তা আমাকে জানতে হবে। আমার ধারণা আমার এ জানা পজেটিভ হবে। কারণ নেগেটিভ ধারণা অপছন্দ করি, নেগেটিভ কিছু আমার জন্য অপেক্ষা করে না। ওর সাথে এসব বিষয়ে অনেক মিল আছে। আমাদের চিন্তাগুলো অনেক সময় বড় অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। আশা করি এবারও মিলে যাবে, তবে মিলন হবে না।

 

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, মিলনে তৃপ্তি নেই, যা আছে বিরহে। মিলন আর বিরহ নিয়ে আমাদের পথ চলা। যার যা নেই তাই নিয়ে আফসোস করে। তাই মিলন ও বিরহ এমন জিনিস যা জীবনে সকলেরই কাম্যবস্তু। জীবনে যে যেটার দেখা পায় সে সেটির মূল্যায়ন করে না, যেটি না-পায় তার জন্য আফসোসের শেষ থাকে না। এই টানাপড়নের নামই কি বিরহ! ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট  এপিজে আবুল কালাম বলেছেন,‘স্বপ্ন সেটা নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটা যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না’। এ-কথা শোনার পর আমার মনে হচ্ছে প্রেম সেটা নয়, যে প্রেম কাজ করতে দেয়; প্রেম সেটা যা মানুষকে কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। কেউ প্রেমে না-পড়লে এটা অনুভব করা কঠিন। আমার ফিলিংসটা এমন ছিল না কিন্তু তানির নাকি এমনটা হয়। কোনো কাজ করতে পারে না। প্রায়দিন বাড়িতে ওর মায়ের বকা খায়। গোসল ঘুম বিশ্রামের কোনো টাইম-ট্যাবল নেই। পড়াশোনার কোনো বালাই নাই।

 

আর আমার বেলায় সম্পূর্ণ উল্টো, আমার চলছে বেশ ভালো। অনেকদিন পর লেখা শুরু করলাম। প্রতিদিন লিখে যাচ্ছি। বরং যেদিন কথা কম হয় সেদিন লেখাও কম হয়। তাই লেখাই যেহেতু উদ্দেশ্য তাই কথা আর কম বলে লাভ কি? আমার এ-মতের সাথে তানি একমত না-ও হতে পারে। প্রত্যেকের আলাদা একটা জগৎ আছে, আছে আলাদা চিন্তাশক্তিও। তাই কাউকে কিছু চাপিয়ে দেয়া যায় না, উচিতও না।

 

মাঝে মাঝে ভাবি দুই অক্ষরের প্রেমের মধ্যে এমন কী শক্তি আছে যে, সকল কাজের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। পাঠক মাত্র বুঝতে পারবেন যে, আসলে এই শব্দের মাঝে অনেক শক্তি লুক্কায়িত আছে। এই শব্দটি মনে আসা মাত্র শরীরে এক ধরনের কম্পন তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, প্রেমিক-প্রেমিকা একসঙ্গে কিছুক্ষণ থাকলে তাদের মধ্যে রক্ত-স ালন প্রক্রিয়া এত দ্রুত সম্পাদন হয় যা অন্য সময় হয় না। দুইজন একসাথে হলে কপালে ঘাম চলে আসে। হাত-পা কাঁপাকাঁপি করে। এর কারণ একটাই, রক্তস ালন প্রক্রিয়া খুব দ্রুত সম্পাদন হচ্ছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

বিজ্ঞানীরা এভাবে সাধারণ দম্পতি ও প্রেমিক-প্রেমিকার রক্ত পরীক্ষা করে দেখেছেন দুই গ্রুপের রক্তের স ালন প্রক্রিয়া আলাদা। তারা প্রমাণ করেছেন অসুস্থ কোনো মানুষের পাশে যদি তার প্রেমিক বা প্রেমিকাকে রাখা যায় তবে সে দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। একথা প্রমাণিত সত্য যে, প্রেম ভালোবাসা বিরহ এগুলো কোনোটাই খারাপ না। তবে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পার্থক্য ভেরি করে এটা স্বাভাবিক। কে কীভাবে গ্রহণ করলো, তার মাথায় কীভাবে সেটআপ দিলো তার উপর নির্ভর করছে সবকিছু। এই সেটআপের বিষয়টি নিয়ে কাজ করা দরকার। এখানে মেধার প্রশ্ন আছে, আছে বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজনও। জাগতিক জীবনের কর্মফলই মানুষ পারত্রিক জীবনে ভোগ করবে। এটা জেনেশুনে বুঝে প্রত্যেকেরই এই সেটআপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত। এটা যার যেমন ভালো হবে, সে তেমন ভালো ফল উপভোগ করবেন। ভালো না-হলে এর প্রায়শ্চিত্ত তাকে ভোগ করতেই হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হোক সেটা দুনিয়ায় কিংবা আখিরাতে। মানুষের সকল কর্মকা-ের উত্তম ফল আসবে পরকালে এটা ভেবেই কাজ করা উচিত। উত্তম ভাবনাই নিয়ে যায় মানুষকে কল্যাণের পথে, স্বর্গীয় পথে।

 

তানি প্রায়শ আমাকে ওর বাড়িতে আসার দাওয়াত দেয়। খুব আগ্রহ নিয়ে আসতে বলে, আমি ওর বাড়িতে বেড়াতে যাব এতে বেশ আনন্দ পায় ও। ২/১ বার যাওয়ার জন্য তারিখ নির্ধারিত হওয়ার পরও যাওয়া হয়নি। ২৫ সেপ্টেম্বর যাওয়ার জন্য আবারও দাওয়াত দেয়। কিছুটা সম্মতি প্রকাশ করায় ও প্রস্তুতি নিতে থাকে। কনফার্ম করিনি যে যাব, তবে আমিও চেষ্টা করছি যাওয়ার জন্য। একদিন আগে বুঝতে পারলাম এবারও যাওয়া হচ্ছে না। ও মন খারাপ করলো, কিছুটা আমারও খারাপ। আমি কারো বাড়িতে বেড়াতে চাই না। আমার ভালো লাগে না। স্বাধীন মতো চলাফেরা করতে পারি না। একবেলা খেতে রাজি কিন্তু রাতে থাকতে রাজি না। এমন ইচ্ছা প্রকাশ করায় তানির ভালো লাগেনি। আমিও ভাবছি কেউ আমাকে দূর থেকে ভালোবাসে, বাড়িতে গেলে সে ভালোবাসা কি অব্যাহত থাকবে? যদি না-থাকে, তবে বাড়িতে দাওয়াত না-খাওয়াই ভালো। আমার এমন ইচ্ছার কথা চূড়ান্তভাবে জানার পর তানি খুব বেশি যোগাযোগ করে না। ২৪ ঘণ্টা পর ফোন করলেও আমি সময় দিতে পারিনি, কথা বলতে পারিনি। হয়তো ও ভাবছে আমি ওকে এড়িয়ে চলছি, বিষয়টি মোটেও তা নয়। বলা যায় সম্পূর্ণ বিপরীত।

 

ওর বাড়িতে যাওয়ার আমার তীব্র ইচ্ছা আছে, আছে অধীর অপেক্ষার মনও। জানি হয়তো তানি তা বুঝতে পারেনি। আমাকে ও কম-বেশি বোঝে তা আমি মানি। তারপরও যেহেতু ওর সাথে দীর্ঘ ১৬ বছরে কোনো যোগাযোগ হয়নি তাই একটা গ্যাপ তো আছেই বলা যায়। ১৬ বছরে কত কিছু বদলেছে, মানুষ কত কিছুতে মনের আদান-প্রদান করেছে। এসব বিষয় ওর কাছে তেমন মূল্য নেই। ওর ধারণা ১৬ বছর হলেও তেমন কিছু আমাদের বদলায়নি। পূর্বে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলে এমন সম্পর্ক তৈরি না-ও হতে পারতো। অথচ এখন একটা গভীর সম্পর্ক অনুভব করছি। যদিও এ-সম্পর্কের ফলাফল কারো জানা নেই, তবুও এক অচেনা অজানা যাত্রায় শামিল হলাম দুজনে। কোথায় যাব কেন যাব কারো জানা নেই, তবুও যাত্রা থেমে নেই, চলছে অবিরত। ভেতরে ভেতরে একটা টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই। ২য় বার তানির বাড়িতে যাওয়া হচ্ছে না, এমন সংবাদ বুঝতে পেরে আমাকে নানাভাবে অবজ্ঞার সুর শোনাচ্ছে। আমাকে আপ্যায়ন করার যোগ্যতা ওর নাই, বাড়িতে গেলে আমাকে আমরা মনের মতো খাওয়া-দাওয়া করাতে পারবো নাÑএমন অনেক কথা শোনানো হচ্ছে আমাকে। গরিবের বাড়িতে হাতি পাড়া দেয় না, আরো কত কী শুনছি এখন। তানিকে বলতে ইচ্ছা করছে এসব কি তোমার মনের কথা? না কি আমাকে শোনানোর জন্য কিছু কল্পনার কথামালা তৈরি করেছ তুমি। কথায় একেবারে কম প-িত তুমি না। কথা বলার পা-িত্য আছে তোমার। আমি শুনে যাচ্ছিÑযাব, যতদিন না তোমার বাসায় হাজির হবো।

 

সময় লাগতে পারে, সামনে কলেজে ভর্তির অনেক ঝামেলা আছে। এসব সামাল দিয়ে কবে যাব, তা ওয়াদা দেয়া বেশ মুশকিল। তারপরও আশা করছি শীঘ্রই দেখা হবে তোমার সাথে তানি। আর দেখা না-হলেই বা কী হবে? কিছুই না, তুমি তো বারবার বলেছ দেখা না-ও হতে পারে। আমিও আমার মনকে স্থির করে নিয়েছি, দেখা না-হলেও মনে যেন কষ্ট না-পাই। এটা একান্তই মনের ব্যাপার। মনকে বোঝাতে পারলে সবই সম্ভব। কেন নয়, অবশ্যই সম্ভব হবে তোমার ক্ষেত্রেও।

 

পরের দিন শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮। ভৈরব টিটি কলেজ পরিদর্শনে যাব। এর আগে কয়েকবার প্রোগ্রাম করেও যেতে পারিনি। এবার আগ্রহটা একটু বেশি। বেশ কিছুদিন যাবত তানির বাসায় যাওয়ার প্ল্যান করছি। ও বারবার আমার আগমন কামনা করছে কিন্তু যাওয়া হচ্ছে না। এবার না-গেলে খুব মাইন্ড করবে এমন একটা আল্টিমেটাম আগে থেকে আমার জানা আছে। সকালে জার্নি করতে হবে তাই রাতে সব প্রস্তুতি শেষ করছি। রাত ১০টার সময় মনে হলো গাড়ির কাগজপত্র বাসায় নেই, আছে অফিসে। রাতেই অফিস থেকে অনেক  খোঁজাখুঁজি করে কাগজ সংগ্রহ করলাম। ঘুমাতে ঘুমাতে অনেক রাত হয়ে গেল। প্রচুর গরম, ঘুম আসছিলো না। তানি বারবার ফোন দিচ্ছে আমি কখন রওয়ানা হবো। নিজের শরীরটা ভালো থাকে কি না এসব নিয়ে টেনশন করছি। মনে মনে তানি বিরক্ত হচ্ছে, আমার আসার সময় জানতে চাচ্ছে। জানাতে পারলাম না, তাই ও সারারাত ঘুমাবে না-বলে আমাকে জানায়। আমার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ঘুমাতে পারছি না।

 

রাতে ফোন আসে ফোন যায় এই করে করে ৫টা বাজে। রেডি হলাম, ড্রাইভার ফোন ধরে না। চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে ৮টার দিকে বের হলাম। ততক্ষণে গাড়ির তেল, হাওয়া দেয়া আরো কত কী বাকি। কোনো দোকান খোলা নেই, এ দোকান ঐ দোকান করে বেলা হয়ে গেল। ততক্ষণে ওদের বাসার জন্য কিছু ফল নেয়ার কথা মনে হলো। আমার পছন্দের জায়গা থেকে নিতে হবে, তাই আবার ফিরে আসা হাতিরপুল বাজারে। ‘এবার যাত্রা শুরু করলাম’ শিরোনামে এফবিতে একটা পোস্ট দিলাম। লাইক কমেন্ট শুরু হলো। কোনোরূপ যানজট ছাড়া গাড়ি ভৈরবের উদ্দেশ্যে চলছে। মাঝপথে বাসা থেকে মুন্নীর দেয়া ফল খেয়ে নাস্তার পাঠ চুকানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু নরসিংদী পার হওয়ার পর গরম গরম পরাটা দেখে ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললাম। ড্রাইভার মজা করে খাচ্ছে তা দেখে আমারও খাবার ইচ্ছা জাগলো কিন্তু খাওয়া আর হলো না।

 

তানি জানালো রাস্তায় সবজির বাগান পড়বে, তাই অপেক্ষা, কিছু সবজি কিনলাম ওর বাসার জন্য। কেউ কারো বাসায় সবজি নিয়ে যায়? এরই মধ্যে ভৈরব টিটি কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয় ফোন দিয়ে আমার লোকেশন জানতে চায়। কথাবার্তায় মনে হলো ওনার আসার আগেই আমি ভৈরব পৌঁছে যাব। মাঝখানে কিশোরগঞ্জ টিটিসির অধ্যক্ষ মহোদয় ভৈরব আসার আগ্রহ প্রকাশ করলো।

 

তানি আমার আগমনবার্তা ওর স্কুলের সবাইকে পূর্বেই অবহিত করেছে। অধ্যক্ষের কলেজে আসতে একটু দেরি হবে তাই একটু সময় পাওয়া গেল। গোছামারা প্রাইমারি স্কুলের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। তানি এই স্কুলের সহকারী শিক্ষক। পুরো স্কুল আমার জন্য অপেক্ষা করছে। অন্য রকম এক আনন্দ লাগছে। স্কুল ভিজিট আমার দারুণ পছন্দের কাজ। ছোট ছোট কোমলমতী শিশুদের সাথে সময় কাটানোর দৃশ্য ভাবলেই ভালো লাগে। ওদের স্কুলের রাস্তাটা খুব একটা প্রশস্ত না, তাই গাড়ি খুব আস্তে চলছে। তানি ওর স্কুলের সামনেই দাঁড়ানো, তারপরও স্কুল পার হয়ে সামনে চলে গেলাম। তানিকে কেন যেন চোখেই পড়ল না। ফোন দিয়ে জানালো আমি রাস্তায় দাঁড়ানো। আমাকে দেখে না দেখার ভান করে সামনে চলে গেলেন? 

 

যাক, গাড়ি ঘুরিয়ে অবশেষে স্কুলে পৌঁছালাম। ইতোমধ্যে পুরো স্কুল জুড়ে একটা উৎসব উৎসব ভাব। সবার মুখে তানিয়া ম্যাডামের স্যার আসছে এমন ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকের রুমে গিয়ে বসলাম। আগে থেকেই আমার পছন্দের নাস্তা, দেশীয় ফলমূল টেবিলে হাজির করে রেখেছে তানি। সাথে আমার প্রিয় পানীয় ডাবের পানি তো আছেই।

 

খুব কম সময়ের মধ্যে পুরো স্কুল ভিজিট করে ভৈরব টিটি কলেজের উদ্দেশে বের হলাম। পথেই তানির বাড়ি, এক ঝলক না-দাঁড়ালে কেমন হয়, তানির মা সকাল থেকেই নানা আয়োজন করে রেখেছে আমার জন্য। ওর মায়ের সাথে দেখা করে অনুষ্ঠানে চলে গেলাম। অনুষ্ঠান শেষ করে দুপুরে ওদের বাসায় লা  করলাম। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ বেশ কয়েকবার আসা-যাওয়া করে। ঘামে ভিজে একাকার, কোথাও একটু শান্তি খুঁজতেছিলাম। অনেকদিন হয় নান্দনিক ডিজাইনের হাতপাখার বাতাস শরীরে লাগেনি। বেশ আরাম লাগছিল, অনেকদিন পর ছাত্রীর খেদমত পাচ্ছি। ওর চোখে-মুখে আনন্দের শেষ নেই, কী করলে আমি খুশি হবো তাই করার চেষ্টা। পুডিংটা বেশ মজার, সাথে তালের পায়েস খুব স্বাদ করে খাচ্ছি। সামান্য কিছু সময় পাওয়া গেল অতীত কিছু স্মৃতি রোমন্থন করার জন্য। 

 

এরই মাঝে তানির বড় আপা বাসায় চলে আসলেন, উনিও ভৈরবের কালিকা প্রসাদ স্কুলের প্রধান শিক্ষক। উনি আমাকে চেনেন না কিন্তু তানি বিনিদ্র রজনীতে যে আমার সাথে ফোনে কথা বলে তা উনি জানেন। ভাবছিলাম হয়তো আমাকে দেখে খুশি হবেন না। না, আমার ধারণা ভুল, ভুল হলো তানির আম্মার ধারণার ক্ষেত্রেও, দুজনই বেশ হাসোজ্জ্বল মুখে আমাকে সময় দিয়েছেন। ওর মা খাবার টেবিলে যা আয়োজন করেছে, তা সবই আমার পছন্দের তালিকার। তদুপরি কিছু খাবার সিলেকশন করতে হয়েছে ডাক্তারের বিধি-নিষেধের কারণে।

 

খাওয়ার টেবিলে তাজওয়ার, তালিমীকে নিয়ে বিকেলে ভৈরব ব্রিজ দেখার প্ল্যান হয়। রেস্ট নেয়ার সুযোগ হয়নি। সন্ধ্যায় ঢাকায় ফেরার তাড়া আছে। ভৈরব মেঘনা ব্রিজ দেখতে গেলাম। সাথে বড় আপা ও তালিমীও আছে। নদীর পাড়ের দৃশ্য, বাতাস, পানি, লোকজনের কলরব আমাকে সবসময় টানে। ভালো সময় কাটবে কিন্তু সময় হাতে নেই। তাহমিনা আপা নৌকায় চড়ে নদীতে যাবে না, তাই আমাদেরকে ঘুরে আসার অনুরোধ করেন। সুযোগ নিলাম, ঘুরলাম, প্রশান্ত হলাম ঠা-া বাতাসে, সেলফি তুললাম বেশ কিছু কিন্তু এসব ছবির মালিক আমি হতে পারলাম না। এর মালিকানা যার ফোন তার, তানির এসব ছবি খুব ক্লোজ পিকচার। তাই আমাকে বিশ্বাস হলো নাÑতাই নেয়ার চেষ্টা করেও লজ্জিত হলাম।

 

আর কিছুক্ষণ পরেই ভৈরবকে বিদায় জানাতে হবে, এখানে থাকার পারমিশন নেই। যাওয়ার আগে কত কী প্ল্যান কিন্তু বাস্তবে কোনো কিছুই চোখে পড়লো না। আস্তে আস্তে মনে ক্ষোভ জমে, আবেগে আর বাস্তবতায় মিল-অমিল খুঁজে বেড়াই। ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। ড্রাইভার সিডি প্লেয়ার অন করে মন খারাপের যত গান আছে তা শোনাতে থাকে। দিন শেষে বিদায়ের মুহূর্তটা সুন্দর হয়নি, তানি বারবার বলছিল। তখন ভৈরবের লোকাচার সম্পর্কে ওর কিছু মন্তব্যের কথা মনে পড়ছিল। আজ যে সে-কথা ওর নিজের বেলায় প্রযোজ্য হবে তা বোধহয় ও কোনোদিন চিন্তা করেনি। গাড়ি চলছে, চলছে করুণ সুরে হৃদয় ভাঙা গানও। দিন শেষে হৃদয় কিছুটা আহত। চিকিৎসা প্রয়োজন, কিন্তু কে দিবে চিকিৎসা? যার দেওয়ার কথা সেই যে এখন চরম বাস্তবতার সাক্ষী। 

 

কিছুক্ষণ পর ফোনে তানির সাথে কথা হয়, জানতে চায় নানা কিছু। তেমন উত্তর দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না, এমন এক পরিস্থিতিতে মেজাজ হয়ে যায় বেপরোয়া। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ভেঙে মনে হয় চুরমার হয়ে গেল। খুব যে বেশি কিছু আসা করেছিলাম তা-ও না। আমি আগে থেকেই নারীর বিষয়ে বিস্তর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। তারপরও একটা কারণে সেই অভিজ্ঞতার কথা ভুলে গিয়ে ভুল পথে পা বাড়ালাম ভেবে কষ্ট পাই। বুকে ভীষণ ব্যথা অনুভব করি। কোনো ভাবেই জমাট বাঁধা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারছিলাম না। খুব ইচ্ছাও হয়নি। তারপরও মনের অজান্তে রাতে কথা হয় তানির সাথে। কিসব যে বলেছি তার হিসেব নেই।

 

মেলে না আমার আচরণের সাথে এসব খুঁজতে খুঁজতে রাত অতিবাহিত হওয়ার উপক্রম হয়। প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করি, সেখানেও আপত্তি কিছুটা, প্রচ- বুক ব্যথা নিয়ে ঘুমের চেষ্টা করি। আজান হয়ে গেল, ঘুম আর হলো না। মাঝখানে ম্যাসেঞ্জার আর ভিডিও কলে অপ্রয়োজনীয় কথা হয়, মন চলে যায় নির্বাসনে আর আমি চলে যাই দূর থেকে বহুদূরে। যেখান থেকে আমাকে ফেরানোর চেষ্টা সফল না-ও হতে পারে। তবুও আমি ভালোবাসি একজনকে। সকাল থেকে অফিসে ব্যস্ত সময় পার করি। খুব বেশি কথা বলার সুযোগ হয়নি। ২/১ বার ফোন এসেছে ফিরেও তাকাইনি। কাজের মধ্যে সময় ভালো যাবে ভেবে তেমন চিন্তা করিনি।

 

অফিস থেকে বেরোনোর পর ফোনের অপেক্ষার পালা। আসরের নামাজ আদায় করে লেকের পাড়ে জগিং করছি। ফোনে কথা বলার আগ্রহ জাগে কিন্তু কথা আর হয় না। প্রকৃতির সাথে সময় কাটানো আমার জীবনের অন্যতম ব্রত তা অনেকেই জানে। এসব ব্যাপারে ও আমাকে মাঝেমধ্যে উদ্বুদ্ধও করে, কিন্তু পাশে থাকলে ভালো হতো ভেবে গুরুত্ব দিইনি। হঠাৎ ফোনে এসএমএস আসে। পড়ার মতো বটে, মনে রাখার মতো বার্তা। ভালো লাগা তো আছেই। মুছে ফেলতে মন চাচ্ছে না, কিন্তু মুছে ফেলতেই হবে। এমন সময় কিছু ছবি দেখলাম যা কিনা ঐদিন ওর এলাকার বিভিন্ন লোকেশনে তোলা। ছবিতে লোকেশন তেমন একটা বোঝা না-গেলেও হৃদয়ের বন্ধনটা বেশ পরিষ্কার। ছবিগুলো তোলার সময় আমার তেমন আগ্রহ ছিল না কিন্তু দেখার পর অন্যসব ছবিও দেখতে আগ্রহ জাগলো।

 

তানি আগেই বলেছে এই ছবিগুলো ওর ব্যক্তিগত সম্পদ। এখানে ভাগাভাগি চলবে না। এখন কী করে এসব ছবিতে ভাগ বসাই। না, এমন ইচ্ছা আমার নেই, কারো ভালোলাগার মুহূর্তগুলো আমি নষ্ট করবো। ওর কথার সাথে মাঝে মাঝে কাজের মিল খুঁজে পাই না ভেবে বিরক্ত হই বারবার। তারপরও আবার ওর ভালো লাগার বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসি। কারণ এগুলো ছাড়া ও বাঁচতে পারবে না। ওর জীবন হিস্ট্রি খুব একটা সুখের মনে হয়নি আমার কাছে। যদিও এসব বিষয় ও কখনোই মুখ খুলে কিছু বলেনি আমাকে। আমি ভেবেই নিয়েছি ও ভালো থাকার অভিনয় করে। অন্যদের সাথে ওর তুলনা করি না, কারণ ওর ভাগ্যটা অন্য দশজনের থেকে আলাদা। তবে ও বেশ ভালোই আছে। এভাবে থাকতে ওর ভালো লাগে। কষ্টের কথা শেয়ার করতে চায় না, ভালো লাগার গল্পটাই বেশি শোনায়। এটা ভালো অভ্যাস, ভালো থাকার জন্য এই টিপসটা জরুরিও বটে।

 

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এমন মানুষের সাথে বেশ দেখা হয় কিন্তু তাকে জানা হয় খুব কমই। অন্যের সুখ-দুঃখের অংশীদার সবাই হতে পারে নাÑসবার মনও থাকে না। অন্যের প্রয়োজনে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মাঝে যে আনন্দ আছে তানি মনে হয় তা আগে থেকেই জানে। ওর জানাটা পরিষ্কার রাখে সব সময়ে, অপরিচ্ছন্ন জ্ঞানাহরণের পক্ষে নয় ও।

 

কিছু মানুষ এমন আছে যে, যাদের ব্যবহারের কারণে প্রতিশোধ নেয়ার স্পৃহা জাগে। মাঝে মাঝে ওর ক্ষেত্রে এমন মনে হয় আমার। পরক্ষণেই ভাবি যে, ওর বাবা বেঁচে নেই। যার আদর স্নেহ ভালোবাসা থেকে বি ত। পরিবারের অন্যসব সদস্য যে যার মতো ব্যস্ত জীবন কাটায়। একটু সুখের জন্য হয়তো আমার মতো মানুষের সাথে যুক্ত হয়েছে। আমিও যদি অন্যসব মানুষের মতো প্রতিশোধপরায়ন হই তাহলে ও যাবে কোথায়? যাওয়ার জায়গা নেই এমন বিষয় নয়। তবে ও খুব চুজি। অন্য দশজনের সাথে ওর রুচিবোধের বিস্তর ফারাক আছে। আছে মিল-অমিল। এসব ভেবে ওকে বারবার কাছে টেনে নিই। বলি চিন্তা করো না আমি আছি তোমার পাশে সবসময়। ও স্বার্থপর নয়, আমিও হতে পারি না। কেনই বা হবো স্বার্থপর। আমার জন্ম তো মানুষের কল্যাণের জন্য। সেখানে তানির জীবন তো সর্বাগ্রে গুরুত্বপূর্ণ।

 

কিছুক্ষণ আগে প্রেসের লোকজন অফিসে এসে কিছু বইর পা-ুলিপি নিয়ে গেল। এর মধ্যে আমার জীবন হিস্ট্রি নিয়ে লেখা বইটির কিছু অংশও আছে। এখানে তানির একটা পর্ব আছে। হয়তো কিছুদিনের মধ্যে বইটি বাজারে আসবে। কারো সম্পর্কে লিখতে আমার ভয় লাগে, তার মনের কথা আমি কী করে জানলাম। আমি তো কারো ইন্টারভিউ করিনি। জীবনের অভিজ্ঞতার আয়নায় যা দেখি তা নিয়েই লিখি অন্যের গল্প। তবে এসব লেখালেখিতে সত্যের আশ্রয় নিয়ে লেখা উচিত। অনেকে এটা এড়িয়ে যায় ভালো লাগে না এসব। মিথ্যা লিখে কী লাভ হবে? সত্য জানলে কী ক্ষতি হবে? না ‘দুই দিনের এই দুনিয়ার মানুষ চেনা বড় দায়’Ñ গানের এই লাইনটি আজও মনে পড়ে। স্বস্তির কথা আছে এ গানে। মানুষ নিয়ে আমি যা-ই লিখি, সে-লেখা যখন পড়বে তখন তা পরতে পরতে মিলে যাবে এমন আশা করা ঠিক নয়। আমি যা ভাবি যা লিখি তার সবই মিলে যাবে এমন চিন্তা করা জরুরি না। যথার্থ লেখাটাই বেশি জরুরি। 

 

আমি কারো সাথে কথা বললে কিংবা কেউ আমার সাথে ওঠাবসা করলে উম্মে হাবিবার খুব মন খারাপ হয়। এটা নাকি ভালোবাসার লক্ষণ। আমারও এমনটা হয়। পৃথিবীর সকল মানুষের এমন হয় কিনা তা জানি না। তবে হওয়াটা স্বাভাবিক। আমিও আছি এই দলে। আমার তো হৃদকম্পন শুরু হয়, কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। বড্ড মেজাজ খারাপও হয়। হরহামেশা যে শব্দ ব্যবহার করি না তাও চলে আসে। অস্থির লাগেÑকী করি কোথায় যাই এমন মনে হয় বারবার। জীবনে এই ক্ষত যে কতবার সৃষ্টি হয়েছে তা বোঝাতে পারবো না। মাঝে মাঝে একা-একা শপথ নেই, এমন কাজ মোটেই ভালো না, আর না আর না। কিন্তু এ-শপথে বেশিদিন স্থির থাকা হয় না। আমি জানি হাবিবার কেন মন খারাপ হয়। ওকি আমাকে ভালোবাসে? এমন প্রশ্ন কেন করলাম, জানি না। তবে মাঝেমধ্যে ওর আচরণে বেশ সন্দেহ জাগে। ভালোবাসার কিছু লক্ষণ আছে, সেসব লক্ষণ খুঁজি ওর মাঝে। পাইনি একথা বলা যায় না। খুব পেয়েছি তা-ও জোর দিয়ে কী করে বলি। এসব করেই কাজের মাঝে ব্যস্ত থেকেই অনেকটা বছর একসাথে কাটালাম।

 

আমার সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য যে মানুষ সদা সজাগ থাকে, তার জন্য ভালোবাসা থাকা প্রয়োজন মনে করি। যেভাবে তা হওয়া দরকার তা কী করে সম্ভব। ভাবনার জগৎটা বেশ বড় কিন্তু বাস্তবতার জগৎটা তেমন আর বড় করতে পারলাম না। চেষ্টা যে করিনি তা নয়। এটাকে ব্যর্থ চেষ্টাও বলা যাবে না। বলা যায় সফল হইনি। তবে মাঝে যে একটা প্রবল ইচ্ছা বিরাজ করছে তা টের পাই বেশ। কিছু একটা করতে পারতাম ওর জন্য, বড্ড ভালো লাগতো। সময় সুযোগ আর অর্থের দ্বন্দ্ব আমাকে বারবার ব্যর্থ করেছে। মানুষ ভুল বুঝেছে। কাউকে বোঝাতে গেলে সময় লাগে কিন্তু সে সময় কেউ কাউকে দিতে চায় না। সবাই তাৎক্ষণিক রিটার্ন চায়। অপেক্ষা কেউ করতে চায় না। যারা অপেক্ষা করেছে তারাই বা কী পেয়েছে এমন প্রশ্ন যখন কেউ আমাকে করে তখন উত্তর দিতে পারি না। কেউ কেউ উত্তর কামনা করে না। শুধু বলে লোকটার মনটা ভালো কিন্তু সামর্থ্য নেই। কী আর করার ভালোবাসার মানুষের সাথে দেখা না হোক কথা তো হবে। এমনটা আশা করি সবসময়ে।

 

কথায় যখন ছন্দপতন হয় কিংবা বিরতিটা বড্ড বেশি হয় তখন মনের অবস্থা কেমন হয় তা প্রেমিক মাত্ররই জানা আছে। ফোন বিজি বা বন্ধ পেলে কেমন লাগে তা কি আর ব্যাখ্যা করে বলতে হবে। না, এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। কিন্তু একটা মানুষকে এর থেকে ব্যতিক্রম মনে হতো। সে আমাকে ভালোবাসে, পছন্দ করে বলেও জানাতো। আমার মনে হতো এসব মিথ্যা কথা, আমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য শুধু শুধুই বলে। আমি ওর ভালোবাসা মাপার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি বলব না, তবে অভিজ্ঞতা ভালো না। কথা বলার মাঝে যদি বলি ফোনটা রাখি, রাজি হয়ে যেত। আমাকে কেউ ফোন দিচ্ছে কথা বলতে হবে, অমনি রেখে দিত। আমাকে ওয়েটিং পেলেও কোনো প্রশ্ন নেই। কেন ফোনটা বন্ধ ছিল এমন কৈফিয়ত দেয়া লাগে না। বাহ! এমন মানুষ যদি বলে আমাকে ভালোবাসে। আমি তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করি। আমার যতটুকু বিদ্যাবুদ্ধি আছে তাতে মনে করি এটা কোনো ভালোবাসা নয়।

 

হঠাৎ করেই সকালবেলা জিজ্ঞাসা করলো আমি তাকে কেন ব্লক করলাম? ব্লক করলে কথা হয় কীভাবে? না, আমি ব্লক করে আবার ওপেন করে দিয়েছি। শুনে অবাক হলো। কেন ব্লক করবো আর করলে ওর কী সমস্যা। অনেক কথার মারপ্যাঁচ শুনলাম। রাস্তায় কথা বলতে সমস্যা হচ্ছে তাই সরাসরি জানতে চাইলাম তোমার কোনো সমস্যা হচ্ছে কী? হ্যাঁ, আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বারবার। এই বাক্য এই প্রথম শুনলাম। সাধারণত ওর এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই তার মুখে এমন কথা শুনে অবাক হই। কথা না-হলে দম বন্ধ হওয়া, বুকে ব্যথা অনুভব করা, মনের ভেতরটায় ছটফট শব্দ হওয়া এসব এই প্রথম শুনলাম। আমি জানতাম এ-শব্দগুলোর সাথে তানির কোনো পরিচয় নেই। কিন্তু মানতে নারাজ, কে শোনে আমার কথা। শুধু বলেই যাচ্ছে। বলতেই ভালো লাগে, কোনো বিরতি ছাড়া। বলার সুযোগ পেল, অনেক বলা হলেও তৃপ্তি হলো না। শুধু বারবার বলছিল আমার মনটা কেমন যেন করছে, বলে বোঝাতে পারবো না। সবার ক্ষেত্রে এমনটা হয় কিনা বলতে পারবো না। আমারও যে হয় তা অস্বীকার করবো না।

 

আমি ওকে বারবার বলেছি প্রতিটি মানুষেরই মনের অবস্থা এরকম। ও মানতে চায়নি। বিশ্বাস করেনি। আজ যখন নিজের ক্ষেত্রে মিলে গেল তখন শুধুই হাসি, অন্যরকম হাসি। যে হাসির মধ্যে সকল সত্য লুক্কায়িত ছিল। এসব নাকি সবাইকে বলতে হয় না, কেবল একজনকেই বলা যায়। যখন যে বন্ধু তখন তার সাথে শেয়ার করাতেই বেশি আনন্দ। এমন আনন্দ কতবার উপভোগ করেছ? প্রশ্ন করতেই চুপ। বিশ্লেষণ শুরু, আমি শুনতে নারাজ। কারণ নিজেকে বাঁচানোর একটা উত্তর সবার কাছেই রেডি থাকে। যা না-শুনলেও চলে। সময় নষ্ট করে লাভ কী, অন্য প্রসঙ্গে যাই। প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে খুব একটা সময় নিই না আমরা কখনো। বোদ্ধা প্রেমিক প্রেমিকা। প্রয়োজনটা খুব সহজে আমরা বুঝি। বিশেষ করে কেউ কাউকে খুব বেশি অভিযোগ করতে হয় না। কেউ মিথ্যা বলি না। তানি তো বলেই না তা আমি খুব ভালো বুঝি। ওর এ অভ্যাসটা আমাকে খুব আনন্দ দেয়, ভালোবাসতে সাহায্য করে।

 

প্রতিটি মানুষের মধ্যে এমন কিছুু গুণ বৈশিষ্ট্য থাকে যা অন্য কারো মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও তাতে আকর্ষণ থাকে না। এসব বৈশিষ্ট্য একজন আরেকজনের সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করতে সাহায্য করে। প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে এমনটা হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ, ক্ষেত্রবিশেষ জরুরিও বটে। যদিও যখন একজন আরেকজনকে ভালোলাগে তখন এসব বিষয় তেমন গুরুত্ব পায় না। একটা সময় দুজনই দুইজনকে নিয়ে ভাবে কেন আমরা একসাথে আছি? কী আছে আমাদের মধ্যে। একজন অন্যজনের অজান্তেই এসব চিন্তা করে। ভেতরে ভেতরে একজন অন্যজন সম্পর্কে সুন্দর সুন্দর যুক্তি/ উত্তর তৈরি করে। আমি যখন ভাবি আমার মতো লোক কেন একটা এমন মানুষের সাথে জড়িয়ে পড়লাম। কী গুণ বা বৈশিষ্ট্য আছে তার? এর উপরে আামি কী বলি, কী যোগ্যতার কথা চিন্তা করি ওকে নিয়ে কী ভাবি তা আমি কি জানি? ও জানে? ওকে আমি এমনি এমনি ভালোবাসি? না বিষয়টা এমন না। ও আমার উত্তরটা জানে না। ঠিক আমার বিষয় নিয়ে ও কী ভাবে আমিও তা জানি না। হতে পারে আমার মতো ওরও কোনো ভুল উত্তর রেডি আছে ওর কাছে। যদিও এ বিষয়ে আমাকে কিছু উত্তর দিয়েছে। মেনে নিলাম ওর কথা কিন্তু আমি মানতে যে পারি না। কেন আমি ওর সাথে এভাবে যুক্ত হলাম? কী বা আকর্ষণ? জানি এসবই ভুল হবে একদিন। তারপরও আমাকে নিয়ে ভাবে আমাকে ভালোবাসে এমন মানুষকে কেউ কি হারাতে চায়!

 

মাঝে মাঝে ওর ভালোবাসার আকর্ষণ আমাকে দারুণভাবে দুর্বল করে, ছুটে যেতে ইচ্ছে করে ওর কাছে কিন্তু তা আর হয় না। সাক্ষাতে কী হয় তার যে অভিজ্ঞতা আমার আছে। দূরে থাকাটা ভালোবাসা টিকিয়ে রাখার জন্য খুব জরুরি। তাই বলে কি কাছে যাব না কাছে পাব না এই ব্যাকুলতা আমাকে প্রতিনিয়ত কাঁদায়। জানি না এর পেছনে কী কারণ আছে। আমাকে নিয়ে তানির একটা ভয় কাজ করে সবসময়ে। ভয়টা আমার মধ্যেও আছে। কী জানি কোন দিন আমি ওকে দূরে ঠেলে দিই। এমন আশঙ্কা আমারও হয়। ওর সমস্যা হবে কেন? ওর ভালোবাসার মানুষের তো অভাব নেই। সারাদিন-ই শুনতে পাই কেউ না কেউ তাকে ভালোবেসে যাচ্ছে। ইজাব কবুলের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে সারাক্ষণ। এসব কিছু থাকতে কেনই বা আমার মতো একজন মানুষের কাছে ও আসবে? যার কাছে ওর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। নেই কোনো জাগতিক বা পারত্রিক স্বার্থও। তারপরেও আছি দুজন আপন করে একান্তভাবে। এমন ভালোবাসা সব কিছুকেই হার মানায়। কোনো কিছু দিয়েই এটা পরিমাপ বা মূল্যায়ন করা যাবে না। চলুক ভালোবাসা তার নিজস্ব গতিতে। কে রুখবে এমন ভালোবাসা? কেউ পারবে না রুখতে, কারো সাহসও নেই। নেই কোনো ভয়-ভীতিও। 

 

তানি ওর বাড়িতে যে প্রেম করে তা ভাবা যায় না। সবাই জানে ও কার সাথে কথা বলে, কাকে নিয়ে সারাক্ষণ সময় কাটায়। ওর মা আকার-ইঙ্গিতে ওকে নানা কথা বলে, বোন তো সরাসরিই বলে এসব ভালো কাজ না। এসব ছেড়ে কাজে মনোযোগ দাও। বলাটা খুব সহজ কিন্তু কাজটা মোটেই সহজ না। বিশেষ করে কথা না-বলে থাকাটা। কথা না-হলে একদিন হৃদয়ের ভেতরে করে চিন চিন। ওর ভাই-বোন ওর মা তারা কি বোঝে এই কষ্টটা?

 

যেসব গুণ-বৈশিষ্ট্য থাকলে আমি কাউকে পছন্দ করি এমন সব বৈশিষ্ট্য তানির মধ্যে না-থাকলেও অধিকাংশ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান আছে। ভদ্রতা ওর মধ্যে খুব সুন্দরভাবে অবস্থান নিয়েছে। আছে ভালোবাসার প্রধান অনুষঙ্গগুলোও। পছন্দনীয় অপরাপর এসব গুণ আমাকে আকৃষ্ট করেছে। দুর্বল করেছে, ভালোবাসতে শিখিয়েছে। অন্যসব মানুষ যেসব গুণ দেখে ভালোবাসায় আকৃষ্ট হয় ওসব গুণ ওর মধ্যে নেই। সবাই জানে আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী। আমি এর বিপরীত। গুণ না-থাকলে রূপ দিয়ে কী হবে। রূপ ক্ষণস্থায়ী আর গুণ চিরস্থায়ী। আর সব গুণ আমাকে আকৃষ্ট করে না। যে দুই একটা গুণ আমি খুব বেশি পছন্দ করি তা ওর মধ্যে আছে। আমার খুবই ভালোলাগে। এসব গুণ অর্জন করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা লাগে। প্রকৃতির সাথে প্রেম-ভালোবাসায় জড়াতে হয়। আমি জানি না তানির গুণগুলো সম্পর্কে ও নিজে ওয়াকিফহাল কিনা। কোন বৈশিষ্ট্য আমাকে ওর কাছে টেনে নিয়েছে তা আমি কখনো বলিনি ওকে। জানতে চেয়েছে কিনা মনে পড়ে না।

 

মানুষকে আমি যখন কিছু দিই তা ফেরতের আশায় দিই না। মন দেয়া-নেয়া থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেন টাকা-পয়সা পর্যন্ত। ফেরতের আশা করলে কষ্ট পাব ভেবে ফেরতের বিষয়টি সামনে আনি না। কখনো ফেরত পেতে ইচ্ছে করে কিন্তু আমি জানি ফেরতের আশা করলে পাব না। এগিয়ে যাই হরহামেশা। এটা দোষ না গুণ তা বিচার করিনি কখনো। আমার অভ্যাসটা খুব কম মানুষের মধ্যে দেখেছি। আমার সাথে সবাই দ্বিমত পোষণ করেছে একমাত্র তানি ছাড়া। 

 

অফিসিয়াল কাজে হঠাৎ কিছু টাকার প্রয়োজন দেখা দিলে ওর শরণাপন্ন হই। ফেরত দেয়ার সময়-সুযোগ নিয়ে আলাপকালে ও জানালো আমার মনের কথা। ফেরত পাওয়ার আশায় নাকি আমাকে দেয়নি। দিলেও কোনো আপত্তি নেই। ফেরত পেতেই হবে এমন কোনো ইচ্ছাও নেই। বিষয়টা আমার সাথে কীভাবে যে মিলে গেল জানি না। জীবনে কত মানুষকে যে এভাবে দিয়েছি তার হিসেব নেই। মানুষ সমস্যায় পড়ে আমার কাছে এসেছে তাকে কী করে ফেরাই। আমি পারি না। যদি আমার কাছে থাকে। যদি না-থাকে সেটা ভিন্ন কথা। এমন গল্প আমি তানির কাছেও শুনেছি। অসম্ভব ভালো চরিত্র, সুন্দর মনের অধিকারী। বৈশিষ্ট্যের দিক বিচারে এটা সেরা বৈশিষ্ট্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

ছাত্রজীবন থেকে আমি কম বেশি লেখালেখি করি। এক সময় নিজের পড়ালেখার জন্য হ্যান্ডনোট তৈরি করতাম আর এখন অন্যের পড়াশুনোর জন্য বই তৈরি করছি। লেখালেখি আছে বলেই বেঁচে আছি। যেহেতু প্রচুর লেখালেখি করি সেহেতু আমার লেখার অনুষঙ্গ ভালো থাকুক, সচল থাকুক তার দিকে সব সময়ে খেয়াল রেখেছি। লেখার প্রধান উপাদান কলম ও কাগজ। সব সময় ভালো কলমের প্রতি আকর্ষণ ছিল, এখনো আছে। তবে বছর দশেক হবে এখন আর কলমের প্রতি খুব একটা নজর নেই। একটা হলেই হলো, হাতের কাছে যা পাই তাই দিয়ে লেখা শুরু করি।

 

২০১৮ সালের শেষ লগ্নে ২টা বই লিখে শেষ করার প্ল্যান করি। এর মধ্যে বাবার স্মৃতি নিয়ে লেখা একটা বই যার কিছু অংশ আগেই লেখা শুরু করেছি, সময়ের অভাবে লেখা শেষ হয়নি। সামনে অনেক লেখা, তাই একটা ভালো কলম না হলে কেমন হয়। অনেক দিন যাবত হাতের সামান্য ব্যথা অনুভব করছি। বিষয়টা তানির সাথে শেয়ার করি। ওর নাকি কলমের প্রতি এমন দুর্বলতা আছে।

 

পছন্দটাও আমার সাথে মিলে গেল। সময়ের অভাবে বাজারে গিয়ে কলম কেনার মন এখন আর নেই। তাছাড়া নিজের কোনো প্রয়োজন মেটাতে নিজেকে বাজারের দোকানে নিতে নারাজ আমি। অন্যের প্রয়োজন বা শখ মেটাতে হলে এতদিনে বহু কলম কেনা হতো। তানি বিষয়টা বুঝতে পেরে ডজন খানেক কলম ও কিছু লেখার খাতা পাঠায়। আমার এসব পেলে লেখার আগ্রহটা একটু বৃদ্ধি পায়। তাই ভাবলাম আজকে সারাদিন লেখালেখি করবো। কারণ ভালো কাগজ-কলম সাথে আছে। লিখতে কষ্ট হবে না। সকালে অফিসে আসার পথেই তানি জিজ্ঞাসা করেছিল কলমগুলো লিখতে কেমন। আরামদায়ক কিনা বেশ উৎকণ্ঠায় আছে তানি। যদি কলমগুলো লিখতে আরামদায়ক না হয়, ফেরত পাঠাতে হবে। তাই সকালে অফিসে এসেই সেই কলম দিয়ে লেখা শুরু করলাম। লেখা বেশ আরামদায়ক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে অনেক দিন পর এই কলম দিয়ে লিখছি তাই লেখার স্পিড একটু কম এই আর কি। সমস্যা নেই, লেখার স্পিড কম হলে হাতের লেখাটা সুন্দর হয়, কম্পোজারের বুঝতে সুবিধা হয়।

 

তবে এ-কলম দিয়ে কাগজের বোথ সাইডে লেখা সম্ভব হবে না, এটা এখন ক্লিয়ার হলাম। তাতে কী? ম্যাটাডোর তো আছেই। এসব কলম দিয়েও তো কম লিখিনি। জানলে কেউ কেউ অবাক হতে পারেন। আমি জীবনে কত কলম কিনেছি তার হিসেব নেই। তবে ম্যাটাডোর জাতীয় কলম আমি কখনো কিনেছি কিনা তা আমার মনে পড়ে না। তবে আমার টেবিলে হরহামেশা এই কলম মওজুদ থাকে। কোথা থেকে আসে তা-ও আমি জানি না। যত কলম যেখানে পাই তা লিখে শেষ করার চেষ্টা করি সবসময়ে। তানির দেয়া অনেকগুলো কলম, কবে যে শেষ হবে জানি না। এতগুলো কলম না-হলেও চলতো আপাতত কিন্তু এ যে নাছড়বান্দা। আমার ইচ্ছার কোনো কমতি রাখবে না ও। ভালো অভ্যাস ভালো চিন্তা কেউ যদি কারো প্রয়োজন মেটাতে এগিয়ে যায়, শখ পূরণ করে তবে আল্লাহ তার প্রয়োজন মেটাতে এগিয়ে আসবেন এটাও স্বাভাবিক। তানির এ বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান আছে, জানি না এমনটা স্মরণ করে কলম কিনে পাঠিয়েছে কিনা। হয়তো না, যতটুকু জানি কিছু প্রতিদানের আশায় একাজ করেনি, করেছে আমার ইচ্ছা পূরণের জন্য। 

 

পাঠক ভাবতে পারেন কলম নিয়ে আমার এত আগ্রহ কেন, কলম একটা হলেই তো হলো। না, ইসলামে কলমের অনেক গুরুত্ব রয়েছে। এ পৃথিবী সৃষ্টির শুরুতে আল্লাহতায়ালা কলম সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর জ্ঞানচর্চার অন্যতম বাহন এই কলম। যুগে যুগে এই কলমের প্রতি মানুষের আকর্ষণের ইতিহাস পাওয়া যায়। প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে প্রথম উপহার হিসেবে দুনিয়ার সকল মানুষ এই কলমকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেয়।

 

অনেকদিন যাবত তানিকে নিয়ে লিখছি কিন্তু তানি জানে না কী লিখছি। অনেকবার জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছে কিন্তু জানাতে বা শোনাতে পারিনি। ওর মনে হয়তো ভয় কাজ করছে আমি কী লিখি ওর সম্পর্কে। গল্প লিখতে গেলে তো একটু অলঙ্কার দিতে হয় লেখায়। কিন্তু আমি যে বাস্তবতার মধ্যে থেকেই লিখতে চেষ্টা করছি তা ও জানে না। শনিবার অফিস বন্ধ থাকে, তাই লেখালেখি হয় না। আজ অবশ্য বিকেলে একটা মিটিং আছে, তাই বিকালে লিখতে হবে, এমন চিন্তায় একটু আগেই অফিসে চলে আসি। কিছুক্ষণ লেখালেখির পর তানির ফোন কল আসে। কী লিখছি শুনতে চায়। যদিও আমার প্ল্যান ছিল ফাইনাল না-হওয়া পর্যন্ত ওকে শোনাব না।

 

কিন্তু হঠাৎ মনটা রাজি হয়ে গেল। শোনাতে লাগলাম মাঝে মাঝে কিছু অংশ। ভালোমন্দ বুঝতে পারছি না কিন্তু ও বলছে, হ্যাঁ ভালো লাগছে। ২/১টা স্থানে সামান্য কারেকশনও দিলো। বিশেষত যে-বিষয়গুলো বাদ পড়েছে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কারেকশন করিনি, আমি জানি আরো অনেক বিষয় বাদ পড়েছে। ফাইনালে প্রুফ দেখার সময় যোগ করে দেবো। এখন করতে গেলে ধারাবাহিকতা রক্ষা হবে না। পাঠের একাগ্রতা নষ্ট হবে। পাঠে বিঘœ ঘটবে। আমার লেখার পাঠক যেন হোঁচট না-খায় সে-বিষয় লক্ষ রাখি বরাবর। এবারও এর ব্যতিক্রম করার ইচ্ছা আমার নেই। কেননা পাঠককে নিয়েই লেখক। পাঠকের জন্যই লেখা। লেখক ইচ্ছা করলেই পাঠককে কষ্ট দিয়ে কিংবা কোনো বিষয়ে অস্পষ্ট রেখে যা ইচ্ছা তাই লিখতে পারেন না। কখনো কখনো এমন চিত্র লক্ষ যে করি না তা না, তবুও সচেতন মনে একজন লেখক কোনো পাঠকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন না। পাঠকের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ভালোমন্দের গুরুত্ব অবশ্যই একজন লেখককে দিতে হবে।

 

বিকালে অফিস শেষ করে বাসায় ফিরছি। তানি জিজ্ঞাসা করলো আমার আগামীকালের কী প্ল্যান? আমার তেমন কোনো সোশ্যাল প্ল্যান নেই। প্রতিদিনের মতো আগামীকালও চলবে আশা করি। ওদের পরের দিন স্কুল বন্ধ থাকবে। কিছু একটা প্ল্যান নিলে বাস্তবায়ন করার সুযোগ আছে। আমি অনেকদিন যাবত ওর সাথে কোনো প্ল্যানে নেই। বিশেষত প্রথমবার ওর স্কুল ভিজিট করার পর। নানা প্রতিবন্ধকতার গল্প শুনেছি ওর মুখে, কিছুটা প্রত্যক্ষও করেছি। বিরক্ত হয়েছি ওই সময়ে। তাই আর কোনো প্ল্যান নিব না এমন শপথ করেই ঢাকায় ফিরেছিলাম। সেই মানুষের সাথে দু-সপ্তাহ ব্যবধানে আবার কোন প্ল্যান করা যায়? কিন্তু প্ল্যানটা পাশ হয়ে গেল। সকালে যাত্রা শুরু করি। আমি নির্ধারিত সময়ের ১ ঘণ্টা পূর্বেই পৌঁছে যাই। রাস্তায় তেমন একটা কষ্ট হয়নি, নির্ধারিত সময়ের আগেই গন্তব্যে পৌঁছানো আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অজানা-অচেনা জায়গায় চেনা-জানার ভান করে লোকজনের সাথে কথা বলে সময় পার করছি। কিছুক্ষণের মধ্যে এক ভদ্রলোক চা খাওয়ার জন্য অফার করলো। আমার চা খাওয়ার কোনো অভ্যাস নেই, আগ্রহ নেই, নেই ইচ্ছাও। কিন্তু সময় কাটানোর জন্য ভদ্রলোকের আগ্রহে সাড়া দিই। আমার পরিচয় জেনে তার ভালো লাগলো, খানিকটা আমারও ভালো লেগেছে। কিছুটা সাদা মনের মানুষ। যা বলে ক্লিয়ার বলে, যা করে ভেবেচিন্তে করে।

 

আশপাশের দোকানগুলো কেবল খুলছে, এখনও চা খাওয়ার আয়োজন শেষ হয়নি। আমার খুশি খুশি ভাব দেখে জিজ্ঞাসা করলো আপনি কি কারো জন্য অপেক্ষা করছেন? হ্যাঁ সূচক জবাব শুনে তিনি হাসলেন। তিনি প্রতিদিনই এমন কাউকে না কাউকে কারো জন্য অপেক্ষা করতে দেখেন এখানে। আর তিনি তার সময় কাটানোর জন্য সঙ্গী হওয়ার চেষ্টা করেন। একবার একজন নারীর সঙ্গী হতে গিয়ে বিড়ম্বনায়ও পড়েছেন তিনি। তবুও মন থেকে ভালোবাসেন এমন মানুষকে। অপেক্ষা অনেক কষ্টের তা নিজের জীবন থেকেই লিখেছেন। কাউকে অপেক্ষায় রাখেন না, নিজেও এখন কারো জন্য অপেক্ষা করেন না। এমন অপেক্ষার জীবন যেন কারো জীবনে না-আসে তা-ও কামনা করেন। বেশ মজা পেলাম। কিছুটা মন খারাপও হলো।

 

জীবন চলার পথে কেউ কারো জন্য অপেক্ষা করবে এটা স্বাভাবিক। এটা জীবনের অংশ, এটাকে বাদ দিয়ে জীবন কল্পনা করা খানিকটা কঠিনও বটে। সময় চলছে, থেমে নেই। রেস্টুরেন্টের লোক এসে বললো, স্যার দোকান রেডি, আপনারা এখন দোকানে বসতে পারেন। তবে আজকে চায়ের আয়োজন নেই। যে চা বিক্রি করে তার নাকি কেউ একজন আসবে বাড়িতে, তার জন্য আজকে ছুটি নিয়েছে। কেউ বাড়িতে কারো জন্যে অপেক্ষায় আছে। শুনে হাসি আর থামাতে পারলাম না। ভেতরে ভেতরে রাস্তার পাশের দিকে তাকাচ্ছি। কখন আসবে আমার তানি। কিন্তু না, জানতে পারলাম এতক্ষণে সে অনেক দূরে।

 

তিনি কেবল জার্নি স্টার্ট করেছেন। সময় লাগবে। ভদ্রলোকের সাথে গল্পের মোড় অন্যদিকে নেয়ার চেষ্টা করলাম। অমনি অপেক্ষার কাহিনি শুরু করলেন। কিছুটা শোনার পর মিলে গেল আমার সাথে। থামানোর চেষ্টা করে আমার গল্প শোনাতে চাইলাম না। তিনি শুনবেন না, বলবেন। আরো শুনলাম, জানলাম মানুষের জীবন কত বিচিত্র, কত কষ্টের! বারো বছর আগে এখানে কারো জন্য অপেক্ষা করছিলেন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত। হাতে মোবাইল ছিল না। এক সময় খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে থাকেন। অনেক দিন রাতভর অপেক্ষা করেছেন তার প্রিয় মানুষটির জন্য। তখন এখানে লোকজনের কোলাহল ছিল না, ছিল না লোকজনের তেমন যাতায়াত। ঢাকা থেকে যে-বাসটি থামতো অমনি দৌড়ে যেতেন বাসের কাছে। এই বুঝি এই বাসে আমার প্রিয়া আসছে। কিন্তু না, প্রিয়া আর আসে না। অপেক্ষার পালাও আর শেষ হয় না। এক সময় সমাজ-সংসারের লোকজন তার নামের শুরুতে পাগল শব্দ যোগ করে দেয়। কা ন শিকদার থেকে তিনি বনে যান পাগলা কা ন। শোনার পর তার চোখে পানি ছলছল করছিল। কষ্টে কষ্টে বুকে পাথর বেঁধেছেন ঠিকই, মনের মধ্যে পাথর জমেনি আজও। ভালোবাসা বড় নিষ্ঠুর বলে আমার দিকে তাকায়, এতক্ষণে আমার অবস্থা খারাপ। আমারও যে অপেক্ষার পালা চলছে।

 

মনে মনে ভাবলাম আজকে যদি তানি না-আসে, তবে আমারও কি এমনটা হবে? নামের শুরুতে এসব শব্দ যোগ হবে না তো? কিছুটা অন্যমনস্ক দেখে শিকদার জিজ্ঞাসা করলেন কি স্যার ভয় পেলেন নাকি? ভয় পেলে কি প্রেম হবে! প্রেমের জন্য মনে ভয় থাকতে নেই। সাহস রাখেন উনি আসবেন। এখন ডিজিটাল যুগ, না-আসলে খুঁজে পাবেন। কত কী ব্যবস্থা আছে। কিন্তু আমি? এই যে আমাকে দেখেন, আমি আজও আমার ভালোবাসার মানুষের খোঁজে সকাল-বিকাল এখানে আসি। আমার বিশ্বাস আমার ভালোবাসার মানুষটাকে আমি এখানেই খুঁজে পাব। কখন আসবে জানি না, তবে আসবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তখন আমার ছাত্রজীবনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের প্রেমকাহিনি মনে পড়ে যায়। তার জীবনটাও অনেক নাটকীয়তায় ভরপুর ছিল। অনেক অনেক কাহিনি, তবে অনেকটা এই কাহিনির সাথে মিল আছে। আমার জানা মতে, এমন কাহিনি কমবেশি অনেকের জীবনেই আছে। আছে রোমান্টিকতাও। কেউ কষ্ট পায়, কেউবা এর মধ্যেই সুখ খুঁজে নেয়। যেমনটা পাগলা কা ন আজও পথে পথে সুখ খুঁেজ বেড়াচ্ছেন।

 

দেড়/দুই ঘণ্টার আলাপে একবারও তার প্রিয়ার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে কিছু বললেন না, উপরন্তু অনেক গুণের কথা বর্ণনা দিলেন। শুনতে খুব মজা পাচ্ছিলাম। আবার অপেক্ষা করে করে বিরক্তও হচ্ছিলাম। কা ন জানতে চায় আপনার লোক কখন আসবে? হাতে সময় আছে? থাকলে নাকি আরেকখান গল্প শোনাবেন। না ভাই আর শুরু করার দরকার নেই। এইখান শেষ করেন। কিছুটা বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকায় আমার দিকে। ইতোমধ্যে খাবার রেডি হলো, তাকে অফার করলাম। রাজি হওয়া মাত্র খাবার খেতে খেতে গল্পের শেষটা জানতে চাইলাম। এবার তিনি বেঁকে বসলেন। গোঁ ধরলেন, আমার গল্প তাকে শোনাতে হবে। আমার গল্পের কাহিনি শোনানোর আগ্রহ তো নেই, আবার সময়ও নেই। এখনই আমার তানি যে এসে পড়বে, কী যে অস্থির লাগছে। ভেতরটায় কম্পন শুরু হয়েছে। ফোনে চেষ্টা করছে, রিসিভ করতে পারছি না। ফোন করতে ইচ্ছা করছে। ভাবলাম লোকটাকে বিদায় দিতে হবে আর দরকার নেই গল্প শোনার। এখন যে আমার জীবনের গল্পটা শুরু হবে। লোকটা আমার অবস্থা বুঝতে পারে। স্যার, আপনার লোক মনে হয় এসে যাবে, তাই না?

 

আপনি কত ভাগ্যবান মানুষ। আমি তাকে আশায় বুক বাঁধতে বলি। একদিন ঠিকই আপনার প্রিয়াকে খুঁজে পাবেন বলতেই আমাকে আলিঙ্গনের চেষ্টা করে, আমি তাকে থামতে বলি। এটা যে কেবল তানির জন্য প্রস্তুত, তা কী করে অন্যকে বিলিয়ে দিই। লোকটা বেশ মন খারাপ করে আমার দিকে তাকায়। আমি খুব কম মানুষের শরীরের গন্ধ সহ্য করতে পারি। আরো অচেনা-অজানা লোক। যাক, এরই মধ্যে তানি ফোনে জানতে চায় আমি ঠিক কোন জায়গাটায় আছি। লোকটার সাথে গুড বাই জানিয়ে আমার অপেক্ষার পালা শেষ করি। তাকাতেই দেখি রিক্সায় তানি হায় দিচ্ছে। এতক্ষণের গল্পের উত্তাপ আর অপেক্ষার বিড়ম্বনায় শরীর কিছুটা ঘর্মাক্ত। নির্মল বাতাসের জন্য গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দু-চারটা সেলফি তোলার চেষ্টা। তানির মোবাইলের ক্যামেরাটাও অন হয়ে গেল। বাহ! দেখি সেলফি স্টান্ডও নিয়ে এসেছে। শুরুতেই একখান ছবি তুলে ফেললাম। দেখার মতো তবে রাখার মতো নয়। এ-ছবি আজকে আমাকে দিতে হবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেলাম না।

 

পূর্বের দিনের মতোই হবে জানতাম। তবুও ছবি তুলে যাওয়া নিরন্তর গতিতে বিভিন্ন লোকেশনে আর বিভিন্ন স্টাইলে। জায়গাটা বেশ সুন্দর। পুকুরপাড়, চারদিকে ছোট ছোট নারিকেল গাছ। গরমের মধ্যে গাছের ছায়া আর পুকুরের পানির হিমেল হাওয়া শরীরকে মুহূর্তেই সচল করে তুললো। মনোরম পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে শুরু করলাম। নানা প্রশ্নের উত্তর দেয়া শুরু হয়েছে। ছবি তোলাও বাদ যাচ্ছে না। অনেক দিনের অস্থিরতায় তানি বেশ কাতর। বোঝা যাচ্ছে চাহনিতে অবাক চাহনি। চোখ ফেরায় না। কী দেখছ অমন করে? এভাবে কি দেখা ঠিক। আমার আর কিছুতে মন নেই, শুধু একজনকে দেখতেই ভালো লাগছে। সকালবেলার রদ্দুরটা বেশ তাপ দিচ্ছে, সাথে গরম লু হাওয়াও বইছে। চারদিকে সবুজ গাছপালা, তার বুক চিরে জোড়ায় জোড়ায় প্রেমিক-প্রেমিকা বের হচ্ছে একটু পরপর। সবাই আমাদেরকে দেখে কী ভাবছে জানি না। তবে তাদের মতোই ভাবছে হয়তো। কারণ আমাদেরও ওদের সাথে একাকার না-হলে মানাচ্ছে না বুঝলাম।

 

শুরুতেই কিছুটা বিব্রতবোধ করলেও কিছুক্ষণ পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। হাওয়া বদলের খেলায় মনের ভেতর শুরু হয় ভালোবাসার গুঞ্জন। উঁকি দেয় এক অজানা-অচেনা দৃশ্যের, যা ১৬ বছর আগের। হারিয়ে যেতে লাগলাম। গানে গানে ভাবনার জগৎ ঘুরে আসলাম মুহূর্তের মধ্যে। তানির ইচ্ছাগুলো পূর্ণ করার প্রচেষ্টা কিন্তু আমি..। না, আমার সব ইচ্ছা পূর্ণ হবে না, ইচ্ছাও নেই। কিছুটা মনকে মানিয়ে নেয়া, বুঝতে দিলাম না ওকে। যখন বুঝে ফেলল আমার চাহনি, কী যে আচরণের শিকার হলাম তা কষ্ট করে বলে বোঝাই ওকে। সম্ভব হলো না, কোনোভাবেই ভালোবাসার গন্ধ ছড়ানো যাচ্ছে না। সকালে ১ ঘণ্টার জন্য এসেছি অথচ এতক্ষণে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। কিছু খাওয়ার আগ্রহ জাগে, পাশে থেকে চেষ্টা করে প্রথম দফায় ব্যর্থ। পাশের দোকানে চাইনিজ আইটেম খাওয়ার জন্য অর্ডার দিলো তানি। আমার পছন্দের আইটেম খুব একটা পেলাম না।

 

ওর প্রিয় খাবারটা খেয়ে আবার বের হলাম। উদ্দেশ্যটা ঘোরাঘুরি; সময় ক্ষেপণ করা। দুজনেরই ফেরার তাগাদা আছে কিন্তু কেউ কাউকে ছাড়তে ইচ্ছা করছে না। সামনে একটা পুল চোখে পড়ে, বেশ সুন্দর ছবি, ভিডিও হলো। সাথে সাথে অন্যরকম এক অনুভূতির জগতে প্রথম প্রবেশ। কল্পনা করা যায়, বাস্তবে পাওয়া কঠিন। আনন্দ-বেদনা সাথি করে অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। বড্ড বেশি হয়ে গেল, কে শোনে কার অভিযোগ। এখন যে এসব শোনার কারো সময় নেই। ব্যথাকাতর ভগ্ন হৃদয়ে কিছুটা অন্যরকম সময় পার করছি। সুন্দর সময়ের অপেক্ষা, প্রিয় যাই যাই বলো না। আর কিছুটা সময় না হয় থাকো কাছে।

 

সামনেই গিফট আইটেমের দোকান, বেশ আগ্রহ নিয়ে প্রবেশ করলাম। তানির পছন্দের কিছু জিনিস প্রাপ্তির খোঁজাখুঁজি। কিছুটা আশা পূর্ণ হলো, সাথে আমার জন্যও কিছু। স্মৃতিকে বহন করতে হবে, কষ্ট লাগবে তদুপরি প্রিয় মানুষের স্মৃতি। রিক্সায় চেপে কিছুদূর পথচলা। এদৃশ্য জীবনে প্রথম দেখা হলো, ভালোলাগার পরশ বুলিয়ে গেল ক্ষণিকের জন্য। বিদায় বেলা উড়ন্ত ভালোবাসার দুরন্ত সাহস আমাকে খানিকটা হালকা করেছে; দেখা হবে কথা হবে, কিন্তু এমন দৃশ্যটা আর দেখা যাবে না। জার্নির কষ্ট বাতাসে মিলিয়ে গেল আমার। দেহটা বিভক্ত হলো ক্ষণিকের জন্য। মনটা থেকে গেল স্মৃতির দুয়ারে। স্মৃতি-বিস্মৃতির এই পাস্থশালায় আমরা দুজন ক্লান্ত পথিক। ফেরা হলো আপন আলোয় দুজন দুজনায়।

 

মনের টেনশন দূর করার চেষ্টা কতটা সফল হলো জানি না। তবে আগামীকাল সকালে কলেজের ঝামেলায় নিজেকে জড়াতে হবে। আজ সারাদিন আমাকে ফোনে কেউ তেমন একটা পায়নি। যে টেনশন দূর করার জন্য বিগত একমাস চেষ্টা করলাম তা কখনোই আর দূর করা সম্ভব হলো না। মন ভালো না-থাকলে লেখা যায় না। আমি জানি কিন্তু কিছু যে করার নেই। কী করব সিদ্ধান্তের জন্য তানির শরণাপন্ন হলাম বারবার কিন্তু ওর সাফ কথা কলেজ ছাড়া যাবে না। কলেজ ছাড়লে আমার জীবন হুমকির মুখে পড়বে, এটা ও ভালোভাবে আঁচ করেছে। আমাকে ও হারাতে চায় না, আমিও চাই না। তাই চেষ্টা প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। মাঝে মাঝে ভাবি এ-বিষয়গুলো ওকে কেন জানাচ্ছি, আমি চাই না তারপরও বলা হয়ে যাচ্ছে ও জেনে যাচ্ছে। সিদ্ধান্তহীনতায় আমি থাকতে অভ্যস্ত নই। ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত নিতে পারি আমি। এজন্য কখনো কখনো সফল হয়েছি। আবার ব্যর্থ যে হইনি তা নয়।

 

ব্যর্থ শব্দটা আমার মোটেই পছন্দ না। সবসময় এড়িয়ে চলি এ-শব্দটাকে। তারপর মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যায় পরিচিত এই শব্দের সাথে। কে জানে এবার কলেজ নিয়ে কী পরিণতি হয়। কোন্ ব্যর্থতা আমাকে পেয়ে বসে। তানি বারবার জানতে চায় সমস্যায় সমাধান হলো কি না, কোনো ব্যবস্থা হলো কি না। না সূচক জবাব দিলেই ওর মনটা খারাপ হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি ওকেও আমি একটা ঝামেলায় ফেলেছি। ও ওর মতো চেষ্টা যে করে না তাও না। কিন্তু ফলাফল না-আসা পর্যন্ত কারোরই ঘুম নেই। সমস্যা থাকবে তাই বলে তা উত্তরণের কোনো পথ নেই। না, এমনটা হতে পারে না। সমাধান হতেই হবে। সমাধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

হঠাৎ আমাকে ওর গোল্ড বিক্রির প্রস্তাব দেয়। আমার শরীর কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। টেবিলে বসে থাকি অনেকক্ষণ, চিন্তার জগতে প্রবেশ করি আবারও। ওকে ফোন দেবার কথা কিন্তু ফোন আর দেয়া হয় না। ও কী প্রস্তাব করলো আমাকে? কেন ওর গোল্ড বিক্রি করে আমার সমস্যার সমাধান করবে। কী লাভ ওর। কী সম্পর্ক আমাদের মাঝে। না, এসব প্রশ্নের সদুত্তর আমার কাছে জানা নাই। আমাদের মাঝে যে সম্পর্ক বিরাজ করছে তাতে কেউ কি এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে? না, পারে না। হওয়া উচিত না এমন।

 

কী ভাবনায় ফেলে দিল আমাকে, আমি ওর মুখোচ্ছবি দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে যাই। কিছুক্ষণের জন্য। কিন্তু কোথায় পাব ওর ছবি, কেমন ওর চেহারাটা। ভাবনার জগতে ওর চেহারাটা ভেসে ওঠে বারবার। কী যেন মায়াবী একটা ভাব আছে ওর চেহারায়, আমাকে বেশ আকর্ষণ করে। চেহারা, দেখা হবে না তাই ফোনে কথা বলে জানি আমাকে হেল্প করার জন্য অন্য এক পরিকল্পনার কথা। শুনে কষ্ট হলো। কেনইবা এভাবে আমার বিপদে ওকে সাথি করলাম। কেউ কিছু নষ্ট করে আমার জন্য কিছু করবে এটা আমার শুনতে ভালোলাগে কিন্তু বাস্তবে এমনটা মানতে পারি না। দারুণ কষ্ট লাগে, আমার ভাবতে ভালোলাগে না। কেন মানুষ আমার জন্য এমন কিছুু করবে? আমি তার জন্য কী করেছি। কিছুই তো আমি করতে পারবো না। যদিও তানি কোনো প্রতিদানের আশায় আমাকে কোনো হেল্প করছে না তা আমি ভালো করেই জানি।

 

সকালে ক্লাস প্রেজেন্টেশন, আরো কত কাজে ব্যন্ত থাকবে ও। এর মাঝেও আমার জন্য ব্যাংকের ঝামেলা পোহাতে হবে ওকে। আমি নিজের কথা ভাবলে দিশেহারা হই, সেক্ষেত্রে ও কীভাবে ম্যানেজ করবে জানি না। ওর এ-বিষয়ে বেশ কৌতূহল আছে। কাজের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পায়। এমন কাজ করতে ওর ভালোলাগে আমাকে এ-কথা অনেকবার বলেছে। বাস্তবেও তাই দেখছি। নিজের জন্য কোনো কাজ করতে নারাজ। তবে অন্যের কাজের তাগিদ দিবারাত বিরাজ করে ওর মনে। জীবনটা খুব ছোট্ট, সময় খুব কম। তাই এ-সময়ের মাঝে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা কেন থেমে থাকবে বিশাল কিছু অর্জনের জন্য এমন যুক্তি ওর। যুক্তি নয় বাস্তবতাও এমন হওয়া উচিত। আমাদের ছোট্ট জীবনে বড় বড় কাজ করার সময় কোথায়। সুযোগও কম আসে, তাই সময় সুযোগের সমন্বয় হলে অনেক আনন্দ নিয়ে কাজ করা উচিত।

 

মাঝে মাঝেই ওকে প্রশ্ন করি তুমি কেন আমকে এত পছন্দ করো? ওর যখন যা মনে আসে তাই বলে আমাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে। তবুও যেন উত্তরে আমার মন ভরে না। আবারও একই প্রশ্ন করি। এবার একটু ভিন্ন উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে। আমি যেহেতু লেখালেখি করি সেহেতু বাংলা বানানের প্রতি একটু সতর্ক দৃষ্টি রাখি। চেষ্টা করি সঠিক বানান জানার এবং জানানোর। তানি মাঝেমধ্যে ২/১টা বানান কিংবা কোনো শব্দের অর্থ আমাকে জিজ্ঞাসা করে। আমি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করি। আর এটাই নাকি আমাকে ভালোবাসার কারণ। যাক আজকে নতুন একটা কারণ জানা গেল।

 

এরই মধ্যে অনেক কারণ জেনেছি, এটা নতুন কারণ। শুনে ভালো লাগলো। কেননা আমি বহুদিন যাবত বাংলা বানান নিয়ে সতর্ক আছি। প্রতিনিয়ত শিখছি কিন্তু কেউ কোনোদিন এজন্য আমাকে ধন্যবাদও দেয়নি। ভালোবাসা তো দূরের কথা। কোনো কাজের যখন কোনো স্বীকৃতি আসে তখন সে-কাজে মনোযোগ বেশি থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার জীবনে হয়েছে উল্টোটা। আমি বাংলা বানান নিয়ে মানুষের উপর খুব বিরক্ত ছিলাম। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত মানুষগুলোর প্রতি। তারা কোনোভাবেই বানানের প্রতি গুরুত্ব দিতে চায় না। বলা যায় এসব নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছি অনেক। কোনো সুখের স্মৃতি আমার নেই। এবার যখন তানির মুখে শুনলাম ও আমাকে এসব কারণে ভালোবাসে, তখন ভাবলাম আমার কষ্টটা অনেকটা সার্থক হয়েছে। বলা যায় এ-কথা শোনার পর অনেকগুলো কঠিন বানাননীতিতে আমি আবার একটু চোখ বোলাই। আসলে বানান শিখে শিখে মনে রাখা যায় না, যদি না চর্চা থাকে। তাই বানান জানতে হলে চর্চা করতে হবে, আর লেখালেখিতে বেশি সতর্ক হতে হবে। কলমে যা আসে তা লিখলে বানান শেখা যাবে না।

 

তানি নিজেও বানান সম্পর্কে যে সচেতন তা ওর কথাবার্তায় ভালো বোঝা যায়। তবে ওর লেখালেখি দেখিনি অনেকদিন। যখন দেখেছি তা এখন আর খেয়াল নেই। মনে রাখিনি এসব বিষয়ে, জানতাম না এ দিয়ে কী হবে, কোন কাজে লাগবে এসব। না-বুঝেই চলেছি জীবনের অনেকটা পথ আর বাকিটা পথ এমনিতেই শেষ হয়ে যাবে। তানি এসব কথায় খুব বিশ্বাস করে। আমার আবার এসবে যথেষ্ট আপত্তি আছে। ও মাঝেমধ্যে আমাকে খোঁচায় আমি খানিকটা মজা নিয়ে ওকেও আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করি। তবে ওর শেখার আগ্রহ আছে খুব। তবে ছাত্রজীবনে এমন কোনো আগ্রহ ওর মধ্যে লক্ষ করিনি। ছাত্রজীবনে এমন আগ্রহ থাকলে ওর নাকি প্রাইমারিতে পড়ে থাকার কথা নয়। আসলেও তাই ওর বড় বোন তাহমিনা আপার বেজায় ক্ষোভ এসব বিষয়ে। ওকে নিয়ে হয়তো ভিন্ন কোনো আশা ছিল তার। কিন্তু সে-আশায় গুড়েবালি। ও যে কেন চেষ্টা করেনি তা আজও জানা হয়নি, তবে জানার চেষ্টা করা কমবেশি অচিরেই। তবে এও জানি সহজে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। পাওয়া গেলে সন্তুষ্ট হবো কিনা জানি না। কারণ ওকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রশ্ন করলে তার উত্তর আমার কখনোই মনঃপূত হয় না। যদিও আমি মনঃপূত উত্তরের জন্য ওর পেছনে লেগে থাকি, বারবার প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। যখন একাধিক উত্তর পেয়ে যাই তখন মনঃপূত উত্তরটি ওর মনের কথা বলে ধরে নিই।

 

 

 

%d bloggers like this: