আমার সাতকাহন-৯ / ছন্দা দাশ

আমার সাতকাহন 7

আমার সাতকাহন

আমার সাতকাহন-৯ / ছন্দা দাশ

 

সবদিন তো আর সুখের হয় না।কখনো দিন আসে ঘোর অন্ধকার হয়ে। তেমনি একদিন এলো আমাদের। তখন বাজার রোজ রোজ বসতো না।সপ্তাহে দুদিন বা একদিন। আমাদের বাজার বসতো শনি আর মঙ্গলবার। সে বাজারের নাম ছিল কালাইয়্যার হাট। আরও একটি বাজার ছিল তার নাম লাম্বুরহাট।বাসা থেকে অনেক দূর ছিল সেটি। মা কেষ্টদাকে পাঁচটাকা দিতেন। পাঁচটাকা দিয়ে কেষ্টদা পুরো ঝুড়ি ভরে বাজার আনতো।হাতে ঝুলতো একজোড়া ইলিশ।কখনো বা অন্যমাছ।হাটের  দিন খেলতে খেলতে দেখতাম হাটুরেরা ফিরছে। মাথায় নিয়ে বাজার রাস্তার ধূলি উড়িয়ে।কেষ্টদা কখনো আমাদের জন্য নিয়ে আসত কাঠি লজেন্স,সিগারেট লজেন্স,গোল গোল কতক লজেন্স ছিল তার নাম আজ আর মনে নেই।কেষ্টদা আবার সেই টাকা থেকে পয়সাও

চুরি করতো। বাজার আসার পর মা বারান্দায় বসে মাছ কুটতে বসলে আমরাও গোল হয়ে মায়ের পাশে বসে যেতাম। বাবাও চেয়ার টেনে নিয়ে গল্প শুরু করতেন। সে এক চাঁদের হাট বলা যায়। সেবারে বাজার এলে পর সবাই যখন মায়ের পাশে গোল হয়ে বসি, মা বলে, কাজল আসেনি? আমি আর বাবু বলি দাদা এসেছে তো? মা চারধার তাকিয়ে বলে ডাকো তাকে।কিন্তু দাদা নেই। মায়ের প্রাণ উড়ে যায়।চার বোনের পর মায়ের কত সাধনার সন্তান দাদা। ব্যাকুল হয়ে এঘর ওঘর করতে করতে মা জ্ঞান হারায়। চারধারে রব উঠেছে অংশুমান হোরের ছেলেকে পাওয়া যাচ্ছে না। সমস্ত পাড়া,আর হিন্দু মুসলিম,বৌদ্ধ ছাত্রাবাসের ছাত্রেরা ছুটে আসে। যত পুকুর আছে সবগুলোতে জাল ফেলে ওরা। কেউ কেউ ছোটে রিক্সা নিয়ে দূর দূরান্তে। আজকের ছাত্রদের কাছে এমনটি আশা আর করা যায় না। আমাদের বাসা মানুষে থৈ,থৈ করছে।কোথাও দাদা নেই। মায়ের অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে চলে  যাচ্ছে। উপায় না পেয়ে এক ছাত্র বুদ্ধি করে বাবুকে কোলে করে বলে,  মাসী এই যে কাজল। মা সেই অবস্থাতেও হাত নেড়ে জানায় ও কাজল নয়। আমার কাজল কোথায়? প্রায় তিন ঘণ্টা পার হয়ে যাচ্ছে। বাবার মুখের দিকেও তাকানো যাচ্ছে না।হঠাৎ আমার বিশ্বভোলা বাবা ভাবলেন সব তো দেখা হলো। লাগোয়া স্নানঘরের সাথে সরু যে গলি ওখানে দেখা হয়নি।বাবা তাঁর টর্চ জ্বেলে আলো ফেলতেই দেখেন দাদা ওখানে গুঁজে বসে আছে হাতে আধ খাওয়া কলা। বাবা ব্যাকুল হয়ে বিশ্বখুঁজে পাওয়া হৃদয়ে দাদাকে কোলে তুলে নেন।

দাদাকে যতই প্রশ্ন করে তুমি ওখানে কেন? সে কিছুই বলতে পারে না।ছোটকা বলেন, ও বোধহয় ভয়ে ওখানে লুকিয়েছে।কিন্তু তার কোন সদুত্তর নেই। সে যাত্রা আমাদের বিপদ কাটলেও দাদা এমন আরেকবার একটা কাজ করেছিল।

শিক্ষক আবাসে শিক্ষকেরা প্রথম দিকে তাঁদের সন্তানদের  বাড়ি থেকে আনতেন না।যখন তাদের লেখাপড়া শুরু হয় তখন স্ত্রী,সন্তানসহ কোয়ার্টারেই বসবাস শুরু করতেন।তেমনি আসে  ইংরেজীর শিক্ষক মনীন্দ্রলাল ভট্টাচার্যির বড় মেয়ে পারুলদির কথা (সেজদি যার নাম দিয়েছিল ললিতা আলু) তার ছোট বোন বীণাপানি আসে দু বছর পর।সে আমারই বয়সী ও একই ক্লাসে পড়ে। তার নামই বীণাপানি। বিদ্যায়  একেবারে অষ্টরম্ভা।

জ্যাঠামশাই দিনরাত ছাত্র পড়াতেন আর ওদের সাথে নিজের ছেলেমেয়েদেরও সারাবেলা পড়িয়েই যেতেন।বীণা অত পড়েও একটি অক্ষরও কেন যে শিখতে পারে নি কে জানে? তবে ওকে নাচতে বলা মাত্র দম দেয়া পুতুলের মত শুরু করে দিত নাচ। তাকে নাচ না বলে লাফানোও বলা যায়।সেজদি তারও একটি সুন্দর নাম দেয়। থঁওর চুমা (তামাকের চোঙা)। বীণা আমার সাথে

যেদিন স্কুলে প্রথম যায় গেইটের সামনে আইসক্রীমওয়ালাকে দেখে কোনমতে আর স্কুলে ঢোকে না। দেরী হোচ্ছে দেখে আমিই শেষে তাকে ফেলে ক্লাসে ঢুকে পড়ি। স্যার এলে পর তার কথা আর আমার মনে নেই। সে স্যার ছিলেন ভয়ানক বদরাগী। তাই ছাত্রেরা তাঁর নাম দিয়েছিলেন, বোলা (ভীমরুল) মাস্টার।হঠাৎ দেখি স্যার রক্তচক্ষু নিয়ে কাকে বলছেন দাঁড়াও।পেছন ফিরে দেখি বীণা। হাতে তার লাল সবুজ,কমলা আর সাদা রঙের চারটি রঙের আইসক্রীম।মনের সুখে খাচ্ছে।স্যার তাকে প্রশ্ন করেন,

এতক্ষণ কি পড়িয়েছি।সে নিরুত্তর।তখন বলেন,  ঠিক আছে জানা থাকলে বলো ‘খর পানি ‘কাকে বলে। এবারে বীণা একগাল হেসে বলে, আমি জানি স্যার।কোন পুকুর গাছের পাড়ে তেঁতুল গাছ থাকলে সে গাছের তেঁতুল যখন পুকুরের পানিতে পরে পানি খর হয়ে যায় তখন সে পানি আর খাওয়া যায় না।তাকে খর পানি বলে। অমন রাগী স্যারও সেদিন হো হো করে হেসে ফেলেছিলেন।

 

বিকেলে খেলার মাঠ থেকে আমাদের সূর্ ডোবার সাথে সাথেই ঘরে ফিরতে হতো।তারপর হাত পা ধুয়ে সবাই প্রার্থনায় বসতাম।বড়দি হারমোনিয়াম বাজাত,বাবা বেহালা নিয়ে বসতেন । আমরা সব ভাই বোন হাত জোড় করে গোল করে আসনের সামনে বসে গাইতাম।কখনো হাবিবুর রহমান সাহেবের ছেলে তুষার,সাগরেরাও আমাদের সাথে বসে গাইতো।সে বড়ো সুন্দর সময়। ধূপের

গন্ধ,দীপের আলোয় সে এক অন্য পৃথিবী যেন। কিন্তু এক একদিন খেলতে খেলতে দেরী হয়ে গেলে আমাদের বুকের রক্ত হিম হয়ে যেত। জানি মা দরজায় বেত হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমি,দাদা,বাবু  ভয়ে আর ঘরে যাই না।মেশিন ঘরের সামনে যেখানে ডাইনামো বসানো ঘর থেকে সন্ধ্যে হলেই বজলদা মেশিন ছেড়ে আমাদের কোয়ার্টারগুলোতে লাইট জ্বালিয়ে দেয়। তার সামনের লাইট পোস্টের নীচে বসে থাকি বাবার অপেক্ষায়। বাবা অধ্যাপক হোস্টেল বা কলেজ থেকে ফিরবে তখন বাবার হাত ধরে ঘরে ঢুকবো।তবে মা আর মারতে পারবে না। বজলদার হাসিটা ছিল একদম শিশুদের মত। আমাদের খুব আদর করতো।উনিও আমাদের সামনে ঘাসের উপর

বসে বসে কত গল্প করত। এখন আর বড় ছোট মানুষ এভাবে মিশতে দেখি না।বাবা আসতে দেখলেই একছুটে বাবার হাত ধরে ঘরে ঢুকতেই মায়ের রক্তচক্ষু। কিন্তু

সে বাবার উপর দিয়েই যেত। আমার শান্তিপ্রিয় বাবা নীলকণ্ঠের মত সব ধারণ করে সংসারে মহাদেবের মতই বিরাজ করতেন।বাবা যখন বৃদ্ধ একদিন দেখি বাবা ছোটভাই বাবুর হাত ধরে চলেছেন সেলুনে চুল কাটতে। হাত বদল হয়ে গেছে। পুত্র এখন বাবা।বুকে কষ্টের একদলা খাঁমচে ধরেছিল সেদিন।

 

একদিন মায়ের রাগ ভীষণ। দাদা ভয়ে চোখ বন্ধ করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে।যেন শরীর খারাপ।মা ঘরে ঢুকে দাদাকে শুয়ে থাকতে দেখে ব্যাকুল হয়ে ছোড়দিকে বকা দিয়ে বলেন, আহা ছেলেটার শরীর খারাপ লাগছে মনে হয়। বালিশ ছাড়াই শুয়ে পড়েছে দেখনি? কেন তাকে বালিশ দাওনি? এসব কখন শিখবে? আমার চুপচাপ থাকা ছোড়দি এ ব্যাপারটি মেনে নিতে পারেনি।তাই বললো কাজল তো ঘুমায়নি। দেখছোনা ও চুপচাপ শুয়ে আছে? ঘুমালে তো পা নড়ে। আর দাদা তখুনি তার পা নাড়াতে লাগলো।মা আর কি করে হাসি চেপে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন।

(চলবে)

ছন্দা দাশ 
ছন্দা দাশ
%d bloggers like this: