বাহিরে যার হাসির ছটা, ভেতরে তার চোখের জল

বাহিরে যার হাসির ছটা, ভেতরে তার চোখের জল

মহিলাকে বরাবরই খুব হাসি খুশি মনে হত আমার। দেখতে সুশ্রি, চটপটে, মাঝারি গড়ন। পোশাক আশাকে সৌখিন তবে অশালীন নয়। ব্যবহারে চমৎকার। দেখা হলেই হেসে কাছে এসে হাত জড়িয়ে ধরে। কুশলাদি জানতে চায়। ওনার দিকে তাকালেই কেন জানি ভাল লাগে। মনে হয়, যাক এখনও পৃথিবীতে সুখি মানুষ আছে!
ওনাকে আমরা ভাবি ডাকি। ভাবির নামটা শুনেছিলাম কখনও, কিন্তু মনে রাখতে পারিনি। উনি আমাদের খুবই আমুদে আর প্রিয় ভাবি এটাই যথেষ্ট। ওনার স্বামী সম্পর্কে আমার সিনিয়র সহকর্মি ।
ওনার স্বামী রফিক ভাইও খুব প্রিয় আমাদের। ছোট খাট গড়নের মানুষ। হাসিখুশি, প্রাণবন্ত এবং আন্তরিক। বেশ ভাল সোশাল কানেকশন আছে তার। সভা সমিতি ক্লাবের দিকে ঝোঁক আছে। তবে বাজে কোন অভ্যাস আছে বলে কখনও শুনিনি। ভাইকেও বরাবর ভাবির প্রতি কেয়ারিং মনে হয়েছে। যেখানেই যায় দুজনে একসাথে, দুজনের মুখেই হাসি। এই হাসির আকারের দিনে তাকিয়ে কার না ভাল লাগে!
দুজনেরই দ্বিতীয় বিয়ে। বেশ অনেকদিন চুটিয়ে প্রেম করার পর মিতা ভাবিকে বিয়ে করেছিলেন রফিক ভাই। খুব সুখে ছিলেন দুটিতে। হঠাৎ কঠিন অসুখে মারা যান মিতা ভাবি। মেয়েরা তখন বেশ বড় । স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যা প্রেম ছিল তাতে সবাই ধরেই নিয়েছিল ভাই আর বিয়ে করবেন না। ভাবির স্মৃতি নিয়েই কাটিয়ে দেবেন জীবন। বাস্তবে তা ঘটেনি। বছর না ঘুরতেই বিয়ে করেছেন ভাই । স্বাভাবিকভাবেই বড় বড় মেয়ে দুটো বাপের দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নেয়নি। তবে তেমন কোন সিনক্রিয়েটও করেনি। ওদের পরিবারে তেমন কোন বিকট সমস্যা আছে বলেও কখনও শুনিনি। মেয়ে দুটো বড় হয়ে গেছে। লেখাপড়া শেষ করে নিজেদের পছন্দমতো বিয়েও করেছে।
ভাবির আগের স্বামীর সাথে কি ঘটেছিল তা আমার জানা নেই। তবে তারও বেশ বড় একটা মেয়ে আছে। মেয়েটাকে স্বামীর কাছে রেখে তিনি এসেছেন নতুন সংসার করতে। আর দুটিতে আছেনও বেশ।

সেদিন থার্টি ফার্ষ্ট নাইটে একটা অনুষ্ঠানে দেখা হল দুজনের সাথে। যথারীতি হাসিখুশি। আমার দু রো আগে বসেছিলেন। দেখেই পাশে ডাকলেন। স্বামী বন্ধুদের সাথে চা খেতে গেছেন। সেই চেয়ারে বসালেন আমাকে । কুশলাদি জানতে চাইলেন। আমিও জানতে চাইলাম তার কুশলাদি, মেয়েদের কথা, সময় কেমন কাটছে, চাকরি কেমন চলছে এসব। ভাবি তড়বড় করে কথা বলছিলেন। চাকরির প্রসঙ্গ আসতেই থমকে গেলেন। কোন উত্তর দিলেন না। আমি ভাবলাম, উনি বুঝি শুনতে পাননি। দ্বিতীয়বার বললাম। ভাবি এবারও বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর থেমে থেমে বললেন,
: চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি ।
: সেকী কেন ভাবি! এই দিনে কেউ চাকরি পায় না। আর আপনি অমন ভাল চাকরিটা ছেড়ে দিলেন।
: আপনার ভাই পছন্দ করেন না। বুয়ার রান্না খেতে চান না। রাগারাগি করেন। বলেন, ‘আমরা মাত্র দুটো মানুষ । আমাদের কি ভাতের অভাব!’
: ভাবি মানুষ কি ভাতের অভাবের জন্য চাকরি করে?
: করে না। আমিও করিনি। কিন্তু কি করব। সংসারের শান্তির জন্য ছাড়লাম । একবার সংসার ভেঙে এসেছি। আবার যদি..
ভাবির গলা ধরে এল। মনে মনে ভাবলাম সেই অতি পুরাতন কথা,‘বাহিরে যার হাসির ছটা, ভেতরে তার চোখের জল।’

Author: রক্তবীজ ডেস্ক

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts